Published : 23 Jun 2026, 03:06 PM
দেশের পরিবহন খাতে গাড়ি চালনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং তাদের জন্য সব ধরনের লাইসেন্সিং ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বিআরটিএর দরজা সবসময় খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান।
মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে পেশাদার নারী চালকদের প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে ‘চালকের আসনে নারী: সাফল্য উদযাপন, সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহন খাত’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করা ১১তম ব্যাচের ১০ জন নারী চালকের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ তুলে দেওয়া হয়।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, "নানান বৈষম্য ও সামাজিক বাধা টপকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এই নারীরা আজকে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেছেন। স্টিয়ারিং ধরা মানে শুধু গাড়ি চালানো নয়, তারা আমাদের অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবেন। বিআরটিএ চেয়ারম্যান হিসেবে আমি বলছি, আমাদের দরজা সবসময় আপনাদের জন্য উন্মুক্ত।"
নারীরা স্বভাবগতভাবেই ‘মার্জিত এবং নিয়মকানুন মানতে’ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে নারী চালকদের বড় চাহিদা তৈরি হচ্ছে জানিয়ে গাড়ি মালিকদের প্রতি নারীদের সম্মানজনক মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, "উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ইচ্ছা ও সুযোগ থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব তা ব্র্যাকের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে।"
তিনি আরও বলেন,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আগামী বাংলাদেশকে সবার উপযোগী এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ভিত্তিতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ বলেন, "দক্ষতা ও সক্ষমতার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ চালকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ব্র্যাকের নিজস্ব পরিবহন বহরেই বর্তমানে ২৪ জন নারী চালক কর্মরত আছেন।"

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নারী চালকদের চাহিদা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এই নারীদের যদি 'কেয়ার গিভিং' বা 'হাউজহোল্ড হেল্প' এর মত বহুমুখী দক্ষতা (মাল্টি-স্কিল) দেওয়া যায়, তবে তারা দেশের বাইরে আরও উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।"
তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারি ট্রান্সপোর্ট পুলে এসব নারী চালকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্র্যাকের ‘ফোর হুইলস টু ফ্রিডম’ উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১৭৯ জন সুবিধাবঞ্চিত নারী পেশাদার চালক হিসেবে এবং ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪,৫০০ এর বেশি নারী অপেশাদার ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
সফলভাবে কোর্স সম্পন্ন করা এই ১০ জন নারী ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলে তিন মাসের নিবিড় আবাসিক প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক ও হাতে-কলমে ড্রাইভিং শেখার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা এবং জেন্ডার ও সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।
সনদ হাতে পেয়ে নারী চালক মীম আক্তার মুক্তা বলেন, “আমাদের জন্য একটা দারুণ সুযোগ তৈরি হলো। এই প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে আমরাও পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারব।"
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন নারী চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয় এবং তাদের কার্যক্রম তুলে ধরেন৷
তিনি জানিয়েছেন, ২০০১ সাল থেকে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ১৩ হাজার জনকে ডিফেন্সিভ চালনা, সাড়ে ১২ হাজার জনকে সাধারণ চালনা এবং ৪০৯ জনকে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে নিরাপদ সড়কের জন্য কার্যকর আইন ও শক্তিশালী নীতিমালা নিশ্চিত করতে ব্র্যাক অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা বা 'গোল্ডেন আওয়ার'-এ আহতদের জীবন রক্ষায় ব্র্যাক কমিউনিটি-ভিত্তিক দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, স্বেচ্ছাসেবী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে কাজ করছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং সহায়তা এবং ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল ও স্কুটারভিত্তিক চলাচলের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে গণপরিবহনে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতের কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এছাড়া ডিস্ট্রিক্ট রোড সেফটি কমিটির মিটিং, কমিউনিটি স্পিড ওয়াচ কার্যক্রম, পথনাটক এবং স্কুলভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ উদযাপনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ অব্যাহত রেখেছে সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এবং কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক এম খালিদ মাহমুদ।