Published : 12 Jun 2026, 06:32 PM
বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বা পুশ ইনের ঘটনা নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে।
চার দিনের এই সম্মেলনে যৌথ টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সীমান্ত সহযোগিতা জোরদারসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে সম্মত হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স- বিএসএফ।
শুক্রবার সম্মেলনের শেষ দিন প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বিজিবি ও বিএসএফ এই আলোচনাকে ‘আন্তরিক, ইতিবাচক এবং দূরদর্শী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিজিবির ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। প্রতিনিধি দলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, যৌথ নদী কমিশন এবং অন্যান্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন।
ভারতের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। উভয় প্রতিনিধি দল আগামী নভেম্বরে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন করার বিষয়ে সম্মত হয়।
এ বিষয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নাজুক দশায় পড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভারত জোরপূর্বক অভিবাসীদের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে ঢাকা, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। সেখানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠা ‘পুশইন’ এর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সীমান্ত সম্মেলনে স্থান পায়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় পক্ষ মানব পাচার, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মেলনে আলোচনা করেছে।
উভয় পক্ষই সীমান্তে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সমন্বিত টহল জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি, রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) তথ্য আদান-প্রদানের উন্নতি এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
সম্মেলন চলাকালে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতের নাগরিকদের দ্বারা প্রাণঘাতী ও অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে নিরস্ত্র নিরীহ বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে বিএসএফ মহাপরিচালককে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেন।
সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং কঠোর জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় পক্ষই এ বিষয়ে সম্মত হয় যে, এসব বিষয় আন্তরিক, সৎ ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে, প্রচলিত আইন অনুসরণ করে এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হয়ে সমাধান করা যেতে পারে। নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনাগুলোও তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও তারা একমত হয়। 
বিজিবি মহাপরিচালক রোহিঙ্গাসহ ভারতীয়দের বাংলাদেশে ‘পুশ-ইনের’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একে সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, আগের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষীয় নীতি ও প্রটোকলের ‘পরিপন্থি’ বলেন তিনি।
যে কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ‘যাচাইকৃত’ হন, তবে তাকে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গ্রহণ করা হবে বলে বৈঠকে প্রতিশ্রুতি দেন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
তিনি বিএসএফ মহাপরিচালককে এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা এবং বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া ও প্রটোকল অনুসরণের দাবি তোলেন।
অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ দ্রুত সম্পন্ন করার এবং দেশটিতে থাকা ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার কথা বলেন।
এছাড়া বৈঠকে বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের মিজোরাম রাজ্যে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতের সহযোগিতা কামনা করেন।
জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক দাবি করেন, ভারত সরকার জাতীয়তা নির্বিশেষে সব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং নিজেদের ভূখণ্ড এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অনুমতি দেয় না।
উভয় পক্ষ নিজ নিজ ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে না দেওয়া, সতর্কতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়।
বিজিবির মহাপরিচালক বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি, ধর্মীয় বর্ণনা, রাজনৈতিক বিষয় এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত বিষয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে কিছু নির্দিষ্ট প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ও বিকৃত সংবাদ, গুজব এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পরে উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অপপ্রচার বা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত রাখার জন্য নির্দেশনা দেবে বলে সম্মত হয়।