Published : 08 Feb 2026, 10:45 PM
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্নীতি মোকাবেলায় যেসব সুপারিশ এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন ফাওজুল কবির খান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এ উপদেষ্টা মনে করেন, দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি তাদের ‘হাতে নেই’। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো সংস্থার কথা বলেছেন তিনি।
রোববার সন্ধ্যায় ঢাকায় বিদ্যুৎ ভবনে সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলেন তিনি। এর আগে জ্বালানি বিভাগের পাঁচটি অ্যাপ উদ্বোধন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনার অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
তিনি বলেন, “দুর্নীতির তদন্ত ও শাস্তির বিষয়টি আমাদের হাতে নয়। এ জন্য আলাদা সংস্থা রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আছে। তবে যেসব ক্ষেত্রে আমাদের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও প্রমাণ আমরা সরবরাহ করেছি।”
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতীতের চুক্তি ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় একটি জাতীয় কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটি বিভিন্ন সূচক (ইন্ডিকেটর), চুক্তির ধরন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
“আমরা প্রতিবেদনটি পেয়েছি নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগে। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সেটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে গেছি। তবে সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। এই খাতে যে ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল, সরকারের স্বল্প মেয়াদের কারণে তা আমরা পাইনি। অনেক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সময়ের অভাবে তার সুফল দেখানো সম্ভব হয়নি।”
তিনি বলেন, সৌদি আরবে বিনিয়োগ আলোচনা চলাকালে দেশটির রাজপরিবারের একজন সদস্য সরকারের মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চান।
“সরকারের মেয়াদ যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো, তাহলে বিনিয়োগটি আসতে পারত। আরেকটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) জরুরি ছিল, কিন্তু স্বল্প মেয়াদের সরকারের কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।”
নিজের সম্পদের হিসাব প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “আমি সম্পদের হিসাব জমা দিয়ে রেখেছি। আমার কোনো অভিলাষ নেই। দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমার একটি গাড়ি ছিল, সেটি বিক্রি করে দিয়েছি। দায়িত্ব শেষে আবার গাড়ি কিনতে হবে, তখন সম্পদের হিসাব আবার কমবে।”
বিগত সরকারের সময়ে অনুমোদিত বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এসব প্রকল্পের কোনোটারই ক্যাবিনেট কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, এসব প্রকল্পের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদনই দেওয়া হয়নি।”
আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, “চুক্তিটি বর্তমান সরকার আসার আগেই হয়েছিল। এ বিষয়ে সরকার কোনো ‘উইচ হান্টিংয়ে’ যেতে চায়নি।”
উপদেষ্টার মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তি হঠাৎ বাতিল হলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সব তথ্য ও প্রমাণ পরবর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বিল বকেয়া থাকার অভিযোগের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিদেশি সরবরাহকারীদের আগে টাকা দেওয়ার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো বৈষম্য নয়।
তার ভাষ্য, কিছু বিদেশি সরবরাহকারীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। এছাড়া বিলম্বজনিত কারণে বড় অঙ্কের জরিমানা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।
“কয়েক দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার পরিশোধ না করলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেত‒এমন পরিস্থিতিও ছিল। তখন সরকার হিসেবে আমাদের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখাই অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে,” বলেন তিনি।
আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি দাবি করছি না যে একদম লোডশেডিং হবে না। তবে সামনে যেই সরকারই আসুক না কেন, তারা যেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না পড়ে, সেই প্রস্তুতি আমরা রেখে যাচ্ছি।”
এলপিজি সংকট প্রসঙ্গে জ্বালানি উপদেষ্টার বক্তব্য হলো, গত দুই–তিন মাসে আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ চেইনের জটিলতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
“ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি। রমজানের আগে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারি পর্যায়েও আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,” যোগ করেন তিনি।
নিজের দায়িত্বকালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দুর্নীতিনির্ভর একটি ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে স্বচ্ছতার দিকে নেওয়া।
“একটি দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো থেকে ট্রান্সপারেন্ট রেজিমে আসা কখনোই সহজ নয়। এই রূপান্তরের পথে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, এতে অনেকে অসন্তুষ্ট হয়েছেন।”
তবে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে দাবি করেন, অন্তত কিছু জায়গায় অনৈতিক চাপ ও অবৈধ লেনদেনের সংস্কৃতি ভাঙতে পেরেছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করবে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিমসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।