Published : 05 May 2026, 01:31 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের একদম শেষ মুহূর্তে করা বহু আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেওয়া বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে 'অযথা উদ্বেগের কিছু নেই' বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মত নয় যে ইচ্ছামত বাতিল করা যাবে; তবে কোনো চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তা সংশোধনের সুযোগ সেই চুক্তির মধ্যেই রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি দুই পক্ষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এতে উভয় পক্ষের স্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
"কাজেই এ চুক্তি নিয়ে অযথা উদ্বেগের কিছু নেই।"
সচিবালয়ে মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ওই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ বলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পাল্টা বাণিজ্য চুক্তি বা এআরটি’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সমালোচনার মধ্যে ঢাকা সফরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা লিঞ্চ। তার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকায় থাকবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি করে। চুক্তিতে ১৩১টি শর্ত রয়েছে, যা বাংলাদেশকে মানতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছয়টি শর্ত মানতে হবে বলে খবর এসেছে।
ট্রাম্পের বাড়তি সম্পূরক শুল্ক এড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সোমবার এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ঢাকার উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন এক আইনজীবী।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের এ সফরের আগের দিন জনস্বার্থে রিট আবেদনটি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ মাইদুল ইসলাম পলক।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটিকে ‘সুস্পষ্টভাবে অযৌক্তিক এবং কাঠামোগতভাবে অসম’ আখ্যা দিয়ে রিট আবেদনে বলা হয়েছে, এটি কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থেরই পরিপন্থি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্যও ক্ষতিকর।
তবে এসব খবর, রিট এবং নানামুখী আলোচনার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের এ চুক্তি এক প্রকার চালিয়ে যাওয়ার মনোভাবের কথাও সরাসরি প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, "বর্তমান সরকার এ চুক্তির সূচনাকারী নয়, তবে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মত নয় যে ইচ্ছামতো বাতিল করা যাবে।
"এটি একটি বাস্তবতা এবং আমরা সেটিকে দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে চাই।"
তিনি আরো জানিয়েছেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত প্রক্রিয়া (ইনভেস্টিগেশন) শুরু করা হয়েছে, যার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাখ্যা চেয়েছে এবং প্রাপ্ত ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ জানানো হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, বিদ্যমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের তদন্ত শুরু না হলে তা আরো ইতিবাচক হত।"
বাংলাদেশের উৎপাদন ও বাণিজ্য বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "দেশে কোনো ক্ষেত্রেই ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ নেই এবং বাংলাদেশ ডাম্পিং করে এমন 'অভিযোগও ভিত্তিহীন'।"
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা অধিকাংশ পণ্য আমদানি করি। যেগুলো রপ্তানি করি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত-তা কঠোর আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের মধ্যে পরিচালিত হয়।” সেখানে শ্রম আইন লঙ্ঘন বা শিশুশ্রমের কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি যোগ করেন।
চুক্তি বাতিলের প্রশ্নে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "এই সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সবসময় দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
"কোনো চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তা সংশোধনের সুযোগ সেই চুক্তির মধ্যেই রয়েছে।"
তিনি এটিকে ‘সেলফ কারেক্টিং এলিমেন্ট’ বলে বর্ণনা করেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, "চুক্তির মধ্যেই সংশোধন বা সমন্বয়ের প্রয়োজনীয় বিধান রয়েছে। তাই এটি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।"
বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারসহ বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান এসময় উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি নিয়ে আলোচনায় ঢাকায় আসছেন মার্কিন সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি
বাণিজ্য চুক্তি মার্কিন ‘দাবির’ তালিকা নয়, যৌথ অঙ্গীকার: রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন