১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ওবায়দুল কাদেরকে ‘পলিটিক্যাল ক্লাউন’ বললেন প্রধান কৌঁসুলি

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাত আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ করেছে প্রসিকিউশন।

ওবায়দুল কাদেরকে ‘পলিটিক্যাল ক্লাউন’ বললেন প্রধান কৌঁসুলি
আমিনুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Aug 2026, 07:05 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:49 PM

কার্যাক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ‘রাজনৈতিক জোকার’ বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করার পর ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “আওয়ামী লীগ সবসময়ে তারা যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকত বা থাকে, তখন তারা নিজেকে প্রথম শ্রেণির নাগরিক এবং অন্যদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবত বলে আজকে আমি আমার যুক্তিতর্কে উপস্থাপন করেছি।

“আমি এটাও বলেছি যে আওয়ামী লীগের যে সেক্রেটারি জেনারেল, অর্থাৎ ওবায়দুল কাদের, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রাজনৈতিক জোকার বা পলিটিক্যাল ক্লাউন। কারণ তিনি, তার যে বিভিন্ন সময়ের ডায়ালগ, কথাবার্তা এটা কখনোই কোনো একজন রাজনৈতিক নেতাসুলভ কোনো বক্তব্য নয়, হতে পারে না। তিনি একজন টিকটকার হিসেবে তাকে সকলে অভিহিত করেন। তার বক্তব্যকে টিকটকাররা ব্যবহার করে তারা ফেইসবুকে নানা রকমের পোস্ট দেয়।”

ওবায়দুল কাদেরের মতো একজন ‘জোকারকে’ দলের সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী লীগ বিপর্যস্ত হয়েছে মন্তব্য করে 

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য, কর্মকাণ্ডের জন্য ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, অঙ্গহানি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন ঘটে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।

আন্দোলন দমাতে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি।

বুধবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার সমাপনী যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন। 

ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। 

পলাতক অবস্থায় তাদের বিচার চলছে।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “ওবায়দুল কাদেরের এই যে সহযোগী ছয়জন, তারাও কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছদ্মাবরণে প্রকৃতপক্ষে তারা ছিলেন আসলে দুর্বৃত্তপরায়ণ। তারা ছিলেন দুর্নীতিবাজ, তারা ছিলেন দুষ্কৃতকারী।”

তিনি দাবি করেন, ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পরই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়।  সে সময় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সহিংস ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সরকার ‘দেখা মাত্র গুলি’ বা ‘শুট অ্যাট সাইট’ এর মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, “ওবায়দুল কাদেরের এসব বক্তব্যের পাশাপাশি মামলার অন্য আসামিদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং যুবলীগ নেতা মাইনুল হোসেন খান নিখিলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আদালতে তুলে ধরা হয়েছে।”

ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির দায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “তাদের ব্যক্তিগত দায় আছে, তাদের সুপিরিয়র কমান্ড দায়ও আছে।”

সরাসরি অপরাধের পাশাপাশি নেতৃত্বের দায়, এই দুই কারণেই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে, বলেন তিনি।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মোট ২৯ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাবলী বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। 

নিহত শরীফ ওসমান হাদির বক্তব্যও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নিহতদের স্বজন ও বিশেষজ্ঞদের জবানবন্দি এবং ভিডিও, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও ফরেনসিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করার কথা বলেছেন তিনি।

আমিনুল ইসলাম বলেন, “সবকিছু মিলিয়ে এটি আমরা প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে একটা ওয়েল-প্রুভড কেস, আমরা সন্দেহাতীতভাবেই এই কেসটি সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে, তথ্যপ্রমাণ দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি।”

সমাপনী যুক্তিতে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ চাওয়া হয়েছে, বলেন তিনি।

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও জরিমানার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালি বিধিতে স্পষ্টভাবে নেই।

এ কারণে প্রচলিত আইনের ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার বিধান ‘মিউটাটিস মিউটান্ডিস’ অনুসরণ করে জরিমানা আদায় ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থা করার আবেদন করা হয়েছে।

গত ৪ আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক পটভূমি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর পাঁচ কার্যদিবসে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

প্রসিকিউশনের সমাপনী যুক্তি শেষ হওয়ার পর পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন।