Published : 05 Jul 2026, 09:46 PM
শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে আইন অনুযায়ী লভ্যাংশ জমা না দেওয়া ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ পাবলিক ও প্রাইভেট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।
রোববার দুই বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে এ আদেশ দিয়েছে।
আদালত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন (চেয়ারম্যান ও মেম্বার সেক্রেটারি), কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) মহাপরিদর্শক ও শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটকারী আইনজীবী এস এম আরিফ মণ্ডল নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জিয়াউর রহমান।
আইনজীবী আরিফ মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে প্রায় ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর এই শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে টাকা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। কিন্তু গত বছরের এক হিসাব অনুযায়ী ৫১৮টি প্রতিষ্ঠান তাদের লভ্যাংশ জমা দিয়েছে, যেখান থেকে এ পর্যন্ত জমা হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি টাকা।
“সক্ষমতা থাকা ৮ হাজার কোম্পানি নিয়ম অনুযায়ী তাদের অর্থ জমা দিলে এই জমার পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় ২৫০ লাখ কোটি টাকা।”
বর্তমানে এই ফান্ডে শ্রমিকদের সুবিধাভোগের জন্য সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা থাকার তথ্য দিয়ে রিটকারী আইনজীবী বলেন, “অথচ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডায়েফ) এবং শ্রম অধিদপ্তর তাদের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে পারছে না। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বিপুল পরিমাণ অর্থ অনাদায়ী রয়ে গেছে। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করেই আমি রিট আবেদনটি করেছি।”
রুলের ব্যাখ্যা করে এ আইনজীবী বলেন, “রুলের মূল বিষয়বস্তু হল, আইন অনুযায়ী যেসব পাবলিক ও প্রাইভেট কোম্পানি তাদের লভ্যাংশ তহবিলে জমা দিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আদালত এই মর্মে চার সপ্তাহের রুল জারি করেছেন।”
শ্রম আইনের বিধান ও তহবিলের কাঠামো তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর ২৩৪ ধারায় অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিলের কথা বলা আছে। আইন অনুযায়ী মালিক প্রত্যেক বছর শেষ হওয়ার অনূর্ধ্ব নয় মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ অর্থ শেয়ার করবেন। সেই অর্জিত অর্থ যথাক্রমে ৮০:১০:১০ অনুপাতে জমা হবে।
“৮০ শতাংশ যাবে অংশগ্রহণ তহবিলে, ১০ শতাংশ যাবে কল্যাণ তহবিলে এবং বাকি ১০ শতাংশ জমা হবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬ এর ধারা ১৪ অনুযায়ী ‘শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ তহবিলে।”
কোন কোন কোম্পানির এ আইন প্রযোজ্য হবে, সে কথা তুলে ধরে আরিফ মণ্ডল বলেন, “শ্রম আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ী যেসব কোম্পানির হিসাব বছর শেষে পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ১ কোটি টাকা অথবা হিসাব বছরের শেষ দিনে যার স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ২ কোটি টাকা রয়েছে, সেসব পাবলিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে এবং তারা এই তহবিলে লভ্যাংশ দিতে আইনত বাধ্য।”
আইন অমান্যের শাস্তি, জরিমানা ও মাঠপর্যায়ের মামলার তদারকি নিয়ে তিনি বলেন, “শ্রম আইনের ২৩৫ ধারায় গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে কেউ যদি বিধি লঙ্ঘন করেন, তবে বোর্ডের চেয়ারম্যানের অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে প্রথম তারিখের পর থেকে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫ হাজার টাকা করে জরিমানার নিয়ম আছে।
“কিন্তু মাঠপর্যায়ে সাধারণত যেটা ঘটে, শ্রম বিভাগের পরিদর্শকরা যখন বোঝাপড়া বা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন না, তখনই কেবল মামলা করেন। পরবর্তীতে জোরালো পদক্ষেপ বা তদারকি না থাকায় অনেক সময় এসব মামলা খারিজ হয়ে যায় এবং কোনো অর্থ আদায় হয় না।”
শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ অনাদায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে গত ২১ জুন জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করা হয়।
রিটে দেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত সকল প্রতিষ্ঠান ও কারখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘বোর্ড অব ট্রাস্টিজ’ এর বিরুদ্ধে শ্রম আইন ও শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তদারকির অভাব এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে নিষ্ক্রিয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো দিনের পর দিন আইন লঙ্ঘন করছে। এই নিষ্ক্রিয়তার ফলে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা এবং আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।
তহবিলের অভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক কল্যাণমূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও রিট আবেদনে তুলে ধরা হয়।