১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নাম তার গোলবাহার

বন ধ্বংস, খাবারের সংকট, শিকার এবং পাচারের কারণে বাংলাদেশে এই প্রজাতির অজগর ঝুঁকিতে আছে।

নাম তার গোলবাহার
পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সীতা পাহাড় এলাকায় রাস্তার ওপর এই গোলবাহার অজগরের দেখা পান।

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2025, 11:44 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:12 PM

পুরো শরীর জুড়ে হলুদ আর কালোর রুহিতন আকৃতির নকশা। সেই নকশার মাঝে আর দুই পাশে সাদা রঙের বাহার। মাথাটি সোনালি, নাম তার গোলবাহার। 

বাংলাদেশে যে দুই প্রজাতির অজগর সাপের দেখা মেলে; তার মধ্যে এটি একটি। গোলবাহার অজগর বা জালি অজগর নামে পরিচিত এ প্রজাতি। 

বুধবার রাতে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সীতা পাহাড় এলাকায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে এমনই একটি গোলবাহার অজগরের দেখা মেলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল সড়কের উপর সাপটিকে দেখতে পায়। 

পিচ্ছিল সড়ক বেয়ে সাপটির পারাপার হতে কষ্ট হচ্ছিল। আর ওই সড়কে প্রতিনিয়ত নানা রকম যানবাহন চলাচল করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ওই দলটি সাপটিকে সড়ক থেকে পাশের গাছপালা ঘেরা জায়গায় নেমে যেতে সহায়তা করে। 

তা না হলে হয়ত সুন্দর গোলবাহার অজগরটি গাড়ি চাপায় মারা পড়ত। সাপটিকে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ভিডিও পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার ফেইসবুক পেইজে শেয়ার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি দেখেছে কয়েক হাজার মানুষ। 

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সীতা পাহাড় এলাকায় দেখা গোলবাহার অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল আট থেকে নয় ফুট।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন সীতা পাহাড় এলাকায় দেখা গোলবাহার অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল আট থেকে নয় ফুট।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কাজী ইফতেকার উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অফিসের কাজে তারা সেদিন কাপ্তাই গিয়েছিলেন। কাজ শেষে ফিরছিলেন চট্টগ্রামে। 

“সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সীতা পাহাড় এলাকার প্রশান্তি পার্কের কাছাকাছি অংশে সড়কের ওপর সাপটি দেখতে পাই আমরা। সাপটি রাস্তার কোনো দিকে এগিয়ে যেতে পারছিল না। রাস্তায় তখন আমাদের গাড়ি ছাড়া অন্যান্য গাড়িও ছিল।” 

ইফতেকার বলেন, তাদের উপ-পরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গাড়িতে ছিলেন। তারা সাপটিকে নিরাপদে রাস্তা পার করে দিতে বলেন। 

“আমরা গাড়ি থেকে নেমে অন্যান্য যানবাহন থামাই। তারপর আট-নয় ফুট লম্বা সাপটাকে নিরাপদে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছি।”

বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, অজগর Serpentes বর্গের অন্তর্গত Boidae গোত্রের নির্বিষ সাপ। সারা পৃথিবীতে ৯ প্রজাতির অজগর আছে। অজগর অন্যান্য সাপের তুলনায় আকারে বড় এবং দাঁত অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও এর বিষ দাঁত নেই। 

গোলবাহার অজগর বা জালি অজগরের ইংরেজি নাম reticulated python । বৈজ্ঞানিক নাম Malayopython reticulatus। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, অজগরের এই প্রজাতিটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দৈর্ঘ্যের সাপ। 

গোলবাহার অজগর এমনকি দৈর্ঘ্যে অ্যানাকোন্ডার চেয়েও বড় হয়। এই প্রজাতির সাপ সচরাচর ২৩ ফুট থেকে ২৬ ফুট পর্যন্ত হয়। ১৯১২ সালে ইন্দোনেশিয়ার সেলেবস দ্বীপে একটি গোলবাহার অজগর পাওয়া গিয়েছিল, যার দৈর্ঘ্য ১০ মিটার বা ৩২ দশমিক ৮ ফুট। 

ভারত, বাংলাদেশ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়ায় অজগরের এই প্রজাতির দেখা মেলে। 

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, অজগরের এই প্রজাতিটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দৈর্ঘ্যের সাপ। 

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, অজগরের এই প্রজাতিটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দৈর্ঘ্যের সাপ।

গোলবাহার অজগরের গায়ে তামাটে রঙের উপর হীরার আকৃতির নকশা থাকে। এই নকশায় সাদা, কালো, হলুদ এবং লাল রঙের আঁশ থাকে। মাথার আঁশের রঙ উজ্জ্বল বাদামি। রাতের আঁধারে কৃত্রিম আলোয় যা সোনালি বলে মনে হয়। 

মাথার উপর একটি সরু কালো রেখা আছে। চোখ কমলা রঙের। গোলাবাহার অজগর রাতে বেশি চলাচল করে। দিনের বেলা গাছে বা ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। প্রজনন মৌসুম ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস। 

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর তালিকা অনুসারে বিশ্বব্যাপী গোলবাহার অজগর কম ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি। তবে বাংলাদেশে এই প্রজাতি ‘অতি বিপন্ন’। বন ধ্বংস, খাবারের সংকট, শিকার এবং পাচারের কারণে বাংলাদেশে এই প্রজাতির অজগর ঝুঁকিতে আছে। 

চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে গোলবাহার অজগর আছে। জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে এই প্রজাতির সাপ থাকে। আগে তেমনটা হয়ত চোখে পড়েনি।

“কাপ্তাইয়ে যেখানে সাপটি দেখা গেছে সেটা কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের অংশ। সেখানে সড়ক আছে। তাই সাপটি হয়ত বনের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাচ্ছিল। ওই পথে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের সচেতন থাকতে হবে যাতে প্রাণিগুলো বাঁচে।”