Published : 30 Aug 2026, 02:01 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় আন্দোলনকারীদের পানি পান করাতে গিয়ে গুলিতে নিহত আব্দুর রহমান জিসান হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ।
এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাসহ ২৯ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাউছার হুসাইন গত ৮ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় আসামিদের কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৬ অক্টোবর দিন রেখেছেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন জানিয়েছেন।
আসামি কারা
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয় ছাড়াও আসামির তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক ও জাহাঙ্গীর কবীর নানকের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও মশিউর রহমান সজল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকার সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশীদ, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসানকেও আসামি করা হয়েছে।
আসামির তালিকায় আরো আছেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ খান মুন্না, যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, মেহেদী হাসান সুমন, শান্ত নূর খান, রবিউল ইসলাম হেলালী, সাবেক কাউন্সিলর সফিকুল ইসলাম খান দিলু, আবুল কালাম অনু, সাবেক কমিশনার মোস্তাক আহমেদ, যুবলীগ নেতা ফয়সাল খন্দকার ও জাহাঙ্গীর আলম।
তবে এশিয়ান টেলিভিশনের চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘প্রমাণ না পাওয়ায়’ তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এসআই কাউছার হুসাইন বলেন, “মামলার তদন্ত শেষে গত মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়নি তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।”
মামলার বাদী জিসানের বাবা বাবুল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
জিসানের মা জেসমিন আক্তার বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে রয়েছেন। তার নম্বরে যোগাযোগ করা হলে পরিবারের সদস্য ইয়াসমিন আক্তার ফোন ধরেন।
ইয়াসমিন বলেন, “আন্দোলনে গেছে, মারা গেছে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। আমরা কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না।”
পরে জেসমিনের সঙ্গে হোয়াটঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়। তিনিও মামলার বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা শুনেছি, মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়েছে। অভিযোগপত্র দেখে পড়ে সিদ্ধান্ত নেব।”
যেভাবে মৃত্যু জিসানের
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে মাতুয়াইলের ২ নম্বর তিতাস গ্যাস রোড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পানি পান করাতে বাসা থেকে বের হন জিসান।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ওই এলাকায় আন্দোলনকারীদের পানি পান করানোর সময় পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি গুলি চালান।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের হাতে থাকা একটি কাটা রাইফেল থেকে ছোড়া গুলি জিসানের ডান চোখের ওপর, ভ্রুর সামান্য নিচ দিয়ে ঢোকে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্ত্রী রাবেয়ার আত্মহত্যা
জিসানের মৃত্যুর নয় দিন পর ২৯ জুলাই তার স্ত্রী রাবেয়া মিষ্টি আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগপত্রে জানানো হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে, জিসানের মরদেহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামের উত্তর-পশ্চিমগাঁওয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে বাধা দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের নির্দেশে স্থানীয় যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলাম হেলালী মরদেহ দাফনে বাধা দেন এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেন।
ফলে জিসানের মা বাধ্য হয়ে মাতুয়াইল কবরস্থানে তাকে দাফন করেন।
কী আছে অভিযোগপত্রে?
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেন।
১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বলা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য এবং পরদিন ওবায়দুল কাদেরের বলা ‘আন্দোলনকারীদের মোকাবেলা করার জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ মন্তব্যকে আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার ‘অন্যতম কারণ’ হিসেবে তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে ‘দমনের’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, শেখ হাসিনার ‘নির্দেশনা’ ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘বিদেশ থেকে দেওয়া বার্তার’ মাধ্যমে অন্য আসামিদের অংশগ্রহণে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা ও র্যাবের কর্মকর্তারা আন্দোলন দমনে অধস্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। তাদের নির্দেশে ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
তারপর স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় অংশ নেয় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
মামলা বৃত্তান্ত
জিসানের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা বাবুল মিয়া ২০২৪ সালের ২৫ অগাস্ট আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় শুরুতে ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল।
তদন্তের পর কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও মশিউর রহমান সজলের ‘সম্পৃক্ততা পাওয়ার’ কথা তুলে ধরে তাদের যুক্ত করে ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার আসামিদের মধ্যে সফিকুল ইসলাম খান দিলু উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, আবুল হাসান, মনিরুল ইসলাম মনু ও হারুনুর রশীদ খান মুন্না রয়েছেন কারাগারে।
অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।