এ পৃথিবী একবার পায় তারে

বিরল বাঙালি নিমাই চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে অন্তরঙ্গ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন করেছেন কবি একরাম আলি

একরাম আলিএকরাম আলি
Published : 15 Sept 2022, 11:30 AM
Updated : 15 Sept 2022, 11:30 AM

তিনি ছিলেন ভিতর-রসিক। একটি ছড়ায় লিখেছিলেন— ‘অবলা বসুর অনুমান /জগদীশেরও আছে প্রাণ।’ কিন্তু তাঁর ‘অবলা বসু’ অর্থাৎ জয়া চট্টোপাধ্যায় আগেই পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছেন। তাই জানা সম্ভব হয়নি,  ঠিক কবে থেকে তিনি নিষ্প্রাণ হয়ে তাঁর প্রিয় আরামকেদারায় শুয়ে ছিলেন। তিনি নিমাই চট্টোপাধ্যায়। বিরল জাতের এক বাঙালি, যাঁদের শেষ দেখা গেছে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। ১৮ জানুয়ারি লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিন রোডের এক্সচেঞ্জ ম্যানসনে তাঁর ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে আবিষ্কৃত হয় নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের মরদেহ। বয়স হয়েছিল ৮৩। ডাক্তাররা জানান, অন্তত তিন সপ্তাহ আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আবিষ্কার করেন রেচেল ডগলাস-নাম্নী এক মহিলা, যিনি নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের নিকটজনের বন্ধু। ফোনে টানা না-পেয়ে সেই বন্ধুটি খোঁজ নিতে অনুরোধ করেন কাছাকাছি-থাকা রেচেলকে। সেই খোঁজ-যে নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের মরদেহর পাশে এসে থামবে, ভাবা যায়নি।

চারিদিকে অসংখ্য বই, ফাইল আর তিনি। অর্থাৎ তাঁর মৃতদেহ। যাঁরা তাঁকে চিনতেন, ভরাট কণ্ঠস্বরের কাছাকাছি হয়েছিলেন, শুধু তাঁরাই জানতেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের মেধার উচ্চতা। কেননা, বি বি সি-তে দীর্ঘ দিন কাজ করেও বেশি কথা বলার বা নিজেকে প্রকাশ করার অভ্যেস তাঁর ছিল না। সংগ্রহে ছিল বহুমূল্য ছবি, দুষ্প্রাপ্য বহু নথি আর জিনিসপত্র। নিঃসন্তান এই মানুষটি ২০০৮-এ দান করে দেন লন্ডনের টেট মডার্ন গ্যালারিতে, যার মূল্য কম করে হলেও ৫ লক্ষ পাউন্ড। টেট গ্যালারিতে তাঁর সংগ্রহ-রক্ষার অংশটিতে লেখা আছে— ‘নিমাই চ্যাটার্জি’স কালেকশন’।

কিন্তু নিমাই চট্টোপাধ্যায় সম্বন্ধে এসব তথ্য কিছুই নয়। তিনিই ছিলেন একমাত্র বাঙালি, বিশশতকের মধ্যভাগের ইউরোপ-আমেরিকায় প্রায় সমস্ত মনীষীর সঙ্গে ছিল যাঁর চিঠিপত্রের সংযোগ।

সেই চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু কী?

১৯৫৪-তে নিমাইদা চলে যান বিলেতে। ১৯৬১-তে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী। তাঁর পরিকল্পনা ছিল— সেই সময় যদি এমন একটা সংকলনগ্রন্থ বের করা যায়, যাতে লিখবেন দুনিয়ার সেইসব কবি-লেখক-দার্শনিক-প্রাবন্ধিক, যাঁরা কখনো-না-কখনো রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে এসেছিলেন, কেমন হয় তাহলে!

একটি চিঠির খসড়া করেন, ইংরেজিতে। তারপর সেই চিঠি পাঠাতে শুরু করেন ইতালিতে রাশিয়ায় জার্মানিতে ফ্রান্সে স্পেনে— সর্বত্র। এবং দুই আমেরিকায়।

আশ্চর্যের যে, প্রায় সবাই সেই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের বয়স কিন্তু তখনো তিরিশ হয়নি!

কী এমন জাদুশক্তি ছিল সেই তরুণের চিঠির, যেটিকে হাইদেগার বা বারট্রান্ড রাসেলের মতো গেরেম্ভারি চালের মানুষও অবহেলা করতে পারেননি? নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সেই চিঠির হদিস আজো মেলেনি। তবে, শঙ্খ ঘোষ, যে-বন্ধুর ওপর শেষের কয়েক বছর তিনি বেশি নির্ভরশীল ছিলেন, জানতে চাইলে বলেছিলেন— কোথায় যেন একবার ছাপা হয়েছিল সেটা!

আর কোনো বিখ্যাতজনের নাম মনে পড়ছে কি? যাঁরই পড়ুক, তাঁরই সঙ্গে ছিল নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের চিঠিপত্রের সম্পর্ক। যেমন এজরা পাউন্ড, যেমন হেনরি মিলার। হেনরি মিলারের একটি চিঠির বক্তব্য এরকম— ‘এখনকার পৃথিবী রবীন্দ্রনাথের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের পৃথিবী রবীন্দ্রনাথকে আরো গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।’ বরিস পাস্তেরনাক রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। নিমাই চট্টোপাধ্যায় জানতে চান, ওই লেখাগুলোই কেন তাঁর অনুবাদের লক্ষ্য হয়ে উঠল? সদ্য নোবেলজয়ী গৃহবন্দী পাস্তেরনাকের উত্তর ছিল— ‘আমি কিছুই নির্বাচন করিনি। বস্তুত কবিতাগুলো আমাকে অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছিল শাস্তি হিসেবে।’ তাঁর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে নেহরু একটু উদ্‌যোগ নিতে কি পারেন? জানতে চেয়েছিলেন পাস্তেরনাক। নিমাই চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, নেহরুকে বলবার মতো জায়গায় তিনি নেই। তবে একজনকে বলতে পারেন। বলেওছিলেন নেহরুর শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবীরকে। কবীর নেহরুকে সেই কথা জানানোর পর পাস্তেরনাকের মুক্তির জন্যে বিশ্বজনমত তৈরি করতে নেহরু সচেষ্ট হন। এমন সব রত্নভাণ্ডার নিমাই চট্টোপাধ্যায় জমিয়ে রেখেছিলেন বিশশতকের সেই ষাটের দশক থেকে। মাঝে-মাঝেই সে-সব চিঠি প্রকাশের প্রসঙ্গটি উঠত বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তায়। তাঁর ইচ্ছে ছিল, চিঠিগুলোর সঙ্গে থাকবে আনুষঙ্গিক তথ্য, টীকা। সেই কাজটা আর করে উঠতে পারলেন না। হয়তো ইচ্ছেই ছিল না প্রকাশের। একটা-না-একটা ছুতোয় পিছিয়ে যেতেন আর যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখতেন প্রায় হাজার আড়াই চিঠি। এহেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের দাহকর্ম আটকে গিয়েছিল অর্থাভাবে। একা-একা থাকতেন। ১০/২০ মিনিটের দূরত্বে থাকা বাঙালি প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন অজ্ঞাতনামা কেউ। ফলে সৎকারের টাকা জোগাড় হচ্ছিল কলকাতায়। তার আর দরকার হয়নি অবশ্য। লন্ডনেই জোগাড় হয় টাকার। কিন্তু, তত দিন পর্যন্ত নিমাই চট্টোপাধ্যায় নামের দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণ, আত্মমগ্ন এবং সুরসিক মানুষটির শবদেহ শায়িত ছিল লন্ডনে, তাঁর বাড়ির কাছাকাছি এক হাসপাতালের মর্গে।

দুই

নিমাই চট্টোপাধ্যাইয়ের মৃত্যুসংবাদ আজকাল-এ বেরিয়েছিল ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১। দ্য গার্ডিয়ান (৩ এপ্রিল ২০১১) জানিয়েছিল— ২০১০-এর ২৫ ডিসেম্বর নাগাদ (around 25 December) তিনি মারা যান। পরে খবর আসে, পুলিশ এসে পোস্টমর্টেম করার পর জানিয়েছিল, অন্তত তিন সপ্তাহ আগেই নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ ঘটেছে। ইজিচেয়ারে শায়িত তাঁর নিথর বুকের ওপর ছিল একটি বই, খোলা। যদিও কী বই, জানা যায়নি। পুলিশরা পুলিশই!

আনুমানিক ১৯৩০-এ জন্ম এই মানুষটি স্ত্রীবিয়োগের পর শঙ্খবাবুর কাছে একবার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন কিছু টাকা দান করার। কোথায় দেওয়া যায়? শঙ্খবাবু বলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কথা, যে প্রতিষ্ঠানটি চিরকাল অর্থসঙ্কটে ভুগছিল।

একটু লজ্জায় পড়েন নিমাই চট্টোপাধ্যায়। একদা বাবা বসন্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বই সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত হলেও তিনি-যে কোনো দিন যাননি সেখানে!

অবশেষে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গেই যান প্রাচীন ওই প্রতিষ্ঠানে। সঙ্গে যে-চেকটি ছিল, তার মুল্য তখনো জানতেন না শঙ্খবাবু। সাহিত্য পরিষদে গিয়ে বের হয় চেকটি। বেশি নয়, কুড়ি লক্ষ টাকা। শর্ত, ওই টাকায় তাঁর স্ত্রীর নামে লাইব্রেরির একটা অংশ সাজানো হোক। সাহিত্য পরিষৎ চেকটি সেদিন নেননি। পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হলে নেবেন— এমন কথা হয়।

এরই মধ্যে নিমাইদার ডাক পান শঙ্খবাবু। কী ব্যাপার? একটা উইল করতে চান তিনি। সমস্ত টাকাপয়সা দিয়ে যেতে চান সাহিত্য পরিষৎকে। একটা ট্রাস্ট সে-সব দেখাশোনা করবে। বন্ধু শঙ্খকেই সেই উদ্যোগ নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত দুটি ট্রাস্ট হয়। একটি এ দেশের জন্য, বিলেতের জন্য আর-একটি।

নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর যেদিন পরিষদের সচিব ব্যাঙ্কে যান চেকটি আনতে, চমকে ওঠেন। ব্যাঙ্কের লোকদের বলেন— কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?

--কেন, কীসের ভুল?

--শূন্য বেশি পড়ে যায়নি তো?

--না, ঠিকই আছে।

উত্তর শুনেও হতভম্ব-ভাবটি যায় না পরিষৎ-সচিবের। যাবে কী করে? তাঁর হাতে যে-চেকটি তখনও ধরা, তাতে অতিকায় একটি অঙ্ক লেখা-- সাড়ে পাঁচ কোটি! লন্ডন থেকে আসে আরও পঞ্চাশ লাখের মতো।

এই হচ্ছেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়। সাদাসিধে। কম কথার মানুষ। এবং, তাঁকে বাসে-ট্রামে ঘুরতেই দেখা গেছে।

কিন্তু সেই চিঠিগুলোর কী হল? সেগুলো-যে আরও মূল্যবান! বাজারে একটাও বেরিয়ে গেলে, যদি যায়, ক্রিস্টির বা সদবির হাতে পড়লে, কত-যে দাম, কল্পনাও করা যায় না! বহু চেষ্টার পর চিঠিগুলোর প্রায়-অর্ধেক বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের হাতে এসেছে। বাকি অর্ধেক লন্ডনের টেট গ্যালারি থেকে আসার অপেক্ষা। তারপর ইংরেজি, জার্মান, রুশ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ভাষার সেই সব চিঠির পাঠোদ্ধার, তরজমা, টীকা— সেসব অনেক-অনেক দিনের কাজ। যদি হয়, সেটিই হবে পৃথিবীর আশ্চর্য এক বই, যা আগে কোনোদিন হয়নি। একজন মনীষী সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক দুনিয়ার সেরা সব মনীষীর লেখার সংকলন। নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের অবর্তমানে আমাদের অপেক্ষা একটু দীর্ঘ হবে হয়তো। কখনো হতাশায় ভুগব আমরা। তবু অপেক্ষা তো করতেই হবে।

তিন

এ হেন নিমাই চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম কোথায় দেখি আমি? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, আমার গ্রামের বাড়িতে। বীরভূমে।

১৯৮৮ সাল। কলকাতা ছেড়ে তখন আমি সেখানে। শুনলাম, বিবিসি-র নিমাই চট্টোপাধ্যায় আসবেন আমার বাড়ি। কেন? পরিষ্কার জানা গেল না।

ছ-ফুট লম্বা (ছ-ফুট বললে বাঙালির দৈর্ঘের শেষ সীমা বোঝায়, তাই এমনটা লিখলাম! বেশিও হতে পারে।), ফর্সা, মাথায় পাতলা বাদামি চুল, কালো হাওয়াই শার্ট, ক্রিমরঙা প্যান্টের এক অতিমানব কাঁধে কালো ভারী ব্যাগ নিয়ে ওই গণ্ডগ্রামে যখন আবির্ভূত হলেন, আশপাশে লোক জড়ো হয়ে গেছে। কোথায় তাঁকে বসাই, কী ভাবে আপ্যায়ন করি, বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা আমার।

তিনি অকারণ ব্যস্ত হতে নিষেধ করলেন। আমার প্রথম বইটি (অতিজীবিত) তাঁর সঙ্গেই আছে। জনপদ পত্রিকায় সদ্য প্রকাশিত একগুচ্ছ লেখা (যেগুলো পরে ঘনকৃষ্ণ আলো-য় জায়গা পেয়েছিল), সেসবও তাঁর সঙ্গে। নতুন লেখাপত্র নিয়ে এখনই বেরোতে হবে। দশ কিলোমিটার দূরে সিউড়িতে, সার্কিট হাউসে, ঘর নেওয়া আছে। সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা।

কলকাতা থেকে প্রায় দেড়শো কিমি দূরে, ভায়া শান্তিনিকেতন, তিনি এসেছেন এই গাঁয়ে, আমার মতো অখ্যাত এক তরুণের কবিতা রেকর্ড করতে! না, শুধু কবিতাপাঠই নয়, কবিতাভাবনাও তিনি জেনে নিতে চান। আর তাই, একটি সাক্ষাৎকারও নেবেন তিনি।

গেলাম তাঁর সঙ্গে। পরিবেশ সহজ করার জন্যে তখন তিনি বলছেন, বীরভূমেই তাঁদের আদি বাড়ি। মল্লারপুরে। তাঁর ঠাকুরদার বাবা ছিলেন জয়পুরের মহারাজার দেওয়ান। সেই থেকে তাঁদের পরিবার রাজস্থানে।

--পৈত্রিক বাড়িতে গেছেন কখনো?

--না।

সার্কিট হাউসে এক ঘরে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর পরই সেই অতিমানবটি হয়ে গেলেন— নিমাইদা!

তার পর কত কথা। আড্ডা বলতে বাধো-বাধো ঠেকছে। যদিও সেদিন আমরা আড্ডাই দিচ্ছিলাম। এবং সেসবের সবটুকু কৃতিত্ব নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের। এক অচেনা, তরুণ, কবিতালেখককে সাবলীল ছন্দে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। কেননা, সাক্ষাৎকার তখনও বাকি। অনুষ্ঠানটি ছিল পনেরো মিনিটের। এবং আমার প্রশ্নের উত্তরে শুধু এটুকুই বলেছিলেন— তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় মেট্রোপলিটন শহরের বাইরেও-যে নতুন ধরনের লেখালেখি হচ্ছে, তার একটা চেহারা তুলে ধরাই এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় কাজটা করছেন তিনিই।

পরে, কলকাতায় এলে কখনো ডেকেছেন। সঙ্গে সঙ্গে গেছিও। প্রলোভন একটাই ছিল— দীর্ঘদেহী ওই মানুষটার অতল এবং প্রশান্ত গভীরতাকে একটু ছোঁয়া।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক