Published : 29 Mar 2026, 04:46 PM
প্রথমবারের মত জাতীয় সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করতে এসে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
তিনি বলেছেন, “সংসদের প্রতিটি সদস্যের অধিকার, মর্যাদা এবং সুযোগের সমতা রক্ষায় আমি সর্বদা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব।”
ঈদ ও অন্যান্য ছুটির পর রোববার বেলা ৩টায় সংসদ অধিবেশন বসে। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
অধিবেশন শুরু হয় কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। বৈঠকে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার সংসদ পরিচালনায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন। নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তিনি ইতোমধ্যে সরকার ও দলের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলেও জানান।
সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কায়সার কামাল বলেন, তাকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করে যে ‘আস্থা ও সম্মান’ দেখানো হয়েছে, তার জন্য তিনি সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী এবং সব সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে নেত্রকোণা ১ আসনের ভোটারদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
পরে তাকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা সংসদীয় কাজে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী দিলারা হাফিজ এবং যশোর ৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলীর মায়ের মৃত্যুতে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে সংসদে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম।
বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার মুক্তিযুদ্ধ, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথাও বলেন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই আন্দোলন ‘গণতন্ত্রের দ্বার উন্মুক্ত করেছে’ এবং জুলাই-অগাস্টের শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে।
তিনি শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মুগ্ধসহ আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আহতদের প্রতিও সমবেদনা জানান।
দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা চেয়ে ডেপুটি স্পিকার হযরত আবু বকরের (রা.) একটি বক্তব্য থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, “আমি সঠিক থাকলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন আর ভুল করলে আমাকে শুধরে দেবেন।”
তিনি বলেন, সংসদের অনেক সদস্য তার চেয়ে ‘বেশি জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ’। তাই দায়িত্ব পালনে তিনি সদস্যদের সহযোগিতা চান।
সংসদকে প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে বর্ণনা করে কায়সার কামাল বলেন, এই সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়, “একই সাথে জনগণের নিকট সরকারের জবাবদিহিতার জায়গাও বটে।”
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হল আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা। আইন সবার জন্য সমান, সরকার কিংবা জনগণ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকার কথা তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রে উভয় পক্ষেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকার জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে, আর বিরোধী দল সংসদের ভেতরে সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা, বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
বিরোধী দলকে সরকারের ‘প্রতিপক্ষ নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদীয় ব্যবস্থাকে আরও ‘কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য’ করে তোলে।
অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং অন্য সদস্যদের সহযোগিতামূলক মনোভাবের কথাও তুলে ধরেন ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে জাতির সামনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব।
সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবেন জানিয়ে কায়সার কামাল বলেন, সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি এবং দীর্ঘদিনের সংসদীয় রীতিনীতি ও ঐতিহ্য মেনেই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওয়েস্টমিনস্টার ধারার গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে সফল হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সংসদের মর্যাদা রক্ষায় সব সদস্যকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “মতভেদ থাকবে, বিতর্ক হবে কিন্তু তা অবশ্যই শালীনতা, যুক্তি এবং পারস্পরিক সম্মানের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদ হবে জাতির দর্পণ।”
তিনি বলেন, “জনগণ সংসদের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখার জন্য। তাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবাধিকার রক্ষা করাই সংসদের দায়িত্ব হওয়া উচিত।”
বর্তমান সংসদকে তিনি ‘গতানুগতিক ধারার বাইরে এক ঐতিহাসিক সংসদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, এই সংসদে এমন মানুষ আছেন, যারা কারাগার, নির্যাতন, গুম, নির্বাসন ও দুঃসহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছেন।
নিজেকে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, এই সংসদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে ‘সৌভাগ্যবান’ মনে করছেন।
গত ১২ মার্চ সাধারণ নির্বাচনের এক মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হয়। পরে ঈদ ও অন্যান্য ছুটির কারণে অধিবেশন ২৯ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি ছিল।