১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

কবি নূরুল হকের ছাত্রজীবনে লেখা কবিতা

নুরুল হকের মতো বিশ্বজগতের কবিরা রক্তদানায় প্রবাহিত কথাকেই লিখতে থাকেন। শুধু কবিত্বের বিকিরণে তিনি সীমায়িত নন; বলার সহজতায় এবং অভিজ্ঞতার অপূর্বতায় তাঁর কবিতা জীবনের ছায়াতল।

চরু হক চরু হক

Published : 19 Oct 2026, 10:59 PM

Updated : 19 Oct 2026, 10:59 PM

কবি নূরুল হক সমকালীন বাংলা কবিতার একজন (২৫.১১.১৯৪৪-২২.০৭.২০২১) উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি ষাটের দশকের। কবিতায় জীবনকেই প্রধান করে দেখেন তিনি। যাপিত জীবনের আঘাত, অর্জন ও প্রজ্ঞানগুলোই ছড়িয়ে পড়ে কবির রক্তদানায়।

সময় এবং সমাজ থেকে কবি কোনভাবেই ফসকে যেতে পারেন না। হোক রাজনৈতিক, হোক অরাজনৈতিক প্রত্যেকটা বিষয়কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কবিতায় নামাতে হয়। নূরুল হকের কবিতা তাই সময় ও যাপিত জীবনের অভিজ্ঞান।

একটা পরম দরদী ভাষায় জীবনের সৌন্দর্য ও অতলতাকেই স্পর্শ করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের মতে কবি দুই ধরনের, বিশ্বজগতের কবি এবং সাহিত্যজগতের কবি। বিশ্বজগতের কবিরা জগতের মূল প্রস্রবণ থেকে কবিতার সারবস্তু তুলে আনেন। আর সাহিত্যজগতের কবিরা কেবল রচনার কলাকৌশল ও আঙ্গিকের সমৃদ্ধি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। ভাষা ও শব্দসুষমা, সাহিত্যতত্ত্বেই এঁদের মন ও প্রকৃতি। অন্যদিকে নুরুল হকের মতো বিশ্বজগতের কবিরা রক্তদানায় প্রবাহিত কথাকেই লিখতে থাকেন। শুধু কবিত্বের বিকিরণে তিনি সীমায়িত নন; বলার সহজতায় এবং অভিজ্ঞতার অপূর্বতায় তাঁর কবিতা জীবনের ছায়াতল।

জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৪৪। প্রয়াণ ২২ জুলাই ২০২১। নাগরিকত্ব বাংলাদেশী। পৃথিবীর পাঠশালায় স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৯। মাতৃশিক্ষায়তন আশুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, নেত্রকোনা নাসিরাবাদ কলেজ, ময়মনসিংহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা সরকারি কলেজে শিক্ষকতা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন। দাম্পত্য সঙ্গী ফেরদৌসি সুলতানা রূপু। সন্তান চরু হক, সাব্বিরুল হক ও রাইন হক। কর্তব্যযাপন মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দেওয়া, ১৯৭১, কোম্পানি কমান্ডার, যুদ্ধসেক্টর ১১।

অঞ্জলিশোভন খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার ১৪১৯।

অনুমান করা হয় এই কবিতামালা তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন জীবনের শুরুর দিকে রচিত।

ভূমিকা ও সম্পাদনা: চরু হক

পথলিপি

এইভাবে নম্র হও,

দেখ,

কি করে যে মরমী দুনিয়া

হঠাৎ করেই ওই

অভাবিত

চলে আসে,

দরোজায়,

টোকা দেয়

বলে,

'এসো, এসো, চলে

এসো

রমনার মাঠে। '

কিন্তু গেলে শুধু

খোলা হাওয়া

আর কিছু নয়

খোলা হাওয়া জীবনের জল নিয়ে শত দিকে

চলে যায়।

সুন্দরের প্রথম ঘন্টা বাজে

হৃদাকাশে,

যেতে হবে জানি

বহু পল্লবের সাথে

বহু পাখি সঙ্গে নিয়ে

মঞ্জরিত হয়ে

হায়, বাসা বাঁধবে তাই

নিয়ে যাচ্ছে এক টুকরো খড়

জীবনের জল নিয়ে

শত দিকে চলে যায়

সুন্দরের প্রথম ঘন্টা বাজে

হৃদাকাশে

সোনার পৃথিবী কোনো

তৈরি হতে হবে

তাই যেতে হবে

জীবিত পুরুষ থেকে

আগামী পুরুষে

পিঁপড়ে সারির মতো

আরো সন্ধ্যা ঢেলে দিতে

হবে

হৃদয় পাবনে।

সুন্দরের সুতো

কে ফেলে রেখে গেছে?

এই খানে?

তাই দিয়ে বাঁধতে হবে

কারে?

*

জতুগৃহ

ওই ডাকছে অতিথিরা

ভোরের সদস্য আর

শ্রোতৃমন্ডলীর অংশ যারা

জতুগৃহ দেখে

অবিভক্ত বিপুল বিনাশে ডুবে জেনেছে এখানে

বড় কোন অধিকার আছে

তাই আনন্দ পাখির ডাক

আর মানুষের অশ্রুজল

এক হয়ে গেছে

কত যে দোলনার আলো

ধরাশায়ী

হয়ে গেছে

যে আঘাত ফেরানো যায় না

কোনো ছলে

মর্মমূলে গিঁথে রয়

দিব্য অন্ধকারে

কোনো সন্ধ্যা খোঁজ পায় নাই

পরিচয় হয় নাই কারো সঙ্গে কারো আর যেনো

এই সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে আজ

শুধু অবিন্যস্ত হয়ে আছে

সবকিছু

কোনো বক্ষ স্তব্ধতা নিঃশেষ

করে নাই

শুধু স্বস্থিহীন

প্রতীক্ষায়

পুড়ে গেছে সব

অন্তরালে

ছাই হয়ে গেছে

আদিগন্ত

এখানে বিশাল কোনো

অবিচার আছে

প্রকৃতির অভিমান আছে

কেন্দ্রস্থলে

তাই ধ্বসে পড়ে

সবকিছু

অযৌক্তিক

অবিশ্বাস্যভাবে।

*

বাঁশি

ভরতে হবে এই পাত্র

হৃদয়ের নীচ থেকে

এসে,

সকল বিলাপ জানি

কাঁটার মতোই একদিন ফুল

হয়ে যাবে,

তিয়াসে তিয়াসে সব

জমে উঠবে

পথের খিল খিল হাসি

ধানক্ষেতে

ঢেউয়ের মাচায়,

পরিত্রাতা যেন।

*

মেয়েটি

স্বপ্ন ঝরে পড়ছে

তার বাহু থেকে

গাল থেকে

তার গ্রীবা থেকে

যেন স্বপ্নেরই তৈরি একটি

মূর্তি হয়ে আছে

সে।

আহা।

*

নীলাচলের রূপরেখা

আবার ডাকছে

ওই

শৈলমালা,

আড়ালের দিকে।

হৃদয়ে পাষাণ ভেঙে

জলস্রোত

নেমে আসে নীচে।

ওইখানে

ওই

সুন্দর আলোয়

স্নান করার যোগ্য হবে কে?

*

সম্পাদ্য

আত্মার মুক্তির অগ্রভাগে

মানুষের অবশ্যই মেনে নিতে হবে গতিরেখা

হৃদয়ের গানে

জেগে উঠতে হবে পথে

নিশান উড়িয়ে

কলস্বরে ঐকতান ধরে।

*

ইতিকাহিনি

নাম ধরে ধরে ডাক আসে

তাই পাতা উড়ে যায়

দলে দলে

চৈত্রের জীবনে

পাখির পালকে।

মানুষের ক্ষমা শক্তি বেড়ে গেলে পরে

স্ফটিক নয়নে

একদিন জেনে নেবে

জীবনের পরাভব

সুগভীর অন্ধকার থেকে

উঠে আসছে

এখানে ওখানে।

এবং গোপনে

মরা পথে হাঁটি আমি একা একা।

*