বিচারকের সঙ্গে অশোভন আচরণ: খুলনার ৩ আইনজীবীকে তিরস্কার

আদালত এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রশ্রয় না দিতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট বার নেতাদের।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Nov 2022, 12:12 PM
Updated : 22 Nov 2022, 12:12 PM

খুলনা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক (বর্তমানে যুগ্ম জেলা জজ) নির্মলেন্দু দাশের সঙ্গে অশোভন আচরণের জন্য খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ তিন আইনজীবীকে তিরস্কার করেছে হাই কোর্ট।

তারা মঙ্গলবার তলবে হাজির হয়ে নিজেদের আচরণের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ থেকে তাদেরকে তিরস্কার করা হয়। এ বিষয়ে আদেশের জন্য বুধবার দিন রেখেছে আদালত।

শুনানির শুরুতে খুলনার এই তিন আইনজীবীর পক্ষে আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির।

এ সময় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, “কোনো সভ্য মানুষ কি বিচারকের সঙ্গে এ আচরণ করতে পারে?  তিনি কি বার সভাপতি হয়ে আদালতে দাপট  দেখাচ্ছেন? আপনারা কেন এসব লোকদের পক্ষ নিয়ে আদালতে আসেন? আপনারা তাদের পক্ষ নিলে আমরা বিব্রত হই। মানুষ কতটা নিম্ন মানের হলে একজন বিচারকের সঙ্গে এ ভাষায় করতে পারে!”

এ সময় খুলনা বারের সভাপতি সাইফুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে বিচারপতি বলেন, “আপনি শুধু আইনজীবী সমাজের কলঙ্ক না। আপনি গোটা খুলনার কলঙ্ক। আপনি কি নিজেকে খুলনার মহানায়ক ভাবেন?”

এ সময় নিজের অশোভন আচরণের জন্য আদালতের কাছে ক্ষমা চান খুলনা বার সভাপতি সাইফুল। তিনি বলেন, “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। আমাকে মাফ করে দেন।”

এ সময় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, “আমরা লজ্জিত এবং একই সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। এটা সত্যি, যে অভিযোগ তা পড়তে লজ্জা লাগে। রেপ ভিকটিমের জবানবন্দির মতো মনে হয়।”

তখন বিচারক বলেন, “আইনজীবী যদি আদালতের সঙ্গে এ রকম আচরণ করেন, তখন আদালত, বার বলে কিছু থাকে না। তারা শুধু অদালত অবমাননাই করেননি, ফৌজদারী অপরাধ করেছেন।”

এরপর সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আব্দুন নূর দুলাল, আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা, রবিউল আলম বুদু খুলনা বারের তিন আইনজীবীর হয়ে উচ্চ আদালতের কাছে ক্ষমা চান। আর কখনও আর এমন হবে না বলে সমস্বরে প্রতিশ্রুতি দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

তখন বিচারক বলেন, “যারা আদালত অবমাননা করে, বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, আপনারা তাদের পক্ষে নিয়ে আর কখনও আসবেন না। এ ধরনের ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দিবেন না। আপনারা তাদের পক্ষে দাঁড়ালে ভুল বার্তা যায়।”

এ সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলেন, এবারের মত ক্ষমা তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হোক। আর কখনও এমন হবে না।

তখন বিচারক আবার বলেন, “আপনারা ভুল করেননি, অপরাধ করেছেন।”

এরপর বিচারক খুলনার আরেক আইনজীবী শেখ আশরাফ আলী পাপ্পুকে ডায়াসের সামনে ডেকে নিয়ে বলেন, “আপনি এর আগে কী করতেন?”

জবাবে পাপ্পু বলেন, “ব্যবসা করতাম।”

তখন বিচারক বলেন, “আপনার আচরণ আইনজীবীর মতো না। বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণের ক্ষেত্রে আপনি মূল ভূমিকা পালন করেছেন। আপনাদের মতো ব্যবসায়ীরা এসে আইন পেশাটাকে নষ্ট করে দিচ্ছেন।”

এরপর আদালত খুলনার আরেক আইনজীবী শেখ নাজমুল হোসেনকেও ভর্ৎসনা করে।

আইনজীবীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর খুলনার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ) নির্মলেন্দু দাশ প্রধান বিচারপতির দপ্তরে অভিযোগ দেন। অভিযোগটি প্রধান বিচারপতির সামনে উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রব্বানী।

পরে গত ২৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি অভিযোগটি হাই কোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে উপস্থাপন করতে বলেন। সে অনুযায়ী গত ১ নভেম্বর অভিযোগটি উপস্থাপন করা হয়।

পরে অশোভন আচরণ ও আদালত অবমাননার অভিযোগে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলামসহ এ তিন আইনজীবীকে তলব করে হাই কোর্ট। আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। সে তলবেই হাজির হন খুলনার এই আইনজীবীরা।

এরপর তাদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনার পর এ বিষয়ে আদেশের জন্য বুধবার দিন রেখেছে আদালত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক