Published : 08 Dec 2025, 12:59 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি গুছিয়ে আনছে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
রোববার এ নিয়ে কমিশন সভাও হয়েছে। এরপর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন তারা। এখন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করে প্রস্তুতি অবহিত করা বাকি রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছেন, ইতোমধ্যে নাগরিকরা নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন, যা দেশে নির্বাচনি ‘আমেজ’ সৃষ্টি করেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেছেন, দেশে নির্বাচনের ‘ভাইব’ এখনো শুরু হয়নি।

আসছে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট করার লক্ষ্যে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল দেওয়ার কথা রয়েছে।
এই ভোট আয়োজনে ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ থাকার কথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে অবহিত করেছে ইসি।
রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সিইসি নাসির উদ্দিন ভোটের প্রস্তুতির অগ্রগতি তুলে ধরেন।
বৈঠকে সিইসি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রস্তুতি ‘সঠিক ও সুন্দরভাবে’ এগোচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন ও একই দিনে গণভোট আয়োজনের জন্য তারা ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ রয়েছেন।
প্রস্তুতির বিষয়ে ইসিকে পূর্ণ সহযোগিতা করার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনাররা ধন্যবাদ দিয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অর্ধশতাধিক দল অংশ নেবে। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ভোটের বাইরে থাকতে হবে। জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিক কয়েকটি দল ইসির সংলাপে ডাক পায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে ইসি।
তফসিল দ্বিতীয় সপ্তাহের যে কোনো দিন
সিইসি ছাড়া বর্তমান ইসিতে রয়েছেন-চার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, তাহমিদা আহমদ ও আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। আর সচিবের দায়িত্বে আছেন আখতার আহমেদ।
এ ইসির অধীনে ত্রয়োদশ সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে হবে; একসঙ্গে দুই ভোটের ঘটনাও প্রথম।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের আগে এদিন সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিইসির সভাপতিত্বে কমিশন সভা হয়।
সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সকালে আধা ঘণ্টা ও বিকালে আধা ঘন্টা সময় বাড়বে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট চলবে।”
৮ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ইতোমধ্যে ভোটের জন্য সার্বিক প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন এ নির্বাচন কমিশনার।
কমিশন সভার সার্বিক সিদ্ধান্তের পর ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
ইসির প্রস্ততি ও চ্যালেঞ্জ, যা বলছেন বিশ্লেষকরা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘ সময়ে ধরে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিয়েছে এবং অনেক তো সময় তাদেরকে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু কিছু প্রস্তুতি আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি।”
তিনি বলেন, “এখন তফসিল ঘোষণা করলে নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হবে এবং যথাসময়ে নির্বাচন হবে। তবে যেটা প্রশ্ন, সেটা হল, নির্বাচন কেমন হবে-সেটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কারণ নির্বাচনটা যদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে কি, হবে না এই প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারপরে নির্বাচনে সহিংস আচরণ, সহিংসতার মাত্রা কোন পর্যায়ে থাকতে পারে সেগুলো নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন (আছে)।”
ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপকের মতে, নির্বাচন কমিশন যে পর্যায়ে এসেছে, তাদের পক্ষে নির্বাচন করাটা খুব কঠিন না। শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে যদি সফল হয় বা সক্ষম হয়, তাহলে এটা কোনো সমস্যা নেই।

তিনি বলেন, সবাই মাঠে রয়েছে, তারা নির্বাচনী প্রচারণায় তৎপর। জামায়াত তৎপর, এনসিপি তৎপর, বিএনপি তৎপর।
“তৎপর আমরা দেখতেই পাচ্ছি, সবাইকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন-এটা একটা বিতর্কিত শব্দ আর অন্তর্ভুক্তিমূলক কীভাবে ব্যাখ্যা দিবেন? আওয়ামী লীগকে (নিবন্ধন স্থগিত) আসতে দেবেন কিনা, জাতীয় পার্টিকে আসতে দেবেন কিনা, এগুলো তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এগুলোর সাথে তো নির্বাচন কমিশনের কোনো সম্পর্ক নাই।
“এগুলো রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি সিদ্ধান্ত হয়, তাইলে আসবে তারা, তখন নির্বাচনের মানটা একটু ভালো হবে। এটা তো আমরা বলতেই পারি, আশাই করতে পারি।”
সামগ্রিকভাবে দেশের যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন সময়মতো হবে, সময়ের মধ্যেই হবে বলে মন্তব করেন অধ্যাপক সাব্বির।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, ইসির অতীত ইতিহাস অনুযায়ী সাধারণত তফসিলের আগে এ জাতীয় কাজগুলো (রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টাকে প্রস্তুতি অবহিত করা) করে থাকে; এটা নতুন কিছু না।
“কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন পর্যন্ত অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। এসব নিয়ে কী প্রস্তুতি রয়েছে, সবাইকে বলা দরকার, যারা নির্বাচনের অংশীজন রয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানুষ এখনও পুরোপুরি খুশি নয়। ইসি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সরকার থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটা ব্রিফিংয়ে পাওয়া দরকার।”
ভোট নিয়ে এখনও রাজনৈতিক মহলে বিভাজন থাকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, “নির্বাচন নিয়ে বিভাজন দেখতে পাচ্ছি-সেটা একটা ব্যাপার আছে। তারপরে আদালতে কিছু রিটও আছে। তারপরে এই যে দুইটা নির্বাচন একই দিনে হবে, প্রস্তুতিটা কেমন।
“যেহেতু এই নির্বাচন কমিশন কখনোই কোনো নির্বাচন আয়োজন করেনি। এগুলো যদি মানুষকে জানাতো তাহলে মানুষ বুঝতে পারতো যে নির্বাচন কমিশন সঠিক পথে আছে। ঠিক জায়গায় আছে।
“ফলে দেশে ইলেকশনের ভাইব, সে জিনিস কিন্তু এখনো শুরু হয়নি।”
এ বিশ্লেষকের মতে, অতীতের যে নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্য ছিল, সেই নির্বাচনগুলোয় যেরকম ‘ভাইব’ ছিল, তা এখন নেই। নির্বাচন কমিশনের তফসিলের আগেই উচিত হবে যে বিষয়গুলো আছে জনগণের সামনে সেই বিষয়গুলো নিয়ে একটা আপডেট দেওয়া, জনগণকে জানানো।
ভোটের সময় বাড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই একটি বিষয় জানা গেল, সেটা ভালো।
“আবার বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্বে রাখা হচ্ছে না, ভালো। কিন্তু, এই যে যে বিষয়গুলো, এগুলো নিয়ে একদম পরিষ্কারভাবে জনগণকে, নির্বাচনের অংশীজনদেরকে পরিষ্কারভাবে জানানো দরকার, তাহলে সেই ‘ভাইব’টা আসবে।”

তফসিলের অপেক্ষা, ভাষণ সম্প্রচারের প্রস্তুতি
রোববারের কমিশন সভায় ভোটের সম্ভাব্য সময়সূচির পাশাপাশি তফসিল ঘোষণার আগের কাজ ও তফসিল থেকে ভোটে যাওয়া পর্যন্ত কাজের ফর্দ পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “রীতি অনুযায়ী কিছু কাজ আছে। পুরো কমিশনের আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করবো। সিইসির ভাষণ রেকর্ড করার জন্য বিটিভি ও বেতারের কাছে সোমবার চিঠি দেওয়া হবে।”
এ নির্বাচন কমিশনার বলছেন, সংলাপ, আইন-বিধি সংস্কার, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত, প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার প্যানেল প্রস্তুত, পোস্টাল ভোটিং, আইনশৃঙ্খলা, পরিপত্র জারিসহ সার্বিক অগ্রগতি রয়েছে ।
উপদেষ্টারা ভোট করতে পারবেন?
বর্তমান সরকারের দুজন উপদেষ্টা এবার নির্বাচন করতে যাচ্ছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ নভেম্বর স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, কবে নাগাদ পদত্যাগ করব, সেটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপরও অনেক কিছুটা নির্ভর করছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে উপদেষ্টারা যেন স্বপদে থেকে নির্বাচন করতে না পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করার জন্য কমিশনারকে অনুরোধ করেছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের আগামী নির্বাচন থেকে বিরত রাখার বিধান জরুরি মন্তব্য করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ সংলাপে বলেছেন, “অন্যথায় সরকার ও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টারা পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না কিনা, এক সংবাদিকের এমন প্রশ্নে কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “এটা যথা সময়ে দেখতে পাবেন। এটা সম্ভবত সম্ভব নয়।”

রাজনৈতিক পরিস্থিতি
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে তফসিলের ঘোষণার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “এটার পক্ষে-বিপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য আছে। এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য। নির্বাচন কমিশন তার স্বীয় বিবেচনায় যে, আগের যে ‘কমিটমেন্ট’ আছে এবং সরকারের যে পরিকল্পনা আছে সেই অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।”
এবার জাতীয় পার্টির ও ১৪ দলের শরিকদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক বক্তব্যের ব্যাপারে আপনারা জানেন, ওই সময় তারা বলে গেছেন। আমাদের অবস্থান হচ্ছে, আইন যাদেরকে পারমিট করবে, তারা ভোটে অংশগ্রহণ করবেন। এবং আইন বলা আছে কারা ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, কারা পারবেন না।”
আগের খবর:
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে কমিশন প্রস্তুত: প্রধান উপদেষ্টাকে সিইসি