Published : 25 May 2026, 10:43 PM
ঈদযাত্রায় বাসে বাড়তি ভাড়া ঠেকাতে সরকারের তরফে নানা উদ্যোগ ও নজরদারির কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।
চাহিদা বেশি থাকা পরিবহনগুলোর টিকেট আগেই প্রায় ফুরিয়ে যাওয়ায় অন্যদের 'মনমতো' ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কারণ হিসেবে পুরনো যুক্তি তুলে ধরে তারা বলছেন, যাওয়ার সময় বাসভর্তি যাত্রী মিললেও ঢাকারপথে একেবারে ফাঁকা থাকে। এ কারণে তারা 'কিছু বাড়তি' নিচ্ছেন।
ঈদের ছুটির প্রথমদিন সোমবার দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের পরিবহনগুলোর অন্যতম বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদে যাত্রীদের তেমন চাপ দেখা যায়নি।
যারা আগে টিকেট কেটেছেন, তারা কাউন্টারে পৌঁছে অপেক্ষা করেছেন নির্ধারিত বাসের জন্য। আর দুপুরে বৃষ্টির পর পর টিকেটবিহীন যাত্রীর চাপ কিছুটা বাড়তে থাকলে তাদেরকেই যাত্রী বানানোর চেষ্টা করছিল বাসগুলো।
ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে চলাচলকারী 'বিএমএফ পরিবহনের' একটি বাসে জনপ্রতি ৮০০ টাকায় যাত্রী তুলছিল। বাসের গেটেই হাতে লিখে টিকেট দেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের।
যাত্রীসেবায় সুনাম থাকা পরিবহনগুলোর ভাড়া যেখানে ৫০০-৫৫০ টাকা, সেখানে পিছিয়ে থাকা বাসেও এদিন ৮০০ টাকা আদায় করা হচ্ছিল।
ভাড়া বেশি কেন জানতে চাইলে ওই বাসের শ্রমিক মনির বলেন, "বাস যে যাইবো, আবার আপ্নেগোরে নেওয়ার লাইগা আহন লাগব না? আহনের সময়তো একটা যাত্রীও পামু না, তেলের খরচটা কই পামু আমরা?"
তার ভাষ্য, ঈদের মধ্যে এই বাড়তি ভাড়া 'অস্বাভাবিক না'।
ওই বাসেই ওঠার জন্য টিকেট নিতে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, "কবে যেতে পারব বাড়ি, সেটি আগে থেকে জানতাম না, তাই টিকেট কাটা হয় নাই। এখানে এসে অনেক কাউন্টারে টিকিট খুঁজে না পেয়ে এটাতেই যাইতে হচ্ছে।"
বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "বেশির তো একটা লিমিট আছে। তাই বলে জনপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা বেশি নেওয়া হবে! আসলে আমাদের তো উপায় নাই এছাড়া, বাড়ি যেহেতু যাওয়া লাগবে, তাই চলে যাই।"

ফরিদুলের কথার প্রমাণ মিলল হানিফ পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে। বরিশালের টিকেট চাইতেই কাউন্টারে কর্মরত মেহেদী বললেন, কোনো টিকেট নাই।
যারা আগে টিকেট নিয়েছেন, তারাই কাউন্টারে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। সময়মতোই বাস ছাড়ছে বলে দাবি তার।
একই রুটের 'সেন্টমার্টিন পরিবহনে' ১০০ টাকা কমিয়ে ৭০০ টাকা চাইলেন বাসটির 'লাইনম্যান' আবজাল। তিনি বলেন, "বাস নাই, একদাম ৭০০ টেকায় যাইতে পারবেন। গেলে ওঠেন।"
দক্ষিণের আরেক রুট খুলনা যেতেও কিছু কিছু পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
'মামুন পরিবহন' নামে একটি বাসের কাউন্টার প্রায় ফাঁকা। সেখানে গিয়ে টিকেটের খোঁজ করতেই আলআমিন নামে একজন বাসের সামনে নিয়ে গেলেন।
ভাড়া কত জানতে চাইলে ৮০০ টাকা চেয়ে বাসের গেইটে দায়িত্বরত একজনকে টিকেট দিতে বললেন। অন্যসময় এই রুটের জনপ্রিয় পরিবহনগুলোর ভাড়া থাকে ৬৫০ টাকা।
বাড়তি ভাড়া আদায় করার কৌশল হিসেবেই কাউন্টারে টিকেট বিক্রি না করে সরাসরি বাসে নিয়ে যাচ্ছে তারা।
পশ্চিমের বেশকিছু পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে এদিন। লক্ষ্মীপুর রুটে যেখানে নির্ধারিত ভাড়া ৪০০-৪৫০ টাকা, সেখানে 'জোনাকী পরিবহন' এদিন কাউন্টারেই টিকেট বিক্রি করছে ৬০০ টাকা করে। একই রুটের 'আল আরাফা' বাসে নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা করে।
লক্ষ্মীপুরের টিকেট কাটা ওমর ফারুক বলেন, “ঈদ আসবে, আর বাসে বাড়তি ভাড়া নেবে না, সেটা আমাদের দেশে আদৌ সম্ভব? মন্ত্রীরা সবসময়ই দেখি বয়ান দেয়, কিন্তু বাস্তবে প্রতি ঈদেই বাড়তি ভাড়া দিয়েই আমাদের যেতে হয়।”
জোনাকী পরিবহনের কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড়ের কারণে একপর্যায়ে কাউন্টারের বাইরে এসে টিকেট বিক্রি করছিলেন একজন। বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে তার দাবি, সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৫৫০ টাকা।
তিনি বলেন, “আমরা ঈদের মধ্যে ২০-৩০ টাকা বেশি নিতেছি, এটা তেমন কোনো বাড়তি ভাড়া না। ভাংতির ঝামেলার কারণে ৬০০ করেই নিতেছি।”
সিলেট রুটে চলাচলরত ‘আল মোবারাকা পরিবহনে’ এদিন ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৬৫০ টাকা করে। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই লোকাল বাসে ৪০০-৪৫০ টাকা করে রাখা হয়। আর নামডাক থাকা পরিবহনগুলোর ভাড়া ৬৫০-৭০০ টাকার মধ্যে।
এই বাসের কাউন্টারে দায়িত্বরত কাওসার নামে একজন বলেন, “অন্য সময় ভাঙা ভাঙা যাত্রী নেওয়া হয়। আজ যাবে সরাসরি। সেই হিসাবে এইটা কমই নেওয়া হইতেছে।”
চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য ‘ইয়াসিন এক্সপ্রেসে’ ৮০০ টাকা করে আদায় করতে দেখা গেছে। ওই পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসি বাস হিসেবে ভাড়া তারা কমই নিচ্ছেন।
এই বাড়তি ভাড়া আদায়ের ‘নৈরাজ্যের’ মধ্যে এদিন দুপুরের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম সায়েদাবাদ পরিদর্শনে গিয়ে টার্মিনালটিকে ভবিষ্যতে ‘আধুনিকায়ন করার’ কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, “ঢাকার যানজট নিরসন ও ঈদযাত্রার চাপ সামলাতে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে তার মূল নকশা অনুযায়ী দ্রুত আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদের সময় সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার্থে টার্মিনালের বাইরে এবং আশপাশের সড়কে গড়ে ওঠা সমস্ত অবৈধ ও অনুমোদনহীন টিকেট কাউন্টার উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “দূরপাল্লার সব বাস যেন মূল সড়কে না দাঁড়িয়ে বাধ্যতামূলকভাবে টার্মিনালের ভেতর থেকে যাত্রী ওঠানামা করায়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
এবারের ঈদযাত্রায় অবশ্য বেশির ভাগ পরিবহনকে টার্মিনালের বাইরের কাউন্টারগুলো থেকে টিকেট বিক্রি এবং মূল সড়ক থেকে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, “টার্মিনালের ভেতরে থাকা ৬টি ব্লকের মোট ১১০টি টিকিট কাউন্টার সুষম ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিবহন মালিকদের মাঝে দ্রুত পুনর্বণ্টন করার কাজ চলছে। টার্মিনালের ভেতরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে বাস পার্কিং ও যাত্রী চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা উন্মুক্ত করা হবে।”
ঈদযাত্রায় বাসের সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করতে এবং ফ্লাইওভারের সঠিক ব্যবহারের লক্ষ্যে টার্মিনালের খোলা জায়গায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
আরো পড়ুন
ঈদযাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চাপ, নেই বড় যানজট