Published : 30 Nov 2025, 12:55 AM
নারিকেলের মালা দিয়ে তৈরি ‘পরিবেশবান্ধব কয়লা’ নিয়ে এসেছিলেন তারা প্রদর্শনীতে।
‘জলশিখা’ নামের একটি দল এমন উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ব্র্যাক আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে।
এমন উদ্যোগের বিষয়ে দলটির সদস্য নাজমুল খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা একটি জরিপ করতে হাসপাতালের সামনে গিয়ে এমন কিছু করার ধারণা পান।
“যে ডাব বিক্রি হয়, এর আশেপাশে অনেক ময়লা জমে থাকে। সেখান থেকে ডেঙ্গুর পাশাপাশি মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। এটাকে ওভারকাম করতে চেয়েছিলাম আমরা। এরপর সেগুলো সংগ্রহ করে কয়লা তৈরি করছি। পরিবেশের ক্ষতি কমানোর চিন্তাও ছিল আমাদের।”
শনিবার সাভারের বিডিএমএতে ‘কার্নিভাল অব চেঞ্জ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ব্র্যাক, সেখানে জলশিখার মত ১২টি দল অংশ নেয়।

এ আয়োজনে অংশ নিয়ে এসব দল তাদের পণ্য বিক্রির পাশাপাশি কাজের প্রচারণার সুযোগও পেয়েছেন বলে তুলে ধরলেন প্রদর্শনীতে আসা প্রতিনিধিরা।
‘গুডডু টয়েজ’ বিক্রয়কেন্দ্রে প্রদর্শন করা হয় কাঠের তৈরি শিশুদের খেলনা। দলের সদস্যরা শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখতে পান বাজার ছেয়ে আছে প্লাস্টিকের খেলনায়। এরপর তারা কাঠ দিয়ে খেলনা তৈরির কাজ শুরু করেন।
দলটির সদস্য ওয়াসিফা জান্নাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ খেলনাগুলো শিশুদের ক্রিয়েটিভ বিষয়গুলোকে সাপোর্ট করে। ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ প্রজেক্ট থেকে এমন ধারণা এসেছে যে, খুবই কম রিসোর্স নিয়েও যে কারখানা করা যায়। এখানে আমাদের নেটওয়ার্ক আর ব্র্যান্ডিংয়ের বড় সুযোগ ছিল।”
তরুণদের উদ্ভাবন আর সৃজনশীলতার প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শনিবার শুরু হয় ব্র্যাকের ‘কার্নিভাল অব চেঞ্জ ২০২৫’ অনুষ্ঠান। এ আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ২৫০ জনের বেশি তরুণ অংশ নেন।
সাভারের ব্র্যাক সিডিএমএতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রদর্শনীর পাশাপাশি মতবিনিময়, আলোচনা ও কর্মশালাসহ নানা আয়োজন করা হয়, যা চলবে রোববার পর্যন্ত।

প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হয় অনুপ্রেরণামূলক পর্ব ‘ইউথ ভয়েসেস একোয়িং দ্য এসেন্স অব চেঞ্জমেকিং’ দিয়ে। এরপর হয় ‘দ্য ওয়ে টু সাকসেস’ বা ‘সাফল্যের পথ’ শীর্ষক বক্তৃতা।
এতে ব্র্যাকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ক্লাস্টারের পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, সাফল্যের কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা নেই, প্রতিটি মানুষ তার জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে সাফল্যকে সংজ্ঞায়িত করে।
“সমাজ সাফল্যকে সংকীর্ণ ও বস্তুবাদী গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখে, কিন্তু মানুষের জীবনে সত্যিকার অর্থে যা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি এই সংজ্ঞায় প্রতিফলিত হয় না।”
সবশেষে ‘আমরা নতুন ইয়াং চেঞ্জমেকার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ ঘোষণা করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০টি দল আবেদন করে, এর মধ্যে ১২টি প্রকল্প চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনীত হয়। সেখান থেকে তিনটি দল পুরস্কার জিতে নেয়।
বিজয়ী দলগুলো হল- প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অডিওবুক ‘স্টোরিজ অব ইনক্লুশন’, নারকেলের মালা থেকে পরিবেশবান্ধব কয়লা তৈরির প্রকল্প ‘জলশিখা’ এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক খেলনা তৈরির প্রকল্প ‘গুডডু টয়েজ’।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এবারের বিজয়ীরা পাবেন ব্র্যাকের সোশ্যাল এন্টারপ্রেনার্স ফেলোশিপ।
এর বাইরে ‘ইকো ফেয়ার’ দল কফি বর্জ্য থেকে অলঙ্কার, ‘উত্তরণ’ নারিকেলের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প পণ্য, ‘আরোহণ’ পুরনো কাপড় পুনর্ব্যবহার করে চুড়ি ও শাড়ি, ‘ত্রিরি’ পুরনো কাপড় থেকে গয়না, ‘প্রেরণা’ পুরনো কাপড় থেকে ব্যাগ, ‘নির্ভয়া’ শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের নারীদের জন্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাড, ‘শূন্য’ আখের বর্জ্য থেকে হস্তশিল্প, ‘নান্দনিক’ টেক্সটাইল বর্জ্য থেকে ফ্যাশন পণ্য তৈরি করছে এবং ‘হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি’ খুলনার গ্রামে কমিউনিটি লাইব্রেরি পরিচালনা করছে।
এসব দলকে তাদের প্রকল্প তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছে ব্র্যাকের ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ (এএনএন)। এএনএন মূলত কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের নিয়ে। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতেই ২০১৮ সালে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দেশের ১৭টি জেলায় এএনএন উদ্যোগের মাধ্যমে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি তরুণ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তাদের অনেকে গেটস ফাউন্ডেশন, নাসা এবং জাতিসংঘ থেকে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
এমন উদ্যোগ নিয়ে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, “এদেরকে দেখে অন্যান্য তরুণ যারা আছে তারা মনে করবে; আমাদের জন্যওতো সম্ভাবনার ধার উন্মোচিত। আমরা তো অনেক কিছু করতে পারি।”
প্রদর্শিত প্রকল্পগুলোকে আরও দূর এগিয়ে নিতে, ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে নিজেদের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরার পরামর্শ দেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
তিনি বলেন, “জীবনে কোনো কিছু ছাড়তে হয় না। যদি একবার রক্তের মধ্যে কিছু মিশে যায়, এর পিছু নিতে হয়। নিজেকে জিজ্ঞেস করো তোমার জীবন কি চায়, তোমার স্বপ্ন কী চায়? স্বপ্নকে অনুসরণ করো। স্বপ্নকে অনুসরণ করলে শীর্ষে পৌঁছে যাবে। জীবনে নতুন কিছু করো।
“মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণী, মানুষের মধ্যে অন্তহীন চলার শক্তি আছে। মানুষ আঘাত পায়, ভেঙ্গে যায়, কিন্তু থামে না। তোমরা থেম না।”
মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন।
‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ এর সদস্যদের পাশাপাশি ওয়ারফেজ ব্যান্ড ও সভ্যতা গান পরিবেশন করেন।
দ্বিতীয় দিন অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীদের আত্ম উন্নয়ন, ক্যারিয়ার নির্দেশনা ও দেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার বিষয়ে মতবিনিময়, আলোচনা, সংলাপ এবং কর্মশালা করা হবে।