Published : 22 Jan 2026, 01:29 AM
র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে ‘গুম’ করে নির্যাতনের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্র্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে তিনি সাক্ষ্য দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ব্যারিস্টার আরমান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুদ্ধাপরাধের মামলায় তিনি তার বাবার আইনজীবী ছিলেন। ওই সরকারের সময়ই তাকে র্যাবের টিএফআই সেলে কয়েক বছর গুম করে রেখেছিল বলে অভিযোগ তার।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ১৫ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।
গত ১৮ ডিসেম্বর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) ‘গুম ও নির্যাতনের’ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় গ্রেপ্তার ১০ সেনা কর্মকর্তা হলেন–র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসরকালীন ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
পলাতক রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অবরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক র্যাবের ডিজি এম খুরশিদ হোসেন ও ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, র্যাবের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খায়রুল ইসলাম।
আরমান সাক্ষ্যে বলেন, ট্রাইব্যুনালে তার বাবার ফাঁসির রায় হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ হয় এবং এরপর রিভিউ শুনানি চলছিল। ওই সময় ২০১৬ সালের ৯ অগাস্ট মিরপুর ডিওএইচএস এর ভাড়া বাসা থেকে র্যাবের সদস্যরা তাকে অপহরণ করেন।
তার ভাষ্য, ৯ অগাস্ট সকাল ৯টা/সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে একটি মাইক্রোবাস তাকে অনুসরণ করে। রাত আনুমানিক ১১.৩০টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন। পরে রাতের খাবার খেতে বসার সময় ৭/৮ জন অস্ত্রধারী লম্বা চওড়া লোক তাকে বাসা থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। নিচে নেমে দেখেন যে মাইক্রোবাসটি সারাদিন তাকে অনুসরণ করেছে সেই মাইক্রোবাসটি দাঁড়ানো সেখানে। ওই মাইক্রোবাসে তুলে তাকে নিয়ে যায়।
কিছু দূর যাওয়ার পর তাকে হাতকড়া পরায় এবং চোখবেঁধে ফেলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, যাত্রাপথে কয়েক জায়গায় মাইক্রোবাসটি থামে এবং তাদের কথোপকথন থেকে বুঝতে পারেন তারা বিভিন্ন যায়গায় রিপোর্ট করছিল বলে সাক্ষ্যে তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, “যিনি আমাকে আটকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার কোমরে একটি ছোট অস্ত্র ছিল এবং দুইজনের হাতে বড় অস্ত্র ছিল এবং সেই অস্ত্রের গায়ে সাদা কালিতে সিরিয়াল নামবর লেখা ছিল।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরমান বলেন, গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে একটি সংকীর্ণ সেলে প্রবেশ করায় এবং তার জামা-কাপড় বদলে তাদের দেওয়া লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরতে বলে।
“আমাকে চোখ বেঁধে ওই ঘরে রাখা হয়েছিল। ওই ঘরের মেঝে স্যাঁতসেতে, ইঁদুর এবং তেলাপোকা আমার শরীরের উপর দিয়ে চলাফেরা করছিল।”
তার ভাষ্য, ওই কক্ষে তাকে ১৬ দিন রাখা হয় এবং ওই ১৬ দিনে তিনি বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৬ দিন পর এক মাঝরাতে ওই বন্দিশালা থেকে বের করে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে একটি গাড়িতে তুলে আরেক বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সেলটি আগেরটির চেয়ে অনেক বড় এবং মঝে টাইলস করা।
টয়লেটে যাওয়া এবং খাওয়ার সময় তার চোখের বাঁধন ঢিলে করে দেওয়ার কারণে তিনি কক্ষটির বিভিন্ন জায়গা দেখতে পেয়েছেন বলে তুলে ধরেন।
তার ভাষ্য, “আমি বন্দি থাকা অবসস্থায় সিলিংয়ের একটা অংশ খুলে পড়েছিল যা পরবর্তীতে মেরামত করা হয় যা এখনও দৃশ্যমান, যেটা আমি মুক্ত হওয়ার পর গুম কমিশনের সদস্যগণ, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, তদন্ত সংসস্থার লোকজন এবং চিফ প্রসিকিউটরের উপস্থিতিতে আমাকে যেখানে বন্দি রাখা হয়েছিল সেটা পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি। যেটা ছিল র্যাব-১ কম্পাউন্ডে, র্যাব সদরদপ্তরের অধীনে পরিচালিত, র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইং এর টিএফআই সেল।”
আরমান বলেন, পরের সেলের প্রহরীদের আচরণ নির্মম ছিল এবং তারা তাকে সার্বক্ষণিক চোখ বেঁধে এবং হাতকড়া পরিয়ে রাখত। খাবারের সময় ডান হাত এবং টয়লেটে গেলে বাম হাত খুলে দিত। গভীর রাতে প্রতিদিন দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হত। সকালে নাস্তা না দেওয়া পর্যন্ত এইভাবে রাখা হত।
ওই কক্ষ থেকে তিনি বাইরে উড়োজাহাজ, ট্রেন এবং জোরে গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনতে পেতেন; অন্যান্য সেলের বন্দিদের নির্যাতনের সময় আর্তচিৎকার শুনতে পেতেন।
“আমি প্রায়ই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়তাম। সেই সময় বাইরে থেকে চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দিত। আমি তাদের বলি এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? তখন তারা বলে, সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আপনার বিষয়ে নির্দেশ আসে। আমাদের করার কিছু নাই। আমাকে সেলে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ঔষধ দেওয়া হত।
“একদিন ওষুধ দেওয়ার সময় একটি কাঠের বাক্স দেওয়া হয়, আমি চোখ বাঁধা অবস্থায় নিচ দিয়ে নাকের ফাক দিয়ে একটু দেখতে পেতাম, ওই ফাক দিয়ে দেখি ওই বাক্সের গায়ে লেখা টিএফআই এবং আমার ওষুধগুলো একটি বড় ঠোঙ্গার মধ্যে ছিল, তার গায়ে লেখা ছিল ভিআইপি-২।”
তার ভাষ্য, ঘায়ে মলম দেওয়ার জন্য তার হাতে বের করে দিত; টিউবের গায়ে লাল অক্ষরে লেখা ছিল ‘প্রোপার্টি অব র্যাব এইচ কিউ’।
প্রহরীরা সাধারণত তার সঙ্গে কথা বলতো না তুলে ধরে তিনি বলেন, “কয়েক বছর পর একবার একজন প্রহরী নরম ভাষায় কথা বলছিল। এতে আমি সাহস পেয়ে তাকে অভিযোগের সুরে বললাম এভাবে কোনো মানুষকে রাখা? উত্তরে সে বলল আপনি ভাগ্যবান যে আপনি বেঁচে আছেন। আপনার মনে পরে কি যে আপনাকে আনার দিন আপনার ওজন নেওয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, আপনাকে হত্যা করা হবে। এসিড দিয়ে আপনার চেহারা এবং হাত ঝলসে আপনার ওজন অনুযায়ী ইট বেঁধে বরিশালের নদীতে আপনাকে ফেলে দেওয়া হবে। কিন্তু যিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়। এরপর আপনার বিষয়ে সিদ্ধান্তটি ঝুলে যায়। আপনি আরো সৌভাগ্যবান যে জিয়া এখন আর এখানে নাই। থাকলে আপনি এতদিন হায়াত পেতেন না।”
প্রায়ই পরিদর্শনের জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তার সেলের সামনে আসতেন বলে সাক্ষ্যে বলেন তিনি।
“তখন আমাকে পিছন দিক দিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসিয়ে রাখা হত। আমি মোবাইলের আওয়াজ শুনে এবং দামি পারফিউমের ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারতাম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমি তাদের কথাবার্তা শুনতাম। আমি এদের মধ্যে হিন্দি ভাষায় কথোপকথন শুনেছি। আমি যখন গুম হই তখন সে ছিল কর্নেল এবং পরে জেনারেল হয়। আমি জানতাম সে গুমের মাস্টারমাইন্ড। দ্বিতীয়জন যে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল সে ব্যক্তি সিলেটে সন্ত্রাসী হামলায় মারা যায়।”
আরমান বলেন, “মুক্ত করার কয়েক মাস আগে থেকে খাবার খাওয়ার পরে তার সারা শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হত; মনে হত হাজারটি পিঁপড়া যেন কামরাচ্ছে। খাবার পর প্লেট আমাকে নিজেকে ধুতে হত। তখন আমি দেখতাম প্লেটে পানি পরলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত বুদবুদ উঠত। আমার তখন সন্দেহ হয় আমার খাবারে তারা কিছু মেশাচ্ছে। তখন আমি অধিকাংশ খাবার টয়লেটে ফেলে দিতাম। মাঝে মাঝে ক্ষুধার কারণে কিছু খাবার পানি দিয়ে ধুয়ে খেতাম।”
মুক্তির দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, একদিন গভীর রাতে তাকে একটি গাড়িতে তুলে মেঝেতে শোয়ানো হয়। এরপর একজন প্রহরী বুকের উপর এবং আরেকজন উরুর উপর বসে। গাড়ি আনুমানিক ৩০ মিনিটের মত চলে। এরপর থেমে যায়।
“আমাকে সেই গাড়িতে শোয়া অবস্থা থেকে তুলে বসানো হয়। তখন একজন বয়স্ক লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, এতদিন কোথায় ছিলি? এবং আমরা কারা? আমি ভীত হয়ে বলি আমি জানি না। তখন তারা আমাকে বলে যে, সবাইকে এটাই বলবি। তারপর গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। আমি মনে করেছিলাম আমাকে হত্যা করা হচ্ছে। আমি সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকি। যেন মৃত্যুটা সহজ হয়। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারি আমি একা।
“পরে আমি চেষ্টা করে চোখ ও হাতের বাঁধন খুলে ফেলি। আমি দূরে আলো দেখতে পাই আমি ঐ আলোর দিকে হাঁটতে থাকি। আলোর কাছে গিয়ে দেখতে পাই সেটি একটি নির্মাণাধীন ভবন এবং সেখানে সাইনবোর্ডে লেখা "দিয়াবাড়ী, উত্তরা"। তখনও আমি জানি না যে, দেশে বিপ্লব হয়েছে।”
তিনি ওই ভবনের কর্মরত লোকদের মিরপুর যাওয়ার পথ জিজ্ঞাসা করেন এবং তারা দিক নির্দেশ করে হাঁটতে বলেন।
টিএফআই’তে ‘গুম-নির্যাতন’: হাসিনা, কামাল ও ১৫ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরুর আদেশ