১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ফাঁদ: বিদেশে হয়েছিলেন ‘বিক্রি’, দেশে ফিরে ফেরারি

বাংলাদেশ থেকে গত দেড় বছরে বহু তরুণ-তরুণী বৈধ চাকরির আশায় কম্বোডিয়া কিংবা মিয়ানমারে গিয়ে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকা পড়েছেন।

স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ফাঁদ: বিদেশে হয়েছিলেন ‘বিক্রি’, দেশে ফিরে ফেরারি
কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টার। ছবি: রয়টার্স

মাসুম বিল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Jul 2026, 05:55 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

কেউ ফাঁদে পড়েছেন বিদেশে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে, কেউ ভরসা রেখেছেন পরিচিতজনের কথায়; তবে তাদের গন্তব্য ছিল একই–আদ্যোপ্রান্ত প্রতারণার স্ক্যাম কম্পাউন্ড।

চাকরির আশায় বিদেশ যাওয়ার পর তাদের আক্ষরিক অর্থেই ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হতো প্রতারকচক্রের হাতে। কথামত কাজ না করলে ভাগ্যে জোটে শারীরিক নির্যাতন, বেতন তো দূরে থাক, সেখান থেকে ছাড়া পেতে উল্টো টাকা খরচ করতে হয়েছে তাদের।

এটি কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে বেঁচে ফেরা বাংলাদেশিদের গল্প। দেশে ফিরে দেনার দায়ে তাদের অনেকে এখন কাটাচ্ছেন ফেরারি জীবন।

প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে যাওয়া এই ব্যক্তিদের এমন সব স্ক্যাম কম্পাউন্ডে রাখা হয়, যেখানে কাজই হল অনলাইনে যোগাযোগ তৈরি করে অন্য মানুষদের টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া।

কম্বোডিয়ার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে ফেরা তিনজনের এমন অমানবিক ভাগ্যের গল্প শুনেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তাদের দুইজনকে দেশে ফিরেও দেনার দায়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের পুরনো সংকটের মধ্যেই গত কয়েক বছরে নতুন বিপদ হয়ে উঠেছে এ ধরনের স্ক্যাম সেন্টার।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে চাকরির নানা প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। শুধু প্রলোভন বা প্রতারণা নয়, জোর করে বন্দি করে অনেককে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধকেন্দ্রকেই স্ক্যাম সেন্টার বলা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ থেকে গত দেড় বছরে বহু তরুণ-তরুণী বৈধ চাকরির আশায় কম্বোডিয়া কিংবা মিয়ানমারের এসব সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকা পড়েছেন। 

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কোনো চাকরি পাননি। অনেককে স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছে। 

কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে এ বছরের জুন মাসেই সেখান থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে।

আলামিনকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টারে।

আলামিনকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টারে।

ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তারা কোনো চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশ বলেছেন, জোর করে প্রতারণা বা স্ক্যামের কাজে তাদের যুক্ত করা হয়েছিল। ৮৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না। 

৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ২৭ শতাংশ ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই পালিত হবে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।

নতুন ধরনের এই প্রতারণাকে ‘আধুনিক দাসপ্রথা’ হিসাবে বর্ণনা করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, প্রতারণার এই চক্রে বাংলাদেশের কোনো একজন মানুষকে থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের সীমান্তে কোনো একটি কম্পাউন্ডে বন্দি করে রাখা হচ্ছে কোনো আমেরিকান বা অস্ট্রেলিয়ানকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য। তাতে একসঙ্গে অনেক দেশের মানুষ এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।

এখানে যাকে নেওয়া হচ্ছে, তিনি নিজে একজন ভিক্টিম। তাকে নির্যাতন করে আরেকজনকে ভিক্টিম বানাতে বাধ্য করা হচ্ছে। 

কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে এ বছরের জুন মাসেই সেখান থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী দেশে ফিরেছেন। 

কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে এ বছরের জুন মাসেই সেখান থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী দেশে ফিরেছেন।

আদ্যোপান্ত প্রতারণার জালে আলামিন

ফেইসবুক-ইউটিউবে ভিয়েতনামে রেস্তোরাঁয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে এমআর ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় রাজবাড়ীর আলামিন মিয়ার।

হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার পর কথা হয় ওই এজেন্সির কর্মী তিথির সঙ্গে। ফোনে কথার সূত্র ধরে সপ্তাহখানেক পর ভাগ্নি জাহিদা শেখকে সঙ্গে নিয়ে বারিধারায় রেটিনা ওভারসিস নামে একটি কোম্পানির কার্যালয়ে যান আলামিন।

ওই কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে আসার পর তাদের জানানো হয়, এর পরের যোগাযোগের গন্তব্য বারিধারা বাঁশতলার এমআর ইন্টারন্যাশনাল কার্যালয়।

এভাবে ওই কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের তৈরি হওয়ার পর মাথাপিছু পাঁচ লাখ টাকায় ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়ার কথা পাকা হয়।

আলামিন বলেন, “তারপরে আমরা ওদের সাথে কথা বলে চলে আসি। পরে পাসপোর্টসহ কাগজপত্র জমা দিই এম আর ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা রনি এবং কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা মুকুলের কাছে।

“ওদেরকে পাসপোর্ট বইগুলো জমা দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় নাটক। আমাদেরকে ধাপে ধাপে বলতে থাকে, এই আপনাকে ভিসা দিচ্ছি, পাঠায়ে দিচ্ছি ইত্যাদি। নানা রকমের কথা বলে আমাদেরকে ভোগাইছে ছয় থেকে সাত মাস। বিভিন্ন ধরনের কথা বলে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আমাদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে টাকা নিছে।”

টাকা নেওয়া যখন শেষ, তখন মুকুল আর রনিদের নতুন চেহারায় দেখার কথা তুলে ধরে আলামিন বলেন, “তখন লাস্ট পর্যায়ে বলতেছে যে, আপনি যে দেশে যাইতে চাইতেছেন, সে দেশে ভিসা হচ্ছে না। তো, আপনার জন্য একটা দেশ আছে, কম্বোডিয়া। আপনি যদি যেতে চান, এটা আপনার জন্য খুব ভালো হবে। নিজস্ব কোম্পানি আছে, ডেটা এন্ট্রির কাজ করতে হবে।”

অচেনা কম্বোডিয়ার নাম শুনে দ্বিধায় পড়ে গেলেও চাকরির প্রয়োজনে মুকুলদের কথায় ভরসা রাখার চেষ্টা করেন আলামিন। তাদেরকে জানানো হয়, ইতোমধ্যে তাদের ‘চাকরির ভিসা’ হয়ে গেছে।

তখন তাদের হাতে এমপ্লয়মেন্ট ভিসা ধরিয়ে দেওয়া হলেও সেটা পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়। এরপর এমআর ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে বিএমইটির স্মার্ট কার্ড পান আলামিনরা। 

বিমানের টিকেট নিয়েও জালিয়াতি হয়েছিল জানিয়ে আলামিন বলেন, “আমাকে এডিট করে একে একে তিনবার টিকেট দিয়েছে। চারবারের সময় আমি ওই দেশে যাই।”

২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর দেশ ছাড়ার আগে আলামিনদের বলা হয়েছিল, কম্বোডিয়াতে যাওয়ার পরে ডলার দেখাতে হবে। তারা যেন দেশ থেকে দেড় হাজার ডলার করে নিয়ে যান। কথামত তিনি সঙ্গে ডলার নেন।

থাইল্যান্ডে ৫ ঘণ্টা ট্রানজিট পেরিয়ে আলামিন ও তার সঙ্গীরা যখন নমপেনে পৌঁছান, তখন ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদেরকে শুরুতে আটকে দেয়।

সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা দিয়ে আলামিন বলেন, “ওই দেশের পুলিশ প্রশাসন পাসপোর্ট নিয়ে নেয় আমাদের হাত থেকে এবং এরপর ভিসার সিল মারে। 

“এরপর কার সাথে যেন কথা বলে। সম্ভবত গোলাম মোস্তফা মুকুলের সাথে কথা বলে, এখানে আমাদের থেকে টাকাপয়সা নিয়ে সে কম্বোডিয়ায় আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। ঢাকায় মাসুদ রানা রনি সব কিছু গোছগাছ করে দিয়েছে।” 

মাসে ৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে কম্বোডিয়ায় নিয়ে শরীয়তপুরের নড়িয়ার মন্নান ছৈয়ালকে বিক্রি করে দেওয়া হয় স্ক্যাম সেন্টারে।

মাসে ৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে কম্বোডিয়ায় নিয়ে শরীয়তপুরের নড়িয়ার মন্নান ছৈয়ালকে বিক্রি করে দেওয়া হয় স্ক্যাম সেন্টারে।

বিমানবন্দরে থাকা অবস্থায় আলামিনের কাছে মুকুলের ফোন আসে। সঙ্গে টাকাপয়সা কত আছে, তা জানতে চান তিনি।

আলামিন বলেন, “আমি বললাম, ‘টাকার হিসাব কেন? টাকা তো যা দরকার আপনাকে আগেই দিয়ে দিয়েছি।’ কয়, ‘টাকা লাগবে। ১২ শ ডলার করে দিতে হবে। ১২ শ ডলার করে লাগবে।’ কয়, ‘সমস্যা নাই, আপনার টাকা আমি আপনাকে ফেরত দেব। সময় নাই বেশি হাতে, আমার একটা লোক গেছে, তার হাতে টাকাপয়সা সবগুলো বুঝায়া দেন।’”

এরপর সেখানকার এক ব্যক্তির হাতে টাকাপয়সা তুলে দেওয়ার কথা জানিয়ে আলামিন বলেন, “আমরা যে কয়জন লোক ছিলাম, প্রত্যেকে তার হাতে টাকাপয়সা দিয়ে দিই। ও ব্যাংকের মাধ্যমে কার কাছে যেন টাকাপয়সা পাঠায় দিল, আমাদেরকে বলল, ‘কোনো দিকে তাকাতাকি করবা না, এখান থেকে যাও’।

“পরে বইয়ের ভেতরে দেখি, ট্যুরিস্ট ভিসা। এটা দেখে আমাদের মাথা গরম হয়ে যায়। বললাম, ‘আমাদেরকে বলে আনলেন একটা, দেশের ভেতরে দিলেন একটা, ভিসা হইল আরেকটা। এটা কোন ধরনের ব্যবহার?’”

আলামিন বলেন, এরপর ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরিফ শেখ নামে এক ব্যক্তি বিমানবন্দরে তাকে ‘রিসিভ’ করে। তার কাছে দুদিন রেখে একটি স্ক্যাম সেন্টারে ‘বিক্রি’ করে দেয়। 

“সেটাও আমি শুরুতে জানতাম না, তখন আমি বুঝতে পারি নাই। ওখানে তামিল এবং পাকিস্তানি দুইজনকে আইনা আমাকে একটা ইন্টারভিউ দেওয়ায় এবং এরপর সবকিছু বুঝায়া ওদের গাড়িতে আমাকে উঠায়া দেয়। উঠায়া দিলে আমি চলে যাই। এক চাইনিজ স্ক্যাম সেন্টারে আমাকে বিক্রি করে দেয় এবং সেটাও বুঝতে পারি নাই তখন যে, আমাকে বিক্রি করে দিচ্ছে।”

ওই চীনা কোম্পানির কম্পাউন্ডে যাওয়ার পর তাদের কাজ দেখে সব কিছু স্পষ্ট হয় আলামিনের কাছে। 

তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারি, এটাতো যেটা বলছে ওইটা না। এটাতো অমানবিক কাজ। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা। হ্যাকার-ট্যাকার অনেক কিছু আছে ওদের। এদের কাজ হচ্ছে আমেরিকার বয়স্ক লোক যারা আছে, তাদের টার্গেট করে, যাদের ব্যাংক ব্যালেন্স অনেক বেশি।”

কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টার। ছবি: রয়টার্স

কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টার

প্রতারিত ব্যক্তির প্রতারণার চাকরি

আলামিনকে যে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রতারণার ফাঁদ কীভাবে চলে তার একটি ধারণা পাওয়া যায় তার কথায়।

তিনি বলেন, “ফেইসবুকে একজন মানুষের সাথে বন্ধু পাতায়। আমার কাজ ছিল নম্বর সংগ্রহ করা। মেয়ে মানুষের নাম দিয়ে একটা আইডি খুলে দেওয়া হয়েছে, আইফোন দেওয়া হইছে ছয়টা। ১২ ঘণ্টা ডিউটি। ভুয়া আইডি দিয়ে টোপ ফেলে আমার আকর্ষণে আনার পর ওদের কাছে নম্বর সংগ্রহ করি। 

“নম্বর সংগ্রহ করে পাঁচজন লোক আছে, ওদের কাছে দিই। এরপর লোক আছে আরও কাজ করে। সর্বশেষ হল হ্যাকার। হ্যাকার হচ্ছে, ব্যাংক-ব্যালেন্স যা আছে, একেবারে সব হাতিয়ে নেয়। এই হচ্ছে মূলত ওদের ব্যবসা।”

আলামিন বলেন, “এভাবে প্রতিদিন শত শত মানুষকে টার্গেট করে একেবারে নিঃস্ব করে দেয়। এটা দেখে এক পর্যায়ে আমার আর ভালো লাগেনি। আমি বললাম, এই কাজ আমি করতে পারব না, আমাকে হোটেল-রেস্টুরেন্টের যে কাজের কথা বলা হইছিল, ওই কাজে দেওয়ার জন্য।

“এভাবে অনেক কথা কাটাকাটি হয়। তখন চীনা লোকটা আমাকে বলে যে, ‘তোকে আমরা টাকা দিয়ে কিনে আনছি, তোকে কি আমরা এমনি এমনি আনছি। আর এখান থেকেতো বের হতে পারবি না। কেন কাজ করবি না, তোর বসকে ফোন কর। কী হইছে, সমস্যা কী?’”

প্রতারণার কাজ করতে না চাওয়ায় শুরু হয় নির্যাতন। 

আলামিন বলেন, “আমাকে ওরা মারধর করে। আমি বলি যে, আমি কাজ করব না। তখন বলে যে, ‘আমি ১৫ শ ডলার দিয়ে তোদের কিনে আনছি, সেটা দিয়ে তারপর এখান থেকে যাবি।’ পরে বাড়ি থেকে অনেক ধারদেনা করে টাকা নিয়ে ওদের দিই।”

চীনা কোম্পানি থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আলামিনের গন্তব্য হয় গোলাম মোস্তফা মুকুলের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রুমে’। সেখানে তার পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়।

ওই কক্ষে তখন মোট ১২ জন ছিলেন জানিয়ে আলামিন বলেন, “পাসপোর্ট নেওয়ার পর আবার নতুন নাটক শুরু করে দেয়। বলে যে, ‘এখন তোদের বাড়ি যাওয়ার টিকেট আমরা করব, সমস্যা নাই। আমাদের অনেক লস হইছে। বাড়ি থেকে টাকা আন, নইলে কিন্তু যেতে পারবি না।’

“আবার জনপ্রতি ৫০ হাজার করে টাকা বাড়ি থেকে নিয়ে দিই। ও আবার নানান কথা বলা শুরু করে, টিকেটও দেয় না, কিছুই না। কথা কাটাকাটি হওয়ার পর আমরা সবাই মিলে চাপ সৃষ্টি করলাম, তখন পাসপোর্ট দিয়ে দেয় এবং বলে, ‘এখান থেকে এখনই ভাগ, এক সেকেন্ডও থাকবি না’।” 

মুকুলের ডেরা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তারা বাংলাদেশি একটি গেস্টহাউজে গিয়ে ওঠেন। এরপর বাড়ি থেকে আবার টাকা নিয়ে ভিসার অতিরিক্ত মেয়াদে থাকার জরিমানা মেটান।

“এক মাস মেয়াদি ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়েছে। ওখানে থাকছি দুই মাস। একেক দিন জরিমানা হচ্ছে ১২ ডলার করে। প্রায় ৭৬০ ডলার জরিমানা দিছিলাম। এরপর নিজ খরচে দেশে আসছি গত ১১ জানুয়ারি।”

কম্বোডিয়ায় গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ব্র্যাকের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছেন অনেকে। 

কম্বোডিয়ায় গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ব্র্যাকের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছেন অনেকে।

পরিচিত দালালের খপ্পরে মন্নান ছৈয়াল

২০২২ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরবে থেকে ২০২৫ সালের জুনে দেশে ফেরেন শরীয়তপুরের নড়িয়ার মন্নান ছৈয়াল। প্রতিবেশী মানিক শেখের প্রস্তাবে কম্বোডিয়া যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢোকেন তিনি। মানিক শেখের ভাই রবিন শেখের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় যান।

মন্নান ছৈয়াল বলেন, “মানিক শেখ একদিন বলল, ওর ভাই রবিন শেখ কম্বোডিয়ায় থাকে, ভালো চাকরি করে। চাইলে আমারও যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে।

“বাবা এবং তিন চাচাকে সঙ্গে নিয়ে ওদের বাবা-মার সাথে কথা বলি, দালাল রবিনকে কম্বোডিয়ায় কল দেয়। কথা বললে সে জানায়, ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে যাবে। প্রথমেই ভিসা করে দেবে এক বছরের এবং ওয়ার্ক পারমিট করে দিবে।”

কম্বোডিয়ায় রেস্টুরেন্টের চাকরিতে মাসিক ৭০ হাজার টাকা বেতনের কথা বলা হয়েছিল মন্নানকে। 

তিনি বলেন, “কয়েকদিন পরে পাসপোর্ট আর টাকা ম্যানেজ করি। দালালের বাবাকে বললে, সে সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় আসে। বাসায় এলে ৫০ হাজার টাকা এবং পাসপোর্ট দিয়ে দেওয়া হয়। সপ্তাহ দুই পরে সে আমাকে একটা ভিসা দেয়। পিডিএফ পাঠায়। এরপর সরকারিভাবে তিনদিনের প্রশিক্ষণ আছে না, সেটা নিতে যাই। ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে আসি।”

এরপর আরও ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার পর বিএমইটির স্মার্টকার্ডের ব্যবস্থা হয় মন্নানের। তারপর টিকেট কাটার জন্য নতুন করে নেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। 

পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকেট সব বুঝিয়ে দেওয়ার পর মুরুব্বিরা মিলে বাকি সাড়ে তিন লাখ টাকা রবিন শেখের পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয় মন্নান ছৈয়ালের পরিবার।

তিনি বলেন, “৫ ডিসেম্বর আমার ফ্লাইট হয় ঢাকা থেকে। আমাকে ট্রানজিট দেওয়া হয় কুয়ালালামপুরে। সেখান থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিহানুকভিল। সেখানে নামলে একজন কম্বোডিয়ান এবং আমার দালাল রিসিভ করে। রিসিভ করে নমপেন নিয়ে আসে। এখানে প্রায় সপ্তাহ দুই-তিনেক ছিলাম।”

এরপর একদিন সন্ধ্যায় রবিন শেখের ফোন পান মন্নান, বলা হয় কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে। এরপর রবিন তাকে নিয়ে যান সিহানুক শহর। 

মন্নান বলেন, “সেখানে চায়নিজ বসের সাথে পরিচয় করায়ে দেয়। বলে, কালকে থেকে কাজে নিয়ে যাবে, আজকে রাতে তোমারে হোটেলে রাখবে। তখন আমাকে এবং পাসপোর্ট চাইনিজের কাছে রেখে সে চলে যায়।”

পরদিন চীনা ‘বস’ মন্নানকে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে যান। তার বর্ণনায়, “অনেক বড় ভবনে নিয়ে যায়, যেখানে সিকিউরিটি ছিল অনেক। এরপর আমাকে ১৬ তলায় নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর আমি দেখি যে, হাজারো মানুষ কাজ করতেছে। প্রত্যেকের সামনে কম্পিউটার।”

এরপর কীভাবে প্রতারণার কাজে যুক্ত করে দেওয়া হল, সেই বর্ণনায় মন্নান বলেন, “আমাকে একটা ইনস্টাগ্রাম আইডি দেওয়া হয় এবং আমাকে একটা নাম দেওয়া হয়। ওই নাম চুজ করে ইনস্টাগ্রাম আইডি খোলো। আমাকে একটি ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার। ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার

“আমাকে বলা হয়, তুমি ভালো ভালো কাস্টমার খোঁজো। যাদের দেখে মনে হয় টাকাপয়সা আছে। তাকে মেসেজ করো, নাইস লুকিং। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করো। রিপ্লাই করলে তার সাথে কথা বলো, কী কাজ করে। বয়স কত। লোকেশন কোথায়। এরপর আমাদের ওয়ার্কশপে অ্যাড হতে বলো। হোয়াটসঅ্যাপে অ্যাড করো।”

কোনো ছেলে ভিডিও কলে কথা বলতে চাইলে নারী মডেলের ব্যবস্থা ছিল সেখানে। 

মন্নান বলেন, “মেয়ে মডেল তখন বলে যে ‘আমি একটা ওয়েবসাইটে চাকরি করি, সেখানে যুক্ত হলে ভালো আর্নিং করতে পারবা’। দেখা যায়, ২০-২৫ জন বললে ৫-৭ জন রাজি হয়। প্রথম জয়েন করলে তাকে বোনাসসহ উই গ্রুপ কিনে দেওয়া হয়।”

এই প্রতারণা ভালো লাগেনি মান্নানের। কিন্তু সে কথা বলতেই শুরু হয় বিপত্তি।

মন্নান ছৈয়াল বলেন, “আমি একদিন বলি যে, এই কাজ আমার জন্য না। আমি তো এই কাজের জন্য আসি নাই। তখন আমাকে বলে যে, তোমাকে একটা কথা বলি, তোমাকেতো আমার কাছে বিক্রি করে গেছে। 

“বিক্রি করে ২ হাজার ৮৫ ডলার নিয়ে গেছে। এখানে তোমাকে কাজ করতেই হবে। আর কাজ না করলে টাকা দিয়ে তুমি চলে যাও।”

মন্নান তখন দালাল রবিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সেও বেঁকে বসে। 

“সে বলে কিছু করার নাই। অন্য কোনো কাজ নাই। এত দূরে আইসা পড়ছো, কাজটা করো। কিন্তু আমার যে চাইনিজ বস, সে টার্গেট দিয়ে দিত ৫ হাজার ডলার, ১০ হাজার ডলার। কিন্তু যাদের ওইটা হত না, ওদেরকে খাবার দিত না, মারধর করত। 

“আমি যখন এটা পারতেছিলাম না, তখন আমাকে মারধর করত। যখন আমি কাজ করতে চাইনি, আমাকে আয়নাঘরে আটকায় রাখছিল। খাবার দিত না, মারধর করত। খুবই কষ্টকর সময় গেছে। সপ্তাহ দুই পর্যন্ত ওইখানে আটক ছিলাম।”

নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “যখন কাজ করতে অস্বীকার করতেছিলাম, তখন এমনি বকাঝকা করত। থাপ্পড় দিত। বলত, কাজ কর, কাজ কর, কাজ শেখ–এই রকম। যখন কাজ করতে চাচ্ছিলাম, পারতেছিলাম না, তখন তারা আটকে রাখে। লাঠি দিয়ে বাড়ি দেয়। গলায় পিঠে কারেন্টের শক দেয়।”

এর মধ্যে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকার কথা তুলে ধরে মন্নান বলেন, “যোগাযোগ করতে পারি নাই। মোবাইল ছিল না। আমার বাবা দালালের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে, তারা রেসপন্স করতেছিল না। পরে আমার বাবা-চাচারা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে, ব্র্যাকের খোঁজ পায়।”

গত ১৩ জুন দেশে ফেরার আগের পরিস্থিতি বর্ণনা করে মন্নান বলেন, “তখন কম্বোডিয়ার উপর আমেরিকার একটা চাপ আসে। তখন কম্বোডিয়া পুলিশের একটা অভিযান চলে, ওই অভিযানে আমাকে বের করে তারা। বের করার পরে পাসপোর্ট ছিল না, ভিসার মেয়াদও ছিল না। 

“তখন ব্র্যাক সহযোগিতা করে এবং পরে আউট পাসের ব্যবস্থা করে দেয়। জরিমানা হয়েছিল প্রায় দুই মাসের মতন। আবেদন করেছিল মওকুফ করার জন্য এবং সেটা মাফ করে। আইওমের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিকেটের ব্যবস্থা করে।”

কাজ করতে গিয়ে ‘বিক্রি’ হন তালাত

পূর্বপরিচিত একজনের মাধ্যমে ডেটা এন্ট্রি আর কুরিয়ার সার্ভিসের কাজের জন্য কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের তালাত মাহমুদ। গত বছর সেপ্টেম্বরে গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে আটকে পড়েন তিনি।

কোড নেম ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “যখন আমি বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে ঢুকি, ঢোকার পরে তখন ওখান থেকে আমাকে কিছু কোড বলে দেওয়া হল যে, এই কোড বলবা তাহলে তোমার আর কোনো ঝামেলা হবে না। আমি তো আর প্রথম অবস্থায় এগুলা বুঝি নাই। 

কম্বোডিয়ায় যাদের স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তাদের অনেকেই ফিরে এসে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। 

কম্বোডিয়ায় যাদের স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তাদের অনেকেই ফিরে এসে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।

“তো ওখানে আমি ইমিগ্রেশনে যখন ঢুকি, ঢুকার পরে কোড চায়। মানে বলে যে, কোড কী। পরে আমি কোড বললাম। তো এগুলা বলার পরে আমি ইমিগ্রেশন ক্রস করেছি আরকি।”

গুয়াংজু হয়ে নমপেন পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশনে জটিলতার মুখে পড়েন তালাত মাহমুদ। এক ঘণ্টা মত তাকে আটকে রাখা হয় ইমিগ্রেশনে।

তালাত বলেন, “আমাকে পাস দিচ্ছিল না। তো যখন আমি ইমিগ্রেশনটা ক্রস করতেছি, তখন আমার এজেন্টকে ফোন দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে ওই দেশে পরিচয় হয়েছে। এদেশ থেকে যাওয়ার পরে বলছে যে, ‘তুমি এখন পরবর্তীতে যোগাযোগ করবা ওইখানে যাইয়া।’ তো আমি যখন ওইখানে যাইয়া যোগাযোগ করি, তো বলছে যে, ‘তুমি একটু অপেক্ষা কর, একটু ঝামেলা হইছে।’

“আমি বললাম যে কি ঝামেলা? কইছে, ‘এটা তোমার ঝামেলা না, এটা আমার ঝামেলা, মানে আমাদের একটু ঝামেলা হইছে।’ আমি তো ওই সময় বুঝতে পারি নাই। এই ঝামেলার পরে তো ওখানে আধা ঘণ্টা-৪০ মিনিটের মত অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করার পরে বলতেছে যে ঠিক আছে, ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিছে।”

হোটেলে এসে পাসপোর্টে কাজের ভিসার পরিবর্তে ট্যুরিস্ট ভিসার তথ্য দেখে বিস্মিত হন তালাত।

সে কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, টুরিস্ট ভিসা কেন, আমি তো টুরিস্ট হিসাবে আসি নাই, কাজের ভিসা দেন। বলে, সমস্যা নাই। তোমাকে কোম্পানিতে দিলে কোম্পানি তোমাকে চেঞ্জ করে দেবে।”

এক চীনা কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম দুই-তিনদিন তালাতকে কম্পিউটার অনুশীলন করানো হয়। এরপর বাছাই হওয়ার কথা জানিয়ে কাজ করতে বলা হয়। 

তিনি বলেন, “আমি ১৫ দিন কাজ করার পর আমার আর কাজ ভালো লাগতেছিল না। আমি যত এজেন্টকে বলতেছি, সে আমাকে ফিরিয়ে নেয় নাই। পরে এক মাস শেষ হওয়ার পরে আমি যখন তাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলাম, তখন সে ঠিকমত রেসপন্স করতেছিল না। না করার পরে এক-দেড় মাসের মাথায় কোম্পানি আমাকে ফায়ার করে দেয়।

“যখন ফায়ার করছে, তখন আমি বলছি যে, যেহেতু ফায়ার করছেন, তাহলে আমাকে ছেড়ে দেন। তারপরে বলছে যে, তোমাকে এখানে বিক্রি করে দেওয়া হইছে। একটা অ্যামাউন্ট তখন আমি জানতে পারি। বলে যে ‘তুমি তোমার এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করো।’”

নিজের এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ার তথ্য দিয়ে তালাত বলেন, “যখন ফোন দিয়ে বলছে, না, এগুলা কিছুই না। তুমি থাকো, আমার সাথে আগের একটা লেনদেন ছিল। এসব নানান বিষয় আর কি। 

“এগুলো করতে গিয়ে আমি ওখানে প্রায় ১০ দিনের মত টর্চারের শিকার হইছি। তারা ফিরায়ে নেয় না। পরে মনে করেন কোনো এক প্রসেসে আমি ওখান থেকে বের হয়ে আসতে পারছি আর কি।”

এরপর সেখান থেকে তাকে হোটেলে এনে রাখে দালাল। কিন্তু পাসপোর্ট আটকে রাখে। যেখানে সুযোগ দেওয়া হবে, সেখানে কাজ করার শর্ত দেয়।

তালাত বলেন, “আমার কাছ থেকে জোর করে একটা সাদা কাগজে লিখিত নেয়, পরে আমার পাসপোর্ট ফেরত দেয়। কিন্তু আমার ভিসা না থাকার কারণে আমি ওখানে কাজ করতে পারি নাই। কিছুদিন থাকার পরে যখন দেখতেছি যে, আর সম্ভব না, যেহেতু পুলিশ রেইড দিতেছে, বিভিন্ন ধরনের ঝামেলা করতেছে, পরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশনের মাধ্যমে দেশে ফেরত আসছি।”

তালাত জানান, কুরিয়ার সার্ভিসে কম্পিউটার অপারেটরের কাজের কথা বলে নিয়ে তাকে প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা খুইয়ে গত মাসে দেশে ফেরেন তিনি।

“ওরা আমাকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ার জন্য চিন্তাভাবনা করছিল। ট্রাই করছিল আর কি। আমাকে বলছিল যে, তুমি ইন্টারভিউ দাও। এই করো, সে করো, আমি রাজি হই নাই।

“তখন মারছে। আলাদা লোকজন রাখছিল টর্চার করার জন্য। ওই রুমে কোম্পানির লোক ছাড়া বাইরের লোকের প্রবেশাধিকার ছিল না। একবার ঢুকলে বাইরের দুনিয়া দেখা অসম্ভব ছিল। ভবনে ছিল দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।”

দেশে ফিরে ‘খুব বাজে পরিস্থিতির’ মধ্যে থাকার তথ্য দিয়ে তালাত বলেন, “একটা জব খুঁজতেছি, অনেক ট্রাই করতেছি। এখনো ওইরকমভাবে পাইনি। ঋণটাও আছে। শোধ করতে পারিনি।”

দেনার দায়ে ফেরারি

আলামিন বলেন, “সুদের উপর টাকা নিয়েছি, কিস্তিতে টাকা নিয়েছি, বাড়িঘরেইতো থাকতে পারি না। আমার পরিবার পরিজনকে সময় দেব, সেই সময়ও দিতে পারি না। আমার দুইটা ছেলে, পারতেছি না ওদেরকে এক জায়গায় নিয়ে থাকতে।

“আমার থাকতে হয় পালায়া পালায়া, কারণ পাওনাদারতো টাকা চাইবেই। কিস্তির অফিসাররা আসে। আমার প্রতি মাসে ৫৩ হাজার টাকা কিস্তি। আমি যে কতটা কষ্টে আছি, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”

একই অবস্থায় শরীয়তপুরের মন্নান ছৈয়ালেরও। ধার দেনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাল্টা মামলায় জেলে যাওয়ার ভয়।

তিনি বলেন, “টাকা ফেরত পাওয়াতো দূরের কথা, আমি ন্যায়বিচার পাব কিনা, সেটাই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ওদের মিথ্যা মামলায় আমার বাবা ২০ দিন জেল খাটছে। আমাকেও ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ওরা খোঁজে।

“আমি বাসায় যেতে পারি না। আত্মীয়ের বাসায় থাকতে হচ্ছে। আমার ছোটো ভাইকেও আসামি করছে। আমাকে উকিল বলেছে, তুমি শরীয়তপুরে আসলে তোমার জামিন কেটে দেওয়া হবে। তোমাকে হাই কোর্ট যেতে হবে। হাই কোর্টে যাওয়ার মত অবস্থা আমার নাই।”

প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় ভাটারা থানায় মামলা করেছেন আলামিন।

প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় ভাটারা থানায় মামলা করেছেন আলামিন।

মন্নানের ভাষায়, “এমনিতে মাসে ৩৫ হাজার টাকা আমার কিস্তি। ৭-৮ মাস হয়ে গেছে কোনো কিস্তি দিতে পারি না। এলাকায়ও যেতে পারি না। ব্যাংক ইতোমধ্যে নোটিস পাঠাইছে আমাকে।”

মামলা ঠুকে অপেক্ষায়, পাল্টা মামলার ভুক্তভোগীও

কম্বোডিয়া থেকে সর্বস্বান্ত হয়ে ফেরা তিনজনের দুজন দেশে এসে মামলা করে অপেক্ষায় আছেন বিচারের আশায়। 

আরেকজন কম্বোডিয়ায় থাকা অবস্থায় শরীয়তপুরের আদালতে মামলা করেছিলেন তার বাবা। এখন তাদের বিরুদ্ধেও পাল্টা মামলা করেছে মূল আসামির মা।

রাজবাড়ীর আলামিন বলেন, জানুয়ারিতে ফেরার পর ২৫ এপ্রিল ভাটারা থানায় মামলা করেন তিনি। কিন্তু আসামিরা ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’।

“আমি আসার পরপরই মুকুল দেশে চলে আসছে। ওইদেশে অভিযান শুরু হয়ে গেছে, স্ক্যাম সেন্টার    অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ওই ফাঁকে ওরা চলে আসছে। মুকুল ঢাকার ভেতরেই আছে। আরেক আসামি রনি ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে রনি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস চালায়।”

শরীয়তপুরের মন্নান ছৈয়াল কম্বোডিয়ায় বন্দি থাকাবস্থায় ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ নড়িয়া থানায় মামলা করেন তার বাবা ছিদ্দিক আলী ছৈয়াল। ওই মামলায় কম্বোডিয়ায় থাকা দালাল রবিন শেখের বাবা তিন মাস জেল খেটে এখন জামিনে আছেন।

শরীয়তপুর আদালতে রবিন শেখের মায়ের পাল্টা মামলার কথা জানিয়ে মন্নান বলেন, “ওদের বাবা যখন জামিন পাচ্ছিল না, তখন কাউন্টার মামলা করে। ওরা পাল্টা মামলা করে আমি নাকি আমাদের দালালটাকে কম্বোডিয়ায় নিয়েছি, এই দাবি করে মামলা করে। সেইম মামলা আমার বিরুদ্ধে করে, আমি নাকি ওকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়েছি। অথচ ও কম্বোডিয়ায় গেছে দেড় বছর হয়ে গেছে। 

“ও মামলায় লিখেছে যে, গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আমি তাকে কম্বোডিয়ায় রিসিভ করে বাসায় নিয়ে গিয়েছি, পরে তার পাসপোর্ট নিয়ে তাকে চাইনিজ কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিছি। কিন্তু ওই সময়েতো আমি সৌদি আরবে ছিলাম। আমি সৌদি আরব থেকে ফিরেছি ২০২৫ সালের ৯ জুন।”

দালাল রবিন শেখদের মামলায় মন্নান ছৈয়ালের বাবাও ২৬ দিন জেল খেটেছেন। জেলে যাওয়ার ভয়ে নিজেও এলাকায় যেতে না পারার কথা বলেন তিনি।