Published : 10 Sep 2026, 07:03 PM
পাঁচ করবর্ষের জন্য জাতীয় রাজ্স্ব বোর্ডের দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা কর এড়াতে আদালতে মামলা করেও লাভ হল না গ্রামীণ কল্যাণের।
এই সামাজিক ব্যবসা ও অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা দুটি রিট মামলায় হাই কোর্ট যে রুল দিয়েছিল, বৃহস্পতিবার তা খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ।
এই রায়ের ফলে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য ধার্য করা ওই রাজস্ব আদায়ে এনবিআর ডিমান্ড নোটিস জারি করতে পারবে বলে তথ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ পরিবারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের সাবেক চেয়ারম্যান।
এর আগে মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতায় থাকাকালে তার পক্ষে গ্রামীণ কল্যাণের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, এমন সংবাদ প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রচার হয়। তবে গত ১৪ জুলাই কর মওকুফ এবং মামলা প্রত্যাহারের খবর ‘ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর’ বলেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন।
বৃহস্পতিবার রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, “দীর্ঘ শুনানির পর আজ এ মামলাটি হাই কোর্ট ডিভিশনের একটি দ্বৈত বেঞ্চে রায় প্রদান করেন এবং রুলটি ডিসচার্জ করা হয়। ফলে এই রায়টি ট্যাক্সেস ডিপার্টমেন্টের পক্ষে তথা সরকারের পক্ষে আসে।
“কোর্ট কোনো ডিটেইলস রায় দেন নাই, ভারবালি শর্ট রায় দিয়েছেন। কোর্ট বলেছেন, রুল ডিসচার্জ। কোর্টের অবজারভেশন হচ্ছে, উনারা যে ৬৬৬ কোটি টাকা ট্যাক্স হবে না মর্মে দাবি করেছিল, তাদের এই দাবিটি রুল ডিসচার্জের মাধ্যমে খারিজ করে দেওয়া হয়।”
অন্যদিকে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আজকের রায় প্রমাণ করছে যে, মামলাটি তুলে নেওয়া হয়নি। জয়েন্ট কমিশনার সাহেব যখন ৬৬৬ কোটি টাকা ট্যাক্স ধরে দিলেন, তখন প্রশ্ন করা হল, আমাদের যে অ্যাট সোর্স কাটা হল, সেই টাকাটা কোথায় যাবে? এর কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই।
“তখন বলা হল, যদি ইনকোয়ারি করতেই হয়, তবে গ্রামীণ টেলিকমকে করুন এবং অতিরিক্ত টাকা নিলে তা গ্রামীণ টেলিকমকে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু তারা সেটাও করছে না।”
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে পরামর্শ করে আপিল করা হবে বলে জানান ব্যারিস্টার মামুন।
এনবিআরের কর দাবি ও বিরোধের সূত্রপাত
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জনসেবা ও দুস্থ মানুষের সেবায় পরিচালিত হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের একটি অংশ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে গ্রামীণ কল্যাণ তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তিতে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্যারিস্টার মামুন বলেন, “গ্রামীণ কল্যাণ উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ও নামকরা একটি প্রতিষ্ঠান, যা দরিদ্র মানুষের সেবা করার জন্য সারা দেশে গ্রামভিত্তিক ক্লিনিক গড়ে তুলেছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের চারজন ব্যক্তি তাদের সম্পত্তি সেখানে দান করে দিয়েছেন, যেন সেখানে গ্রামীণ কল্যাণের বিভিন্ন হাসপাতাল করা হয়। এটি কোম্পানি আইনের ২৮ ধারার অধীনে প্রতিষ্ঠিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান।”
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নোবেল পুরস্কার জয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। তবে আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে তিনি গ্রামীণ কল্যাণ বা গ্রামীণ গ্রুপের কোনো পদে আর যুক্ত নেই।
চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ গ্রামীণ টেলিকমকে ৫৩ কোটি ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৪১ টাকা ঋণ হিসেবে দেয়, যা গ্রামীণ টেলিকমের নামে গ্রামীণ ফোনের শেয়ার কেনার কাজে বিনিয়োগ করা হয়।
চুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, “আর্থিক সহায়তার প্রতিদান হিসেবে গ্রামীণ টেলিকম তার অর্জিত ডিভিডেন্ড থেকে, গ্রামীণ কল্যাণের শেয়ার থেকে অর্জিত ডিভিডেন্ড থেকে ৪২.৫০ শতাংশ লাভ গ্রামীণ কল্যাণকে দেবে।”
গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীর দাবি, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চুক্তির ভিত্তিতে লভ্যাংশ দেওয়ার আগে উৎসে কর কাটা হত।
আব্দুস সামাদ আজাদ জানান, “পরবর্তীতে এটা যখন আয়কর কর্তৃপক্ষ তাদের ফাইলটা আন্ডার সেকশন ১২০ তে রিওপেন করে এবং দেখা যায়, গ্রামীণ টেলিকম থেকে গ্রামীণ কল্যাণ যে লাভ করেছে, সেটার উপর তারা অ্যাট সোর্সে উৎসে কর কর্তন করেনি। যে কারণে এই রিওপেন।”
পাঁচ করবর্ষে ৬৬৬ কোটি টাকার দাবি
আয়কর অধ্যাদেশের ১২০ ধারায় গ্রামীণ কল্যাণের ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের কর নথি পুনরায় খোলার পর, সংশোধিত আদেশের মাধ্যমে পাঁচ করবর্ষে নিরূপিত আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর ধার্য করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১২-১৩ করবর্ষে ১৮৯ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৬ টাকা, ২০১৩-১৪ করবর্ষে ১৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ১২ টাকা, ২০১৪-১৫ করবর্ষে ১১৪ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৪ টাকা, ২০১৫-১৬ করবর্ষে ১১৫ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৫ টাকা এবং ২০১৬-১৭ করবর্ষে ১১৫ কোটি ৬৩ লাখ ১ হাজার ৬৯৩ টাকা রাজস্ব জড়িত। সব মিলিয়ে পাঁচ করবর্ষে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা দাবি করা হয়।
রিভিশন খারিজ ও আইনি লড়াই
কর নির্ধারণের ওই আদেশের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ কর কমিশনারের কাছে রিভিশন আবেদন করলেও ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর তা খারিজ হয়ে যায়। এর কারণ ব্যাখ্যা করে আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, “রিভিশন অর্ডার ফাইল করার একটা প্রি-রিকুইজিট ছিল যে, অ্যাট সোর্সে যে টাকাটা কর্তন করা হয়েছে ওই টাকার চালান কোর্টে জমা দিতে হবে। কিন্তু তারা গ্রামীণ টেলিকমের নামে যে চালানগুলো ছিল সেগুলো গ্রামীণ কল্যাণের নামে শো করার চেষ্টা করে; যা আমাদের দৃষ্টিতে অবৈধ, অন্যায় এবং আইন অনুযায়ী হয়নি। যথাযথ চালান দাখিল না করায় রিভিশন আবেদনটি নামঞ্জুর করা হল।
“ওই খারিজ আদেশের এবং পরে ২৭ নভেম্বরের রেক্টিফিকেশন আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে হাই কোর্টে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করে, যার রুল বৃহস্পতিবার খারিজ হল।”
২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের আয়কর কার্যক্রমে আয়কর অধ্যাদেশের ১২০ ধারায় দেওয়া আদেশগুলো কেন বেআইনি ঘোষণা করে বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ওই রুল জারি করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাই কোর্ট বিভাগ এই রিট দুটির ওপর রায় দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ হাই কোর্টের রায়টি বাতিল করে আবার রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩ অগাস্ট হাই কোর্টের বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি মনিরুজ্জামানের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি শেষে মৌখিক রায় দেওয়া হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
রায় প্রত্যাহারের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “পরবর্তীতে ওই বিচারপতিদ্বয় রায়টা রিকল করেন, কারণ সেকেন্ড জাজ যখন ডিএজি ছিলেন। তখন তিনি এই মামলায় ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট তথা সরকারের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। রায় রিকল করার পর সাংবাদিকদের মাঝে প্রশ্ন ওঠে যে, ইউনূস সাহেব ক্ষমতায় থাকার কারণে মামলাটি উইথড্র করে নিয়েছেন। আজকের রায় প্রমাণ করছে যে মামলাটি উইথড্র হয়নি।”
কর আদায়ের প্রক্রিয়া কি হবে
হাই কোর্টের রুল খারিজ হওয়ায় কর বিভাগের রাজস্ব আদায়ের পথ উন্মুক্ত হয়েছে তথ্য দিয়ে আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, “এখন যথাযথভাবে ডিমান্ড নোটিস ইস্যু করে সরকার তার রাজস্ব আদায় করতে পারবে, যে রাজস্বটা গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ থেকে ফাঁকি দিয়ে আসছে। ডিমান্ড নোটিসটা ইস্যু করবে ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস। সাধারণত ৩০ দিন সময় দেওয়া হয় ডিমান্ড নোটিসে।
“প্রত্যেকটা করবর্ষে ওই প্রতিষ্ঠানের টোটাল নিরূপিত আয় ধার্য করা হয়েছে, আর নিরূপিত আয়ের উপর ৩৫ শতাংশ হারে ট্যাক্স। এর সাথে সরল সুদ যুক্ত হবে আইন অনুযায়ী। ইনকাম ট্যাক্স অ্যাক্ট অনুযায়ী সরল সুদ দাবি করতে পারবে ২০১৭ সাল থেকে। আদায় না হওয়া পর্যন্ত সরল সুদ আরোপ করার বিধান আছে।”
গ্রামীণ কল্যাণ এনবিআরের দাবিকৃত ওই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি জব্দ করা যেতে পারে বলেও মত দেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইন কর্মকর্তা।