“ধর্ষকের শাস্তি যদি সময় মতো দেওয়া হতো, পরবর্তী ঘটনাটা ঘটত না,” বলেন এক প্রতিবাদকারী।
Published : 11 Mar 2025, 01:37 PM
ধর্ষণ মামলার বিচার অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করার দাবিতে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘সকাল-সন্ধ্যা অবস্থান’ কর্মসূচি শুরু করেন। পরে সোয়া ১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন।
তাদের অবরোধের কারণে আধা ঘণ্টার বেশি সময় শাহবাগ মোড় দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বেলা পৌনে ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা আবার জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেন।
এ সময় তারা ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’; ‘ধর্ষকদের বিচার কর, নইলে হাতে চুরি পর’; ‘আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’; ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, ধর্ষকদের ফাঁসি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
প্রতিবাদকারীদের একজন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে ধর্ষণ পরিস্থিতি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। বর্তমান সরকার ধর্ষণের বিচারের সময় ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিনে নামিয়ে আনার কথা বলেছেন। আর তদন্ত শেষ করতে বলেছেন ১৫ দিনের মধ্যে।
“আমাদের কথা হচ্ছে, ১৫ দিনের মধ্যে যদি তদন্ত শেষ হয়, তাহলে তার বিচার শেষ করতে কেন ৯০ দিন সময় লগবে? একজন ধর্ষককে কেন বসিয়ে রাখা হবে এতোদিন? আমরা দ্রুততম সময়ে ধর্ষকদের ফাঁসি চাই। আমরা আজকে এখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করব, এখানেই ইফতার করব।”
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্রী হেনস্তা’, মাগুরায় ‘শিশু ধর্ষণ’সহ বিভিন্ন স্থানে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষের ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়েছেন।
এর মধ্যে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রোববার বলেন, ধর্ষণ মামলার বিচার ১৮০ দিনের পরিবর্তে ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রেখে আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাশাপাশি আসামির জামিন না দেওয়া এবং তদন্তের সময় অর্ধেকে নামিয়ে ১৫ দিন করার ভাবনা রয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী রুভা বলেন, “মেয়েরা এখন ঘরেও সেইফ না। বাবার কাছে, শিক্ষকের কাছে ধর্ষিত হচ্ছে। এরপর সে সুস্থ্য হলেও ট্রমা থাকে, সোসাইটি তাকে খারাপ চোখে দেখে। আমরা এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ চাই, আর একটা ধর্ষণের ঘটনাও দেখতে চাই না।”
শাহরিয়ার নামে একজন বলেন, “আমরা চব্বিশের গণআন্দোলন করেছি, এরপর কীভাবে ধর্ষকের সাহস হয় আমার বোনকে ধর্ষণ করার? ধর্ষকের কালো হাত ভেঙে দিতে হবে।
“দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষকের ফাঁসি দিতে হবে। অন্যথায় আমরা ছাত্রসমাজ রাস্তা ছাড়ব না।”
ঢাকা কলেজের আরেক শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ বিন নূর হোসাইন বলেন, “একের পর এক ধর্ষণ হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষকের শাস্তি যদি সময় মতো দেওয়া হতো, পরবর্তী ঘটনাটা ঘটত না।”
এদিকে শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচি ঘিরে শাহবাগে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। প্রথমে শিক্ষার্থীরা জাদুঘরের সামনে টিএসসি থেকে শাহবাগগামী প্রধান সড়কে অবস্থান নেন। পুলিশের অনুরোধে তারা যান চলাচল স্বাভাবিক রেখে জাদুঘরের সামনে একপাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান।
তখন পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “তাদের শাহবাগ মোড়ে কর্মসূচি ছিল। জনদুর্ভোগ বিবেচনায় তারা জাদুঘরের সামনে অবস্থান নিয়েছে। এখানে তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে বলে জানিয়েছে।”
আন্দোলনকারীদের ৬ দাবি
জাদুঘরের সামনে থেকে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তরফে ৬ দফা দাবি ঘোষণা করেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নকিব।
প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র ও আইন উপদেষ্টার উদ্দেশ্যে এসব দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা রাজপথ থেকে যাব না।”
দাবিগুলো হলো-
১. ধর্ষকদের শাস্তি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়।
২. ধর্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
৩. দ্রুত ও প্রকাশ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা:
যদি কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তাহলে-
ক) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে মেডিকেল প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
খ) পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ‘যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে’ ধর্ষকের ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে।
গ) এই প্রক্রিয়ার মধ্যে একটিও অসামঞ্জস্য হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না।
ঘ) শারীরিক পরীক্ষার জন্য ল্যাব সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
৪. ধর্ষণের ঘটনার বিচার সালিশি মাধ্যমে করা যাবে না, এই বিচার করবে কেবল রাষ্ট্র। অসাধু উপায়ে ধর্ষণ মামলার কোনো আসামি ছাড়া পেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করতে হবে।
৫. আসামি অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলে অন্তত আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান রাখতে হবে।
৬. চলমান সব ধর্ষণ মামলার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় ছেড়ে পুনরায় জাদুঘরের সামনে গিয়ে অবস্থান নেওয়ার পর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, "কর্মসূচি ছিল- জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেবে। পরে আবার হুট করে তাদের মাথায় জাগল, ওরা এখানে এসে একটু সাংবাদিকদের সঙ্গে একটু কথা বলবে, কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করবে, আসলে তাই করছে।"
“ওরা বলছে যে- একটু জানান দেওয়া। ওদের যে ছয় দফা আছে ধর্ষণ রিলেটেড, এই ছয় দফার বিষয়ে এখানে এসে একটু বলছে। পরে তারা আবার আগের অবস্থানে চলে গেছে। এখন তারা জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান করছে।”