১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

এক হত্যায় দুই মামলা, গ্রেপ্তার হচ্ছে দুটোতেই!

“এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় কীভাবে দুই মামলা হয়, বুঝে আসে না,” বলেন এক আসামির আইনজীবী।

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2025, 12:38 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:34 PM

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আল শাহরিয়ার হোসেন রোকন নিহতের ঘটনায় হয়েছে দুটি হত্যা মামলা। এক ঘটনায় দুই মামলার বিষয়টি জেনেও পুলিশ একই ব্যক্তিকে উভয় মামলাতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে চলেছে।

এক আসামির আইনজীবী শওকত আলম বলছেন, বিষয়টি আদালতের নজরে এনেও সুরাহা হচ্ছে না।

গত বছরের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের ময়ূখ ভিলার সামনে গুলিতে নিহত হন আল শাহরিয়ার রোকন। এ ঘটনায় ৩ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ১টার দিকে আদালতে মামলা করেন রোকনের বাবা মনির হোসেন। এর ঠিক ৪৫ মিনিট পর আরেকটি মামলা করেন রোকনের সহযোদ্ধা রবিউল খান হিলোল। আদালতের নির্দেশে আবেদন দুটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। 

জানতে চাইলে এক মামলার বাদী রবিউল খান হিলোল বলেন, “আমি আর রোকন একসাথে আন্দোলন করি। আমার সামনে সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমিও আহত হই। 

“পরে ওর পরিবারের সাথে মামলার বিষয়ে আলাপ করি। ওর পরিবার জানায়, মামলা করবে না। পরে জানতে পারি, ওর বাবা আওয়ামী লীগ করতো।”

তিনি বলেন, “রোকন আমার রক্তের কেউ না; কিন্তু তার চেয়েও বেশি। আমরা একই সাথে আন্দোলন করেছি। জ্যান্ত মানুষটা মারা গেছে, যারা খুন করছে তাদের বিচার তো হতে হবে। 

“রোকনের পরিবার মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আমি মামলা করি। এরপর ওর বাবা মামলা করেছে।”

রোকনের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৬৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯ জুলাই সকাল ১১টার দিকে রোকন ও হিলোল জরুরি কাজে বাসা থেকে বের হন। মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের ময়ূখ ভিলার সামনে পৌঁছালে তাদের উপর হামলা ও গুলি চালানো হয়। তারা দুইজনই গুলিবিদ্ধ হন। 

প্রথমে তাদের তমা মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক রোকনকে মৃত ঘোষণা করেন এবং হিলোলকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে শিকদার মেডিকেলে চিকিৎসা নেওয়ার কথা এজাহারে বলেছেন হিলোল।

যোগাযোগ করা হলে রোকনের বাবা মনির হোসেন বলেন, “আমার ছেলে খুন হয়েছে, আমি মামলা করব। অন্য কেউ কেন করবে? আমি পৌনে ১টায় মামলা করি। আর ওই লোকটা মামলা করে একই দিন দেড়টায়।”

তিনি বলেন, “আমি রোকনের বাবা। আমার ছেলে মারা গেছে। মায়ের জ্বলে না, মাসির বেশি জ্বলে। মামলা করব আমি। সে মামলা করার কে? আমরা তাকে চিনিও না। আর সে থাকে আদাবরে। ঘটনা মোহাম্মদপুর এলাকায়। 

“আমার ছেলে মারা গেছে ১৯ জুলাই। আর আমরা পরে খবর নিয়ে জেনেছি, ওই লোক আহত হয়েছে ২০ জুলাই। সে অমানবিক কাজ করেছে। আমার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করছে। মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ করছে।”

মনির হোসেন ছেলে হত্যার মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৩৮ জনকে আসামি করেছেন। 

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ময়ূখ ভিলার সামনে অবস্থান করছিলেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তখন রোকন রাস্তা পার হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। 

বুলেট তার বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায় বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

রোকন হত্যার দুই মামলাতেই একই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে, যাদের মধ্যে আওয়ামী সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাও রয়েছেন। মনিরের মামলায় আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, শাজাহান খান, সাদেক খান, আতিকুল ইসলামসহ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে হিলোলের মামলায় আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, শাজাহান খান, সাদেক খান, আতিকুল ইসলামসহ গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ১২ জনকে।

আসামি সাদেক খানের আইনজীবী শওকত আলম বলেন, “এমন ঘটনা আগে বিরল ছিল। কিন্তু এখন এটা দেখা যাচ্ছে। 

“বিষয়টি আদালতকে জানানো হলেও এর সমাধান হচ্ছে না। এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় কীভাবে দুই মামলা হয়, বুঝে আসে না।

রোকন হত্যার দুই মামলারই তদন্ত করছেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই রাজু আহম্মেদ। 

তিনি বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। অধিকাংশ আসামি পলাতক।”

এক ব্যক্তি হত্যার ঘটনায় দুই মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা রাজু বলেন, “মামলার ঘটনায় একজন বেঁচে আছে, আরেকজন মারা গেছে। তদন্ত শেষে যে ধারার অভিযোগ পাওয়া যাবে, সেই ধারায় প্রতিবেদন জমা দেব।”