তারা তাদের চক্রান্ত করেই যাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তারা তৎপর আছে সারাক্ষণই। আমি জানি তাদের তৎপরতা অনেক বেশি।”

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2022, 03:20 PM
Updated : 3 August 2022, 03:20 PM

১৫ অগাস্টের হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে দেশ পরিচালনায় ফিরে আসাটা অনেকেরই পছন্দ নয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচনের আগে তারা আবারও চক্রান্ত শুরু করেছে।

বুধবার সকালে গণভবনে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির নবনির্বাচিত বোর্ড সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাত করতে গেলে তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ বিষয়ে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে করোনাভাইরাস মহামারীসহ রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ সংকটে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সবাইকে সতর্ক করে শেখ হাসিনা বলেন, “দুর্যোগ চতুর্দিক দিয়ে আসবে এবং আসছে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরেকদিকে মানুষের তৈরি দুর্যোগ।

তিনি বলেন, “মানুষের তৈরি দুর্যোগ হচ্ছে যেমন- আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ধাক্কাটাও যেমন আসবে আর তাছাড়া যেখানে রাসেলকে পর্যন্ত খুন করল আর সেই পরিবার থেকে আমি বেঁচে এসে সরকারে আসলাম, সাফল্য এনে দিলাম, বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা এনে দিলাম এটা অনেকেই পছন্দ করবে না।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কাজেই তারা তৎপর আছে সারাক্ষণই। আমি জানি তাদের তৎপরতা অনেক বেশি। তবে যারা এই তৎপরতা চালাচ্ছেন তাদের কার কী, সে খবরও আমি রাখি, চিনি তো।

“আমার তো অচেনা কেউ নাই। তাদেরও বিষয় আমার জানা আছে। কিন্তু তারা তাদের চক্রান্ত করেই যাচ্ছে।”

২০১৪ সাল এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও একই ধরনের চক্রান্ত হয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা।

“আবার এখন নির্বাচন যখই সামনে আসছে আবার। মানে… শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। তাদের কি লাভ হবে জানি না। তবে বাংলাদেশের মানুষের তো ক্ষতিই হবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছিল এবং তারা চেয়েছিল আওয়ামী লীগ যেন কখনোই ক্ষমতায় আসতে না পারে।”

এসময় জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দলের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফেরার কথা স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।

দেশে ফেরা ও অবস্থানের ক্ষেত্রে সেই সময় অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘণ করে যারা সরকারে এসেছিল তারা নানাভাবে বাধা তৈরি করেছিল বলেও জানান তিনি।

“আমার একটা চিন্তা ছিল যে, দেশটাকে কিভাবে আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা, বিকৃত ইতিহাসের হাত থেকে আমার দেশের মানুষকে মুক্ত করা এবং দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করা।

“এই একটা চিন্তাই আমার মাথায় ছিল এবং সেভাবেই সকল পরিকল্পনা নিয়েছি সব সময়। সেটা বাস্তবায়ন করে এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি।”

ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে জমিসহ ঘর করে দেওয়ার পাশাপাশি জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে জানিয়ে কেউ ভূমিহীন, গৃহহীন থাকলে সেই তথ্য জানানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকার প্রধান জানান, প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়া হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে উন্নত দেশগুলোর পাশপাশি বাংলাদেশে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য জ্বালানি সাশ্রয়ে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ করোনাভাইরাস মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “তবে কৃচ্ছ্রতাসাধন করতে হবে,সঞ্চয় করতে হবে। এক ইঞ্চি জমি যাতে অনাবাদি না থাকে সেই ব্যবস্থাও নিতে হবে।”

“কারণ একে তো করোনা, তার ওপর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ তারপরে এই স্যাংশন,পাল্টা স্যাংশন। এই স্যাংশনের ফলেই সব জিনিসের দাম বাড়ছে।

“আমি জানি না কারা লাভবান হচ্ছে এই যুদ্ধে। লাভবান হচ্ছে শুধু অস্ত্র যারা প্রডাকশন করে তারাই লাভবান হচ্ছে আর মরছে সাধারণ মানুষ।”

যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এর আগে মিডল ইস্ট,গালফ কান্ট্রি,এখন রাশিয়া, ইউরোপ পরে ধরবে চায়না।

“আর চায়না ধরলে তো তার বাতাস আমাদের মধ্যেও আসবে।’

সেই কারণে বাংলাদেশে এখন থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে জানিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে কারো এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি না থাকে সেই নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন সরকার প্রধান।

শেখ হাসিনা বলেন, “আজকে এটা প্রমাণিত সত্য যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ কাজ করেনি,করেও না। আর অবৈধ ভাবে ক্ষমতা যারা দখল করে তারাতো তাদের ক্ষমতার চেয়ারটা কিভাবে দখলে রাখবে ওই চিন্তায়ই ব্যস্ত থাকে।”

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের দুঃসহ ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমার মাঝে মাঝে শুধু এটাই চিন্তা হয় যে, বাঙালির জন্য এত করলেন আর তারাই গুলিটা করল,তারাই মারল। কিভাবে মারল?

“এটার হিসাব আমি এখনো পাই না। আমার কাছে অবাক লাগে। যেখানে পাকিস্তানিরা তাদের ওপরও নির্দেশ ছিল দেখার সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করার। তারা পারেনি। তারা পারেনি খুন করতে।

“ফাঁসির হুকুম দিয়েও তারপরও দিতে পারল না। যে মাটিতে নিজের দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনটাকে বিলিয়ে দিলেন,সারাটা জীবন কষ্ট করলেন আর সেই মানুষের ভেতর থেকেই খুনি বের হল!”

জাতির পিতার খুনিরা একসময় তার ধানমন্ডির বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেছে এবং খাওয়া-দাওয়া করেছে বলেও এসময় জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা।

“মুক্তিযুদ্ধের সময় কামালের সাথে ছিল,সেই মেজর নূর। আমার চাচীর বাসায় গিয়ে খেয়ে আসত। ডালিমের শ্বাশুড়ি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের বাসায়ই বসে থাকত। ডালিম তো সব সময় আসা-যাওয়া করত।

“ডালিমের বউ সবসময় আমাদের বাসায় পড়েই থাকত সারাদিন। আমি এভাবেই বলব… সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাজির।”

শেখ হাসিনা বলেন, “জিয়াউর রহমান দুই মাস পরপর বউকে নিয়ে হাজির হত। কারণ বউকে সাথে নিত, তাহলে দোতলায় যাওয়া যায়। মার সাথে দেখা করার কথা বলে।

“ঠিক ৩২ নম্বরের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর যে ছোট লবিটা ওখানে যে সুইচ বোর্ডটা আছে তার নিচে উঁচু উঁচু মোড়া, সিলেট থেকে আনা। ওই মোড়ায় গিয়ে বসে থাকত।

খন্দকার মোশতাক মুক্তিযুদ্ধের পর যে বাসায় জাতির পিতার পরিবারের সদস্যরা বন্দি ছিলেন সেখানে মাটিতে বিছানা তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করেছিল বলে জানান তিনি।

আবেগজড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, “জানি না নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস। জাতির পিতা কিন্তু… ১৫ই অগাস্ট যারা মারা গিয়েছেন তাদের তো কাফন, দাফন কিছু হয়নি।”

জাতির পিতার লাশ সেনা সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে কোনোমতে মাটি চাপা দিয়ে চলে আসার পরিকল্পনায় ছিল বলে জানান তিনি।

“যেহেতু আমাদের মসজিদের ঈমাম সাহেব এবং অন্যরা সবাই বলেন যে, আপনারা যদি মনে করেন এটা শহীদী মৃত্যু তাহলে ওভাবেই দিতে পারেন, তবে মুসলমানের লাশ এটা একটু কাফন-দাফন দিতেই হবে।”

ওই সময় কার্ফু থাকায় সব দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং টুঙ্গিপাড়ায় তখন কাফনের কাপড় কেনার তেমন কোনো দোকানও ছিল না বলে জানান শেখ হাসিনা

“তখন এই রেড ক্রসের যেই কাপড় তিনি সাধারণ মানুষকে বিলাতেন ওই কাপড় নিয়ে এসে সেই কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে সেটিই কিন্তু তিনি নিয়ে গেছেন।

“আর কিছু নেননি বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে। আর কিছুই নেননি। সেটাও কিন্তু ওই রেড ক্রসের কাপড় দিয়েই ওনার কাফন। এটা হল বাস্তবতা।”

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নব নির্বাচিত বোর্ড সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি আব্বার হাতে করা। স্বাধীনতার পর পর তিনি এটা গড়ে তুলেছিলেন।

“আপনাদের যেভাবে বললাম এভাবে একটা একটা কথা না বলে একটা টোটাল পরিকল্পনা নেন, এটাকে আরও কিভাবে কার্যকর করবেন।”

হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল ঢাকায় ‘এক নম্বর’ হাসপাতাল ছিল মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এটার সেই গৌবরটা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসেন সেটাই আমি চাই।

“ওখানে আরেকটা জায়গা, কিন্তু… মগবাজারের পাশে আরেকটা জায়গা। ওখানে একটা স্কুল করার কথা ছিল। আমার মনে হয় সেটাও করা যেতে পারে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক