Published : 09 May 2026, 12:10 PM
যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে উচ্চশিক্ষিত হয়ে মেয়ে একদিন দেশে ফিরবে-এমন স্বপ্ন নিয়েই একদিন শাহজালাল বিমানবন্দরে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছিলেন বাবা–মা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল নির্মম এক হত্যাকাণ্ডে। যে মেয়ের দুমাস পরে দেশে ফেরার কথা ছিল, বিমানবন্দর থেকে তারই কফিনবন্দি মরদেহ বুঝে নিতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।
শনিবার সকালে দুবাই থেকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে বৃষ্টির কফিন ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এরপর ১০টা ২০ মিনিটে মরদেহ গ্রহণ করে তার পরিবার।
মেয়ের কফিন পাওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবা। এ সময় মা আলভি বেগমের আহাজারি থামছিল না। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বারবার মেয়ের নাম ধরে ডাকছিলেন।
সেখানে আরও ছিলেন বৃষ্টির ভাই, নানা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। তাদের কেউ কেউ কফিন ছুঁয়ে দেখেন।
বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে নিয়ে যাওয়ার আগে এমন দৃশ্যই দেখা গেল ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, আগামী ১৭ জুলাই রাতে দেশে ফিরবেন বৃষ্টি, আর তারা ভিড় করবেন বিমানবন্দরে। কিন্তু সেসব আশা ভরসা এখন বিলীন। বৃষ্টি দেশে ফিরলেন ঠিকই কিন্তু নিথর দেহে।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, “মেয়েকে এভাবে মরদেহ হয়ে দেশে ফিরতে হবে, এ জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল অনেক বড় কিছু করার। অত্যন্ত পরিশ্রম করে পড়াশোনা করত।”

তিনি বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানেও ছিলসমৃদ্ধ। কোরআন-হাদিস সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ছিল তার এবং নামাজ-কালামে কখনো অবহেলা করেননি।
“একপর্যায়ে স্কলারশিপ পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান বৃষ্টি। সেখানে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা ছিল তার। বিশেষ করে গ্রামের অসহায় ও দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল।”
বৃষ্টির বাবা বলেন, “গ্রামের বাড়িতে বৃষ্টির নকশা করা একটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবারের আশা ছিল, দেশে ফিরে মেয়েই বাড়িটি উদ্বোধন করবেন। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তার স্বপ্ন ছিল ‘ড. নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি’ নামে পরিচিত হওয়া। যদিও তিনি একটি সনদ অর্জন করেছেন, সেটি এসেছে মরণোত্তরভাবে।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জহির উদ্দিন আকন বলেন, “আমি সবার কাছে মেয়ের জন্য দোয়া চাই। একই সঙ্গে হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করি। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন কুখ্যাত ঘাতক এ কথা বিশ্ববাসী জানে।
“বাংলাদেশের প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও যেন হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে জোরালো অবস্থান নেওয়া হয়, সেই প্রত্যাশা জানাই।”
এদিন বিমানবন্দরে উপস্থিত পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে নিহত শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার কাজ করে যাচ্ছে।”
এ ঘটনায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সকাল সাড়ে ১০টায় বৃষ্টির মরদেহ শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মাদারীপুরে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়।
সেখানে বাদ আসর বৃষ্টির জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে দাদা–দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
একই ঘটনায় নিহত জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ গত ৪ মে দেশে পৌঁছায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক জামিল আহমেদ লিমন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন।
অন্যদিকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
গত ১৬ এপ্রিল এই দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হন। তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া গেলে পরিবারের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরে গত ২৪ এপ্রিল স্থানীয় একটি সেতুর কাছ থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে।
লিমনের লাশ উদ্ধারের পর ওইদিনই তার রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ নিহত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে।