১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারের ই-সেবা পেতে সশরীরে যেতে হয় ৬৮% নারীকে: গবেষণা

৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী বলেছেন, তাদেরকে সশরীরে যেতে হয়েছিল স্থানীয় অফিসের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার জন্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 31 Aug 2026, 05:53 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:02 PM

সরকারের অনেক সেবা পুরোপুরি অনলাইনে পাওয়ার নিয়ম থাকলেও ৬৮ শতাংশ নারীকে সশরীরে যেতে হয় বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।  

এসব সেবা পেতে ঘুষ লেনদেনও করতে হয় বলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এ গবেষণায় উঠে এসেছে। 

সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে গবেষণার ফল তুলে ধরেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটির গবেষক তামিম আহমেদ। 

গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি ই-সেবা পুরোপুরি অনলাইনে সম্পন্ন করতে পেরেছেন ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। 

বাকিদের মধ্যে ২০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা বেশির ভাগ কাজ অনলাইনে সেরেছেন; পাশাপাশি কিছু ‘পেপারওয়ার্কের’ প্রয়োজন ছিল। 

৩৮ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা শুধু অনলাইনে ফরম দাখিল করেছেন। বাকি কাজ সারতে হয়েছে অফলাইনে। 

১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা প্রথমে অনলাইনে ফরম দাখিল করেছেন; পরে তাগাদা দিতে ফের সশরীরে গিয়ে জমা দিয়েছেন।

৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারী বলেছেন, পুরো কাজটিই অফলাইনে সেরেছেন, যদিও কাজটি অনলাইনে হওয়ার কথা। অর্থাৎ, ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ নারীর কোনো না কোনোভাবে সরকারি অফিসে বা ঘরের বাইরে আসার প্রয়োজন পড়েছে।

তামিমের ভাষায়, “সরকার থেকে অনেক ধরনের ই-সার্ভিস আমরা লিস্টেড করে থাকি। কিন্তু আমরা যখন ফিল্ডে গিয়েছি, আমরা যখন নিজেরা কেস স্টাডি করেছি, আমরা দেখেছি যে, আসলে ই-সার্ভিস বলা হলেও ‘ব্যাকএন্ডে’ অনেক ধরনের কাজ করতে হয়, যে কাজগুলো আসলে ডার্কেন। অফিসে যেতেই হচ্ছে তাকে।

“ফলে যদিও তাকে দালিলিকভাবে বলা হচ্ছে ই-সার্ভিস, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাকে কিন্তু আসলে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অফিসে গিয়ে কোনো না কোনো সার্ভিস নিতে হচ্ছে। ফলে আদতে আমরা সেটাকে ই-সার্ভিস বলতে পারছি না এবং সেটিই কিন্তু আমাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।”

এ গবেষণার অংশ হিসেবে কেন তাদের অফিসে যেতে হয়, তার ধারণাও নেওয়া হয়।

সেখানে বলা হয়, ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী বলেছেন, নথিপত্র সরাসরি জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পড়েছে; ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী বলছেন নথিপত্র সরাসরি গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজন পড়েছে; ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন স্বাক্ষর করার জন্য সরাসরি যেতে হয়েছে; অর্থ জমা দিতে যাওয়ার কথা বলেছেন ২২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী।

৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী বলেছেন, ‘স্থানীয় অফিসের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে’ যেতে হয়েছে; কিছু প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করার প্রয়োজনে যেতে হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ নারীকে। স্থানীয় অফিসের কর্মকর্তাদের তাগাদা দিতে গিয়েছিলেন ৬ দশমিক ১ শতাংশ নারী। অন্যান্য কারণে ১ শতাংশ নারীর প্রয়োজন হয়েছে।

এ গবেষণার জন্য ২ হাজার ৬১১ জন নারী, তরুণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এরমধ্যে নারী ছিলেন ৯৫৭ জন। দেশের সব বিভাগ থেকে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে গত দুবছরে কোনো না কোনো সময় সরকারি এসব ই-সেবা গ্রহণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের এখানে বাছাই করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশকে কোনো না কারণে অফিসে যেতে হয়েছে। আর ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ পুরো সেবাটি গ্রহণ করেছেন অনলাইনে। যাদেরকে অফিসে যেতে হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ বলেছেন, তাদের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে যেতে হয়েছে।

সারাদেশের ১৮-৩৫ বয়সী ১ হাজার ৩৮২ জন তরুণের ওপর এ জরিপ করা হয়।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৮১ জন আদিবাসী, ৫৯ জন চরের বাসিন্দা, ৫৬ জন হাওরের বাসিন্দা, ৩৩ জন বস্তির বাসিন্দা এবং ৪৩ জন প্রতিবন্ধী।

তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ই-সেবা প্রাপ্তিতে তারা সন্তুষ্ট কিনা এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর মতো তাদের জন্য প্রাপ্তির সুযোগ সমান কিনা। অন্যদিকে প্রতিবন্ধীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, এসব সেবাকে তারা নিজেদের উপযোগী মনে করেন কিনা। 

তাতে দেখা যায়, ৫ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা ই-সেবা প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট। আবার ৯৭ শতাংশ আদিবাসী মনে করেন, ই-সেবার ক্ষেত্রে তারা অন্যদের মতো সুযোগ পাচ্ছেন না। এই হার বস্তির বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে ৮১ দশমিক ৮ শতাংশ; হাওরের ক্ষেত্রে  ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং হাওরের ক্ষেত্রে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ। 

অন্যদিকে প্রতিবন্ধীদের মধ্যে ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, ই-সেবা কিছুটা তাদের উপযোগী। ৮ শতাংশ বলেছেন, এসব সেবা একেবারেই প্রতিবন্ধীদের উপযোগী নয়। 

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ই-সেবা সম্পর্কে অনেকে একেবারেই অবগত নন কিংবা আগ্রহী নন। 

তিনি বলেন, “দেখা যাচ্ছে যে অনেকের মাঝেই একটা হচ্ছে যে, তারা জানে না কী কী সেবা পাওয়া যাচ্ছে? আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, তাদের মধ্যে একটা অনীহা রয়েছে ই-সেবাটা নেওয়ার ক্ষেত্রে।

“সেই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; একটা বিশ্বাসযোগ্যতাও লাগবে। তারা যদি সেবাটা ব্যবহার করে উপকৃত হয় অর্থাৎ খুব নির্ঝঞ্ঝাটভাবে সেবাটি পেয়ে যায়, তাহলে কিন্তু তাদের ওই আস্থা বাড়বে এবং অন্যদেরকেও এতে অন্তর্ভুক্ত করবে।”