Published : 19 Aug 2024, 01:07 AM
“আগে থানার সদস্যরা যেমন উৎসাহ নিয়ে কাজে যেতেন, এখন সেটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা কোথাও যাওয়ার আগে দশবার চিন্তা করছি। এখনও কেউ কেউ মনে করছেন, সাদা পোশাকেই চলাচল করা নিরাপদ।”
এভাবেই বলছিলেন ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক পদমর্যাদার এক পুলিশ সদস্য, যিনি চলমান পরিস্থিতিতে তার পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সারা দেশে থানার কার্যক্রম শুরু হলেও এখনও কেন মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের দেখা যাচ্ছে না?
তখন চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ নিয়ে ওই উপপরির্দশক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের কাছে তার ভাষ্য তুলে ধরেন, বলেন, এখনও পুলিশ পরিচয় দিতে তারা স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন না। তবে বিভিন্ন অভিযোগ আর সমস্যা নিয়ে যারা আসছেন, থানার ভেতরে বসে যতটা সম্ভব তাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার মতোই অবস্থা ডিএমপির বেশিরভাগ পুলিশ স্টেশনের।
শনিবার পুলিশি কার্যক্রমের খোঁজ-খবর নিতে আদাবর, তেজগাঁও, কলাবাগান ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা ঘুরে এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘সাত কারণে’ এখনও থানার মধ্যে কার্যক্রম ‘সীমাবদ্ধ’ রাখা হয়েছে।
ডিএমপির জোন ও থানার কর্মকর্তাদের বদলি বা বাধ্যতামূলক অবসর, থানায় হামলা করে অস্ত্র লুট ও গাড়িসহ মালামাল পুড়িয়ে দেওয়া, মামলা ও তদন্তের নথিপত্র গায়েব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ মেরামতে বিলম্ব, আসবাবের সংকট এবং এখনও অস্বস্তিতে ভোগার মতো এই সাত কারণে ধীরগতি বিরাজ করছে পুলিশি কার্যক্রমে।
পুলিশের বাইরে বের না হওয়া, তাদের টহল শুরু না করায় এখনও আতঙ্ক কাটেনি ব্যবসায়ী, দোকানি ও পথচলতি মানুষের। তবে যত দ্রুত সম্ভব ‘বদলে যাওয়া’ পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিত চায় সাধারণ মানুষ।
মোহাম্মদপুরের রিং রোডের একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী স্বয়ন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলছিলেন, "আগে আমার দায়িত্বে থাকা বুথের সামনেই সারা রাত পুলিশ থাকত, নিশ্চিন্তে ডিউটি করতাম। এখন অনেকদিন ধরে পুলিশ নাই; কখন কী যে হয়, সেই চিন্তায় থাকি সব সময়।”
তিনি পুলিশকে আগের চেয়ে আরও বেশি দায়িত্বশীল হিসেবে রাত-দিন তাদের পাশে দেখতে চান।
গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারেরও ১০ দিন কেটে গেছে। এখনও স্বাভাবিকভাবে মাঠে ফিরতে পারেনি পুলিশ। ‘সকল থানা চালুর’ ঘোষণা এলেও কার্যক্রম আটকে আছে পুলিশের থানায় উপস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ সেবাতেই।
কিছু দিন ধরে সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া ‘ডাকাত আতঙ্ক’ কমলেও দৃশ্যমান পুলিশের উপস্থিতি না থাকায় স্বস্তি ফেরেনি জনজীবনে। মামলার তদন্ত কিংবা আসামি গ্রেপ্তারেও আগের মতো পুলিশের ভূমিকা চোখে পড়ছে না।
প্রবল গণআন্দোলন ও জনরোষে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের অধিকাংশ থানায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার খবর আসতে থাকে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় অন্তত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে সংখ্যাটি ঠিক কত, তা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই প্রশ্ন আছে।
এসব হামলায় নথিপত্র, আসবাবপত্রের পাশাপাশি পুড়ে গেছে থানায় থাকা সব গাড়ি। লুট হয়ে গেছে অনেক অস্ত্র ও গুলি। এরপর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় দেশের পুলিশি ব্যবস্থা। জীবন রক্ষার্থে আত্মগোপনে থাকা পুলিশ সদস্যরা কাজে ফিরতে ১১ দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন।
১১ অগাস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি পূরণের আশ্বাস পান পুলিশ সদস্যরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন থেকে তাদের বেশিরভাগ থানায় যোগ দেন, সড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও দেখা যায় তাদের।
গত ১৫ অগাস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের সকল থানায় ‘অপারেশনাল কার্যক্রম’ শুরু হয়েছে।
সেখানে বলা হয়, মেট্রোপলিটনের ১১০টি ও জেলা পুলিশের ৫২৯টি মিলিয়ে দেশের মোট ৬৩৯টি থানার সবগুলোতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশেরও ২৪টি থানায় স্বাভাবিকতা ফিরেছে।
তবে বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। হামলা ও লুটপাটের শিকার বেশিরভাগ থানায় সেবা দেওয়ার মতো জরুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অবশিষ্ট নেই। সব কিছুই নতুন করতে হচ্ছে। এখনও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন মেরামত সম্পন্ন না হওয়ায় আশপাশের ভবন থেকে নিজেরাই তার জুড়িয়ে কোনো রকম কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো।
মাঠপর্যায়ে কোথাও নেই পুলিশ
শুক্র ও শনিবার মধ্যরাতে ঢাকার মগবাজার, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, ধানমন্ডি, শ্যামলী, আসাদগেট মোহাম্মদপুরসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ঘুরে কোথাও পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আগের মতো নেই চেকপোস্ট, দেখা যায়নি কোনো টহল গাড়ি।
মাঝে-মধ্যে সেনা সদস্যদের টহল গাড়ি দেখা গেছে। এই জোরেই প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে মানুষ। সরকার পতনের পর থেকে টানা চার-পাঁচদিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে রাতভর ছিল ডাকাত আতঙ্ক।
পুলিশ নেই বলে এলাকার লোকজন নিজেরাই মিলেমিশে রাতভর পাহারা দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় ডাকাত আতঙ্ক ক্রমেই কাটতে থাকে।
থানায় গিয়ে জিডি করতে পারলেও বাইরে দৃশ্যমান পুলিশ না থাকায় এখনও স্বস্তি ফেরেনি ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংক-বুথের নিরাপত্তাকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাড়া-মহল্লা ও ফুটপাতের দোকানিদের মধ্যে ‘চাপা আতঙ্ক’ রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের রিং রোডের একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, পুলিশ না থাকায় এখন সবসময় তাকে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
একই এলাকার মুদি দোকানী জাকির হোসেন বলেন, “আগে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতাম। মাঝখানে ডাকাত আতঙ্ক গেল, এখন ডাকাতির বিষয়টি কমলেও বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোনো ঘটনা ঘটলে খবর দিয়ে পুলিশও পাওয়া যাবে না। এ কারণে বেশি রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছি না।”
কেমন চলছে ক্ষতিগ্রস্ত থানা
শনিবার ঢাকার আদাবর থানায় গিয়ে দেখা যায়, সামনেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে পুলিশ সদস্যদের পোড়া ইউনিফরম, থানার আসবাব, নানা সরঞ্জাম ও গাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠতেই থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষ, থানাহাজত আর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষ।
ভাঙচুর ও লুটের কারণে এখন ফাঁকা কক্ষের মাঝে ছোট একটি টেবিল ও চেয়ার নিয়ে ডিউটি অফিসার বসেছেন সেবা দিতে।

তখনই আসেন একজন সেবাপ্রত্যাশী। শামীম নামে নিজের ১৩ বছর বয়সি ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে পুলিশের কাছে সহায়তা চাইতে এসেছেন আদাবর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম। তার কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনে একটি জিডি করিয়ে নিচ্ছিলেন ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক সেলিম রেজা।
জাহানারা বেগম বলেন, “৫ অগাস্ট বিকালে গণভবন যাওয়ার জন্য আমার ছেলে বাসা থেকে বের হয়। এরপর আর বাসায় ফিরে আসে নাই। আমরা হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় এই কয়দিন ধরে অনেক খুঁজেও পাই নাই। এখন থানায় আসার পর স্যাররা জিডি করে দিছেন।”
ডিউটি অফিসার সেলিম রেজা বলেন, “অনেকেই থানায় আসছেন, তাদের যতটুকু সম্ভব সেবা দেওয়া হচ্ছে। যারা আসছেন, কাউকেই ফেরত দিচ্ছি না। এখন পর্যন্ত অন্যালগ পদ্ধতিতে আমাদের জিডি কার্যক্রমই শুধু চলমান রয়েছে।"
নাম জানাতে চান না- আদাবর থানার এমন একজন পুলিশ সদস্য বলেন, “থানার অস্ত্রাগার, মালখানাসহ সবকিছু লুট হয়েছে। ৫ অগাস্ট হামলা চালিয়ে যে যা পেরেছে লুট করে নিয়ে গেছে। থানার বাইরে থাকা সব গাড়ি ও জব্দ থাকা অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন দেওয়া হয়েছে।
“পুলিশের অন্তত ৪০টি ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলসহ জব্দ থাকা শতাধিক মোটরসাইকেল যে যার মতো পেরেছে নিয়ে গেছে আর কিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। থানার তৃতীয় তলা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত আগুন দেওয়া হয়েছে।”
শনিবারই দেখা গেল আদাবর থানায় এসে ক্ষতি হওয়া জিনিস ও আসবাবপত্রের তালিকা তৈরি করছেন এক ব্যক্তি, যাকে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো হয়েছে বলে তথ্য দেন তিনি।

মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার এক পুলিশ সদস্য তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এখনও আমরা মাঠপর্যায়ে যাচ্ছি না। আমার থানার সব অস্ত্র লুট হয়ে গেছে, ইউনিফরমও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন আসামি ধরতে গেলে আমার নিরাপত্তার বিষয় আছে, অস্ত্র ছাড়া আমি কীভাবে যাব? পুলিশ সদস্যের কোথাও যাওয়ার জন্য কোনো গাড়িও নেই।”
থানায় কোনো নথিপত্র অবশিষ্ট নেই জানিয়ে পুলিশের ওই সদস্য বলেন, “অনেক মামলার নথি, আলামতের তালিকা থানায় রাখা থাকে। এর কিছুই এখন নেই, এসব মামলার পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে, আমাদের জানা নেই।”
আরেক পুলিশ সদস্য কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, থানার মধ্যেই মাঝে-মধ্যে এখনও তারা পুলিশ পরিচয় দিতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ এসে পুলিশের খোঁজ করলে তারা ভেবে-চিন্তে কথা বলছেন। বাইরের সেবা অনেক দূরের বিষয়, রাতের বেলা প্রায় বন্ধই থাকছে থানার ভেতরের কার্যক্রমও।

সহিংসতার আগুনে পুড়েছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল পোড়া গাড়ির সারি। থানা ভবনের সামনের অংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট।
নিচতলার ডিউটি অফিসারের কক্ষে গিয়ে কথা বরে জানা যায়, তাদের থানায় লুটপাট চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। ঘটনার দিন থানার পেছন দিয়ে দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, যারা এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি সদস্যরা থানায় আসছেন।
তিনি তথ্য দিলেন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ইন্টারনেট সেবা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। অ্যানালগ পদ্ধতিতে যতটুকু সম্ভব জিডি ও মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তবে বাইরের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
এই থানার একটি বাদে সব গাড়ি ভাঙচুর অথবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে থানা এলাকায় প্রতিদিন সাতটি টহল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করত। এখন সেই জায়গায় এখন প্রস্তত রাখা হয়েছে মাত্র একটি টিম, যারা জরুরি প্রয়োজন হলে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নাম জানাতে অনাগ্রহী থানার এক সদস্য বলেন, পোশাকসহ বাইরের ডিউটিতে যাওয়ার সাহস তারা এখনও করছেন না। তারপরেও আজ (রোববার) সকালে ৯৯৯ এর একটি ফোনকলে মহাখালী গিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা।
থানার ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক পরিমল চন্দ্র সরকার বলেন, “থানার কার্যক্রম বলতে জিডিসহ টুকটাক অন্য কাজ চলছে। এ অবস্থায় আগের মতো শতভাগ তো সম্ভব না, তারপরেও যতটা সম্ভব আমরা সেবা দিচ্ছি। সবকিছু স্বাভাবিক হতে হয়তো একটু সময় লাগছে কিন্তু আশা করছি দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অক্ষত থানাগুলো যেমন চলছে
হামলার মধ্যে ঢাকার যে কয়টি থানা অক্ষত ছিল তার মধ্যে দুটি তেজগাঁও মডেল থানা ও কলাবাগান থানা। তাদের সব যানবাহনও অক্ষত থাকার কথা জানা যায়।
৫ অগাস্টের পর ঢাকায় চালু হওয়া প্রথম থানা তেজগাঁও মডেল থানা।
তেজগাঁও থানায় গিয়ে ফটকেই পোশাকধারী সদস্যদের দেখা গেল। ভেতরেও ডিউটি অফিসারের কক্ষ থেকে সবাই পোশাকসহ স্বাভাবিক পরিবেশে সেবা দিচ্ছিলেন।

থানা সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তাদের আগে ছয়টি টহল টিম ছিল। এখন কমিয়ে তিনটিতে আনা হয়েছে। তাদের গাড়ি না পুড়লেও ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোকে গাড়ি সহায়তা দিয়ে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে।
থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সারোয়ার আলম খান বলেন, “আমাদের সব সেবা স্বাভাবিক আছে। টহল টিম কমেছে, কিন্তু তারা বাইরে যার যার নির্ধারিত এলাকায় রয়েছেন। আমরা প্রতিদিন দুই বেলা সকাল ১০টায় ও রাত ১০টায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ টহল দিচ্ছি।”
কলাবাগান থানায় গিয়ে তাদের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের বিষয়ে খোঁজ নিতেই এক পুলিশ সদস্য বলেন, “বাইরের কোনো কল নেই, তাই আমাদেরও কাজ নেই। কোনো আসামি গ্রেপ্তারের কার্যক্রমও নেই। পুলিশ সদস্য সবাই থানাতেই আছেন।"

ডিউটি অফিসারের কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, কালাবাগান এলাকার এক নারী তার বাড়ি দখলের অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। তাকে অভিযোগ নিতে সহায়তা করছিলেন এএসআই মো. নাঈম মিয়া।
ওই নারী বার বার বলছিলেন, “আপনারা ব্যবস্থা নেন। আপনারা আমার সাথে চলেন। পুলিশ না গেলে আমি কার কাছে যাব? সেনাবাহিনীর কাছে যাব?”
নাঈম মিয়া বলেন, “আমাদের থানার সব সেবাই স্বাভাবিক আছে। পুলিশ সদস্যরা কাজ করতে বাইরেও যাচ্ছেন। টহল টিম কমানো হয়েছে কিন্তু যে কয়টি আছে, তারা বাইরেই আছে।”
বদলি চলছেই
শনিবার আদাবর, তেজগাঁও, কলাবাগান ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় গিয়ে কলাবাগান থানাতেই শুধু ওসিকে পাওয়া গেছে। অন্য থানাগুলোর ওসিরা বদলি হয়েছেন। এখনও তাদের স্থানে নতুন কাউকে পদায়ন করা হয়নি। ফলে ওসির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তদন্ত বা অপারেশনসের পরিদর্শক।
গত ১৩ অগাস্ট একযোগে ডিএমপির ১৮ জন ওসিকে বদলি করে ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ খাগড়াছড়িতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের পাঠানো হয়েছে আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন)।
ডিএমপির কর্মকর্তা পর্যায়েও রদবদল অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ শনিবার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার ১৩ জন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। আর উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার সাতজন কর্মকর্তাকে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বে পদায়ন করা হয়।
ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে পুলিশের প্রায় সব স্তরের কর্মকর্তাদের বদলির ধারাবাহিকতায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের মতো প্রভাবশালী দুজনকে।
গত ৫ অগাস্ট সরকারের পতন হলে শেখ হাসিনার নিয়োগ দেওয়া পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পরদিন চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় ট্রাফিক অ্যান্ড ড্রাইভিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট মো. ময়নুল ইসলামকে।
গত ৭ অগাস্ট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হারুন-অর-রশিদকে সরিয়ে পুলিশের এই এলিট ফোর্সের নেতৃত্বে আনা হয় অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমানকে।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানকে সরিয়ে সেই জায়গায় চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মাইনুল হাসানকে।
উদ্ধার হচ্ছে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র
থানা-ফাঁড়ির সঙ্গে লুট করে নিয়ে যাওয়া অস্ত্র নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে পুলিশের মধ্যে। এসব অস্ত্র কোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হাতে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় লুট হওয়া অস্ত্র জমা না দিলে সেসব উদ্ধারে অভিযানের কথা জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও এখনও পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত নয়, তাদের কী পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে।
এর মধ্যেই সর্বশেষ রোববার পর্যন্ত পুলিশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ৭৪৮টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ।
অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়েছে, ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত লুট হওয়া ৭৪৮টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গোলাবারুদের মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ১৯৫ রাউন্ড গুলি ও ১ হাজার ৪৭২টি টিয়ার শেল।