Published : 21 Jan 2026, 01:58 AM
উত্তরায় সাবেক সেনা সদস্য মাহবুব আলম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তারা হলেন– ল্যান্স কর্পোরাল খন্দকার ইমরান হোসেন এবং ‘প্রতারক’ হাসান শিকদার মেহেদীর গাড়ি চালক জাহিদুল ইসলাম জনি।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পেরেছে, মনোনয়ন ও ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন মেহেদী। সেই টাকা আদায়ের জন্য মেহেদীকে তুলে নিয়ে যায় অন্যপক্ষ। সে সময় ঘটনাচক্রে তাদের মারধরের শিকার জন মাহবুব। পরে তার মৃত্যু হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম মঙ্গলবার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে তাদের ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক আসামি ইমরান হোসেনের এবং আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান আসামি জাহিদুল ইসলামের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয় বলে প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই শামীম হোসেন জানান।
মাহবুব আলমের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়। উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় তার বাসা। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করতেন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তরা পশ্চিম থানার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কে যান মাহবুব আলম। সে সময় দুটি গাড়ি সেখানে যায়। একটি গাড়ি থেকে একজন নেমে হঠাৎ লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। আরও পাঁচ-ছয়জন তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করে পালিয়ে যান।
পরে স্থানীয়রা মাহবুবকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ওই ঘটনায় মামলা হওয়া পর সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে গুলশান থেকে জাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার রাত ৩টার দিকে মাগুরা সদর উপজেলার ইছাখাদা এলাকা থেকে ইমরান হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, "গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে খন্দকার ইমরান হোসেন জানায়, মোবাইল ফোনে ১০ মাস আগে হাসান শিকদার মেহেদীর সাথে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের এক পর্যায়ে মেহেদী নিজেকে প্রধান উপদেষ্টার মেয়ের পিএস হিসেবে পরিচয় দেয় এবং তার নিজের কোনো ভাই বোন নাই বলে জানায়।
“ইমরানকে সে ভাই বানিয়ে নেয়। পরে মেহেদী বলে, সে বঙ্গভবনে থাকে, তাই তার অ্যাকাউন্টে লেনদেন করা সম্ভব না। ইমরানকে একটি অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিতে বলে। ওই অ্যাকাউন্টে একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা আসার কথা বলে।"
আবেদনে বলা হয়, “ইমরানের কলিগ আল সাদী বঙ্গভবনে ডিউটি করে। সেজন্য ইমরান বিষয়টি সাদীকে জানায়। সাদী তার কথা শুনে তার বন্ধু বোরহানের অ্যাকাউন্ট নম্বর দেয়। ওই অ্যাকাউন্টে দুইবারে ৬০ লাখ টাকা আসে। টাকাগুলো বোরহান তুলে ইমরান ও সাদীর কথামত হাসান শিকদার মেহেদীকে দেয়।"
তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে বলেন, "পরে ইমরান ও সাদী টাকার উৎস খোঁজার চেষ্টা করে। তারা জানতে পারে, কুষ্টিয়ার শহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে হাসান শিকদার মেহেদী ৪০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে দেওয়ার কথা বলে আরো ২০ লাখ টাকা নিয়েছে।
“টাকা দেওয়ার পর শহিদুল মনোনয়নের ফয়সালার জন্য তার ভাগ্নে কোকোকে দায়িত্ব দেয়। কোকো পরে জানতে পারে, হাসান শিকদার মেহেদী কারো পিএস না, সে প্রতারক। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কোকো টাকা ফেরত দেওয়া জন্য বোরহান, ইমরান ও আল সাদীকে চাপ দিতে থাকে।
“পরবর্তীতে বোরহান, ইমরান ও আল সাদী কথিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বনি আমিনের কাছে যায়। ঘটনা শুনে বনি আমিন টাকা আদায় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমরানের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেয়। কিন্তু তারা কেউ হাসান শিকদার মেহেদীকে খুঁজে পাচ্ছিল না।”
আবেদনে বলা হয়, বোরহান, ইমরান ও সাদী এক পর্যায়ে হাসান শিকদার মেহেদীর গাড়ী ও ড্রাইভারের সন্ধান পান এবং গাড়িটি ভাড়া নেন।
“গত ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বনি আমিন, বনি আমিনের ভাগ্নে বাবর, ইমরান, আল সাদী ও বোরহান উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডে যান এবং ভিকটিম মাহবুব আলমকে আহত করে প্রাডো গাড়ি থেকে হাসান শিকদার মেহেদীকে নামিয়ে বনি আমিনের নিশান গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।”
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, "হাসান শিকদার মেহেদীর কাছে আসামিরা টাকা পেত। সে টাকা দিচ্ছিলো না। টাকা না দেওয়ার কারণে আসামিরা তাকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। মেহেদীর গানম্যান ছিলেন মাহবুব আলম। মেহেদীকে প্রটেক্ট করতে যান তিনি। আসামিরা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে মাহবুব আলম মারধর করে আহত করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।”
মামলার বিবরণে বলা হয়, মাহবুব আলম সিকিউরিটি সার্ভিসেস নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে আলাল গ্রুপের প্রটোকল অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এর বাইরেও তিনি ছুটির দিনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গানম্যান হিসেবে কাজ করতেন।
গত ১৬ জানুয়ারি তিনি সেরকমই এক কাজের জন্য ১৪ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডে যান। তখন সেখানে একটি সাদা প্রাডো গাড়ি এসে থামে। ওই গাড়ির পেছনে একটি নিশান গাড়ি এবং একটি মোটরসাইকেল আসে।
এজাহারে বলা হয়, “মাহবুব আলম প্রাডো গাড়ির দরজা খুলে দিলে ওই গাড়ি থেকে এক ব্যক্তি নামার সাথে সাথে নিশান গাড়ি থেকে চারজন এবং মোটরসাইকেল থেকে দুইজন আসে। তাদের একজন মাহবুব আলমের মাথায় আঘাত করে। মাহবুবের কাছে থাকা শটগানটি নিয়ে তা দিয়ে মুখে আঘাত করে। তারা প্রাডো গাড়ি থেকে নামা লোকটিকে নিশান গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
“আশপাশের লোকজন পুলিশে খবর দিলে তারা এসে আহত মাহবুবকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রথমে তাকে চিকিৎসার জন্য উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। পরে তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাতে মারা যান মাহবুব আলম।
মাহবুব আলম চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার ছেলে আব্দুল্লাহ ইসমে আযম অজ্ঞাতনামা ৬ জনকে আসামি করে ১৭ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। তার বাবার মৃত্যুর পর মামলাটিতে হত্যার ধারা ৩০২ সংযুক্ত করা হয়।
মামলা দায়েরের পর মেহেদীর আরেক চালক বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, "সোমবার তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।"
এখন পর্যন্ত মামলাটিতে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান ওসি।
মামলার বাদী আব্দুল্লাহ ইসমে আযম বলেন, "আমার বাবা তাদের (আসামিদের) কিছুই করেনি। কিন্তু তারা আমার বাবাকে কীভাবে মেরেছে। আমি বিচার চাই। বিচারের জন্য কোনো কিছুর সাথে আমরা আপস করব না। যারা প্রকৃত দোষী তাদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের প্রত্যাশায় আছি।"