১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস

জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর বিলগুলো পাস হয়।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস
ফাইল ছবি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 12:14 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।

বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ওয়াকআউটের পর রোববার প্রথমে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ এবং পরে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়।

দুটি বিলের পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এর আগে সংসদ থেকে বেরিয়ে যায় বিরোধী দল। সংসদে এ বিল দুটো উপস্থাপনের পর থেকে তারা এর বিরোধিতা করে আসছে।

পরে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানো প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। এরপর বিলগুলো পাস করা হয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল বিবেচনার আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী আইন আনার কথা বলেছিল। কিন্তু নতুন মানবাধিকার কমিশন বিলে সাধারণ নাগরিক ও শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত প্রয়োগ’ রাখা হয়েছে।

“আমরা এ আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি। মাননীয় স্পিকার, সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”

এর জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আপনাকে ওয়াকআউট করার জন্য ধন্যবাদ।”

এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

মানবাধিকার কমিশন বিল

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করতে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ সংসদে বিবেচনার প্রস্তাব করেন। পরে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানো প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হলে বিলটি পাস হয়।

নতুন আইনের অধীনেও বিদ্যমান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বহাল থাকবে। একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠিত হবে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকবেন। চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি বাছাই কমিটি থাকবে। স্পিকার এর সভাপতি হবেন।

কমিটিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের মনোনীত সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপক, নাগরিক প্রতিনিধি, সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি থাকার বিধান রাখা হয়েছে।

প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক তদন্ত দল গঠন করতে পারবে কমিশন।

শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে আলাদা প্রক্রিয়া

বিলে শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা পদ্ধতি রাখা হয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ পেলে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর পদক্ষেপ নেবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করবে।

সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে কমিশনকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। এ বিধান নিয়েই আপত্তি তোলে বিরোধী দল।

ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর বলেন, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু কোনো বাহিনী জড়িত থাকলে আগে সেই বাহিনীর কাছে জবাব চাইতে হবে।

প্রথমবার জবাব না দিলে কী হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘আরও শক্তিশালী করে এনেছি’: আইনমন্ত্রী

বিরোধী দল বেরিয়ে যাওয়ার পর আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার আগেই মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী নতুন বিল আনা হয়েছে।

বিল তৈরির আগে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, ভুক্তভোগী, বিদেশি অংশীদার এবং কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে তুলে ধরেন তিনি।

আসাদুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার কমিশন কোনো ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করাই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ কাজ। নতুন আইনে কমিশনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সমন জারিসহ দেওয়ানি আদালতের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রেও কমিশনের তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য শোনার জন্য একটি প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে।

বাহিনী ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে কমিশনের পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে বলেও জানান তিনি।

রুমিনের চার আপত্তি

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা নতুন বিলে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ রাখাকে ইতিবাচক বলেন। তবে তিনি বিলটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান।

তার অভিযোগ, কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই। তদন্তে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততা থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।

কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন ব্যবস্থা এবং সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষার আরও স্পষ্ট বিধান রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

রুমিন বলেন, “একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন রহিত করে আরেকটি ফাঁকফোকর যুক্ত আইন তাড়াহুড়ো করে পাস করলে তা মানবাধিকারের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না।”

আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যের জবাবে বলেন, বিলটি নিয়ে ব্যাপক পরামর্শ হয়েছে এবং অংশীজনদের অধিকাংশ সুপারিশ এতে যুক্ত করা হয়েছে।

পরে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

গুমে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ বিবেচনার জন্য সংসদে তোলেন।

এ বিলের জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। পরে বিলটি পাস হয়।

বিলে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিজে অথবা সরকারের সমর্থন, অনুমোদন বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করলে বা অবস্থান গোপন করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

গুমের অপরাধে ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

গুমের ফলে মৃত্যু হলে অথবা পাঁচ বছর পরও গুম হওয়া ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা না গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

অভিযুক্ত বাহিনী নিজের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না

কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ এলে সেই বাহিনী নিজে অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না, এমন বিধান রাখা হয়েছে গুম প্রতিরোধ বিলে।

সরকার অভিযোগটির তদন্তভার অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে দিতে পারবে।

বিলে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান রাখা হয়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তি ও তার পরিবার তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার তথ্য এবং ওই ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন।

ক্ষতিপূরণের দায় রাষ্ট্রেরও

ভুক্তভোগীর জন্য সরকারি আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে তার সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিধানও রয়েছে।

পাঁচ বছরেও ওই ব্যক্তির সন্ধান না মিললে উত্তরাধিকারীদের জন্য ‘গুম সনদ’ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তারা সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয় পরিচালনা করতে পারেন।

বিচার ৯০ দিনে, প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন

গুমের অপরাধের বিচার করবে এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালত। অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। তা সম্ভব না হলে কারণ দেখিয়ে আরও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে বলে বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্তে অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচারযোগ্য মনে হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যপ্রমাণ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাবেন।

চিফ প্রসিকিউটর প্রয়োজন মনে করলে আরও তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারবেন।

মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

আদালত অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ করতে পারবে।

আগের অধ্যাদেশে আপত্তি কেন ছিল

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে অভিযোগ প্রথমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে নেওয়া এবং পরে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বিচারের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এতে ভুক্তভোগীর জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলে বর্তমান সরকার আপত্তি করেছিল।

অংশীজন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আগের অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, নতুন আইনে পরিকল্পিত ও ব্যাপক গুম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার্য থাকবে। অন্য গুমের ঘটনায় নতুন আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আমরা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এই বিলটা নিয়ে এসেছি।”

গুম প্রতিরোধ বিলের আলোচনায় রুমিন ফারহানা গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে সমর্থন করেন। তবে তিনি অতীতের গুমের বিচার নিশ্চিত করা, প্রমাণের দায়ের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান, সামরিক ও বেসামরিক বিচারের এখতিয়ার পরিষ্কার করা এবং আটকের তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে যুক্ত করার দাবি জানান।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্য আইনের সঙ্গে বিরোধ হলে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনই প্রাধান্য পাবে, এমন বিধান বিলে রাখা হয়েছে।