কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশকে ‘ডর’ দেখানোর সুযোগ নেই: শুভেন্দুর পাল্টায় হুমায়ুন
“যদি মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে চান, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বুঝছেন?”
বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ দ্রুততর করতে জমি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার, সেটা নিয়ে প্রয়োজনে ‘যথাযথ জায়গায়’ আলোচনার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছেন, নির্বাচনি বক্তব্য আর বাস্তবিক সরকার পরিচালনা দুটো ‘ভিন্ন বিষয়’। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার নির্বাচনি বক্তব্যের ধারাবাহিকতা শাসনকার্যেও রাখছে কি-না, তা ‘একটু সময়’ দিয়ে দেখতে চায় ঢাকা।
“কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মত দেশকে এখন ডর দেখানোর মত কোনো জায়গা নাই। দেখেন, যদি মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে চান, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বুঝছেন? বাংলাদেশের সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না, যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব।”
মানুষে মানুষে সম্পর্ক চাইলে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়গুলো সমাধানের ক্ষেত্রে ভারত সরকারকে ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ দেখাতে হবে বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির।
বিধানসভা নির্বাচনে জিতে প্রথমবারের মত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার তার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক শেষে ছয়টি সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে দেড় মাসের মধ্যে বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা তিনি বলেন।
সরকারের প্রথম বৈঠক নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আজকে আমরা প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর তথা বিএসএফের সীমান্ত সুরক্ষিত করার জন্য জমি ট্রান্সফার প্রক্রিয়া অনুমোদন দিলাম এবং আজ থেকেই ল্যান্ড ট্রান্সফার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
“ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর সম্পূর্ণ করতে হবে; যা আমাদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচনের আগেই বলেছিলেন। এই কাজটা আজকে প্রথম কেবিনেটে আমরা করলাম।”
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া লিখেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ‘অরক্ষিত’ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছিল, যা বিজেপির নির্বাচনি প্রচারের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্য ওয়াল লিখেছে, ‘অরক্ষিত’ সীমান্ত বিজেপির নির্বাচনি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের কারণে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ‘অরক্ষিত’ থাকায় বাংলাদেশিরা ‘অবৈধভাবে’ প্রবেশ করতে পারছে এবং ভোটের বিনিময়ে তারা সেখানে থেকে যেতে পারছে।
গত জানুয়ারিতে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্য সরকারকে ৩১ মার্চের মধ্যে ৯টি জেলায় সীমান্ত বেড়া দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল।
সীমান্তে কাঁটাতারের ‘অননুমোদিত’ বেড়া নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির আলোকে ১৯৭৫ সালে সীমান্ত কর্তৃপক্ষের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
তার ভিত্তিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেছিলেন, শূন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতরে কেউ কোনো প্রতিরক্ষা স্থাপনা করতে পারবে না। ওই ১৫০ কাজের ভেতরে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে একে অপরের সম্মতি নিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “এখন পশ্চিমবঙ্গে যে সরকার নতুন গঠিত হয়েছে… নির্বাচনি বক্তব্য উগ্র হতে পারে, অনেক সময় নির্বাচনে জেতার জন্য অশোভন (ভালগার) কথাও মানুষ বলে।
“কিন্তু বাস্তবিক সরকার পরিচালনা একটা ভিন্ন বিষয়। দেখি, আমরা একটু সময় দিই; রেটরিক আর গভার্নেন্সে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার একই জিনিস এগিয়ে নিতে চাচ্ছে কি-না। আর আমাদের সম্পর্কতো প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে থাকে। এখানে আমরা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে ঢুকতে চাই না।”
এরপর কাঁটাতার নিয়ে ‘ভয় না পাওয়ার’ বক্তব্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সীমান্তে মানুষ হত্যা করলে ঢাকা বসে বসে দেখবে না।
তিনি বলেন, “এখানে আগে যেসব কাহিনীগুলি দেখেছি, মানুষ অনেক হত্যা করে ফেলা হয়। কাঁটাতারে লাগায়া আপনি ফেলে রাখবেন, যেগুলো আমরা আগে দেখেছি হাসিনার সময়। ওই নমুনায়তো বর্ডার কোনোদিন ইনশাআল্লাহ আসবে না।
“ওই নমুনায় যদি কেউ বর্ডার করতেও চায়, এই বাংলাদেশ সেই জঘন্য গোলামির বাংলাদেশ না যে, বসে দেখবে। এই বাংলাদেশের পরিকল্পনা আছে কী করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, আশা করি, ওই পথে যাবে না।”
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের প্রসঙ্গও টানেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি চায়, প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ চায় এবং সবাই একটা আন্তরিক অবস্থায় থাকতে চায়। চ্যালেঞ্জ থাকবেই।
“দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া এক সন্ত্রাসী হাসিনা এখন আছে ভারতে, ভারতের সার্বভৌম জায়গায়। ওইটাও বজায় রাখতে হবে যে, ভারতের সার্বভৌম জায়গায় থেকে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি যেন না করা হয়; যাতে তাকে কোনো সুযোগ না দেওয়া হয়। আমরা আশা করি এবং আশ্বস্তও আমরা হয়েছি ভারতের সরকার থেকে যে, ওই সুযোগটা তারা দেবে না।”
দুদেশের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার থাকার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “যদি আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাই, আমরা বলছি যে, দুদেশের নেতৃত্বের মনোভাব ও অঙ্গীকার সেখানে অবশ্যই থাকতে হবে এবং চ্যালেঞ্জ থাকা স্বত্বেও এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে।
“অবশ্যই সেখানে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকবে, কিছু ক্ষেত্রে বড়সড় চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে, সংলাপের দরজা যখন খোলা আছে, তখন এটার সমাধানে আপনি কিছু উদ্যোগ নিতে পারবেন। কিছু দ্রুত সমাধান হবে, আর কিছুতে সময় লাগবে।”
পুরনো খবর
