Published : 21 Oct 2025, 09:12 PM
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০টি চুক্তি ও প্রকল্প ‘বাতিলের’ যে তথ্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দিয়েছেন, তা পুরোপুরি সঠিক না হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তালিকায় থাকা কেবল একটি চুক্তি বাতিলের তথ্য দেন তিনি। একইসঙ্গে, ওই তালিকায় থাকা কিছু চুক্তি ও প্রকল্পের অস্তিত্ব না থাকার কথাও বলেছেন উপদেষ্টা।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “যে তালিকাটা এসেছে, এটা কোনো একজন দিয়েছেন, সার্কুলেট করেছেন, সেটা সম্ভবত একজন উপদেষ্টা রিটুইট করেছেন কমেন্টসহ। কমেন্টটা নিয়ে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাই না। হয়ত এটা উনি না করলেও পারতেন।
“এখন যে তালিকাটা এসেছে ওখানে, এটা সঠিক নয়, এর অধিকাংশ ‘এক্সিস্ট’ করে না। একটিমাত্র চুক্তি গার্ডেন রিচ-এর সাথে যে চুক্তি, এটা বাতিল করা হয়েছে, এটুকু আমি জানি। অনেক পুরনো। অনেকদিন আগে করা হয়েছে।”
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (জিআরএসই) থেকে ২১ মিলিয়ন ডলারে একটি সমুদ্রগামী টাগবোট কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। প্রতিরক্ষা খাতে ভারতীয় ঋণচুক্তির ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আওতায় এটি কেনার কথা ছিল।
ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়ায় জিআরএসইর দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে এই চুক্তি বাতিলের তথ্য চলতি বছরের মে মাসে দিয়েছিল ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম।
আসিফ মাহমুদের প্রকাশ করা বাতিলের ওই তালিকায় থাকা বাকি চুক্তি বা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, “কয়েকটি আছে, যে বিভিন্ন পর্যায়ে আছে এবং ঠিক ওই নামে নেই, অন্যরকম ডেসক্রিপশনের কিছু আছে।”
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০টি প্রকল্প ও চুক্তি ‘বাতিলের’ তথ্য রোববার রাতে নিজের ফেইসবুক পেইজে দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।
আসিফ মাহমুদের পোস্ট করা ফটোকার্ডে লেখা হয়, “হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সাথে করা ১০ চুক্তি বাতিল, বাকিগুলোও বিবেচনাধীন।”
ওই পোস্টে বলা হয়, “অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরই চুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”
সেখানে চুক্তি বা প্রকল্পের নাম, সই হওয়ার সাল এবং সিদ্ধান্তের ধরন তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা।
বাতিল হওয়া চুক্তি ও প্রকল্পের তালিকায় তিনি রেখেছেন, ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেল সংযোগ প্রকল্প, অভয়পুর-আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ, আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর, ফেনী নদী পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, বন্দরের ব্যবহার সংক্রান্ত সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন চুক্তি, ফারাক্কাবাদ সংক্রান্ত প্রকল্পে বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতা প্রস্তাব, সিলেট-শিলচর সংযোগ প্রকল্প, পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সম্প্রসারণ চুক্তি, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (মিরসরাই ও মোংলা আইইজেড) এবং ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি জিআরএসইর সঙ্গে টাগ বোট চুক্তি।
‘স্থগিত’ হিসেবে আসিফ মাহমুদের ফটোকার্ডে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি ‘পুনর্বিবেচনা’ এবং গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ‘নবায়ন/পুনর্বিবেচনা’ করার তথ্য দিয়েছেন উপদেষ্টা।
আসিফ মাহমুদের তথ্য বলছে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিকে (খসড়া অবস্থায় ছিল) ‘বাস্তবায়নের জন্য আলোচনায়’ রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারে আসা আসিফ মাহমুদের ফটোকার্ডের তালিকার ক্রম অনুযায়ী, সেই চুক্তি বা প্রকল্পগুলোর কোনটির কী অবস্থা, তা মঙ্গলবার তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “‘ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেলসংযোগ’, এরকম কোনো প্রকল্প নেই। ‘অভয়পুর আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ’, এরকম কোনো প্রকল্প নাই।
“‘আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর’, এই নামে নেই কিছু। আছে যেটা সেটা ‘আশুগঞ্জ নদীবন্দর-সরাইল-ধরখার-আখাউড়া স্থলবন্দর’ নামে একটি প্রকল্প, (এটা) চলমান আছে। এটার একটা প্যাকেজ বাতিল হয়েছে।”
‘ফেনী নদীর পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’- এরকম কোনো প্রকল্প না থাকার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আছে যেটা সেটা হলো যে, একটা এমওইউ আছে অনেক আগের, আগের সরকারের সময়।
“এবং এটার উপরে আমার একটা লেখাও বেরিয়েছিল প্রথম আলোতে। ‘এমওইউ অন উইড্রয়াল অফ ১.৮২ কিউসেক অফ ওয়াটার ফ্রম ফেনী রিভার বাই ইন্ডিয়া ফর ড্রিংকিং ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম ফর সাবরুম টাউন, ত্রিপুরা’, এটা একটা এমওইউ আছে এবং সেটা এখনো বাতিল হয়নি, বহাল আছে।”
‘কুশিয়ারা নদীর পানিবন্টন প্রকল্প’ নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেটা উল্লেখ করা হয়েছে, এ নামে কোনো প্রকল্প না থাকার কথা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, “আছে যেটা সেটা হল, ‘এমওইউ অন উইথড্রয়াল অব ওয়াটার বাই বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া ফ্রম কমন-বর্ডার রিভার কুশিয়ারা’।
“এটা একটা সমঝোতা স্মারক ২০২২ সালে স্বাক্ষর হয়েছিল। এটা সমঝোতা স্মারকটা এখনো স্থগিত হয়নি।”
‘বন্দরের ব্যবহার সংক্রান্ত সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন চুক্তি’ নামে যেটা বলা হয়েছে, ‘এরকম কোনো চুক্তি নেই’ তুলে ধরে তিনি বলেন, “আছে একটা চুক্তি। সেটা হল এগ্রিমেন্ট অন দি ইউজ অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্ট ফর মুভমেন্ট অফ গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া’। এটা বাতিল হয়নি।”
“‘ফারাক্কা বাঁধ সংক্রান্ত প্রকল্পে’ বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাহার, এ ধরনের কোনো প্রকল্প নেই। ‘সিলেট শিলচর সংযোগ প্রকল্প’, এই নামে কোন প্রকল্প নেই।”
‘পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সম্প্রসারণ চুক্তি’ বাতিলের যে তথ্য আসিফ মাহমুদের ফটোকার্ডে এসেছে, সেই রকম কোনো চুক্তি দুদেশের মধ্যে না হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “আপনারা জানেন যে, একটা পাইপলাইন নুমালিগড় থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত আছে। এটা সম্প্রসারণের জন্য প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল একসময়। কিন্তু যে বলা হচ্ছে, সম্প্রসারণের চুক্তি, এরকম কোনো চুক্তি হয় নাই।”

মিরসরাই ও মোংলার ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প ‘বাতিল’ হয়ে যাওয়ার যে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা, তা বাতিলের প্রক্রিয়া চলার তথ্য দেন তার সহকর্মী তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল, মিরসরাই এবং মোংলায়… ভারতীয় লাইন অফ ক্রেডিট যেটা আছে, এর বিষয়টি বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। বাতিল হয় নাই, প্রক্রিয়া চলছে।”
আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি পুনর্বিবেচনার যে তথ্য আসিফ মাহমুদের পোস্টে দেওয়া হয়েছে, তা ‘মোটামুটি সঠিক’, এ কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আদানি পাওয়ারের সম্বন্ধে যেটা বলা হয়েছে, এটা মোটামুটি ঠিক আছে।
“কারণ আদানি পাওয়ারের সাথে আলোচনা চলমান আছে, আপনারা সবাই জানেন। এটা অনেকবারই খবর হয়েছে। এটা পুনর্বিবেচনার জন্য বা এটাকে রিফ্রেমিং করার জন্য আলোচনা চলছে। এটা চলমান। কোনো চুক্তি যে হয়ে গেছে, বাতিল হয়েছে এরকম কোনো কিছু নেই। পুনর্বিবেচনা হচ্ছে।”
গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পর্কে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আপনারা জানেন যে, আগামী বছর শেষ হবে এটার মেয়াদ, ট্রিটি এটা। এটার নবায়নের জন্য আলোচনা হবে, যোগাযোগ চলছে। এটাতো ওয়াটার মিনিস্ট্রির কাজ, তারা করছে এটার উপরে যেটুকু করার।
“তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়া, এটাতো কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। স্বাক্ষর হয়েছে বলাও হয়নি। এটা তো আপনারা জানেন, দীর্ঘদিন যাবত আমরা করছি, খুব যে অগ্রগতি হয়েছে তা না।”
ভারতীয় ঋণচুক্তির আওতায় কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (জিআরএসই) থেকে টাগবোট কেনার চুক্তি বাতিলের যে তথ্য আসিফ মাহমুদ দিয়েছেন, কেবল সেই তথ্যটি সঠিক হওয়ার কথা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, “জিআরএসই মানে গার্ডেন রিচের সাথে আমাদের একটা টাগবোট কেনার চুক্তি ছিল, সেটা আমরা বাতিল করেছি।
“বাতিল করা হয়েছে, বিবেচনা করে দেখা গেছে যে এটা বাংলাদেশের জন্য খুব লাভজনক না।”
উপদেষ্টা পরিষদের সহকর্মীর ‘সঠিক নয়’, এমন তথ্য শেয়ার করার মধ্য দিয়ে ‘সরকারের সমন্বয়হীনতা’ প্রকাশ পাচ্ছে কি-না, এ প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না।”
উপদেষ্টার মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়ে কোনো ‘অনুরোধ বা আহ্বান’ থাকবে কি-না, এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য না থাকার কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশে চলমান ভারতীয় প্রকল্পগুলোর বিষয়ে এক প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, “প্রথমে প্রজেক্টগুলি প্রায় সবই কিন্তু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কারণ, সিকিউরিটি ইত্যাদি কারণে তারা… হয়ত আসলেও কিছু বাস্তব আর কিছু তারা বলছিল যে সিকিউরিটিতে খুব কমফর্টেবল ফিল করছে না, এ কারণে বন্ধ হয়েছিল। তারপরে আবার চালু হয়েছে।
“আমি এটুকু জানি। ডিটেইলস আপনারা আমার কাছে পাবেন না। এই কারণে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিষয় এবং কিছু চালু হচ্ছে, কিছু হচ্ছে না, কিছু চলছে কিছু হয়তো তেমন কাজ এগোচ্ছে না, এটা হতে পারে।”