Published : 27 Apr 2026, 11:27 PM
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী খুনের আগে হিশাম আবুগারবিয়েহ কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তা এখন সামনে আসছে।
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক আবুগারবিয়েহ হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিল। এর মধ্যে একটি ছিল, কোনো ব্যক্তিকে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়?
ইউএসএফ এর পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাদের মধ্যে শুক্রবার লিমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ বৃষ্টির পরিবারকে ফোনে জানায়, তাকেও হত্যা করা হয়েছে।

লিমনের লাশ উদ্ধারের পর ওইদিনই তার রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চলাকালে স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে তা বৃষ্টির কি না, তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনার অফিস মরদেহটি শনাক্তের কাজ করছে।
স্থানীয় সংবাদপত্র টাম্পা বে টাইমস সোমবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, তদন্তকারীরা যখন ইউএসএফ ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় হিশাম আবুগারবিয়েহর অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি করেন, তখন সেখানে রক্তের চিহ্ন খুঁজে পান।
অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের আবর্জনা ফেলার স্থানে পাওয়া যায় লিমনের মানিব্যাগ, চশমা এবং বৃষ্টির ব্যবহৃত একটি গোলাপি রঙের আইফোন কেস। এছাড়া রক্তমাখা কাপড়ও উদ্ধার করা হয়।
আদালতে উপস্থাপন করা তদন্তকারীদের নথিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার লিমনের লাশ একটি কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় স্থানীয় হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে তার শরীরে অসংখ্য ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তদন্তকারীদের বরাতে টাম্পা বে টাইমস লিখেছে, আবুগারবিয়েহর ফোন তল্লাশি করে দেখা গেছে, ১৩ এপ্রিল থেকে তিনি চ্যাটজিপিটিকে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করা শুরু করেন। ‘ডাস্টবিনে লাশ ফেলা’ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয়, “এটি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে।”
আবুগারবিয়েহ তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, “মানুষ কীভাবে এটা জানতে পারবে?”
লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার একদিন আগে আবুগারবিয়েহ আবার চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চান, ‘গাড়ির ভিআইএন নম্বর কি পরিবর্তন করা যায়? লাইসেন্স ছাড়া কি বাড়িতে বন্দুক রাখা যায়?’
দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর আবুগারবিয়েহ আবারও প্রশ্ন করে, “মাথায় স্নাইপারের গুলি লাগার পর কি কেউ বেঁচে ফিরেছে? আমার বন্দুকের আওয়াজ কি প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে?"
সবশেষে বৃহস্পতিবার, যখন লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ সংবাদ স্থানীয় মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন- “নিখোঁজ বিপদগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?”
তবে এসব প্রশ্নের কী উত্তর চ্যাটজিপিটি দিয়েছে বা আবুগারবিয়েহ তার প্রতিক্রিয়ায় আরো কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন কিনা, তা খবরে জানানো হয়নি।
আদালতে জমা দেওয়া তদন্তকারীদের তথ্যের বরাতে টাম্পা বে টাইমস লিখেছে, ১৭ এপ্রিল বিকেল ৪টার দিকে লিমনের বন্ধু ওমর হোসেন পুলিশকে জানান, আগের দিন সকাল ১০টার পর থেকে লিমন ও বৃষ্টিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উভয়েরই ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ভিডিও পরীক্ষা করে, শেষবার বৃষ্টিকে ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে দেখে।
এরপর লিমনের ফোনের লোকেশন পিন ট্র্যাকিং করে দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল রাতে তার ফোনটি ক্লিয়ারওয়াটার এবং স্যান্ড কি পার্ক এলাকার কাছাকাছি ছিল, এরপর সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়।
তদন্তকারীরা যখন হিশাম আবুগারবিয়েহর সঙ্গে কথা বলেন, তখন তার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখতে পান। হিশাম দাবি করেন, পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তিনি আঘাত পেয়েছেন।
তবে ট্যাগ রিডারে দেখা যায়, লিমনের ফোনের লোকেশন যেখানে ছিল, ঠিক একই সময়ে আবুগারবিয়েহর হুন্দাই জেনেসিস গাড়িটিও সেখানে ছিল।

আবুগারবিয়েহ প্রথমে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও পরে বলেন, লিমন তাকে ওই এলাকায় নামিয়ে দিতে বলেছিলেন এবং তিনি তাই করেছেন।
কিন্তু তার অ্যাপার্টমেন্টের ময়লা ফেলার ঝুড়িতে তদন্তকারীরা একটি রশিদ পায়; যেখানে বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস এবং সাবান কেনার তথ্য ছিল- যা ১৬ এপ্রিল রাতে কেনা হয়েছিল।
এছাড়া লিমনের ঘরে বৃষ্টির ছোট মানিব্যাগ, আইডি কার্ড এবং স্নিকার্স পাওয়া গেছে। আবুগারবিয়েহ ময়লা ফেলার যে ট্রলি ব্যবহার করেছিলেন, সেখানে রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট এবং লিমনের ব্যক্তিগত কিছু জিনিসও পাওয়া যায়।
অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘর থেকে আবুগারবিয়েহর শোবার ঘর পর্যন্ত পাওয়া গেছে রক্তের ছিটা। এছাড়া ফরেনসিক পরীক্ষায় আবুগারবিয়েহর বেডরুমের কার্পেটে রক্তের উপস্থিতি মিলেছে। খাটের নিচেও টেপ এবং প্লাস্টিকের ব্যাগ লুকানো ছিল।