১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাবাকে হত্যার মামলায় মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

এ হত্যার ঘটনার আগে বেশ কিছু দিন আগে ওই মেয়ে বাবার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেছিলেন।

বাবাকে হত্যার মামলায় মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
ফাইল ছবি

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Sep 2026, 01:56 AM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

বছর দেড়েক আগে সাভারে ছুরিকাঘাতে বাবাকে খুনের মামলায় তদন্ত শেষে মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্র গ্রহণের পর আদালত মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে বুধবার শুনানির দিন ঠিক করে দিয়েছে। তবে এ হত্যার ঘটনার বেশ কিছু দিন  আগে ওই মেয়ে বাবার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেছিলেন।

ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ সরওয়ার আলমের আদালতে এ শুনানির দিন রয়েছে বলে আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. হাসান আলী জানিয়েছেন।

২০২৫ সালের ৮ মে সাভারে ছুরিকাঘাতে ওই ব্যক্তি নিহত হন। এ ঘটনায় তার মেয়ের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে, যিনি এখন কারাগারে রয়েছেন।

হত্যার দিনই নিহতের প্রথম পক্ষের ছেলে সাভার মডেল থানায় তার সৎ এক বোনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে ওই মেয়ে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমরান হোসেন বলেন, তদন্তের সময় মেয়ে অভিযোগ করেছেন তার বাবা তাকে ‘যৌন হয়রানি’ করতেন। সেটিই হত্যার মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে।

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, মেয়ের দাবি অনুযায়ী বাবা তাকে ‘ধর্ষণ করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন’–এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্তে পাওয়া যায়নি।

জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ওর বাবা ওকে ডিস্টার্ব করতো, যৌন হয়রানি করত। খুনের প্রধান কারণ এটায়।"

অভিযোগপত্র জমা ৯ মাস আগে, এখন অভিযোগ গঠনের অপেক্ষা

মামলার তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর এসআই ইমরান হোসেন মেয়েকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। 

পরে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত হয়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। গত ২ আগস্ট অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও আসামিপক্ষ নতুন ওকালতনামা দাখিল করায় তা হয়নি। বুধবার এ বিষয়ে পুনরায় শুনানি হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি আলোচিত মামলা। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ গঠনের জন্য প্রস্তুত। অভিযোগ গঠন হলে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচার শেষ করার চেষ্টা করব।”

তদন্তে কী উঠে এসেছে

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমরান অভিযোগপত্রে বলেছেন, ওই মেয়ের মা মারা যাওয়ার পর তিনি পাঁচ বছর বয়স থেকে খালা ও নানির কাছে বড় হন। পরে তার বাবা আবার বিয়ে করেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা তাকে নাটোরে তার কাছে নিয়ে যান। পরে মেয়েকে দীর্ঘদিন ‘যৌন নিপীড়ন ও ব্ল্যাকমেইল’ করেছেন বলে তদন্তে অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্র বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মেয়ে নাটোরের একটি থানায় বাবার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলা করেন। ওই মামলায় পুলিশ বাবাকে গ্রেপ্তারও করেছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, জামিনের পর বাবা মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সাভারের একটি বাসায় নিয়ে আসেন। ওই বাসায় থাকার সময় দুজনের মধ্যে পূর্বের মামলাটি তুলে নেওয়া নিয়ে বিরোধ চলছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

হত্যার ঘটনার বর্ণনা

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘটনার রাতে মেয়ে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বাবাকে খাওয়ান। রাত ৩টার দিকে অন্য বাসিন্দাদের একটি কক্ষে রেখে তিনি বাবার ঘরে যান এবং শীলপাটা ও ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর মেয়ে একটি পেনড্রাইভ খুঁজতে থাকেন, যেখানে নিজের নির্যাতনের ভিডিও রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। পরে পাশের ভাড়াটিয়াকে ঘটনাটি জানানো হলে ৯৯৯-এ ফোন করা হয় এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেয়েকে হেফাজতে নেয়।

বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার পরিবারের

মামলার বাদী ও নিহতের ছেলে বাবার বিরুদ্ধে আনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি বলেন, “আমার বাবা জীবিত থাকতে এমন অভিযোগ কেউ তোলেনি। সে (বোন) আগে সিংড়া থানায় মামলা করেছিল, কিন্তু মেডিকেল পরীক্ষায় ধর্ষণের উপাদান পাওয়া যায়নি। বাবার বিরুদ্ধে এখন যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা মিথ্যা।”

তার দাবি, তার বাবা তার সৎ বোনকে ছোটবেলা থেকে দেখাশোনা ও পড়াশোনার চেষ্টা করেছিলেন। বাবা ওকে ভালো করতে চেয়েছিলেন। এখন তার সর্বোচ্চ শাস্তি চান তিনি।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

মেয়ের আইনজীবী রবিউল হাসান তুষার বলেন, “সে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে–এটি অস্বীকার করেনি। তবে অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আমরা আইনি সুযোগগুলো ব্যবহার করব এবং প্রয়োজনে অব্যাহতির আবেদন জানাব। অভিযোগ গঠন হলে নিয়ম অনুযায়ী বিচার চলবে।”