১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের ‘ট্রমা’ কাটবে কী করে

“আম্মু, আমরা কি আবার স্কুলে আসব?” জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলতেই লামহার পাল্টা প্রশ্ন, “প্লেনটা কি আবার পড়বে?”

বিডিনিউজ২৪

প্রশান্ত মিত্র

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Aug 2025, 01:25 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:29 PM

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী লামহা ক্যাম্পাসে এসেই দেখা পায় সহপাঠী নাইলাতের। দুই বন্ধুর রাজ্যের যত আলাপ, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি; পাশে বসে দেখছিলেন তাদের মায়েরা।

কেমন আছ জিজ্ঞেস করতেই এক শিশুর সহজ উত্তর, “ভালো আছি।”

স্কুল প্রাঙ্গণে উচ্ছ্বসিত শিশুদের এমন চিত্রই চিরায়ত। কিন্তু মাইলস্টেনের পরিস্থিতি গত কিছুদিন ধরেই অন্যরকম। 

অভিভাবকরা বলছেন, সহপাঠীকে পেয়ে যতই ‘ভালো আছি’ বলুক, লামহা-নাইলাতরা আসলে ‘ভালো নেই’।

লামহার মা নাজনীন নীলা বললেন, মঙ্গলবার যখন স্কুলের গেট দিয়ে তারা ঢুকছিলেন, মেয়ে তার কাছে জানতে চাইল, “আম্মু আমরা কি আবার স্কুলে আসব?” 

জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলতেই লামহার পাল্টা প্রশ্ন: “প্লেনটা কি আবার পড়বে?”

প্রশ্নেই বোঝা যায়, দিন দশেক আগে নিজের স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাটি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এই শিশুকে।

নীলা বলেন, “রাতে আমার হাত ধরে থাকছে। ও আমার ওড়না দিয়ে নিজের হাত বেঁধে রাখছে। বলছে, ‘আম্মু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না’।”

বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার দিন পোড়া শরীর নিয়ে কয়েকটি শিশুর ছুটোছুটির ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

লামহার মা বলছেন, এদের মধ্যে তার মেয়ের এক সহপাঠীও ছিল।

“এমনিতে ছোট মানুষ; খুব বেশি কিছু বুঝতে পারছে না। কিন্তু ফেইসবুকে ভিডিওটা দেখে ছেলেটার ফেইসটা দেখে বলছে, আম্মু ও তো আমার ক্লাসের। কিছুক্ষণ পর পরই বলে আম্মু আমার ফ্রেন্ডটা যে পুড়ে গেল, ওর তো অনেক জ্বালা হইছে।”

বছরখানেক আগে গরম পানিতে লামহার গায়ের খানিকটা পুড়ে গিয়েছিল। এখন সেটা মনে করেই বার বার বন্ধুর শরীর পুড়ে যাওয়ার কষ্ট বোঝবার চেষ্টা করছে সে।

সোমবার বাসায় ছবি আঁকতে গিয়েও সেই পুড়ে যাওয়া সহপাঠীকে আঁকার চেষ্টা করেছে বলে জানালেন তার মা। 

নীলা বলেন, “আমি জিজ্ঞাসা করলাম এটা কেন আঁকছ? বলতেছে, ‘আমার মনে হইছে, তার এরকম লাগতেছে’।

“ওদের কষ্টগুলো আমরা তো প্রকাশ করতে পারছি না। কিন্তু সে অনেক ভয়ে আছে। ওর সঙ্গে পড়ত, ওই ছেলেটাকে দেখে বেশি ভয় পাইছে।”

২১ জুলাই দুপুরে বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনের মুখে বিধ্বস্ত হয়। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত যে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই শিশু এবং মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী। 

ঘটনার পর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ এ ক্যাম্পাসের অনেকেই এমন মানসিক ‘ট্রমার’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এখন অপেক্ষা ট্রমা কাটিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কাউন্সেলিং সেন্টার খোলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন মাইলস্টোনের স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক খাদিজা আক্তার।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা আসলে খুবই দীর্ঘমেয়াদি একটা বিষয়, স্বল্প সময়ের বিষয় নয়। জরুরি ভিত্তিতে যাদের প্রয়োজন, তারাই এখন এর আওতায় আসছে। ধীরে ধীরে সব শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষককে এর আওতায় আনা হবে।”

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়েও কাজ হচ্ছে। সরকারের যতগুলো মেন্টাল হেলথ উইং আছে, এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।”

মনরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, ট্রমার মধ্য দিয়ে কেউ যখন যায়, তখন সে শিক্ষক হোক, ছাত্র-ছাত্রী বা অভিভাবক হোক, সবার ওপরেই মানসিক চাপ পড়ে। 

“এই মেন্টাল ট্রমা তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক, একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষের ভেতরে এমন ঘটনায় মেন্টাল ট্রমা তৈরি হবেই।”

এজন্য তাৎক্ষণিকভাবে কিছু প্রতিক্রিয়া যেমন– ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া, পড়ালেখায় মন না বসা, আচরণ খিটমিটে হয়ে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান এ চিকিৎসক।

এর দীর্ঘমেয়দি প্রভাব নিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার— পিটিএসডি হতে পারে; দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা হতে পারে। এছাড়া নানা মানসিক বৈকল্য হতে পারে। 

“সবাই একটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাবে, ট্রমার মধ্য দিয়ে যাবে, কিন্তু সবার দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সমস্যাটা হবে না। ন্যাচারাল হিলিং প্রসেসের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে এই শোক, কষ্ট, ট্রমাটাকে বেশির ভাগ শিশু কাটিয়ে উঠতে পারবে।”

তিনি বলেন, “যাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে এসব সমস্যার লক্ষণ থাকবে, তাদের ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের সমস্যা, আচরণের সমস্যা, স্কুল যেতে না চাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া কিংবা পড়ালেখায় খারাপ করতে থাকার মত সমস্যা হতে পারে। তখন কিন্তু তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে মনোচিকিৎসার প্রয়োজন হবে।”

অনেকেই দ্বারস্থ হচ্ছেন মনোচিকিৎসকের

প্রথম শ্রেণির লামহার দুই বোনও মাইলস্টোনের ছাত্রী। তানহা অষ্টম আর নাবিলা দশম শ্রেণিতে পড়ে। 

ঘটনার আট দিন পর মঙ্গলবার তিন মেয়েকে নিয়ে স্কুল ক্যাম্পাসে আসেন নীলা। স্কুল বন্ধ থাকলেও শিশুদের মানসিক ট্রমা কাটাতে ক্যাম্পাসে শুরু হওয়া ‘কাউন্সেলিংয়ে’ অংশ নিতে তাদের মত সন্তানদের নিয়ে এসেছিলেন অনেক অভিভাবক।

অষ্টম শ্রেণির তানহা তার বেশ কয়েকজন সহপাঠীকে হারিয়েছে। সেদিন সে ক্লাস থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিট পরই বিধ্বস্ত হয় বিমানটি।

তার মা নীলা বললেন, “ওই ভবনের সামনে যাওয়ার পরে তানহা আমাকে জড়ায়ে ধরে রাখছে আর বলছে, ‘আম্মু তুমি এই জায়গাটা থেকে আমাকে নিয়ে যাও।’ ওর ক্লাসের যারা মারা গেছে, তাদের তো ভুলতে পারবে না।

“সে বলতেছে, ‘যখন ক্লাসে নাম ডাকা হবে, মাঝখানে কোডের কোনো বন্ধুটা হয়ত থাকবে না। সে তো আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে’।”

তিন বোনের মধ্যে লামহার ছুটি হয় আগে। এরপর তাকে নিয়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়া হায়দার আলী ভবনের সামনেই প্রতিদিন অপেক্ষা করেন মা নীলা। বড় দুই বোনের ছুটি হওয়ার পর একসঙ্গে তাদের নিয়ে বাসায় ফেরেন।

ঘটনার দিন নীলা আসেননি। বড় মেয়ে ‘প্রি টেস্ট’ পরীক্ষা দিয়ে আগেই বাসায় ফিরে যায়। ছোট মেয়েটাকেও ছুটির পর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর মেজ মেয়ে তানহা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক মিনিট আগে ভবন থেকে বের হওয়ায় তাদের সবাই শারীরিকভাবে অক্ষত ছিলেন সেদিন।

তবে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা নীলার কথায় স্পষ্ট ফুটে উঠে। 

হায়দার আলী ভবনের সামনের দোলনাটা দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি ছোট মেয়েটাকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করি, সে দোলনাটায় খেলতে থাকে, আমি বসে থাকি। সেদিন ঘটনার সময় আমিও থাকতে পারতাম। ঘটনার পর ওদের বাবা বলছিল, আজ হয়ত আমার সবই চলে যেত।”

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া তাবাসসুম ও রিয়ানা ঘটনার দিন স্কুলেই ছিল। তাবাসসুম ভাত খাওয়ার জন্য নিচে গিয়েছিল হাত ধুতে; আর রিয়ানাকে ‘ডিটেনশনে’ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অন্য ক্লাসে। এরমধ্যে বিমানটি আছড়ে পড়ে তাদের ভবনেই।

শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও এই দুই সহপাঠী তাদের এক শিক্ষককে পুড়ে যেতে দেখেছে। তাদের কোনো কোনো সহপাঠী এখনও হাসপাতালে সারা শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে কাতরাচ্ছে। 

এসব ঘটনা প্রতি রাতেই তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় বলে তারা চিকিৎসকদের তারা জানিয়েছে। 

তারা বলেছে, স্কুলের ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনলেই তাদের ভয় হয়। আর বিমানবন্দরের এত কাছে সারাদিনই তাদের ওই শব্দ কানে আসবে। 

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুয়াইরাহকে স্কুলে নিয়ে আসা মা জেসমিন নাহার বললেন, “প্রতিদিনই স্কুলের টিচাররা খোঁজ নিয়েছে; মানসিক অবস্থাটা জানতে চেয়েছে। বলল আজ নিয়ে আসতে।”

ঘটনার দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, “মেয়েটা ওই ভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়, পেছনে তাকিয়ে দেখে ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। একটু সামনে এগিয়ে সে অজ্ঞানের মত হয়ে যায়। তখন অন্য একজনের ফোন দিয়ে আমাদেরকে খবর দিলে আমরা এসে তাকে নিয়ে যাই।

“বাসায় যাওয়ার পর থেকে কান্নাকাটি করছিল। বলছিল, ‘আম্মু এমন দৃশ্য আর দেখি নাই’। বার বার বলতেছে, ‘আমার টিচাররা আমার সামনে পড়ে আছে, স্কুলে দাও দাও করে আগুন জ্বলছে’।”

নবম শ্রেণি পড়ুয়া তানিসা ইসলামকে নিয়ে আসা তার মা বাবলী বলেন, ঘটনার দিন তার মেয়ের পরীক্ষা থাকায় কিছুটা আগেই বেরিয়ে যায়। নইলে তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়া ভবনটির সামনেই প্রতিদিন আড্ডা দিত।

“আমাদের বাসা কাছেই। খবর পেয়ে দেখতে আসছিলাম। ও এমনিতেই একটু ভয় পায়, এখন আরও ভয় পাচ্ছে। এতগুলা বাচ্চা চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছে, যাদের অনেককেই সে চেনে। সে এখন ঘুমাতে পারছে না, আকাশে বিমান গেলেই ভয় পাচ্ছে।”

তানিসা জানাল, বন্ধুদের মধ্যে যারা ভালো আছে, তাদের খবর সে পেয়েছে। কিন্তু অনেককেই এখনও অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের খবর জানতে না পেরে চিন্তিত সে।

ছেলে রিওয়ান ও মেয়ে রিজওয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। দুজনকে কাউন্সেলিং কক্ষে পাঠিয়ে বাইরে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইলাতকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা নুরুন্নাহার রুমা।

তিনি বললেন, “বড় দুজনের বন্ধুরা সরাসরি মারা গেছে। প্রথম কয়দিন মেয়েটা খেতে চায়নি, একদমই খায়নি। খাবার নিয়ে গেলে বলত, ‘আমার বন্ধুরা খেতে পারতেছে না, আমি কীভাবে খাব? তুমি কি চিন্তা করতে পার, আমার ফ্রেন্ডরা না খেয়ে আছে।’ তখন আমিও কাঁদি, মেয়েটাও কাঁদে।”

ছোট মেয়ের ১২টায় ছুটি হলে এই অভিভাবকও হায়দার আলী ভবনের সামনে অপেক্ষা করতেন বাকি দুই সন্তানের জন্য। তাদের ছুটি হলে একসঙ্গে বাসায় ফিরতেন। সেদিন নিজের অসুস্থতায় আসেননি, ছেলে রিজওয়ানও আসেনি।

সেদিন থাকলে কী হত ভাবতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রুমা। তিনি বললেন, “আগের দিনও ওখানে বসা ছিলাম। ভিডিওগুলা তো দেখেছি, সব ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। আমি যদি সেদিন থাকতাম, আমার ছোট মেয়েটাও থাকত সঙ্গে।”

মেয়ে রিজওয়া সেদিন স্কুলেই ছিল জানিয়ে মা বলেন, “মেয়েটা দুই মিনিট আগে ওই ভবন থেকে বের হয়ে আসে এক টিচারের সঙ্গে কথা বলার জন্য। ওর বন্ধু তাসনিয়া ও মায়াকে বলে এসেছে, আমি শুনে আসি মিস কী বলে। এসে আবার তোমাদের সঙ্গে মিটআপ করছি।”

তাদের একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাচে অংশ নেওয়ার কথা। সেখানে গান ও পোশাক কী হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা করতেই রিজওয়া এক শিক্ষকের কাছে গিয়েছিল। 

শিক্ষকের ওখানে থাকা অবস্থাতেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। তারপর রিজওয়া দৌড়ে ভবনের সামনে এলে তার বান্ধবী পুড়ে যাওয়া তাসনিয়া তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।

নুরুন্নাহার রুমা বলেন, “তাসনিয়া এসে জড়িয়ে ধরে বলে, রিজু আমার শরীরটা জ্বলে যাচ্ছে। ও এখন আইসিইউতে। আর ওদের আরেক বান্ধবী মায়া মারা গেছে। যাদের সাথে এতো প্ল্যান, তার বন্ধু মারা গেছে। এজন্য মেয়েটা বেশি ডিপ্রেশনে চলে গেছে।”

এই অভিভাবক বলেন, “আমি প্রায় প্রতিদিনই তাদের নিয়ে বের হচ্ছি। অন্য প্যারেন্টদের বাচ্চাদের বাসায় নিয়ে আসতে বলছি। কারণ ওরা একা থাকলে ভালো থাকবে না। এর মধ্যে এখানকার টিচার ফোন করে বলেছে বাচ্চাদের কাউন্সেলিং করাবে, এজন্যই এখানে নিয়ে আসা।”

মাইলস্টোনে স্থাপিত ‘অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে’ শিক্ষার্থী-অভিভাবক, শিক্ষক ও সব কর্মচারীকে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেছে বিমান বাহিনী। 

প্রথম দুই দিনে এই ক্যাম্প থেকে তিন শতাধিক সেবাপ্রার্থীকে ‘কাউন্সেলিং ও মেডিকেল’ সেবা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেডিকেল ক্যাম্পের নেতৃত্ব দেওয়া স্কোয়াড্রন লিডার ওয়ালীওল্লাহ খান।

তিনি বলেন, “আমাদের কাছে যারা আসছে, তাদের নাম লিপিবদ্ধ করে রাখছি পরবর্তী ফলোআপের জন্য। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে অবগত করছি, তারাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বলেছে। 

“আপাতত সাত দিন আমাদের এ কার্যক্রম চলবে। সাইকোলজিস্ট-মেডিসিন স্পেশালিস্টসহ বিমান বাহিনীর ১৭ জনের টিম এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।”

শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটাতে অন্য দেশে কেমন উদ্যোগ

বিভিন্ন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় শিক্ষার্থীরা।

২০০৪ সালে রাশিয়ায় বেসলানের একটি স্কুলে সশস্ত্র চেচেন বিদ্রোহীদের হামলায় ৩৩৪ জনের প্রাণ যায়, যার মধ্যে ১৮৬ জন ছিল শিশু।

২০০৯ সালে উইনেন শহরের একটি স্কুলে সেখানকারই সাবেক এক ছাত্র ঢুকে গুলি চালায়। এতে প্রাণহানি হয় ১৫ জনের। এরপর হামলাকারী নিজেও আত্মহত্যা করে।

২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে’ এক বন্দুকধারীর হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ২০ জন শিশু।

এর মধ্যে ২০১৪ সালে পেশাওয়ার স্কুলে তালেবান সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাণ যায় অন্তত ১৪৯ জনের, যার মধ্যে ১৩২ জনই ছিল শিশু।

২০১৭ সালে ব্রাজিলের একটি স্কুলে গ্যাস ছড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় সেখানকারই এক কর্মচারী। তাতে ৯ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ৫ জন শিশু।

এমন আলোচিত ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ ২০২২ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের উভালদেতে ‘রব এলিমেন্টারি স্কুলে’ এক বন্দুকধারীর হামলায় ২১ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১৯ জন শিশু।

উভালদে ‘স্কুল শুটিংয়ের’ পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ‘ট্রমা’ দূর করতে বেশকিছু উদ্যোগের কথা সেখানকার সংবাদমাধ্যম ও সরকারি দপ্তরের বরাতে জানা যায়।

এর মধ্যে মানসিক সহায়তার অংশ হিসেবে ‘কাউন্সেলিং’ এবং ‘কাউন্সেলিং ইভেন্টের’ ব্যবস্থা করা হয়। চালু করা হয় ‘ট্রমা-রেসপনসিভ সিস্টেম’।

আইনগত ও প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ‘রব এলিমেন্টারি’ নাম পাল্টে ‘লিগ্যাসি এলিমেন্টারি’ নামকরণ করা হয় স্কুলের।

এছাড়া উভালদে ‘স্ট্রং অ্যাক্টের’ আওতায় বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

মাইলস্টোনের ক্ষেত্রে কেমন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন

মনরোগ বিশেষজ্ঞ হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ‘কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে’ যেটা করা হচ্ছে, সেটাকে ‘সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড’ বলা হয়, যেটি সবার জন্যই প্রযোজ্য।

“এটা এক-দুই সপ্তাহ করার পরেই বেশির ভাগ মানুষ স্বাভাবিক কাজ করবে। কিন্তু এদের মধ্যে একটা অংশের দীর্ঘমেয়াদে মানসিক প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এদের জন্যই দীর্ঘমেয়াদের মানসিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রয়োজন আছে।”

‘সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড’ দেওয়ার পরে যদি ঝুঁকিপূর্ণ কাউকে পাওয়া যায়, বা কারও মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা হতে পারে বলে মনে হয়, কিংবা কারও ভেতরে আচরণজনিত সমস্যা, গুরুতর কিছু মানসিক সমস্যা হয়, তখন তাকে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করাতে হবে বলে মত দেন তিনি।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, সব শিশুর দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়বে না। তবে সব শিশুরই ‘সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড’ প্রয়োজন হবে।”

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিষয় পর্যালোচনার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের একটি ‘ব্যবস্থা’ থাকা দরকার বলে মত দেন হেলাল উদ্দিন। 

তিনি বলেন, “যদি কারও প্রয়োজন হয়, সেটি যেন স্কুল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পায়। দ্বিতীয়ত, অবশ্যই শিশুদের ক্লাসে ফিরে আসতে হবে একটা সময়, কিন্তু এটার জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। ধাপে ধাপে স্টেপ বাই স্টেপ ফিরিয়ে আনতে হবে।”

পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দদায়ক ‘এক্সট্রা অ্যাকটিভিটিজ’ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

তার ভাষ্য, “শিশুরা সতীর্থদের হারিয়েছে, তাদেরকে শোক প্রকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদেরকে যেন তারা স্মরণ করতে পারে। যার যার ধর্ম অনুযায়ী যেন দোয়া-প্রার্থনা করতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। শিশুরা যেন কোন বীভৎস দৃশ্য কিংবা ছবি না দেখে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”

প্রাথমিক পর্যালোচনার পর কারও মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা যাচ্ছে কিনা, সেটি স্কুল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় ‘সাবধানতা অবলম্বনের’ ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এম এ সালাউদ্দিন কায়সার।

তিনি বলেন, “প্রথমত আক্রান্তদের বিরক্ত করা যাবে না, সেটা সাংবাদিকতার নামেই হোক, চিকিৎসার নামেই হোক বা গবেষণার নামেই হোক। ওদেরকে ওদের মত করে স্বাভাবিক হওয়ার একটা সময় দিতে হবে।

“দ্বিতীয়ত, এই ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট, তারাই শুধু এ জায়গাটায় কাজ করবে। আর তৃতীয়ত হল, কোনোকিছু করতে হলে স্কুল বা লিগ্যাল কর্তৃপক্ষ যারা আছে, তাদের কাছে অনুমতি নিয়ে করতে হবে। যাতে কেউ জনে জনে গিয়ে আক্রান্তদের বিরক্ত না করে।”

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘সমন্বিত’ উদ্যোগ

উদ্বেগ, আতঙ্ক ও মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরিভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রম শুরু করার কথা জানিয়েছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

২৪ ঘণ্টা সহায়তা দিতে তাদের জন্য চালু করা হয়েছে হটলাইন, বিশেষ ‘আউটডোর সাইকিয়াট্রিক সেল’ এবং হাসপাতালের অন্তঃবিভাগ সংরক্ষিত শয্যা।

সোমবার শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বয় সভা হয়। 

সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী, স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মাইলস্টোন কলেজ কর্তৃপক্ষ, সাইকিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সভায় দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে ‘সমন্বিত পদক্ষেপ’ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।

ইনস্টিটিউটের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমানের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বিশেষ কমিটি গঠন, আউটডোর সেল চালু, হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে শয্যা সংরক্ষণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে আউটরিচ সেবা চালু এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সঙ্গে সমন্বয়ে হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে।

হটলাইন নম্বরগুলো হচ্ছে—

১. সকাল ১০টা–বেলা ২টা: ০১৮৩৫১৫৪৩৪১, ০১৮৩৫১৫৫৫২১

২. বেলা ২টা–বিকাল ৬টা: ০১৮৩৫১৫৩২৬২, ০১৮৩৫১৫৪৩৪০

৩. সন্ধ্যা ৬টা–রাত ১০টা: ০১৮৩৫১৫৩০০৫, ০১৮৩৫১৫৬২৬২

এছাড়া ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমি দুই দিন প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়েছিলাম, তবে এখন প্রতিদিনই জুলাই অভ্যুত্থান উদযাপন সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলছে, তাই যাওয়ার সুযোগ হয়নি, তবে আমাদের সংশ্লিষ্ট থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।”

শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ের কোনো উদ্যোগ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, "আসলে সেখানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরও কাউন্সেলিং দরকার। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। তাই সেভাবে উদ্যোগ নেওয়া যায়নি।"

পুরনো খবর...

মাইলস্টোনে ছুটি বাড়ল শনিবার পর্যন্ত

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক সেবায় হটলাইন-বিশেষ বহিঃবিভাগ চালু

মাইলস্টোন ট্রাজেডি: তদন্ত কমিশন করল সরকার

দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল, চলে গেল মাইলস্টোনের আয়ান