অর্থপাচারের অভিযোগে রন ও রিকের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

রন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সীমার অতিরিক্ত প্রায় ৬১ লাখ এবং রিক ২৬ লাখ ২২ হাজার ডলারের বেশি খরচ করেন। সেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে ‘অর্থপাচার করে’।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 April 2024, 06:28 PM
Updated : 1 April 2024, 06:28 PM

সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক সিকদার ও তার ভাই রিক হক সিকদারের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে।

দুদক পরিচালক বেনজীর আহমেদ সোমবার কমিশনের ঢাকা জেলা কার্যালয় ১-এ মামলাগুলো দায়ের করেন।

কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রন ও রিক হক ছাড়াও ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পাঁচ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।

দুই মামলার অভিযোগ একই রকম। বিদেশে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে সীমার অতিরিক্ত খরচ করেছেন দুই ভাই। সেই তথ্য বাংলাদেশের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবিকে জানায়নি ন্যাশনাল ব্যাংক। বরং ব্যাংকের কর্মকর্তারা দুই ভাইয়ের ক্রেডিট লিমিট অবৈধভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

রন হক সিকদার এভাবে সীমার অতিরিক্ত বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ কোটি (২০১৭ সালে ডলারের বিপরীতে টাকার মান অনুযায়ী) কোটি টাকা এবং রিক হক সিদকার প্রায় সাড়ে ২১ কোটি টাকা খরচ করেছেন।

সেই টাকা ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে দুই ভাইয় ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের নামে থাইল্যান্ডে থাকা ২০টি ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। সেই অর্থে পরিশোধ হয় দুই ভাইয়ের ক্রেডিট কার্ডের ঋণ। দুই ভাইয়ের নামে অর্থ এসেছে আরও নানা দেশ থেকে।

এই মামলার বিষয়ে দুই ভাইয়ের বক্তব্য জানতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদারের গড়ে তোলা ব্যাবসায়িক ‘সাম্রাজ্য’ বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানদের হাতে এসে পড়েছে। রন ও রিকের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরেই নানা অভিযোগ আসছিল গণমাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তারা ব্যাংকের পরিচালকের পদও হারিয়েছেন। 

আরো পাঁচ আসামি

দুটি মামলাতেই রন ও রিকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব কার্ড ডিভিশন মো. মাহফুজুর রহমান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ সৈয়দ আব্দুল বারী, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ওয়াদুদ ও এ এস এম বুলবুল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোশতাক আহমেদকে আসামি করা হয়েছে।

দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ

মামলায় বলা হয়েছে, রন হক শিকদার ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বার বিদেশে গিয়ে ৬১ লাখ ৫২ হাজার ২২৫ ডলার খরচ করেন। অথচ তিনি একবারে সর্বোচ্চ ১২ হাজার করে মোট ৬০ হাজার ডলার খরচ করতে পারতেন।

অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের লিমিটের অতিরিক্ত ৬০ লাখ ৯২ হাজার ২২৫ ডলার (২০১৭ সালের রেট অনুযায়ী প্রায় ৫০ কোটি টাকা) বিদেশে খরচ করেন।

রিক হক সিকদারের ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পাঁচ বার বিদেশে গিয়ে ক্রেডিট কার্ডে খরচ করেন ২৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৯৯ ডলার। অথচ তার লিমিট ছিল ৬০ হাজার ডলার।

অর্থাৎ তিনি অতিরিক্ত খরচ করেন ২৬ লাখ ২২ হাজার ৪৯৯ ডলার। পরে সই অর্থও বাংলাদেশ থেকে পাচার করে তা দিয়ে কার্ডের ঋণ পরিশোধ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ডের ঋণের তথ্য মাসিক ভিত্তিতে যথাসময়ে সিআইডি ডেটাবেইজে আপলোড করতে হবে। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংকের হেড অব কার্ড ডিভিশন মাহফুজুর রহমান ২০২০ সাল পর্যন্ত চার বছরেও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের তথ্য রিপোর্ট করেননি।

দুটি মামলার ভাষাই একই রকম। এজাজার অনুযায়ী, সিআইবিকে কোনো তথ্য না জানিয়ে আসামিরা অবৈধভাবে রন ও রিক হক সিকদারের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে অবৈধ লিমিট সুবিধা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী তারা ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার ৪৬১ ডলারের লিমিট পেতে পারতেন। কিন্তু নিয়ম বহির্ভুতভাবে বর্ধিতভাবে ক্রেডিট লিমিট দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঋণ পরে পরিশোধ করা হেয়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থ পাচার করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ পর্যালোচনায় দেখেছে, থাইল্যান্ডে রন ও রিক হক সিকদারের নিজ নামে ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্তত ২০টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে সেসব ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড চীন, ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, রাশিয়া থেকেও অর্থ স্থানান্তর হয়েছে রন ও রিক হকের নিজের ও স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে।

ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ব্যাংক পরিচালকের ক্ষমতার অপব্যবহার করে রন ও রিক এক বছরের বেশি সময় ধরে বকেয়া পরিশোধ না করেও ক্রেডির কার্ডের মাধ্যমে খরচ অব্যাহত রেখেছেন।

এসব কর্মকাণ্ড দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২) ও ৪ (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে দুটি মামলাতে উল্লেখ করা হয়।  

শক্তিশালী অবস্থান থেকে দুর্দশায় ন্যাশনাল ব্যাংকের

এক সময় ন্যাশনাল ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে শক্তিশালী কোম্পানি ছিল। কিন্তু সুশাসনের অভাব আর খেলাপি ঋণের খপ্পরে পড়ে এখন সেটি লোকসানি কোম্পানি। ২০২২ সালে ব্যাংকটি তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিয়েছে।

ঋণ কেলেঙ্কারি ছাড়াও দুই ভাই রন ও রিকের বিরুদ্ধে একের পর এক সংবাদ এসেছে গণমাধ্যমে। তবে ২০২১ সালের ২৮ জুন রিক হক সিকদারের পরিচালক পদ কেড়ে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৩ সালে ২১ ডিসেম্বর ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। বাদ পড়েন সিকদার পরিবারের তিন জন সহ ছয় জন।

রন ও তার ভাই দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালের ১৯ মে গুলশান থানায় একটি মামলা হয়েছিল।

এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া এবং অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে অপহরণ করে নির্যাতন ও গুলি করতে চাওয়ার অভিযোগ আনা হয় সেই মামলায়।

২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে গ্রেপ্তার হন রন। পরে জামিনও পান। পরে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে ওই বছরের ১২ অগাস্ট তাদেরকে অব্যাহতি দেয় আদালত।