গল্পের চরিত্রে হেমিংওয়ের প্রথম নারীরা

ফারুক মঈনউদ্দীনফারুক মঈনউদ্দীন
Published : 3 August 2022, 03:23 PM
Updated : 3 August 2022, 07:03 PM

দশ বছরের বন্ধ্যা সময় পার করে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ উপন্যাসটি। ফর হুম দ্য বেল টোলস পড়ার দীর্ঘ ব্যবধানের পর তাঁর পাঠকগোষ্ঠী এবারের দুর্বল উপন্যাসটি আগের উষ্ণতায় গ্রহণ করেনি। নতুন এই উপন্যাসে তিনি তাঁর কন্যাসম আদ্রিয়ানা ইভানচিচকে যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে আদ্রিয়ানা এবং তাঁর মায়ের পক্ষে ইতালিতে পরিচিতদের কাছে মুখ দেখানো কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। পঞ্চাশোর্ধ হেমিংওয়ে শেষবারের মতো প্রেমে পড়েছিলেন তাঁর চেয়ে ৩১ বছরের কনিষ্ঠ আদ্রিয়ানার। আমরা জানতাম, তাঁর প্রথম প্রেম ছিল ইতালির মিলানে আমেরিকান রেডক্রস হাসপাতালের নার্স অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে। কিন্তু তারও আগে, হেমিংওয়ের বয়স যখন ষোল বছর, তখন মিশিগানের পেটোস্কিতে চৌদ্দ বছরের কিশোরী লুসি মার্জোরি বাম্পের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল তাঁর। গ্রীষ্মের ছুটিতে মামা প্রফেসর আর্নেস্ট এল ওহলের হর্টন বে-র বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন মার্জোরি। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওহলের একটা সামার কটেজ ছিল সেখানে। গালে টোল পড়া লাল চুল আর সবুজ চোখের ছোটখাটো মেয়েটিকে স্বভাবতই ভালো লেগে গিয়েছিল সদ্যযুবা হেমিংওয়ের। সেই ভালো লাগা একসময় ভালোবাসায় পৌঁছে গিয়েছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। আর মার্জোরির কাছে দীর্ঘদেহী সুপুরুষ ছেলেটিকে ভালো না লাগার কোনো কারণ ছিল না।

তাঁদের মধ্যকার সেই সম্পর্ক কৈশোর পেরিয়ে যৌবন অবধি পৌঁছে গিয়েছিল। ততদিনে যুদ্ধাহত হেমিংওয়ে ফেরত এসেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে, পেয়েছেন বীরত্বের জন্য খেতাব। হর্টন বে এলাকার তরুণীদের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক স্বপ্নপুরুষ। এসময় অ্যাগনেসের সঙ্গে তাঁর একবছরেরও কম সময়ের প্রেম ভেঙে যায়। প্রথম পরিচয়ের পর থেকে হেমিংওয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতিনির্ভর নানান বিষয় উঠে এসেছে মার্জোরি বাম্পের জবানীতে লেখা তাঁর মেয়ে জর্জিনা মেইনের ২০১১ সালে প্রকাশিত পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ইন সামথিং ফ্রম মার্জ বইতে। বইটিতে চিঠিপত্র, ছবি এবং বাক্যালাপের সূত্রে জানা যায় হেমিংওয়ের জীবনের নানান অজানা তথ্য। এই মার্জোরিকেই অবিকল তুলে এনেছেন হেমিংওয়ে তাঁর `দ্য এন্ড অভ সামথিং' গল্পে। ‘দ্য থ্রি-ডে ব্লো’ গল্পে আবারও উপস্থাপন করেছেন মার্জোরিকে এবং হীনভাবে তুলে এনেছেন তাঁর মাকে। অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ উপন্যাসের জন্য আদ্রিয়ানা ও তাঁর পরিবারকে যেমন ইতালিতে পরিচিত মহলের কাছে বিপাকে পড়তে হয়েছিল, এই গল্পদুটোর জন্যও মার্জোরিকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির। পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ... বইতে মার্জোরি বলেন, ‘আমি সবসময় ভাবি, হেমিংওয়ে কেন আমাকে আর আমার মাকে ছোট করতে চেয়েছেন তাঁর দ্য নিক অ্যাডাম স্টোরিজ-এর ‘দ্য এন্ড অভ সামথিং’ এবং ‘দ্য থ্রি-ডে ব্লো’ গল্পে।... যখন বুঝতে পারি যে অনুমতি ছাড়াই আমার সত্যিকার নাম মার্জ ব্যবহার করেছেন তিনি, সেটা ছিল আমার জন্য এক মানসিক আঘাত। আমার দীর্ঘ জীবনের পুরোটা জুড়ে এক গভীর ক্ষত রয়ে গেছে, কারণ, আমার সত্যিকার নাম দিয়ে অসত্যভাবে আমাকে চিত্রিত করেছেন আর্নেস্ট।’ নতুন বন্ধুদের মার্জোরি কখনোই বলতে পারেননি যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল তাঁর। পেটোস্কির মতো খুবই ছোট শহরে সবাই ছিলেন পরস্পরের পরিচিত, গল্পে এভাবে চিত্রিত হওয়ার কারণে আর কখনোই পেটোস্কিতে যেতে পারেননি মার্জোরি।

কী আছে ‘দ্য এন্ড অভ সামথিং’ গল্পটিতে?

হর্টন বে শহরটি একসময় ছিল কাঠচেরাইয়ের জমজমাট কেন্দ্র। এখন সেই স্বর্ণযুগ আর নেই, প্রায় পরিত্যক্ত একটা শহরে পরিণত হয়েছে জায়গাটা। দশ বছর পরে এসে নিক অ্যাডামস জায়গাটাকে যেন চিনতেই পারে না। নিক আর মার্জোরি নৌকা বেয়ে এসেছে লেকে মাছ ধরে পিকনিক করতে। নিকের সঙ্গে মাছ ধরতে ভালোবাসে মার্জোরি, মাছ ধরার কৌশলও ওকে শিখিয়েছে নিক। ধরে আনা পার্চ মাছ কেটে বড়শির টোপ তৈরি করে ওরা। তারপর বড়শি ফেলে কম্বল বিছিয়ে বসে লেকের পাড়ে। সঙ্গে করে আনা খাবার বের করে প্রথমে নিককে দেয় মার্জোরি। নিকের খেতে ইচ্ছে করছিল না। সহজাত নারীসুলভ স্বভাবে মার্জোরি খাওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করলে রাজি হয় নিক। খেতে থাকে ওরা, কেউ কোনো কথা বলে না, পরস্পরকে স্পর্শ করে না কেউ। নিককে গম্ভীর অন্যমনস্ক দেখে মার্জোরি জানতে চায়, কী হয়েছে ওর। নিক বলে, ও জানে না কী হয়েছে।

হ্রদ পেরিয়ে আকাশের গায়ে পাহাড়ের শরীর স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে দেখে একসময় নিক বলে, চাঁদ উঠবে। মার্জোরি খুশি হয়ে বলে, আমি জানি। নিক একটু বিরক্ত গলায় বলে, তুমিতো সবই জানো। মার্জোরি তার পরও জানতে চায় কী হয়েছে ওর। নিক বলে, আমার কিছু করার নেই, তুমি যেন সবকিছু জানো। মার্জোরি পিড়াপিড়ি করতে থাকলে নিক জানায়, ওর আর ভালো লাগছে না এসব। মার্জোরি চুপ করে থাকে। নিক বলে ওর ভেতরের সবকিছু বরবাদ হয়ে গেছে। মার্জোরি জানতে চায়, ভালোবাসায় আর মজা নেই? নিক বলে, নেই। একথার পর কিছু না বলে নৌকাটা নিয়ে চলে যায় মার্জোরি।

মার্জোরি চলে যাওয়ার পর নিকের বন্ধু বিল আসে। ও জানতে চায়, মার্জোরি ঠিকভাবে গেছে কি না, কিংবা কোনো ঝামেলা হয়েছে কি না। নিক জানায়, কোনো ঝামেলা হয়নি।

বিলের সঙ্গে এই কথোপকথনে বোঝা যায়, মার্জোরিকে নিকের বলা কথাগুলো এবং ওর চলে যাওয়াটা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত, আর সেটা ঘটেছে বিলেরই প্ররোচনায়।

‘দ্য থ্রি-ডে ব্লো’ গল্পটাতেও ছিল মার্জোরি এবং ছিল ওর মায়ের প্রতি চরম বিষোদগার। এই গল্পটিতেও নিক নামের আড়ালে থাকেন হেমিংওয়ে, কিন্তু মার্জ নামটি ব্যবহার করেছেন কোনো ছদ্মনাম না দিয়ে।

এক বৃষ্টির দিনে নিক আর বিল দুই বন্ধু বনভূমির ভেতর নিকদের কটেজে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। নিকের ডাক্তার পিতা শিকারে বের হয়েছেন। দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নেয়, ওরা আজ মাতাল হবে। নিকের বাবার সেলার থেকে আইরিশ হুইস্কির আধখাওয়া বোতল নিয়ে বসে ওরা। সেটা শেষ হলে নিক নিয়ে আসে স্কচের বোতল। তাদের দীর্ঘ আড্ডার একপর্যায়ে বিল নিককে বলে যে মার্জের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে ভালো কাজ করেছে ও। নিক হালকাভাবে সায় দেয়। বিল বলে, নিক যদি ওকে বিয়ে করত, সারাক্ষণ ওদের সঙ্গে সেঁটে থাকতে হতো ওকে, প্রতি রোববার ডিনার খেতে হতো ওদের বাড়িতে। বিল বলে, ‘একবার ভাবো ওর মা, আর তিনি যাঁকে বিয়ে করেছেন সেই লোকটার কথা।’ তারপর বলে, খুব ভালোভাবেই বের হয়ে এসেছে নিক, এখন মার্জোরি ওর মতো কাউকে বিয়ে করে সুখী হোক। সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়া কঠিন একটা কাজ, তবে নিক নিশ্চয়ই শিগগিরই অন্য কারো প্রেমে পড়বে।

বিলের এসব কথার মাঝেও নিকের ভেতর হারানোর একটা বোধ জেগে ওঠে। মার্জোরির সঙ্গে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। ও বলে, ‘হঠাৎ করে সবকিছুই যেন শেষ হয়ে গেল।... তিনদিনের হাওয়া গাছের সব পাতা যেমন ঝরিয়ে দিয়ে যায়, ঠিক তেমনই।’ বিয়ের পর ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল ওদের। এখন সব শেষ।

বিল ওকে সান্তনা দিয়ে বলেছিল যে মার্জোরির সঙ্গে ওর সম্পর্কটা চলার সময় চিন্তিত ছিল ও। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিকভাবেই সামাল দিয়েছে নিক। মার্জোরির মা একটা বিরক্তিকর মহিলা। নিক বলে, ‘ওর জন্য খুব খারাপ লাগছে আমার, কিন্তু কী করতে পারতাম আমি। জানোতো ওর মা-টা কেমন।’ বিল বলে, ‘জঘন্য মহিলা।’ সে জানায়, তিনি লোকজনকে বলে বেড়াচ্ছিলেন যে ওদের মধ্যে বাগদান হয়ে গেছে।

একসময় ওরা যখন ঝড়ের মধ্যে শিকারে বের হয়, নিক ততক্ষণে মার্জোরির ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে একধরনের স্বস্তিবোধ করে ।

‘দ্য এন্ড অভ সামথিং’ গল্পে মার্জোরির সঙ্গে নিকের ছাড়াছাড়ির বিষয়টাই ছিল প্রধান, কিন্তু ‘দ্য থ্রি-ডে ব্লো’তে মার্জোরিকে নয় ববং তাঁর মাকে সত্যিকার অর্থে খুব হেয় করে দেখানো হয়েছে। নিকের ভেতর ছিল মার্জোরির জন্য একধরনের দুঃখবোধ ও বিরহের ভাব। পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ... বইতে গল্পের নিকের ভেতরের এই অনুশোচনা বোঝা যায় মার্জোরির কাছে লেখা হেমিংওয়ের চিঠির ভাষ্য থেকে, ‘সবকিছু বোঝা গেলে অনেককিছুকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।’ অথচ মার্জোরির মায়ের ওপরে ছিল হেমিংওয়ের চরম বীতশ্রদ্ধা, যা এই গল্পে তুলে এনেছেন তিনি। বইটিতে মার্জোরি বলেছেন, ‘বুঝতে চেষ্টা করেছি যাতে ক্ষমা করে দিতে পারি ওকে, কিন্তু সত্যিই আর্নেস্টকে কখনোই ক্ষমা করিনি আমার সম্পর্কে এই দুটো গল্পের জন্য, যেখানে আমার মাকে দজ্জাল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।’

মার্জোরির মায়ের প্রতি হেমিংওয়ের বিরূপ মনোভাবের একটা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় বইটিতে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে যেভাবে দেখি, গল্পের এই মার্জ নিশ্চিতভাবে সত্যিকারের আমি নই। আমরা বিয়ের কোনো পরিকল্পনা করছিলাম না। আমাদের বিচ্ছেদের পেছনে আমার ‘বদমেজাজী’ মায়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। আসলে, ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। হেমিংওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় আমার মা বরং খুশিই হয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে আমি তাঁর তুলনায় যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলাম না।’

নিশ্চিতভাবে গল্পদুটো হেমিংওয়ের আত্মজীবনীমূলক রচনা। নিক অ্যাডামস বরাবরই হেমিংওয়েরই ছদ্মনাম, এই সিরিজের গল্পগুলোর সবকটিই কমবেশি আত্মজীবনীমূলক। নিক লেখালেখিতে হাত পাকিয়ে একজন বড় লেখক হতে চায়, ওর বাবা একজন চিকিৎসক, হেমিংওয়ের বাবাও তা-ই। বাস্তবজীবনে হেমিংওয়ের স্বপ্ন ছিল নববিবাহিতা স্ত্রী হ্যাডলিকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য ইতালি যাবেন তাঁরা, নিকেরও ছিল একই পরিকল্পনা। দুটো গল্পের পটভূমিও হর্টন বে, যেখানে ছিল হেমিংওয়ে পরিবারের সামার কটেজ। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল দুজনের। লুসি মার্জোরি বাম্পের ডাকনাম ছিল মার্জ। এই নামটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে দুটো গল্পেই।

কনস্ট্যান্স চ্যাপেল মন্টগোমারির বই হেমিংওয়ে ইন মিশিগান (১৯৬৬) সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধ থেকে ফেরার পর (১৯১৯) হেমিংওয়ে পেটোস্কিতে এসে এক বোর্ডিং হাউসে থেকেছিলেন কিছুদিন। সেই বাড়ির মালিকের মেয়ে স্মরণ করতে পারেন, মার্জোরিই ছিলেন একমাত্র মেয়ে যাঁর সঙ্গে হেমিংওয়ে ঘুরে বেড়াতেন, বাকি সময়গুলোতে একটা নির্জন ঘরে বসে সারাক্ষণ টাইপরাইটারে লিখতেন। এলাকার অন্য বাসিন্দাদের মতে মার্জকে সবসময় পাহারার মধ্যে রাখা হতো,তবে হেমিংওয়ে ওর ব্যাপারে প্রায় দিওয়ানা ছিলেন। পেটোস্কি হাইস্কুলের শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে মার্জোরির অপেক্ষায় ওর স্কুলের আশপাশে ঘুরঘুর করতেন হেমিংওয়ে। কনস্ট্যান্সের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, মার্জোরি ও বিল দুজনই হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবে বিল চাইতেন না হেমিংওয়ে এই মেয়েকে বিয়ে করুক, ঠিক এই বিষয়টিই ‘দ্য এন্ড অভ সামথিং’ এবং ‘দ্য থ্রি ডে ব্লো’ গল্পের মূল বিষয়। দুটো গল্পই হেমিংওয়ে লেখেন ১৯২৪ সালে, যা ইন আওয়ার টাইম-এর ১৯২৫ সালের সংস্করণে গ্রন্থভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়। বইটির গল্পগুলো পড়ার পর তাঁর বাবা-মা এমনই আঘাত পেয়েছিলেন যে তাঁদের অর্ডার দিয়ে আনানো কপিগুলো প্রকাশকের কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। এটা জানতে পেরে হেমিংওয়ে তাঁর বাবার কাছে লেখেন, ‘লক্ষ করবেন আমার সব গল্পে প্রকৃত জীবনের অনুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছি আমি-- জীবনকে বর্ণনা কিংবা সমালোচনা করা নয়-- চেষ্টা করি তাকে জীবন্ত করে তোলার, আমার লেখা পড়ার সময় বিষয়টা যাতে অনুভব করতে পারেন আপনি। সুন্দর বিষয়গুলোর সঙ্গে খারাপ আর কুৎসিত বিষয়গুলোও তুলে না আনলে এই কাজটা করা যায় না। কারণ, জীবনের সবকিছুই যদি সুন্দর হয় সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না।’

‘দ্য থ্রি ডে ব্লো’ গল্পটি তিনি লিখেছিলেন প্যারিসের সাঁ মিশেলে তাঁর পরিচিত এক ক্যাফেতে বসে। অ্যা মুভেবল ফিস্ট বইতে সেদিনের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এভাবে, ‘কৈশোর, যুবা ও পরিণত বয়স পর্যন্ত হেমন্তশেষের দিনগুলো দেখে আসছি, দেখেছি অন্য কোথাও বসে এসম্পর্কে মূল জায়গার চেয়ে আরো ভালো লেখা যায়। ভাবছিলাম, এটাকেই নিজেকে রোপণ করা বলে-অন্য যেকোনো বেড়ে ওঠা বস্তুর মতো মানুষের জন্যও এটা প্রয়োজন। গল্পের ছেলেগুলো তখন পান করছিল, এতে আমারও তেষ্টা পেয়ে যায়, তাই একটা সেন্ট জেমস রাম দিতে বলি। ঠান্ডার মধ্যে স্বাদটা চমৎকার লাগছিল, আমি লিখে চলি, খুব ভালো লাগছিল, বুঝতে পারছিলাম মার্টিনিক রাম আমার শরীর ও মেজাজকে চাঙা করে তুলছে।’

এখানে এক বৃষ্টির দিনে গল্পের নিক আর বিলের পান করার দৃশ্যের কথাই উল্লেখ করেছেন তিনি।

প্রকৃতপক্ষে ইতালির রণাঙ্গনের পর্বটা বাদ দিলে কৈশোরোত্তীর্ণ হেমিংওয়ের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য পর্ব (১৯১৫--২১) কেটেছে হর্টন বে-র প্রাকৃতিক পরিবেশে। এখানে ঘটে তাঁর প্রথম প্রেম এবং প্রথম নারীসঙ্গ লাভের অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার ওপর একাধিক গল্প লিখেছেন তিনি। ‘দ্য এন্ড অভ সামথিং’ এবং ‘দ্য থ্রি ডে ব্লো’ ছাড়াও তাঁর ‘আপ ইন মিশিগান’, ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’, ‘সামার পিপল’, ‘টেন ইন্ডিয়ানস’-- গল্পগুলো হর্টন বে-র পটভূমিতে তাঁর প্রথম জীবনে আসা নারীদের নিয়ে আত্মজৈবনিক বলে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত।

‘আপ ইন মিশিগান’ গল্পটি জিম গিলমোর নামের এক কর্মকার আর লিজ কোটস নামের এক পরিচারিকার গল্প। লিজ কাজ করে স্মিথ পরিবারে। সেবাড়িতে জিমের আসা যাওয়া আছে। সেই পরিবারের সঙ্গে একদিন শিকার থেকে ফিরে আসার পর কয়েক প্রস্থ পান এবং ডিনার শেষে প্রায় মাতাল জিম রান্নাঘরে গিয়ে লিজকে আদর করে। তারপর ওকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়। একসময় নদীতীরে ডকের শেষমাথায় গিয়ে লিজকে পেতে চায় ও। কামনা থাকা সত্ত্বেও ভয়ে বাধা দিতে চায় লিজ, কিন্তু সে বাধা উপেক্ষা করে তার ওপর প্রায় জবরদস্তি করে উপগত হয় জিম। তারপর একসময় পরিশ্রান্ত হয়ে ওর শরীরের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে, ওকে জাগানোর চেষ্টা করে লিজ। নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে কাঁদতে শুরু করে ও। জিমের ঘুম ভাঙাতে ব্যর্থ হয়ে নিজের গায়ের কোট খুলে ওটা দিয়ে ঘুমন্ত জিমের শরীর যত্ন করে ঢেকে দেয় লিজ, তারপর বনপথে একাকী বাড়ির রাস্তা ধরে।

গল্পের এই লিজ কোটস সেসময় পলিন স্নো নামের এক পরিচারিকা, যার সঙ্গে হেমিংওয়ের প্রথম শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল বলে একাধিক গবেষকের ধারনা। পেইন্টাররা যেরকম দ্রুত কিছু স্কেচ করে রাখেন, হেমিংওয়েও কিছু পরিচিত চরিত্রের স্কেচ লিখে রেখেছিলেন ছোট ছোট অধ্যায়ে। তেমনই একটা চরিত্র ছিল পলিন স্নো। সেই সংক্ষিপ্ত চরিত্রচিত্রণে তিনি লেখেন ‘[হর্টন] বে-তে পলিন ছিল আমাদের দেখা একমাত্র সুন্দরী মেয়ে। সে ছিল গোবরগাদায় সোজা বেড়ে ওঠা চটপটে কোমল পদ্মের মতো।... ওর বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সে ব্লজেট পরিবারে আসে।... সেসময় আর্ট সিমন্স সন্ধ্যায় ব্লজেটদের বাড়িতে আসতে শুরু করে। ... রাতের খাওয়ার পর পলিনকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়। প্রথমদিকে সে আর্টকে ভয় পেতো। ওর মোটা ভোঁতা আঙুল, ওর গায়ে হাত রেখে কথা বলার অভ্যেস- এসব কারণে ও আর্টের সঙ্গে যেতে চাইত না। কিন্তু বুড়ো ব্লজেট ওকে নিয়ে মজা করত।’ পলিনের বড় বড় চোখে ভয় থাকত, তবু সেই গোধূলিবেলায় ওকে আর্টের সঙ্গে যেতে হতো। সূর্যাস্তের সুন্দর দৃশ্য দেখিয়ে আর্টকে সে বলত, কি সুন্দর! আর্ট বলত, ওখানে সূর্যাস্ত নিয়ে কথা বলতে আসেনি ওরা। তারপর একহাতে ওকে জড়িয়ে ধরতো। শেষ প্যারায় হেমিংওয়ে লেখেন, ‘কিছুদিন পর প্রতিবেশীদের কয়েকজন অভিযোগ করে,' তারপর ওরা পলিনকে সংশোধন স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। আর্ট কিছুদিন সরে থাকে, তারপর ফিরে এসে জেনকিনসদের একটা মেয়েকে বিয়ে করে। এটুকু পড়লে স্পষ্ট হয় যে আপ ইন মিশিগান গল্পটির ভিত্তি রচিত হয়েছিল পলিন স্নো চরিত্রকে ঘিরেই। গল্পটি ১৯২৩ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ থ্রি স্টোরিজ অ্যান্ড টেন পোয়েমস-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই গল্প সম্পর্কে প্যারিসে হেমিংওয়ের প্রথমদিকের পৃষ্ঠপোষক ও পরামর্শদাত্রী গারট্রুড স্টাইন তাঁকে বলেছিলেন, ‘গল্পটা ভালোই, তবে কথা আদৌ ওটা নয়, কথা হচ্ছে, ওটা অশ্লীল। ওটা শিল্পীর আঁকা এমন একটা ছবির মতো, যেটা প্রদর্শনীর সময় দেখানো যাবে না, কেউ ওটা কিনবেও না, কারণ ওরাও ওটা দেয়ালে ঝোলাতে পারবে না।’ স্টাইন অশ্লীল বোঝাতে যে ফরাসি শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন, সেটি ছিল inaccrochable, যার অর্থ, যেটা ঝোলানো যায় না, অর্থাৎ প্রদর্শনী বা ঘরের দেয়ালে ঝোলানো যায় না, এমন ছবি। গল্পটা তখনকার মানসিকতায় বহু পাঠককেই আহত করেছিল। বইটির প্রথম প্রকাশ নিজ উদ্যোগে করেছিলেন হেমিংওয়ে। কিন্তু পরের বছর বনি অ্যান্ড লিভরাইট ইন আওয়ার টাইম নামে যে গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল, অশ্লীলতার কারণে সেই সংকলন থেকে এই গল্পটি প্রকাশকের অনুরোধে বাদ দিতে হয়েছিল, তার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ‘দ্য বাটলার’।

গল্পটির চরিত্রের নামগুলো হর্টন বে-র অনেকের কাছেই পরিচিত। সেই ছোট শহরে হেমিংওয়ে পরিবারের বন্ধু ছিলেন এলিজাবেথ ও জিম ডিলওয়র্থ। গ্রীষ্মাবকাশে হর্টন বে থাকার সময় হেমিংওয়ের মায়ের বেশিরভাগ সময় কাটত এলিজাবেথের সঙ্গে ছবি এঁকে, বালক হেমিংওয়েও থাকতেন সেখানে। ডিলওয়র্থদের একটা কামারশালা ছিল। এই দম্পতির নামকেই লিজ ও জিম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে ‘আপ ইন মিশিগান’ গল্পে। হেমিংওয়ের ভাগনে (বোন মার্সেলিনের ছেলে) জেমস স্যানফোর্ডের সূত্রে জানা যায়, একবার হেমিংওয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে ডিলওয়র্থদের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। সেবাড়িতে কিছুদিন থাকা ও খাওয়ার বিনিময়ে তাঁকে কাজ করে দিতে হয়েছে। যদিও এই ব্যবস্থা তাঁরা করেছিলেন হেমিংওয়ের মায়ের পরামর্শে, কিন্তু প্রতিশোধ নিতে গল্পটিতে এই দম্পতিকেই ব্যবহার করেছেন তিনি। গল্পটির বিষয়ে মার্জোরিও বলেছেন পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ... বইতে। তিনি বলেন, বেথ ও জিম ডিলওয়র্থকে নিষ্ঠুরভাবে কলুষিত করেছেন আর্নেস্ট। অথচ লেখালেখি শুরু করার সময় এই পরিবারেই আশ্রয় পেয়েছিলেন তিনি। হর্টন বে শহরে মিষ্ট স্বভাবের বলে পরিচিত ছিলেন দলিদরিয়া বেথ ডিলওয়র্থ, তাঁদের সম্পর্কেই এমনভাবে লিখেছেন হেমিংওয়ে, যেন তাঁরা জীবনের অন্ধকার দিকটির বাসিন্দা।

হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের সংস্পর্শে আসা নারীদের আরেকজনকে পাওয়া যায় ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’ গল্পে। এই গল্পের নিকের বাবার সঙ্গে হেমিংওয়ের বাবার চারিত্রিক বেশ মিল পাওয়া যায়। বাবাকে নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে ওর, কিন্তু তাঁকে চেনে এমন অনেক মানুষই তখনো বেঁচে, তাই তাঁর মধ্যে গল্পের অনেক উপাদান থাকা সত্ত্বেও লিখতে পারছে না ও। গল্পে কৈশোরোত্তীর্ণ নিকের প্রথম শারীরিক অভিজ্ঞতা হয় হেমলক বনের ভেতর ট্রুডি গিলবী নামের এক আদিবাসী আমেরিকান মেয়ের সঙ্গে। হেমিংওয়ে গবেষকদের মতে হেমিংওয়ে পরিবারের ওয়ালুন লেকের বাড়িতে হেঁসেল সামলানোর কাজ করত প্রুডেন্স বৌলটন নামের এক আদিবাসী মেয়ে। এই নারীই তাঁর কৌমার্য ভঙ্গ করেছিল বলে জানা যায়।

হেমিংওয়ের নিক অ্যাডামস সিরিজের টেন ইন্ডিয়ানস গল্পেও বান্তবের প্রুডেন্স বৌলটনকে প্রুডেন্স মিচেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রুডেন্সকে ভালোবাসে নিক, তবে সবার কাছে অস্বীকার করে সেটা। আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা নিচু চোখে দেখে, ওদের মতে কোনো আদিবাসী মেয়ের উচিত নয় শ্বেতাঙ্গ যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক করা। অন্য এক যুবকের সঙ্গে প্রুডেন্সের সম্পর্ক আছে, পিতার কাছ থেকে এই তথ্য জানার পর ওর অবিশ্বস্ততায় ব্যথিত নিক কাঁদে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে জাগার পর মনে আসে না যে ওর মন ভেঙেছে।

হেমিংওয়ে ১৯১৮ সালে ইউরোপ রওনা হওয়ার কয়েক মাস আগে প্রুডেন্স আত্মহত্যা করেছিলেন। এসময় আবিষ্কৃত হয়, তিনমাসের অন্তঃসত্তা ছিলেন তিনি। অনাগত সেই সন্তানের পিতা কে ছিলেন সেটা নিয়ে দ্বিমত আছে। পিটার গ্রিফিনের মতে হচ্ছে সেই লোক ছিলেন এক ফরাসি-কানাডিয়ান করাতি রিচার্ড ক্যাসেল। তবে কনস্ট্যান্স চ্যাপেল মন্টগোমারির বিষ্ফোরক তথ্যমতে আত্মহত্যা করার সময় প্রুডেন্সের অনাগত সন্তানের বাবা হেমিংওয়ে ছিলেন বলে গুজব আছে।

‘সামার পিপল’ গল্পের কেট চরিত্রটি বাস্তবে হেমিংওয়ের বান্ধবী কেট স্মিথ, পরবর্তী সময় যাকে বিয়ে করেছিলেন হেমিংওয়ের বন্ধু ও লেখক ডস পাসোস (১৮৯৬-১৯৭০)। গল্পটি ইন আওয়ার টাইম গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল হেমিংওয়ের, কিন্তু এটিতে নিক ও কেটের মধ্যকার যৌন সম্পর্কের মাত্রাতিরিক্ত বর্ণনার কারণে গল্পটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। তাছাড়া চরিত্রগুলোর আড়ালের বাস্তব মানুষদের কেউ কেউ তখনো বেঁচে। গল্পের নিক একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করে, তার নাম কেট। অথচ মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক অডগার নামের এক যুবকের। কেটকে প্রবলভাবে চায় নিক, তবে অডগার থাকলে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হয় ওর। নিকের ধারনা কেট কখনোই অডগারকে বিয়ে করবে না। ওরা সবাই মিলে নৈশ সাঁতার কাটার পর বন্ধু বিলি ওর গাড়িতে সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। রাতের বেলায় হেমলক বনের নির্জনে আবার কেটের সঙ্গে মিলিত হয় নিক। নিক বাড়ি থেকে নিয়ে আসে শুকনো খাবার, আর কেট নিয়ে আসে দুটো কম্বল। রাতে ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে নিক প্রার্থনা করে যাতে পরদিন ভালো মাছ ধরতে পারে, ওর পরিবারের সবার যাতে মঙ্গল হয়, যাতে একজন ভালো লেখক হতে পারে ও, কেটের মঙ্গলের জন্য, এমনকি বেচারা বয়স্ক অডগারের জন্যও প্রার্থনা করে ও। এতদসত্ত্বেও গল্পটি অচ্ছ্যুত হয়ে থাকে প্রায় পঞ্চাশ বছর। কারণ, বনের মধ্যে রাতের বেলায় দুজনের মিলিত হওয়ার রগরগে বর্ণনা সেসময়ের সংস্কারে যে কোনো বিচারে শ্লীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। সেই বর্ণনা এতই যৌনরসাত্মক ছিল যে দীর্ঘদিন পান্ডুলিপি হিসেবে অপ্রকাশিত পড়ে থাকার পর স্ক্রিবনার্স যখন এটিকে নিক অ্যাডামস স্টোরিজ সংকলনে গ্রন্থভুক্ত করে, হাতে লেখা পান্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধার করার সময় মুদ্রণকর্মীরা হেমিংওয়ের দেওয়া কেটির নাম ‘স্টাট’কে (Stut) ‘স্লাট’ ( slut - বেশ্যা) হিসেবে টাইপ করে। হয়তো গল্পের এই অংশটির সরস বর্ণনার আবহে শব্দটিকে অযথার্থ মনে হয়নি তাঁদের, কারণ, হেমিংওয়ে যে কেটকে ‘স্টাট’ বলে ডাকতেন, সেই তথ্য গবেষকদের জানা থাকলেও সম্পাদকদের জানা ছিল না। এই মারাত্মক ভুলটি পরবর্তী সময় (১৯৮৭) কমপ্লিট শর্ট স্টোরিজ অভ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রকাশিত হওয়ার সময় সংশোধন করা হয়।

গল্পটির মূল পটভূমি হর্টন বে, এখানে হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে বিল স্মিথ ও কেটি স্মিথ নামের দুই ভাই বোনের। বিল তাঁর চেয়ে চার বছর এবং কেটি আট বছরের বড়। কেটি সঙ্গে পূর্বরাগ চলছে কার্ল এডগার নামের এক যুবকের। তবু কেটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন হেমিংওয়ে, সশরীরে চান তাঁকে। এই স্বপ্নকেই তুলে এনেছেন তিনি সামার পিপল গল্পে। গল্পে কেটির নাম হয় কেট, আর এডগারের নাম দেওয়া হয় অডগার। গল্পটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন কেটি বা হেমিংওয়ে কেউই বেঁচে নেই। কেটির জীবদ্দশায় গল্পটি প্রকাশিত হয়নি বলে তাঁকে মার্জোরি বা আদ্রিয়ানার মতো বিপদে পড়তে হয়নি। কেবল কেটি আর বিলই নয়, গল্পের বাকি চরিত্রগুলোর সবাইকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। কেটকে হেমিংওয়ে কখনো ডাকতেন ‘বাটস্টেইন’ কখনো ‘স্টাট’। তাঁর চারবছরের ছোটভাই হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিল স্মিথকে অন্য গল্পেও পাওয়া যায়। কানসাস সিটি স্টার কাগজে প্রথম চাকরি নেওয়ার পর গল্পের অডগার তথা বাস্তবের চার্লস এডগারের সঙ্গে একই ঘরে ভাড়া থাকতেন হেমিংওয়ে। বাস্তবেও এডগার ছিলেন কেটের পাণিপ্রার্থী। হেমিংওয়ের স্কুল জীবনের বন্ধু জ্যাক পেন্টেকস্ট গল্পে হয়েছেন গী। গল্পের চার চরিত্রের পেছনের বাস্তবের মানুষগুলোর সবাই হেমিংওয়ে-হ্যাডলির বিয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন।

হেমিংওয়ের ‘দ্য থ্রি-ডে ব্লো’ গল্পে মার্জোরির মাকে যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন হেমিংওয়ে, তাতে মার্জোরির ধারনা হয় যে তিনি মহিলাকে সত্যিই অপছন্দ করতেন। অপছন্দের কারণটা তিনি জানতে পারেন বহুবছর পর। তাঁর মা জানিয়েছিলেন যে একবার হেমিংওয়ে একান্ত আলাপে তাঁদের বিয়ের কথা তুলেছিলেন। তাঁর মা বলেছিলেন যে তাঁর মেয়েটি বিয়ের জন্য তখনো যথেষ্ট বড় হয়নি, কমপক্ষে কলেজ পার হতে হবে ওকে। সেই আলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য মার্জোরির সম্ভাবনা বিষয়ে হেমিংওয়ের কৌতুহল। তাঁর মা জানিয়েছিলেন যে ঠাকুরমা মারা যাওয়ার আগে সম্পত্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাঁর মেয়ের নেই। মার্জোরির ধারণা ঠাকুরমার সম্পত্তিতে তাঁর উত্তরাধিকারের বিষয়ে কোনো গুজব শুনেছিলেন হেমিংওয়ে। লেখালেখি করার সময় অন্য কোনো পেশা না থাকায় অর্থের প্রয়োজন ছিল তাঁর, মার্জোরিকে বিয়ে করলে সেটি সুলভ হতে পারত। মার্জোরির ভাষ্য থেকে জানা যায় পরবর্তী সময় হ্যাডলিকে যখন বিয়ে করেন হেমিংওয়ে, সেই অনুষ্ঠানে মার্জোরির মাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। মার্জোরি বলেন, ‘আমার মনে হয় পাত্র হিসেবে আমার মা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে তিনি হয়তো বিব্রত কিংবা বিরাগ হয়েছিলেন। কিংবা হতে পারে তিনি এমন ধারনা দিয়েছিলেন যে হেমিংওয়েকে তিনি একজন সুবিধাবাদী ভাগ্যশিকারি বলে মনে করেন।’

১৯১৯ সালে হেমিংওয়ে তিনমাসের জন্য পেটোস্কিতে আসেন, যাতে এখানে বসে গল্প লিখে সেগুলো প্রকাশ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। সেখানে ইভা পোটার নামের এক বিধবার বাড়ির একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। সেসময় তাঁর পাঠানো প্রায় সব লেখাই প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফেরত আসত। ফলে সবসময় অর্থকষ্টে থাকতে হতো তাঁকে। এসময় একাকী বোধ করলে কিংবা ঘরে খাবার না থাকলে মার্জোরির ঠাকুরমার বাড়িতে গিয়ে হাজির হতেন তিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আর্নেস্ট যখন ফিরে আসেন, ততদিনে মার্জোরি পেটোস্কি হাই স্কুলের ওপরের ক্লাসে। সেসময়ই হেমিংওয়ের সঙ্গে সত্যিকার ঘনিষ্ঠতা হয় তাঁর। সেই সম্পর্কের প্রতি হেমিংওয়ের বিশ্বস্ততা কতখানি ছিল, সে বিষয়ে মার্জোরির সংশয় ছিল বরাবরই। এসময় তাঁরা একসাথে অনেককিছু করেছেন-মাছ ধরা, নৌকা চালানো, সাঁতার কাটা, বই পড়ে সেবিষয়ে আলোচনা করা ইত্যাদি। পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ... বইতে মার্জোরি দাবি করেছেন যে তাঁর ইংরেজি এসাইনমেন্ট তৈরি করতে সাহায্য করতেন হেমিংওয়ে, নিজের প্রিয় লেখকদের বই পড়তে উৎসাহিত করতেন, পড়ে শোনাতেন নিজের সদ্য লেখা গল্প।

হেমিংওয়ে যখন (১৯২১) টরন্টো স্টার পত্রিকার কাজ নিয়ে কানাডা চলে যান, তখনও সেখান থেকে মার্জোরির সঙ্গে চিঠিপত্রে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল দুজনের মধ্যে। এসময় হ্যাডলিকে হর্টন বে-র এক মেথডিস্ট গির্জায় বিয়ে করছেন হেমিংওয়ে-এমন সংবাদ পেয়ে মার্জোরি বেশ আঘাত পান। তাঁদের দুই বোনকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠানে। তবে তাঁর মাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি বলে মার্জোরি যাননি সেখানে, তাঁর বোন পার্জ গিয়েছিলেন। হ্যাডলিকে হেমিংওয়ের বিয়ে করার চৌদ্দ বছর পর মার্জোরিও বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাঁদের সম্পর্ক বজায় ছিল, আসা যাওয়াও ছিল। পেটোস্কিতে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে যে গল্পগুজব চালু ছিল সেটা নিয়ে স্বামী সিডনির দুশ্চিন্তা ছিল না, কারণ স্ত্রীর কুমারীত্বের পরিচয় ইতিমধ্যে পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বরং মার্জের নামোল্লেখ করে লেখা দুটো গল্প নিয়ে হেমিংওয়েকে একদিন খোঁচা দিয়ে বলেন যে এই গল্পগুলো একটা মামলার ভালো উপাদান হতে পারে। হেমিংওয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, সেরকম কিছু হলে সেগুলোর কারণে কিছু আয়কর রেয়াত পেতে পারেন তিনি।

কিন্তু ‘দ্য থ্রি ডে ব্লো’ গল্পে তাঁর মা এবং আপ ইন মিশিগান গল্পে ডিলওয়র্থ দম্পতিকে বিরূপভাবে চিত্রিত করার জন্য হেমিংওয়েকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেননি মার্জোরি। তিনি বলেন, ‘কোনো কল্পিত আক্রোশ মেটানো, অবজ্ঞা কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য অন্যদের ক্রুশবিদ্ধ করার অধিকার একজন সৃষ্টিশীল মানুষের আছে বলে আমার মনে হয় না।’ তিনি প্রশ্ন করেন যে হেমিংওয়ে কি মিথ্যাকে নিজের খ্যাতির ছত্রছায়ায় এনে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য? ডিলওয়র্থ দম্পতির পরিচিত অনেকেই এই নিষ্ঠুর আচরণের জন্য হেমিংওয়ের ওপর বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তবে এই দম্পতি আর্নেস্টকে ক্ষমা করে দিয়ে বরং তাঁর সৃষ্টিশীল দিকটাই ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছিলেন।

হেমিংওয়ের এই স্বভাবের কথা স্বীকার করেছেন তাঁর ভাগনে স্যানফোর্ডও। তিনি বলেন, ‘যাঁরা তাঁকে একসময় সাহায্য করেছেন, তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন তাঁর মামা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিষ্ঠুরভাবে।’ পরবর্তী জীবনে হেমিংওয়ের এই প্রবণতার পরিচয় বহুবার পাওয়া গেছে। যেমন, যে শেরউড এন্ডারসন লেখালেখির পথ সুগম করার জন্য হেমিংওয়েকে ইতালির পরিবর্তে প্যারিস যাওয়ার সুবুদ্ধি দিয়েছিলেন, তাঁরই ডার্ক লাফটার বইটির একটা বাজে প্যারোডি লিখেছিলেন তিনি টরেন্টস অভ স্প্রিং নামে। তিনি বলেছিলেন যে টরেন্টস অভ স্প্রিং লেখার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে শেরউড এন্ডারসন, গারট্রুড স্টাইন, সিনক্লেয়ার লুইস, উইলা ক্যাথারদের সব ঝুটগুলো ব্যঙ্গ করে দেখিয়ে দেওয়া এবং এই সব ভণ্ড বেজন্মাদের জলদি অবসরে পাঠানো। একসময়ের বন্ধু স্কট ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে হেমিংওয়ের চমৎকার সম্পর্ক থাকলেও সেই সম্পর্ক শেষাবধি তিক্ত হয়ে গিয়েছিল।

প্রথম উপন্যাস দ্য সান অলসো রাইজেস লিখতে গিয়েও পরিচিত বন্ধু ও লেখকদের চরিত্রহননের কাজটি করেছিলেন হেমিংওয়ে। বইটির প্রায় সব চরিত্রকে এত বেশি খোলামেলাভাবে তুলে আনা হয়েছিল যে প্যারিসের লেখক-বুদ্ধিজীবী মহলের সবাই তাদের অতি সহজেই চিনতে পারেন। এমনকি উত্তম পুরুষে জ্যাক বার্নস চরিত্রের নামটিও প্রথম খসড়ায় ছিল হেম, যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক লেখক। তেমনি বাস্তবের লেখক হ্যারল্ড লোবকে (১৮৯১-১৯৭৪) করা হয় রবার্ট কোহন এবং ডোনাল্ড স্টুয়ার্টকে (১৮৯৪-১৯৮০) করা হয়েছে বিল গর্টন। পরে অবশ্য উপন্যাসটির বহু সরাসরি ইঙ্গিত বাদ দেওয়া হয়েছিল স্কট ফিটজেরাল্ডের পরামর্শে। বস্তুত, এটির খসড়াতে ঘষামাজা করার কাজে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলেন স্কট। সেই স্কটকেই শেষদিকে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন হেমিংওয়ে।

বাস্তব চরিত্রকে গল্পে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে তুলে ধরার একইরকম কাজ তিনি আরো করেছেন ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর একসময়ের পরকীয়া প্রেমিকা জেন ম্যাসনকে ‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অভ ফ্রান্সিস মাকোম্বার’ গল্পে এবং টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট উপন্যাসে তুলে এনে। এই উপন্যাসে গ্রান্ট ও জেন ম্যাসন দম্পতিকে হেমিংওয়ে তুলে এনেছেন নগ্নভাবে, জেনের ব্যভিচারী প্রবণতাকে উপস্থাপন করেছেন হেলেন ব্র্যাডলি চরিত্রের মাধ্যমে। মৃত্যুপরবর্তীকালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা অ্যা মুভেবল ফিস্ট বইতেও তাঁর সমসাময়িক বহু লেখক সম্পর্কে তীব্র ব্যঙ্গ ও বিরূপ মন্তব্য করে গিয়েছেন হেমিংওয়ে।

সুতরাং, দুটি গল্পে তাঁর চরিত্র তুলে আনার জন্য হেমিংওয়ের ওপর মার্জোরি বাম্পের ক্ষোভ অমূলক ছিল না। পরবর্তী সময়ে মার্জোরির মামাত ভাই ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ওহলে হর্টন বে এলাকার ইতিহাস লিখতে গিয়ে হেমিংওয়ে সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার সুযোগ ছাড়েননি। তিনি লেখেন, ‘মানুষ হিসেবে হর্টন বে এলাকায় হেমিংওয়ে খুব বেশি পছন্দের ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবন্ত কল্পনা দিয়ে স্থানীয় ভদ্র সম্প্রদায়ের বিরক্তি উৎপাদন করেছেন তিনি।’ হেমিংওয়ের প্রাক্তন স্ত্রীদের মধ্যে তৃতীয় মার্থা গেলহর্নের আত্মজীবনী ট্রাভেলস উইথ মাইসেলফ অ্যান্ড অ্যানাদার এবং চতুর্থ মেরি ওয়েলশের হাউ ইট ওয়াজ বইতে হেমিংওয়ে প্রসঙ্গে সামান্য তির্যক বক্তব্য থাকলেও বিষোদগার করেননি কেউ। তাঁর একসময়ের প্রেমিকারাও কোনো লেখায় হেমিংওয়ের ওপর চড়াও হননি, যেটি করেছেন মার্জোরি বাম্প পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে ইন সামথিং ফ্রম মার্জ বইতে।

তথ্যসূত্র:

১. মিরিয়াম বি ম্যান্ডেল (সম্পা)-- হেমিংওয়ে অ্যান্ড আফ্রিকা

২. ফিলিপ এইচ মেলিং-- মেমোরিয়াল ল্যন্ডস্কেপ- হেমিংওয়েজ সার্চ ফর ইন্ডিয়ান রুটস

৩. জেমস নিগেল (সম্পা)-- আর্নেস্ট হেমিংওয়ে: দ্য ওক পার্ক লিগ্যাসি

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক