Published : 17 May 2026, 10:13 PM
নিজের আড়াই বছরের মেয়েকে নির্মমভাবে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার এক মাকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত, শিশুটিকে আপাতত দেওয়া হয়েছে তার দাদার জিম্মায়।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান পরবর্তী শুনানির জন্য মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন ভূইয়ার আদালতে পাঠিয়েছেন।
শিশুটিকে নির্যাতনের অভিযোগে তার মা সুমি আক্তারের বিরুদ্ধে গত ৭ মে আদালতে মামলার আবেদন করেন দাদা মনসুর আলী খান। শিশুটির বাবা রেজাউল করিম থাকেন লন্ডনে।
বিচারক মাহবুবুর রহমান বাদীর জবানবন্দি শুনে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সে অনুযায়ী ১৩ মে সুমিকে গ্রেপ্তার করে সাভার থানা পুলিশ। সুমি আক্তারকে আদালতে হাজির করা হলে তার পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়।
আদালত রোববার শুনানির দিন রেখে সুমি আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। নিয়ম অনুযায়ী তার শিশু সন্তানকে তার সঙ্গে কারাগারে রাখার কথা বলা হয় আদেশে। শিশুটিকে যথাযথ শিশুখাদ্য সরবরাহ এবং বিশেষ যত্ন নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন বিচারক।
এদিকে মনসুর আলী তার নাতনিকে নিজের জিম্মায় নিতে আদালতে আবেদন করেন। আদালত শুনানির জন্য রোববার দিন রাখে। শুনানিতে সুমি আক্তারকে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সে অনুযায়ী রোববার সুমি এবং তার মেয়েকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে এখতিয়ার না থাকায় বিচারক মাহবুবুর রহমান মামলাটি শুনানির জন্য ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯ এর বিচারক মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন ভূইয়ার আদালতে পাঠিয়ে দেন।
তবে আপাতত শিশুটিকে তার দাদার কাছে রাখার আদেশ দেন বিচারক মাহবুবুর রহমান।
আদেশে বিচারক বলেন, "ভিকটিম দুই বছর পাঁচ মাসের শিশু। তাকে তার পিতার অবর্তমানে এই আসামি (ভিকটিমের মা) যেভাবে নির্যাতন করেছে মর্মে আপাতত প্রতীয়মান হয়, তা অবর্ণনীয়। আসামি মা হয়ে সন্তানকে যেভাবে নির্যাতন করেছে তাতে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।
“তিন বছরের কম বয়সী একজন শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক মা হলেও এই আসামির ন্যায় একজন মায়ের জিম্মায় ভিকটিম নিরাপদ নয়। জিম্মার ক্ষেত্রে শিশুর কল্যাণ মুখ্য বিবেচ্য। এক্ষেত্রে এই ভিকটিমকে তার মায়ের জিম্মায় রাখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং সে যেহেতু খুবই অল্প বয়সী, দাদা-দাদীর সাথে থাকতে পারবে কি না সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ।"
বিচারক বলেন, “সার্বিক বিবেচনায় শিশুটির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাময়িক সময়ের জন্য তাকে তার দাদার জিম্মার আবেদন মঞ্জুর হল। বুধবার তাকে আদালতে হাজির রাখতে মনসুর আলী ও তার আইনজীবীকে নির্দেশ দেওয়া হল।”
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী শরিফ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, "আজ আসামির জামিন বিষয়ে শুনানির দিনও ছিল। তকে জিম্মায় বিষয়ে শুনানি করতে গিয়ে অফিস টাইম পার হয়ে যাওয়ায় জামিন শুনানি হয়নি।"
মামলার বাদী মনসুর আলী বলেন,"আমার নাতনিটাকে নির্যাতন করত সুমি। আমার ছেলে গোপন ক্যামেরায় তা দেখে। সহ্য করতে না পেরে আমাদের জানায়। জানার পর মামলা করেছি।"
তিনি বলেন, "নাতনিকে আদালত আমাদের জিম্মায় দিয়েছেন। আমাদের কাছে আছে। ভালো আছে, হাসি-খুশি আছে।"
সুমি কেন তার মেয়েকে নির্যাতন করতেন জানতে চাইলে মনসুর আলী বলেন, "অন্য লোকের সাথে পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য হয়ত মেয়েকে মারধর করত।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুমির আইনজীবী শামীমা নাজনীন বলেন, "১০/১৫ দিন আগে সুমি আমার কাছে আসে। বলে, তার শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চায়। এ বিষয়ে একটা অভিযোগও সে লিখে সাভার থানায় জমা দিয়ে রেখেছে।"
তিনি বলেন, "সুমি যা বলে সামনাসামনি বলে। কিন্তু তার স্বামী প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে সুমিকে বিয়ে করে। তাদের দুইজনকে লন্ডনে নিয়ে যেতে চায়। তবে দুই স্ত্রীর এটা নিয়ে ভিন্নমত ছিল। এ কারণে ঝামেলা হচ্ছিল।"
নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে এই আইনজীবী বলেন, "বাচ্চাটা এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসাধীন ছিল। তখন কিন্তু তার দাদা-দাদী দেখতে যায়নি। ডাক্তার বাচ্চাটাকে প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়। তিনি হয়তো এটা বুঝতে পারেননি। দেখবেন খাবার খাওয়ার সময় মারা হয়েছে। অন্য সময় কিন্তু না। আর পড়ে গিয়ে তার ঠোঁট কেটে গেছে।"
তিনি বলেন, "বাচ্চাটা কিন্তু তার মায়ের কাছ থেকে যেতে চায়নি। কান্নাকাটি করেছে। ওর মাও কেঁদেছে।"
আগামী বুধবার সুমির জামিনের বিষয়ে শুনানি করবেন বলে জানিয়েছেন এ আইনজীবী।
মামলার নথিতে বলা হয়, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে পরিচয় থেকে ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল লন্ডন প্রবাসী রেজাউল করিমের সঙ্গে সুমি আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর আবার লন্ডনে চলে যান রেজাউল। ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর তাদের মেয়ের জন্ম নেয়।
অভিযোগে বলা হয়, সুমির আগে তিন বিয়ে হয়। সেখানে তার এক মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। এসব ‘গোপন’ রেখে সুমি রেজাউলকে জানায় তার বাল্যকালে বিয়ে হয়েছিল এবং ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বাচ্চার জন্মের পর সুমি শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে থাকতে না চেয়ে আলাদা বাসা নেন।
মনসুর আলী খানের অভিযোগ, ওই বাসায় যাওয়ার পর গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে বাচ্চাকে ‘বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন’ করতে থাকেন সুমি। করে। কয়েক মাস যাওয়ার পর শিশুটির ঠোঁট, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
মামলায় বলা হয়, এসব দেখে মনসুর আলী তার মেয়েকে দিয়ে ওই বাসায় গোপন ক্যামেরা পাঠান। ক্যামেরায় দেখা যায়, সুমি বাচ্চাটিকে আছাড় দিচ্ছেন, হাত-পা বেঁধে আঘাত করছেন, গলা টিপে ধরছেন, বাচ্চার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।
“গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্যালাইনের পাইপ দিয়ে হাত-পা বেঁধে শিশুটির মুখে খাবার দিতে এবং লাঠি দিয়ে ওই খাবার মুখে প্রবেশ করাতে দেখা যায়। তার কান্নার শব্দ যেন কেউ শুনতে না পায়, সেজন্য উচ্চস্বরে গান বাজানো হচ্ছিল।”
মনসুর আলীর ভাষ্য, গত ১ মে বিকেলে তিনি নাতনীকে দেখতে ওই বাসায় যান। সেখানে তিনি দেখেন, চুল ধরে শিশুটিকে মারছেন তার মা। মারার কারণ জানতে চাইলে সুমি বলেন, শিশুটি তার ‘গলার কাঁটা’। তিনি ‘অন্য জায়গায়’ বিয়ে করবেন, বাচ্চাটা মরে গেলে তার ‘ঝামেলা থাকবে না’।