Published : 25 Jan 2026, 10:24 PM
রাজধানীর গুলশানে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে রড পড়ে বেসরকারি কোম্পানির এক কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনায় কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে তদন্তে এখনও অগ্রগতি না থাকার কথা বলেছে পুলিশ।
ঘটনার তিন দিন পর রোববার পুলিশ বলছে, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। রডটি কোথা থেকে কীভাবে পড়েছে তা খতিয়ে দেখতে সিসিটিভির ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
গুলশানের ১৪০ নম্বর সড়কের ২২ নম্বর ভবনের সামনের ফুটপাথে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দাঁড়িয়ে সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলেন বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (৪৫)। এসময় উপর থেকে একটি রডের টুকরা তার মাথায় ঢুকে যায়। তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক বলেছিলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহত আশফাকুজ্জামান চৌধুরীর শ্বশুর সিরাজুল ইসলাম তালুকদার ওই দিন মধ্যরাতে গুলশান থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে মামলা করেন। এতে তিনি ভবনটির নির্মাতা কোম্পানি কনকর্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার কামাল, চেয়ারম্যান এস এম কামাল উদ্দিন এবং প্রজেক্ট ইনচার্জ আল আমিনসহ অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনকে আসামি করেন।
গুলশান বিভাগের উপ কমিশনার রওনক আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। রডটি কোথা থেকে এসে পড়েছে, কার দুর্বলতা আছে সেসব বিষয়সহ সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।”
কনকর্ড গ্রুপ এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকার দাবি করে বলেছে, একটি পক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘মিথ্যা দায়’ চাপানোর চেষ্টা করছে।
নিহতের শ্বশুর সিরাজুল এজাহারে অভিযোগ করেছেন, তার জামাতা এক সহকর্মীর সঙ্গে গুলশানের ক্রিস্টাল প্লেস ভবনের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় রাস্তার অপর পাশের ১৪০ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লটে ‘কনকর্ডের নির্মাণাধীন ২৫ তলা ভবনের কাজ চলার সময় যথাযথ ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করায়’ একটি রড পড়ে মাথায় ঢুকে আশফাকুজ্জামান চৌধুরী আহত হন। তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে জানান।
“(এটি) চূড়ান্ত রকমের দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধমূলক গাফলতি, যা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

বাদীর অভিযোগ, মামলায় কনকর্ড গ্রুপের যে তিনজনের নাম দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ গত তিন দিনেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমার একমাত্র মেয়ের জামাতার মৃত্যুতে পুরো পরিবার হতভম্ব। অল্প বয়সে বিধবা হল। ১১ বছরের এক নাতনি আছে। লেখাপড়া করে। এখন এই পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে?”
ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের এমন অবহেলার ঘটনায় যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দাবি জানান তিনি।
ঘটনার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুলশান থানার এসআই আজিজ মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যে ভবনের নিচে আশফাকুজ্জামান দাঁড়িয়ে ছিলেন সেটির বিপরীত দিকে সড়কের পাশে কনকর্ডের নির্মাণাধীন ওই ভবন।
“সেই ভবনেই রডের কাজ চলছি। আশপাশের কোনো ভবনে রডের কাজ চলছে এমন প্রমাণ প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া যায়নি। যে ভবনের নিচে আশফাকুজ্জামান দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই ভবনে কোনো রডের কাজ চলছিল না, ভবনের গ্লাস পরিষ্কারের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা।”
রডটি আসলে কোথা থেকে আশফাকুজ্জামানের মাথায় এসে পড়েছে সেটা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে, যোগ করেন তিনি।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “তবে ঘটনার পর থেকে কনকর্ড গ্রুপের ওই নির্মাণাধীন ভবনের প্রজেক্ট ইনচার্জ আল আমিনকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ফোনও বন্ধ।”
বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গুরুত্বের সঙ্গে তদারক করছেন বলে জানান তিনি।

উপ পুলিশ কমিশনার রওনক আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্তে যার সংশ্লিষ্টতা আসবে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে কনকর্ড গ্রুপের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা এম. মাহফুজুর রহমান এটিকে দুঃখজনক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বলে তুলে ধরে তাদের দায় না থাকার দাবি করেন। নিহত ব্যক্তি যে ভবনের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের দায় দেখছেন তিনি।
তার দাবি, “ওই ভবনের সামনের অংশে ফুটপাত বরাবর ঝুলন্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্লাস পরিষ্কারের কাজ চলছিল, যা অত্যন্ত অনিরাপদভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। সেই সময় উপর থেকে একটি ছোট রডের টুকরা উলম্বভাবে পড়ে একজন পথচারীর মাথায় আঘাত করে; ফলে তার মৃত্যু হয়।”

ঘটনার পরপরই গ্লাস পরিষ্কারের কাজ করা কর্মীদের তড়িঘড়ি করে প্ল্যাটফর্ম সরিয়ে নিতে দেখা যাওয়ার দাবি করে তিনি বলেন,, “ওই ভবনের ছাদে একাধিক স্টিল রড পড়ে থাকতে দেখা যায়, যেখান থেকে কোনো একটি রড ঢিলা হয়ে নিচে পড়ে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ও ভিজ্যুয়াল প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে।”
তাদের নির্মাণাধীন ভবনের পাশে কোনো রড-সংক্রান্ত কাজ চলমান ছিল না বলেও দাবি মাহফুজুরের।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থল ও কনকর্ডের নির্মাণাধীন ভবনের মধ্যে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা এবং সম্পূর্ণ ‘গ্লাস ক্ল্যাডিং’ দ্বারা আবৃত। একটি পক্ষ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কনকর্ড গ্রুপের ওপর দায় চাপানোর ‘অপচেষ্টা’ চালাচ্ছে।