Published : 20 Jul 2026, 10:33 PM
নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে যাওয়া, পড়ালেখা, আর বাসায় ফেরা প্রতিদিনের রুটিন ছিল ১০ বছরের আবিদুর রহিম আবিদের। হঠাৎ এক বিপর্যয় যে তার শরীর ও মনে ক্ষত তৈরি করে দিল, তা ঠিক হল না বছর ঘুরেও।
ছোট্ট শরীর পোড়ার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে টানা ছয় মাস হাসপাতালের বিছানায় কেটেছে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এ শিক্ষার্থীর। ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৬টি অস্ত্রোপচার আর ১৮ ব্যাগ রক্ত লেগেছে।
তার ঝলসানো হাত-পা আর মুখ এখনো মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির চিহ্ন বহন করছে, যে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে স্কুলটির ২৮ শিক্ষার্থীসহ ৩৬ জনের।
উত্তরার ওই স্কুলটিতে বিমান আছড়ে পড়ার ঘটনার বছর ঘুরেছে, আবিদের বয়সও বেড়ে এখন ১১।
তবে এখনো সে স্কুলে ফিরতে পারেনি। শিক্ষকরা অনলাইনে পড়ালেখার বিষয়বস্তু দিয়ে দিচ্ছেন, বাসাতে শিক্ষকের কাছেও পড়তে হচ্ছে। এভাবেই চলছে দিন।
ছোট্ট আবিদের কথায়, “যখন স্কুলে যাইতাম, পড়তাম, সারা দিন একটা ডেইলি রুটিন ছিল। এখন ওরকম কোনো রুটিন নাই। একটু ব্যায়াম করলাম, এটা-সেটা করলাম।
“স্কুলে গেলে একটা সময় কেটে যাইত। হাসলাম, পড়লাম, এখন কী করতেছি না করতেছি, কোনো ঠিকঠিকানা নাই।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে এসব কথা বলতে গিয়েই কেঁদে ফেলে আবিদ। স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের মুহূর্তে কী হয়েছিল, এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে।
উড়োজাহাজ উড়ে যাওয়ার শব্দেও কিছুদিন আঁতকে উঠত সে। তবে এখন সেই ভয় কেটেছে। এখনো ফলোআপ চিকিৎসা নিতে হচ্ছে নিয়মিত। তা যে কবে শেষ হবে, জানে না আবিদের পরিবার।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে বিধ্বস্ত হয় বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধ বিমান। ওই ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর কর্মচারী ও পরিচালকসহ ৩৬ জনের প্রাণ যায়। আহত হন দেড় শতাধিক।
ওই ঘটনার পর বছর ঘুরেছে। এখনো আবিদের পরিবারের মত হতাহতদের পরিবার সেই শোক আর স্মৃতি সামলে উঠতে পারেনি। স্কুল বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের এখনো ছুটতে হচ্ছে হাসপাতালে।
‘টিফিন খাওয়ার সময় বিকট শব্দ, এরপর চারপাশ অন্ধকার’
দুর্ঘটনার দিন কী হয়েছিল, সেই স্মৃতি ভোলেনি আবিদ।
তার কথায়, “দুপুরে টিফিন খেতে খেতে হঠাৎই বিকট শব্দ, চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। আমি দেখলাম সবাই পেছনের দিকে চলে গেছে। আমিও যেতে গেলাম, তখন দেখি আমার একটা ফ্রেন্ড, ও বাইরে পানি ভরতে গিয়েছিল। ক্র্যাশটা হয় তখনই।
“ও বাইরে থেকে ভেতরে আসে, দেখি ওর গায়ে আগুন। আমার পানির পটে একটু পানি ছিল, ওইটা ওর গায়ে ঢেলে দেই। ঢালার পরও ও বলতেছিল, ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’।
আবিদের গায়ে তখনো আগুন লাগেনি, তবে উত্তাপে শরীর ঝলসে গেছে।
আবিদ বলে, “কিছুক্ষণ পর আগুনটা একটু নিভানো হয়, কিন্তু পুরো অন্ধকার, একবার ধোঁয়ায় কালো কিটকিটে অন্ধকার হয়ে গেছে। তারপর একটা ভাইয়া টর্চ নিয়ে আসে, বলে ‘আমাকে ফলো করো’। একটা গেইট ছিল, এক দিকে সিঁড়ি ছিল না, উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিয়েছি।”
এরপর স্কুলের ক্লিনিক হয়ে স্থানীয় একটা হাসপাতালে, সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বার্ন হাসপাতালে। এরপর ছয় মাস আবিদের দিন কেটেছে এমারজেন্সি, এইচডিইউ, আইসিইউ, আবার এইচডিইউ, তারপর কেবিন।

‘বাসায় ফেরার পর আসল লড়াই’
আবিদের বাবা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে আবিদ সবচেয়ে বেশি সময় হাসপাতালে ছিল ৬ মাসের বেশি, ১৮৩ দিন। এই ৬ মাসের মধ্যে ওর ৩৬টা অপারেশন হয়েছে। ১৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে। রিলিজের সময়েও ওর হাতে-পায়ে সব জায়গায় ঘা ছিল।
“ছয় মাস পর যখন বাসায় ফেরে আবিদ, তখনই আমাদের আসল লড়াই শুরু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বা স্কুলের পক্ষ থেকে থেরাপি বিভিন্ন জায়গায় ২ মাস, ৪ মাস পর্যন্ত ফ্রি ছিল। কিন্তু ও যখন ঘা নিয়ে হাসপাতালে, সেই ফ্রি সময়টা তখনই পার হয়ে যায়। পরে ওকে থেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন হলে সিআরপিতে, উত্তরায় যেসব জায়গায় ফ্রি ছিল, সেই ব্যবস্থা আমি পাইনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওকে বাসায় থেরাপি দিতে হয়েছে। বেশ কয়েক লাখ টাকা এর পেছনে গেছে।”
এক বছর পরও আবিদের বাম হাত অচল। মুষ্টি করতে পারে না।
আবিদের বাবা বলেন, “শেষ ২১ দিন ভর্তি ছিলাম যে বাম হাতটা সার্জারি করবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সার্জারির সিদ্ধান্তটা হয়নি। এখন ওয়াক্স থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি বিভিন্ন থেরাপিতে ওকে রাখতে হয় সবসময়। ডাক্তাররা বলছেন এই থেরাপিতে যদি ৮০-৯০% ভালো হয়, তাহলে সার্জারিতে যাবে না।”
আজাদ বলেন, “মুখে-হাতে থেকে যাওয়া দাগ নিয়ে এত টেনশন করি না, কিন্তু অন্তত বাম হাতটা তো কাজ করতে হবে। বাম হাতটা যদি কাজ না করে তাহলে তো পঙ্গুর মত হয়ে থাকবে।”
রোদে গেলে পোড়া জায়গায় সমস্যা হয় বলে আবিদকে নিয়মিত স্কুলে পাঠানো হয় না। শিক্ষকরা হোয়াটসঅ্যাপে পড়া পাঠান, বাসায় প্রাইভেট শিক্ষক পড়ান।
“শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বেশ সহযোগিতা আছে, প্রথমদিকে অনেক শিক্ষক আসতেন, দেখা করতেন। প্রথমদিকে কিছু সহপাঠীও আসত। কিন্তু এই শেষ পর্যায়ে এসে তেমন কেউ খোঁজ রাখে না। তারপরও স্কুলে ফেরার আগ্রহ আবিদের কমেনি। শিক্ষকরা স্কুলের পড়া অনলাইনে পাঠিয়ে দেন, আমরা সেভাবেই আবিদকে পড়াচ্ছি,” বলেন আবিদের বাবা।
‘প্রয়োজন পুনর্বাসন ও ফ্রি চিকিৎসা’
দুর্ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও তা নেয়নি আবিদের পরিবার।
তার বাবা বলেন, “স্কুল থেকে ডেকেছিল যে টাকাটা দেওয়া হবে, কনফার্ম করতে হবে, নাহলে রিটার্ন যাবে। আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সবার পক্ষ থেকে এটা গ্রহণ করা হয়নি। কারণ ওদের ক্ষতির তুলনায় এটা সামান্যই সামান্য। এই ৫ লাখ টাকা হয়ত ওর কয়েকদিনের চিকিৎসার খরচ।
“একটা স্বাভাবিক ছেলে যেভাবে স্কুলে যায়, ওরা তো রোদের মধ্যে যেতে পারবে না কত বছর এটা ডাক্তাররাও বলতে পারবেন না। স্বাভাবিক চলাফেরা ওদের জন্য নিষেধ। একজন স্বাভাবিক ছেলের সঙ্গে ওরা পেরে উঠতে পারবে না।”
তিনি বলেন, “এই কারণেই সরকারের কাছে আমাদের দাবি, চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা। আজীবন চিকিৎসার জন্য সরকারি স্বাস্থ্য কার্ড।
“ওদের যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু এই বিষয়ে এখনো আমরা কোনো সাড়া পাইনি। এই ঘটনায় স্কুল, বিমানবাহিনী ও সরকার কারো দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।”