"আমার মনের মানুষের সনে": ঈশ্বর ও ভালবাসার অন্বেষণে লালন, রবীন্দ্রনাথ, এবং স্পিনোজা

মোস্তফা সারওয়ারমোস্তফা সারওয়ার
Published : 2 Nov 2022, 08:45 AM
Updated : 2 Nov 2022, 08:45 AM

১৭৭০ এর দশকে বর্তমানের খুলনা বিভাগের এক অজ পাড়াগাঁয়ে জন্ম হয়েছিল এক মহামানবের। আবার কারো কারো মতে তিনি যশোরে, কারো কারো মতো তিনি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন। সঠিক জন্ম সাল জানা নেই। জন্ম স্থানের দাপ্তরিক নথিপত্র নেই। পিতামাতা সম্পর্কে রয়েছে ভিন্নতর বক্তব্য। তাঁর নিজস্ব বংশধর রয়েছে  বলে দলিল দস্তাবেজ নেই।  প্রাইমারী সোর্স হিসেবে পাওয়া যায় কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ও মীর মোশারেফ হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত 'হিতকরী' পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর সংবাদ। ১২৯৭ বাংলা সালের বৃহস্পতিবার ১লা কার্তিক (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮৯০ সালের ১৬ অক্টোবর) শুক্লপক্ষের ভোর বেলা কুষ্টিয়ার অন্তর্ভুক্ত কুমারখালির  ছৈঁউরিয়া গ্রামে তাঁর আখড়ায় তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল। কাঙাল হরিনাথের 'গ্রামবার্ত্তা পত্রিকা’য়ও লালনের মৃত্যুর সংবাদ ছাপা হয়েছিল বলে কথিত আছে।  

'হিতকরী' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১১৭ বছর। ঘটনার সত্যতা বিচারের পদ্ধতি  'হিতকরী' পত্রিকায় চালু ছিল এমন প্রমাণ নেই। তথাপি এই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করলে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৭৭৩ সালে। কিন্তু কোথায় তাঁর জন্ম, কোন দিন? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

এই মৃত্যু সংবাদটির বাইরে প্রাইমারী সোর্স  হিসেবে রয়েছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পেনসিলে আঁকা একটি প্রতিকৃতি, যার নীচে লেখা আছে "শিলাইদহ, বোট, লালন ফকির ১৮৮৯"। মূল ছবিটির বর্তমান ঠিকানা হল জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ছৈঁউরিয়ায় তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত লালনের আখড়ায় দেখা যাবে তাঁর ব্যবহৃত একতারা ও কাঁথা সহ কিছু জিনিস। এ ছাড়া শান্তিনিকেতনে বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত রবীন্দ্রনাথের দুটো খাতায় কপি করা লালনের কয়েকটি গান। ছৈঁউরিয়ায় লালনের আখড়ার দুটো খাতা থেকে তা কপি করা হয়েছিল। সর্বোপরি রয়েছে লালনের অসংখ্য গান। আমরা পেয়েছি মৌখিক ঐতিহ্য (oral tradition) এর মাধ্যমে। লালন ভক্তদের কারণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে অনেক গান (সংগীত শিল্পী - ফরিদা পারভিন, অনুপম রায়, বাবুল সুপ্রিয়, সতীয়াকী ব্যানার্জী, লায়লা, তাপস এবং বন্ধুরা, অর্ণব এবং বন্ধুরা, এবং অন্যান্য)। 

আমি নিজেই যেন বন্দী হয়ে আছি আট হাজার মাইল দূরে এক অচিন শহরে – ইট, কাঠ পোড়ামাটি আর শ্বাসরুদ্ধকর বিষাক্ত অবগুণ্ঠনে। উপরিউক্ত শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গানের মূর্ছনায় আমার মন চিরায়ত বাংলার বুকে ফিরে যেতে চায়। মনে হয় এই ভিন নগরীর কোন নিভৃত অন্ধকার কক্ষ থেকে আমি শুনছি আমারই নিষ্পেষিত নিঃশ্বাসের শব্দ। বোদলেয়ারের ভাষার অনুকরণে চিৎকার করে বলতে চাই: New Orleans may change; my Melancholy is fixed. মনের মানুষ খাঁচা ছেড়ে চলে গেছে। আর কোনোদিন আসবে না, কোনদিন আসবে না জেনে। যেন আমি দেখছি লালনের চোখেও চিরায়ত নির্বাসিতের করুন চাহনি – অশ্রুসিক্ত, ভেজা ভেজা। 

লালনের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক উপন্যাস (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর 'মনের মানুষ'), নাটক, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র (তানভীর মোকাম্মেলের 'লালন', হাসান ইমামের 'লালন ফকির', গৌতম ঘোষের 'মনের মানুষ', ও অন্যান্য) , লেখা হয়েছে পিএইচডি ডিসার্টেশন (শাহিনূর রহমান)। জ্ঞানের অনিরুদ্ধ পৃথিবীতে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো লালন জেগে আছেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে লালনের আবির্ভাবের সময়ে বঙ্গ ভূমিতে ছিল লেখকের প্রাদুর্ভাব। ভারত চন্দ্র রায়, রামপ্রসাদ সেন, ও রামরাম সেন ছিলেন লেখনীর নিষ্ফলা আকাশের মাত্র কয়েকটি নক্ষত্রের অন্যতম। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে এসেছিল প্রতিভার নিদারুণ প্লাবন - বাংলা তথা ভারতের রেনেসাঁ।  অপর দিকে লালনের জন্মের কিছু পূর্ব-পর অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপের শিল্পকলা-সাহিত্য-সংগীত-দর্শন এর জগতে ঘটেছিল বিপ্লব। ভাস্বর হয়েছিলেন ভলতেয়ার, গ্যোটে, শীলার, মোজার্ট, পুশকিন সহ অনেক মহামানব।

অর্থ-সমাজ-রাজনীতিতে চলছিল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়ায় পরিবর্তনের নিদারুণ ঝর। লালনের আনুমানিক জন্ম বছরের ষোলো বছর আগে পলাশীর যুদ্ধ এবং নয় বছর আগে বক্সারের যুদ্ধের ফল স্বরূপ পূর্ব ভারতে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিষ্ঠা হল। ওয়ারেন হেস্টিংস হলেন গভর্নর জেনারেল। প্রায় আড়াই শত বছর আগে লালনের জন্মের সময় কার্চ চুক্তিতে রুশ সাম্রাজ্যের জয় জয়কার - অন্য দিকে অটোমান সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণুতার ঘণ্টা ধ্বনি। ঐ একই সময়ে উত্তর আমেরিকায় স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত আর ইউরোপে মহান ফরাসী বিপ্লবের পদধ্বনি।

উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গ ভূমিতে রেনেসাঁ-সিক্ত সাহেবি বুদ্ধিজীবীদের প্রাণেও দোলা দিয়েছিল ভিতর ও বাহির বিশ্বের ক্রম পরিবর্তনশীল বুদ্ধি-বিকাশ ও বিস্ফোরণ এবং রাজনৈতিক বিস্মরণ। লালনের জীবদ্দশায় বঙ্গ ভূমির প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ছোট শহর ও হাট বাজার এ দোলা দিচ্ছিল এক ক্রান্তিকাল এবং দিক পরিবর্তন অথবা inflection point এর ইঙ্গিত। দীর্ঘকালের সামন্তবাদী প্রথা ও সংস্কারের মাঝে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হতে লাগলো আধা সামন্তবাদী এবং আধা পুঁজিবাদী অর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের অতীব ক্ষীণ স্রোতধারা। সামাজিক বাঁধন ভাঙ্গার অতি নিম্ন-মার্গের কিছুটা কলরব। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নেমেসিস জাতশত্রু কার্ল মার্ক্স তাঁর প্রবন্ধ 'ভারতে ব্রিটিশ শাসন' এ লিখেছিলেন, "ইংল্যান্ডের যত অপরাধই থাক, সে বিপ্লব [সামাজিক বিপ্লব] সংঘটনে ইংল্যান্ড ছিল ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র"।

ছৈঁউরিয়া থেকে অদূরে কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হত 'গ্রামবার্ত্তা পত্রিকা’। সম্পাদক ছিলেন কাঙাল হরিনাথ। কথিত রয়েছে, কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকায় জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে লিখতেন। কাঙাল হরিনাথকে শায়েস্তার জন্য শিলাইদহের ঠাকুর জমিদারের কর্মচারীরা পাঠালো লাঠিয়াল বাহিনী। লালন তাঁর শিষ্যদের সহ প্রতিরোধ করেছিলেন সেই অত্যাচার। মনে হচ্ছে, ছৈঁউরিয়ার অজ পাড়াগাঁয়ে লালনের আখড়ায় "ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র" এর ক্ষণিক প্রকাশ ঘটেছিল। তবুও বলা যেতে পারে, বাইরের পৃথিবীর রোমাঞ্চিত কাহিনী, ইতিহাসের নিষ্ঠুর হানাহানি অথবা জ্ঞান-দীপ্তির ঢেউ লালনের আখড়ায় এসে দোলা দিয়েছিল কিনা তার কোনো দলিল দস্তাবেজের নিশানা নেই। শুধু বাংলার মায়াময় প্রকৃতির কোলে নিম্ন গোত্র মানুষের শুধু বেঁচে থাকার রাখালি অথবা কারিকরী কর্মের এক ঘেয়ে বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছিলেন এক নিরক্ষর মহামানব। যার রচিত গানের ভাষায় আমরা দেখতে পাই দর্শন, অধিবিদ্যা (metaphysics), জ্ঞানতত্ত্ব (epistomology), সত্তাতত্ত্ব (ontology) এর মুগ্ধ অভিসার। যেটা কখনও কখনও ছাড়িয়ে গেছে ইউরোপ-আমেরিকার ঋদ্ধতার সম্ভার। 

বৈষ্ণব ধর্ম ও সুফিবাদের প্রভাব রয়েছে লালনের দার্শনিক চিন্তাধারার মূলে। দেহে আত্মার বাস। আর সেই আত্মাই হল পরমাত্মায় গ্রথিত। তাঁর বহুল জনপ্রিয় "আমার মনের মানুষের সনে" পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারবো লালনের সত্তাতত্ত্ব অথবা অন্টলজির ব্যাখ্যা।

"চাতক প্রায় অহর্নিশি

চেয়ে আছে কালো শশী

হব বলে চরণ-দাসী

ও তা হয় না কপাল-গুণে"

এজরা পাউন্ড ও এমি লাওয়েল দ্বারা  দূরান্বয়ী চিত্রকল্পের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল ১৯১০ দশকের ‘চিত্রকল্পবাদী’ আন্দোলনে। তিরিশের বাংলা কবিরা এই কাব্য বাহনকে লুফে নিলেও এর সার্থক প্রতিফলন এসেছে জীবনানন্দে। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করতে পারি আজ থেকে প্রায় আড়াই শত বছর আগের ছৈঁউরিয়ার অজ পাড়াগাঁয়ের এক নিরক্ষর বাউলের গানে দূরান্বয়ী চিত্রকল্পের প্রতিধ্বনি। কালো শশী, শ্রীকৃষ্ণ অথবা ঈশ্বর চেয়ে আছে সর্বক্ষণ যেমন চাতক পাখি চেয়ে থাকে মেঘের দিকে বর্ষণের আশায়। কালো শশীর অস্তিত্ব যেন বস্তু। যার বৈশিষ্ট্য সসীম (finite)। সে চেয়ে আছে। চোখ রয়েছে বলেই চেয়ে আছে। বাউল সহজিয়া প্রথায় প্রচলিত চর্চা অনুসরণ করে লালন হতে যাচ্ছেন সেই ঈশ্বরের সেবাদাসী। আজ থেকে প্রায় সাত শতাব্দী আগের সুফি সাধক আমীর খসরুর উর্দু/হিন্দুস্থানি গানেও তিনি নিজেকে দেখেছেন নারী হিসেবে, তাঁর গুরুদেবতা আলাউদ্দিন আউলিয়ার প্রেমিকা হিসেবে। উপরিউক্ত পংক্তি গুলোতে আমরা দেখতে পাই, ঈশ্বরের সেবাদাসী হওয়ার কামনা সার্থক হচ্ছে না লালনের কপাল-গুনে। পূর্ব-নির্ধারিত (predestined) ধারণার বিশ্বাস প্রকাশিত হয়েছে।

পরবর্তী চারটি পংক্তিতে আমরা লালনকে আরও গভীরতর ভাবে বুঝতে পারি সত্তাতত্ত্ব (ontology) এর আলোকে।

"মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন

লুকালে না পাই অন্বেষণ,

কালারে হারায়ে তেমন

ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে"

বিদ্যুৎ মেঘেই লুকিয়ে থাকে। রৌদ্র করোজ্জল অথবা বৃষ্টিহীন সময়ে বিদ্যুৎ থাকে অপ্রকাশিত। তেমনি ব্রহ্মাণ্ডের অতীত (ট্রানসেন্ডেন্ট) এবং সসীম ঈশ্বর (কালা) লুকিয়ে আছেন। লালন সেই ঈশ্বরকে খুঁজে না পেয়ে যখন আয়নায় তাকান, তখন কিন্তু দেখতে পান হারানো ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। এর অর্থ হল লালনের দেহেই বাস করছেন ঈশ্বর। তারই প্রতিবিম্ব তিনি দেখছেন আরশিতে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উদ্ভূত তিনটে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঈশ্বর থেকে লালনের ঈশ্বর ভিন্নতর। এই ভিন্ন ধরনের মানুষের দেহভিত্তিক ঈশ্বরের ধারণা তাঁর অনেক গানেই প্রতিভাত হয়েছে। দুটো গান উদাহরণ হিসেবে দেয়া হল নিম্নে।

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি

কেমনে আসে যায়।

ধরতে পারলে মনবেড়ি

দিতাম পাখির পায়।।

আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা

মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।

তার উপরে সদর কোঠা

আয়নামহল তায়।।"

অথবা

"ডুবে দেখ দেখি মন কীরূপ লীলাময়।

আকাশ-পাতাল খুঁজিস যারে এই দেহে সে রয়।।"

আবার ফিরে যাওয়া যাক, "মিলন হবে কত দিনে" এর শেষের চারটি পংক্তিতে। যার ব্যাখ্যা করা যায় জ্ঞানতত্ত্ব (epistomology) এর আলোকে।

"যখন ও-রূপ স্মরণ হয়,

থাকে না লোক-লজ্জার ভয়-

লালন ফকির ভেবে বলে সদাই

ঐ প্রেম যে করে সে জানে।"

আগের পর্যালোচনা থেকে আমরা জেনেছি "মিলন হবে কত দিনে" গানের প্রথম পংক্তি গুলোতে ঈশ্বরকে হারিয়েছেন লালন, তারপর আয়নায় দেখেছেন নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব রূপে। উপরিউক্ত শেষের চারটি পংক্তিতে, স্মৃতির উৎস থেকে স্মরণ হচ্ছে পরমাত্মার রূপ। সেই রূপের সাথে প্রেমের অভিসারে অথবা মিলনে লোক-লজ্জার ভয় নেই। মনে হচ্ছে অনেকটা জৈবিক ভালবাসা। তা নাহলে লোক-লজ্জার প্রশ্নই আসে না।  জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে আমার মনে হয়, লালনের বোধে মিশে আছে পশ্চিম বিশ্বের অ-অভিজ্ঞতামূলক (non-emperical) এবং পূর্বত-সিদ্ধ জ্ঞান (apriori knowledge) আর ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের পূর্বত-সিদ্ধ পরাবিদ্যা অথবা মোক্ষ।

"মিলন হবে কত দিনে" গানে রয়েছে এক স্বতঃসিদ্ধ (axiomatic) ধারণা। ঈশ্বরের বাস প্রতিটি মানুষের দেহে। তাহলে এই স্বতঃসিদ্ধ থেকে বুঝতে সহজ হবে যুক্তিগত উপপাদ্য এবং যার প্রতিফলন ঘটেছে লালনের গীতিমালায়। যদি ঈশ্বর থাকে সকল মানুষের দেহে, তাহলে সবাইকে মর্যাদা করতে হবে। ধর্ম, জাত, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র, ইত্যাদি সব ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়ধ্বনিই হল স্বতঃসিদ্ধ (axiomatic) ধারণা থেকে অবরোহ (deductive) যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণিত উপপাদ্য। এখানে বলা যেতে পারে যে সামাজিক আন্দোলনে লালনের উপর নিদারুণ প্রভাব ছিল নদীয়ার শ্রী চৈতন্যের - তাঁর মতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।

লালনের অনেকগুলো গানে রয়েছে মানবতার জয়ধ্বনি। যার অন্যতম কয়েকটি নিম্নে দেয়া গেল।

"সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে ।।

লালন কয় জাতের কী রূপ

আমি দেখলাম না দুই নজরে।"

"লালন কয়, জাত হাতে পেলে

পুড়াতাম আগুন দিয়ে।"

"লালন বলে জাত কারে কয়

সে ভ্রম তো গেল না

জাত গেল জাত গেল বলে

একি আজব কারখানা।"

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আমরা দেখতে পাই লালনের প্রভাব - কিন্তু মৌলিকতায় ভিন্নতর।

"আমার       প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে

              তাই হেরি তায় সকল খানে॥

আছে সে    নয়নতারায় আলোকধারায়,    তাই না হারায়--

ওগো         তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়

              তাকাই আমি যে দিক-পানে॥

আমি          তার মুখের কথা শুনব ব'লে গেলাম কোথা,

              শোনা    হল না, হল না--

আজ         ফিরে এসে নিজের দেশে এই-যে শুনি

শুনি         তাহার বাণী আপন গানে॥"

লালন ও রবীন্দ্রনাথে ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ডের অতীত (ট্রানসেন্ডেন্ট) এবং অন্তর্বাসী পরিব্যাপ্ত (ইমানেন্ট)। উভয়ের দার্শনিক প্রতিপাদ্য নৈর্ব্যক্তিক সর্বেশ্বরবাদ (pantheism) ও সর্বজনীনতাবাদ (panentheism) থেকে আলাদা। কিন্তু রয়েছে হেগেলীয় (Hegel) সংশ্লেষণ (synthesis)।  ঈশ্বর বিষয়ে লালনের গানে যে ব্যাখ্যা রয়েছে সেটা অনেকটা মৌলিক। উপনিষদের ব্রহ্মসূত্র ভিত্তিক বৈষ্ণব ধর্মের বিবিধ ব্যাখ্যা যেমন শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত (non-dualistic) বেদান্ত, রামানুজের বিশিষ্টদ্বৈতা (qualified non-dualistic), মাধ্বাচার্যের দ্বৈতাবেদা (dualism) থেকে ভিন্নতর এবং মৌলিকতার কাঠামো রয়েছে লালনের দর্শনে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে

"মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন

লুকালে না পাই অন্বেষণ,

কালারে হারায়ে তেমন

ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে"

এই পঙক্তিগুলোতে রয়েছে মাধ্বাচার্যের দ্বৈতাবেদা (dualism)। কিন্তু এর আগের পংক্তি "ও তা হয় না কপাল-গুণে" তে প্রাধান্য পেয়েছে কর্মপ্রবাহের নিয়তিবাদ (determinism) - যেটা হল অদ্বৈতবাদের সাথে সম্পৃক্ত।

লালনের জন্মের এক শতাব্দী আগে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে শেফার্দী ইহুদি পরিবারে জন্ম হয়েছিল এক ক্ষণজীবী মহামানবের। তিনি হলেন বারুখ স্পিনোজা। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ইহুদি রাবাই ধর্মযাজকরা তাঁকে সমাজচ্যুত করেছিল অনাস্তিকতার অপরাধে। কথিত রয়েছে, লালনকে সমাজচ্যুত করেছিল তাঁর তৎকালীন হিন্দু সহধর্মীরা। কেননা ছিন্নমূল অসুস্থ লালন চিকিৎসা সেবা পেয়েছিল এক মুসলিম পরিবারে। বারুখ স্পিনোজার ঈশ্বর অন্বেষণ নতুনত্ব আভরণে পুনরুজ্জীবিত করেছিল সর্বেশ্বরবাদ (pantheism) যার কাঠামোতে ছিল নিয়তি। প্রায় এক শতাব্দী পরে লালন ব্যাবহার করেছিল নিয়তির অন্য নাম 'কপাল-গুনে'। স্পিনোজার সর্বেশ্বরবাদ অনুযায়ী ঈশ্বর ও প্রকৃতি এক এবং অভিন্ন। ঈশ্বর নৈর্ব্যক্তিক। মানুষের প্রার্থনার তিনি জবাব দেন না - অথবা গ্রহণ/বর্জন করেন না। পোপ, রাবাই, মুনি, অবতার অথবা নবীদের সুপারিশে বিশ্ব আইনের পরিবর্তন ঘটান না ঈশ্বর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জন্মলব্ধ তিনটে প্রধান ধর্ম যথা ইসলাম, খৃষ্ট অথবা ইহুদি ধর্মের ঈশ্বরের আরশ স্পীনোজার কাছে অবর্তমান।

লালন ও স্পিনোজার ঈশ্বরের অন্বেষণ ভিন্নতর। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হল অবরোহ (deductive) যুক্তির মাধ্যমে উভয়ের প্রমাণিত উপপাদ্য হল " লালন কয় জাতের কী রূপ

আমি দেখলাম না দুই নজরে।"

পদার্থবিজ্ঞানের মহামানব আইনস্টাইন, দর্শনের অবতার লুদউইগ উইটগেনস্টাইন, এবং জ্যোতি-পদার্থবিদ্যার পয়গম্বর স্টিফেন হকিং ছিলেন মোটামুটি স্পিনোজার ঈশ্বরের অনুরক্ত। লালন, রবীন্দ্রনাথ, স্পিনোজার ঈশ্বরের কাছে বর্তমান পৃথিবীর বর্ণবাদ, সংঘাত, যুদ্ধ অবাঞ্ছিত - উপপাদ্যের মাধ্যমে তার গাণিতিক প্রমাণ তুলে ধরবে ভবিষ্যতের এক মহামানব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক