Published : 13 Sep 2026, 07:16 PM
আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট ডাকাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট।
একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আদালতের কোনো রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল ডাকলে বাস মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার এক রিট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি ফয়সাল হাসান আরিফের বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালত রায় বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) নির্দেশ দিয়েছে।
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক-চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের পর পরিবহনশ্রমিক ও মালিকদের ডাকা ধর্মঘটের প্রেক্ষাপটে রিট মামলাটি করা হয়েছিল।
জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে ২০১৭ সালে মামলাটি করা হয়।
হাই কোর্টের রায়ের বিষয়ে রিট আবেদনকারী পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রায়ে স্বরাষ্ট্রসচিব, বিআরটিএ এবং বিআরটিসির প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল ডাকলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।”
রায়ে আদালত বলেছে, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুসারে আদালতের রায় সবার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকলেও রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা অবৈধ এবং সংবিধান পরিপন্থি।
২০১১ সালের ১৩ অগাস্ট ‘কাগজের ফুল’ সিনেমার লোকেশন দেখে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরের জোকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নির্মাতা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন।
ওই দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক মুস্তাফিজ, তারেক মাসুদের প্রোডাকশন ম্যানেজার ওয়াসিম ও কর্মী জামালও মারা যান।
গাড়িতে থাকা তারেকের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, চিত্রশিল্পী ঢালী আল-মামুন ও তার স্ত্রী দিলারা বেগম জলি এবং তারেকের প্রোডাকশন ইউনিটের সহকারী সাইদুল ইসলাম আহত হলেও তারা প্রাণে বেঁচে যান।
পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনায় করা মামলায় ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রায় দেয় মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত। রায়ে বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর ওই জেলায় পরিবহনশ্রমিকেরা পরিবহন ধর্মঘট ডাকেন। এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হলে এইচআরপিবি রিট মামলাটি করে, যার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাই কোর্ট রুল জারি করেছিল।
আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা রুলে জানতে চাওয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট বা হরতাল প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পাশাপাশি গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। এ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে বিআরটিএর পক্ষ থেকে হাই কোর্টে কমপ্লায়েন্স দাখিল করা হয়।
আদালতে রিট মামলার পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আহসান হাবীব, বিআরটিএর পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ রাফিউল ইসলাম এবং বিআরটিসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী হাসিবুল হক।
বিআরটিএর আইনজীবী রাফিউল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আদালতের কোনো রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল ডাকা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ধরনের হরতাল বা অবরোধ ডাকলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকসংগঠনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা বিআরটিএর পক্ষ থেকে বলেছিলাম, যে ঘটনার প্রেক্ষিতে হরতাল ডাকা হয়েছিল তা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং কমপ্লায়েন্সও দাখিল করা হয়েছে, ফলে রুলটি নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
“কিন্তু মহামান্য হাই কোর্ট বলেছেন, ‘না, এটি একটি কন্টিনিউয়াস ম্যান্ডামাস হিসেবে আদেশ দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতেও আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যে কেউ হরতাল বা অবরোধ ডেকে বসতে পারে’।”
রাফিউল ইসলাম বলেন, “এই আদেশটি মূলত সড়ক পরিবহনকেন্দ্রিক। অর্থাৎ রাস্তায় যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এবং মামলার পর কোনো চালক বা মালিককে সাজা দেওয়া হয়, তবে সেই সাজার বিরুদ্ধে কেউ হরতাল বা অবরোধ ডাকতে পারবে না। ডাকলে তা অবৈধ হবে।”
রিটকারীদের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুসারে যেকোনো রায় ও নির্দেশনা মানতে সব কর্তৃপক্ষ বাধ্য। দুর্ঘটনার কারণে চালককে সাজা দেওয়ার প্রেক্ষিতে মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে আদালতের আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। একইসঙ্গে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলের মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।