২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

ভোটের ট্রেন ছাড়ল, ইসির সামনে ‘আস্থার পরীক্ষা’

“অনেকের মধ্যে যে সন্দেহ ছিল, অনেকেই যে প্রশ্ন করেছেন, সেই জিনিসটা আর থাকছে না এবং নির্বাচনের যে ট্রেনটা, সেটা তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর দিকে যাত্রা শুরু করলো,” বলেন আব্দুল আলীম।

ভোটের ট্রেন ছাড়ল, ইসির সামনে ‘আস্থার পরীক্ষা’
ভোটের মহড়ায় ভোটারদের সারি। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ২৯ নভেম্বর ঢাকার শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই ব্যালটে ভোটের মহড়া। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

বিশেষ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Dec 2025, 02:02 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:17 PM

অভ্যুত্থানে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর দেখতে মানুষের যে বিপুল প্রত্যাশা, তা পূরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ-জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে রাষ্ট্র সংস্কারের সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটের তারিখ রেখে ঘোষণা করা এই তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। একই সঙ্গে তারা সামনের দিনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেছেন। 

ঢাকার শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৯ নভেম্বর মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। মহড়ার অংশ হিসেবে নির্বাচনি কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিচ্ছেন ভোটাররা। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

ঢাকার শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৯ নভেম্বর মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। মহড়ার অংশ হিসেবে নির্বাচনি কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিচ্ছেন ভোটাররা

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এক নতুন বাস্তবতায় ভোটের ট্রেন গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করায় এ নিয়ে ‘সংশয়ের’ অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

তাদের মতে, অনেক নতুনের নির্বাচন হবে-ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। আইন-বিধি সংস্কারের পর সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট অনন্য মাত্রা আনছে। আবার একটি বড় দল ভোটের বাইরে থাকায় বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচনেও নানা বাধা আসতে পারে। 

তারা বলছেন, ভোটার উপস্থিতি বাড়ার আশা ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের পথে বর্তমান ইসির সামনে আস্থার পরীক্ষাও অপেক্ষা করছে। ভোটের বাদ্য বাজলেও সাংবিধানিক সংস্থাটির জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জও অপেক্ষা করছে।

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সরকারের তরফ থেকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। 

তফসিল ঘোষণা করায় নির্বাচন কমিশনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, “এই তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করল। 

“ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এখন যে নতুন পথে অগ্রসর হচ্ছে—এই নির্বাচন ও গণভোট সেই পথরেখাকে দৃঢ় করবে, গণমানুষের মতকে প্রাধান্য দেবে এবং নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি আরও সুসংহত করবে।”

সরকারপ্রধান ঘোষিত নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনে তফসিল ঘোষণা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, চার কারণে এবারের নির্বাচন ‘জাতির ইতিহাসে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ’।

গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান। 

অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেশের হাল ধরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দুর্নীতির মামলায়ও তার কারাদণ্ডের রায় এসেছে।

দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্রসংস্কারে লক্ষ্য ধরে জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের আদেশ এসেছে, এ বিষয়ে জন্গণের রায় মিলবে গণভোটে।

আর নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা হল।

‘চার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ভোট’

বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণাকালে সিইসি নাসির উদ্দিন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সকল রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ ভোটারদের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা চেয়েছেন। 

“সকলের প্রতি আমার আহ্বান আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফল করে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখুন।”

চার কারণে এবারের নির্বাচন ‘জাতির ইতিহাসে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করছেন তিনি।

“প্রথমত, প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাঙ্খিত সংস্কার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের নির্বাচন এটি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে যা একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে সক্ষমতা প্রমাণ করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অনন্য সুযোগ।

“তৃতীয়ত দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের পর দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলসমূহের মাঝে সৌহাদ্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধারা প্রবর্তনের দাবি রাখে এই নির্বাচন।”

চতুর্থ কারণ হিসাবে প্রবাসী ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের ভোটের আওতায় আনার কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, “প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে পরিমার্জন করে এই নির্বাচনে একটি কার্যকরী রূপ দেওয়া হচ্ছে।

“বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধা তথা প্রবাসী বাংলাদেশী ভোটারদের প্রথমবারের মত ভোটের আওতায় আনা হচ্ছে। একইভাবে প্রথমবারের মত ভোটের আওতায় আসছেন আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারগণ। এছাড়াও নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারী এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে এবার ভোট দেবেন।”

সংসদ ও গণভোটের তফসিল

• ভোটগ্রহণ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা

• মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

• মনোনয়নপত্র বাছাই: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ৪ জানুয়ারি ২০২৬

• রিটার্নিং অফিসারের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের শেষ তারিখ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬

• কমিশনে দায়েরকৃত আপিল নিষ্পত্তি: ১২ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

• প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬

• চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্ধ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬

• নির্বাচনী প্রচারণা: ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত

সংসদের ৩০০ আসনে এবারের নির্বাচনের ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের তালিকা চূড়ান্ত করার কথা বলেছেন সিইসি।

এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭ হাজার ৯৪২ জন।

দলগুলোর প্রতিক্রিয়া

বিএনপির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আমরা মোটামুটিভাবে সন্তুষ্ট।”

তিনি মনে করেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ‘নতুন দিগন্তের’ সূচনা হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।”

এছাড়া নির্বাচনের আগে জোটগতভাবে দেওয়া বিভিন্ন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের বিভিন্ন দাবি আছে, সেটা আমরা জোটগতভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবো।”

অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভাষ্য, “নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ হতে পারবে, সেই বিষয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এবং বর্তমানে যে পরিস্থিতি রয়েছে-লটারির মাধ্যমে এসপি ও ডিসি নিয়োগ হচ্ছে কিন্তু সেটা জাতির সামনে স্পষ্ট করা হয়নি কাদেরকে নিয়োগ করা হচ্ছে। এটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যে করা হচ্ছে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট সক্ষমতা তারা দেখতে পাচ্ছেন না দাবি করে তিনি বলেন, “আমরা এও বলে আসছি যে বর্তমান যে নির্বাচন কমিশন আছে তাদের পুনর্গঠনের কথা। কিন্তু তাদের অধীনেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তারা অনেক উদ্যোগ নিয়েছে, প্রবাসীদের ভোটাধিকারের জন্য, আমরা সেটাকে স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু তাদের কর্মে প্রতিফলন দেখাতে হবে যে তারা রকিবুল কমিশন থেকে আলাদা।

“আমরা আগেও বলেছি, এ নির্বাচন হচ্ছে ‘লন্ডন ডিল’ এর মাধ্যমে। এটি যদি দেশে বসে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে হত তাহলে আরো বিশ্বাসযোগ্য হত।”

এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছেন।

‘সংশয় কাটল, ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পালা’

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিণতিতে গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ওঠে, যাতে কর্তৃত্ববাদী শাসন আর ফিরতে না পারে। 

রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগের মধ্যে গতবছর বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ধারণা দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। 

এ নিয়ে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ বাড়ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চাইছিল তারা।

গত ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সরকারপ্রধান বলেছিলেন, নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে। কিন্তু ১৩ জুন লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে দুই পক্ষই আগের অবস্থান থেকে সরে আসে। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, নির্বাচন হবে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে।

তবে জুলাই সনদ চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা, শেষে সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন হবে কি হবে না, তা নিয়ে জনপরিসরে জল্পনার ডালপালা ছড়ায়।

প্রধান উপদেষ্টা গত ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা দেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট এবং সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে হবে।

লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক করেন। ফাইল ছবি

লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক করেন। ফাইল ছবি

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, সব রাজনৈতিক দল এ তফসিলকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে সেই সংশয় আর নেই।

তিনি বলেন, “অনেকের মধ্যে যে সন্দেহ ছিল, অনেকেই যে প্রশ্ন করেছেন, সেই জিনিসটা আর থাকছে না এবং নির্বাচনের যে ট্রেনটা, সেটা তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর দিকে যাত্রা শুরু করলো।”

আব্দুল আলীম বলেন, গত তিনটা নির্বাচন দেশে ও সারা দুনিয়াতেই নানাভাবে এটা সমালোচনা হয়েছে, কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন এটা নিয়ে। তারপরে যে নির্বাচনটা, এবার মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে কোনো সন্দেহ নেই। 

সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, “সংস্কার হয়েছে আইন-বিধিতে, সংসদ ও গণভোট একসাথে হচ্ছে; এগুলো সবই মাইলফলক। প্রবাসী ভোটিং হচ্ছে মাইলফলক। এগুলো সব মাইলফলক। কিন্তু চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জটা সবসময় কাজের অংশ হয়। 

“চ্যালেঞ্জগুলা মোকাবিলা করার জন্যে ওরকম পরিকল্পনা থাকতে হয় এবং আমার বিশ্বাস, নির্বাচন কমিশন হয়তো সেভাবেই পরিকল্পনা করে যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।”

‘অনেক প্রশ্ন, সংশয়ও’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, অনেক বিষয় এখনও ‘অমীমাংশিত’ রয়েছে। অনেক বিষয় এখনও ‘খোলাসা’ করা হয়নি। তার চেয়ে বড় কথা গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুব বেশি ‘কাজ করা হয়নি’ সরকারের। 

“বরং আমরা দেখেছি-‘মব’ (সহিংসতা) এখনও চলছে, নিয়মিত অনিয়মিতভাবে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নজন আক্রান্ত হচ্ছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায় আক্রান্ত হচ্ছে। এমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মানুষ নির্বাচনি পরিবেশ আস্থার মধ্যে আনতে পারছে না। …মানুষের সামনে সংশয় আছে।”

ভোটকে সামনে রেখে রাজনৈতিক জোটের হিসাব-নিকাশও চলছে, ভোটের তারিখ হলেও সংশয় কাটবে না বলে মনে করেন তিনি। 

“সুতরাং নির্বাচন নিয়ে নানারকম শঙ্কা আছে, সংশয় আছে। সবকিছুর পরেও অনেকে মনে করছেন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি হবে কিনা, যদি, কিন্তু; এবং হালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন এসেছে যে ‘অনিবার্য কারণ’-এই বিষয়গুলো কিন্তু আমাদের ভাবনায় রয়েছে।”

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের প্রস্তুতি হিসেবে মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। ফাইল ছবি 

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের প্রস্তুতি হিসেবে মক ভোটিংয়ের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এবারের ভোটটি অনেকগুলো নতুন দিক আছে। সেই নতুন দিকের চ্যালেঞ্জ তো আছে।  গণভোট কি,  কীভাবে কেন দিতে হবে, গণভোটের বিষয়গুলো কি-এখন পর্যন্ত আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে বেশিরভাগ মানুষ জানে না, বুঝতে পারছে না আসলে।…খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ। 

“দ্বিতীয়ত হল যে প্রবাসীদের ভোটের ক্ষেত্রেও প্রথমবারের মতো সেটিও চ্যালেঞ্জ হতে পারে।”

ভোটের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা যেটা, আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, মাঠে সকল প্রার্থীর জন্য, সব দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে কিনা এবং সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা সকলেই এড়িয়ে যাচ্ছেন বা আলোচনায় আনছেন না, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য, ভোটাররা যাতে নিরাপদে নিশ্চিতভাবে এবং নিজেদের মত করে ভোট দিতে পারবেন কিনা, সে সংশয়টা রয়েই গেছে। 

“বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং নারী তারা কিন্তু ভয়েই আছেন।”

এ পর্যবেক্ষকের মতে, গত ছয় মাসের বিভিন্ন দল থেকে যেভাবে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য এসেছে, ভোটাররা জানে যে বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব বেশি মজবুত না এবং সরকার এ বিষয়ে আসলে খুব বেশি কিছু করতে পারবে বলে জনগণ ‘আস্থা পাচ্ছে’ না, এটা চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলছেন, আরেকটা বিষয় আওয়ামী লীগকে ভোটের বাইরে রাখা, আবার জাতীয় পার্টি নিবন্ধিত থাকলেও ভোটে অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে, তার প্রভাবও পড়তে পারে।

তার ভাষ্য, “দেখুন, বাংলাদেশের মিডিয়া ইতিমধ্যে বলেছে, আমরা জানি যে ৩৫ শতাংশ ভোটার রয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করেন। এর আগে আমরা দেখেছি যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়াকে বলেছেন যে এই ভোটাররাই নির্বাচন প্রতিহত করবে, প্রতিরোধ করবে। তো সেক্ষেত্রেও সেই ভোটাররাও কিন্তু একটা বড় ফ্যাক্টর নির্বাচনে চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে।

অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, “বিভিন্ন দলই ভোটারদের তাদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ফলশ্রুতিতে ভোটাররা আসলে কী করবেন এবং কীভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করবেন, নাকি ভোট প্রতিহত করবেন, সেটাও কিন্তু আমাদের বিবেচনার জায়গা।”

তফসিলের আগে ভোলায় বিএনপি ও বিজেপির কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ। ফাইল ছবি

তফসিলের আগে ভোলায় বিএনপি ও বিজেপির কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ। ফাইল ছবি

মাঠ প্রশাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই প্রশাসনিক কাঠামোতে ডিসি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পরস্পর বিরোধী দাবি রয়েছে। সেগুলো আমলে নিতে হবে।

“তার মানে হল, এই প্রশাসনিক কাঠামো ব্যক্তিরা কোন না কোনভাবে দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট। সেক্ষেত্রে সেগুলোকে কীভাবে নির্দলীয় বলব। নিরপেক্ষ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেই জায়গাটা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।

“…আরেকটা চ্যালেঞ্জ তো আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে-ভোটের মাঠে এবং এই নির্বাচনে বিশেষ করে মহাশক্তিগুলো কীভাবে এই নির্বাচনি জায়গাগুলোতে হস্তক্ষেপ করে, তারা কীভাবে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করে, সেগুলো কিন্তু দেখার জায়গা আছে, সেগুলো একটু বড় চ্যালেঞ্জ।”

‘দরকার কৌশলগত পরিকল্পনা’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “শিডিউল অনুযায়ী ভোট হতেই হবে। কারণ এখন রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে নেমে গেছে। এখন তো আর ফেরার কোনো উপায় নেই। তবে যেটা হলো শান্তিপূর্ণ ভোট। এটাই হবে আমাদের একমাত্র চ্যালেঞ্জ, ভোটটা কতটুকু শান্তিপূর্ণ হবে।”

তার মতে, শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

“সেটা করার জন্য কতগুলো প্রস্তুতি খুব জরুরি, সেটা হল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই। আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল গোয়েন্দা রিপোর্ট। প্রতিনিয়ত গোয়েন্দা রিপোর্টের মাধ্যমে এটা জানা যে, কোত্থেকে কোত্থেকে ভোটকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই রিপোর্টটা যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে কিন্তু নির্বাচন অনেক সমস্যার মধ্যে পড়বে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “৫ আগস্টের পরে একটা নতুন পরিস্থিতিতে বহু ধরনের  অংশীজন, মিডিয়া, সবাই এক ধরনের ‘প্রোপাগান্ডা পলিটিক্স’ এর মধ্যে ‘ইনভলভ’ ছিল। এই ‘প্রপাগান্ডার’ কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে বেশি।”

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা দরকার মন্তব্য করে অধ্যাপক সাব্বির বলেন, “তফসিলের পর সবাই মাঠে। ভোট নিয়ে সরকারের এখন পুরো মনযোগ দেওয়া উচিত, যে কোন কোন জায়গা থেকে এই ভোট বিঘ্ন করার চেষ্টা করতে পারে, সেই জায়গাগুলোকে শনাক্ত করা, এবং আগাম ব্যবস্থা নেওয়া, অর্থাৎ আগে থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করা।” 

তার মতে, এবার নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার ‘ফোর্স’ মাঠ পর্যায়ে আছে।

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল কয়েক দফা বিক্ষোভ করেছে।

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল কয়েক দফা বিক্ষোভ করেছে।

ইসি সচিব যা বলছেন

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিনদিন পর ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়। আর নভেম্বর দায়িত্ব নেয় বর্তমান নির্বাচন কমিশন। 

এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বাকি চার সদস্য হচ্ছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ; আর নির্বাচন কমিশন সচিব রয়েছেন আখতার আহমেদ।

এবার প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি ও নিজ ভোটার এলাকার বাইরে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের ভোট পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নেওয়া হবে।

সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে গণভোটের প্রস্তুতিও শেষ করে নির্বাচন কমিশন। ২৯ নভেম্বর ‘মক ভোটিং’ করে অভিজ্ঞতা নিয়ে ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়; পাশপাশি ভোটকক্ষে গোপন বুথের সংখ্যাও বাড়ায়।

পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের এ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটে লড়বেন। এবার ৫৫টি দল নিবন্ধিত রয়েছে। 

আসন্ন নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে কতগুলো পরিপত্র দেওয়া হয় এবং সে পরিপত্রগুলো ‘রেডি’ করা আছে, আমরা করব। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ ক্ষেত্রে যে যে বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক হবে, আমরা সব নিশ্চয়ই নিশ্চিত করব।”

যাতে কেউ অন্ততপক্ষে কোনো অভিযোগ না করতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

স্থানীয়ভাবে রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে আচরণবিধি প্রতিপালনে ইসির কঠোর পদক্ষেপ থাকলেও রাজনৈতিক দলের সহযোগিতার কথাও বলেছেন সচিব।

আখতার আহমেদ বলেন, “এখন কথাটা হচ্ছে- এটা তো আমাদের দিক থেকে পদক্ষেপ থাকবে। এরপরও যারা এর সাথে জড়িত রাজনৈতিক দলের, তাদেরও সদিচ্ছার ব্যাপার থাকতে প্রাসঙ্গিক। আমি বিশ্বাস করি, আমি আস্থা রাখি এবং আমি এটা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে সবাই সহযোগিতা করবেন।”

কেউ যদি না মানেন তাহলে তার জন্য আইনগতভাবে যে ব্যবস্থাটা আছে সেটা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

আরও পড়ুন:

তফসিল ঘোষণা: সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি 

তফসিল ঘোষণা: ইসিকে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা

উৎসবমুখর ভোটের বার্তা সিইসির

তফসিলে 'মোটামুটি' সন্তুষ্ট বিএনপি 

তফসিল: ‘সংশয়ের’ অবসান দেখছে জামায়াত, ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে ‘সন্দেহ’ এনসিপির