Published : 19 May 2026, 05:40 PM
সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে ‘ম্যানেজ করে রায় পক্ষে’ আনার কথা বলে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫ কোটি সাড়ে ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার হাই কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন ব্যবসায়ী কে এম সোহেল। তিনি রাজধানীর ফুলবাড়িয়ার সিটি প্লাজা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং আদি বাংলা গার্মেন্টসের মালিক।
সোহেল বলছেন, তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন। সম্প্রতি আদালত ওই মামলা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের বাসিন্দা কে এম সোহেল মঙ্গলবার দাবি করেন, সিটি প্লাজার বেজমেন্টে ১৯৯৭ সাল থেকে ৫৩১টি দোকানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় দোকানগুলোর বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হলে ব্যবসায়ীরা আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে হাই কোর্টে আইনজীবী খুঁজতে গিয়ে আবুল হাসেমের শরণাপন্ন হন তিনি।
“উনি (আবুল হাসেম) নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী পরিচয় দেন। মামলা পরিচালনা করার জন্য আমার সঙ্গে তিনি একটা লিখিত চুক্তি করেন। চুক্তি করার পরে বলেন যে, ‘আপনে তো মামলার পিটিশনার না, আপনে মার্কেটের সভাপতি। এই মুহূর্তে আপনাকে অ্যাডেড পার্টি করানো যায়। অ্যাডেড পার্টি করলে আপনে মামলার সমস্ত সুবিধা পাবেন।’ এর জন্য ওর প্যাডের লিখিত দিয়ে আমার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেয়। কিন্তু আমাকে অ্যাডেড পার্টি করে নাই।”
মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে আদালত ও বিচারককে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে হাসেম বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন দাবি করে সোহেল বলেন, “হাসেমের বক্তব্য ছিল এরকম, আপনাদের এই বেজমেন্টে কার পার্কিং থাকবে, সেখানে দোকান হবে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার না। এটার অর্ডারটা নিতে হবে। নিতে হলে কোর্ট ম্যানেজ করতে হবে।
“অমুক জায়গায় এক কোটি টাকা দিতে হবে, ওই স্যাররে ৫০ লাখ দিতে হবে– এইভাবে। এদের নাম দিয়ে আমাদের কাছ থেকে টাকাগুলো নিছে। কোনো একটা রায়ের জন্য ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা নেয়, সেটার ডকুমেন্টসও আমাকে দেয়। সর্বমোট আমার কাছ থেকে নিছে ৫ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।”
তবে এসব লেনদেনে কোনো বিচারপতির সম্পৃক্তর তথ্য ‘জানা নেই’ বলে সোহেলের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “কোনো বিচারপতির সঙ্গে আমার দেখাও হয় নাই, কথাও হয় নাই, টাকা বিনিময় হয় নাই। তারা তো টাকা পয়সা নেয় নাই, তারা তো দুই নম্বরি করে নাই, তারা তো ঘুষ খায় নাই। ঘুষ বা দুই নম্বরিটা করেছে আবুল হাসেম। উনাদের নাম বিক্রি করছে।”
অবশ্য হাসেম একবার তাকে পেছনের দরজা দিয়ে এক বিচারপতির খাস কামরায় নিয়ে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন সোহেল।
তিনি বলেন, “যেই সময় স্যার নাই, রুমে নিয়া বসাইছে, চা খাওয়াইছে, সবই করছে। আমাকে দেখাইছে, বলছে যে এই রুমগুলি সব আমার।”
পরে হাসেমের ‘প্রতারণা’ বুঝতে পেরে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, প্রবীর নিয়োগী ও মোহাম্মদ শিশির মনিরকে দায়িত্ব দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে নিজেদের পক্ষে রায় পান বলে ভাষ্য সোহেলের।
তার দেওয়া অভিযোগ, হলফনামা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথিপত্র থেকে দেখা যায়, হাসেমের স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের চান্দলা গ্রামে। ঢাকায় তিনি পল্টনের আউটার সার্কুলার রোডের অমিত আলফা ক্যাসেলের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবুল হাসেম মূলত ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) সদস্য, যেখানে তার তালিকাভুক্তির তারিখ ২০০৯ সালের ৫ ডিসেম্বর এবং সদস্য নম্বর ১৯৯৬৮।
পুরানা পল্টনের ইব্রাহিম ম্যানশনে নিজের চেম্বারের ঠিকানা ব্যবহার করলেও সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের এনেক্স ভবনের ২১৬ নম্বর রুমেও তিনি বসেন বলে একটি অঙ্গীকারনামায় দাবি করেছিলেন।
ব্যবসায়ী সোহেলের কাছ থেকে পাওয়া একটি কাগজে দেখা যায়, ইব্রাহিম ম্যানশনের ঠিকানাযুক্ত প্যাডে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে তৈরি করা একটি বিলে হাসেম তার কাছ থেকে মোট এক কোটি চার লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য দিয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে আবুল হাসেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো কে এম সোহেলের মামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “সে কি মামলার বাদী না বিবাদী? তার তো কোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নাই। তার থেকে আমি টাকা নেব কেন, আর তার সঙ্গে আমি কন্ট্রাক্ট করব কেন?”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসেম বলেন, “আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী না, আমি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী। ঢাকা বারের।”
ঢাকা বারের আইনজীবী হয়ে হাই কোর্টে মামলার কন্ট্রাক্ট নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি হাই কোর্টে কন্ট্রাক্ট নিই নাই। প্রমাণ থাকলে আপনি প্রকাশ করে দিয়েন।”
ব্যবসায়ীকে বিচারপতির কক্ষে নেওয়ার বিষয়ে তিনি সোহেলের বিরুদ্ধে ‘রায় চুরির’ পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন, “আমি কেন নেব? সে তো নিজে জাজমেন্ট চুরি করছে। বিচারপতির ওখান থেকে জাজমেন্ট চুরি করে নিয়া আসছিল।”