খোন্দকার আশরাফ হোসেন এবং মনে দাগকাটা তিনটি কাগজ

আনিসুর রহমানআনিসুর রহমান
Published : 18 Jan 2023, 06:29 AM
Updated : 18 Jan 2023, 06:29 AM

৪ জানুয়ারি ছিল কবি অনুবাদক প্রবন্ধকার সাহিত্যসমালোচক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের জন্মদিন। স্বাধীন বাংলাদেশে যে গুটিকয় প্রতিভা একইসঙ্গে সৃজনশীল মৌলিক লেখালেখি এবং জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও পাঠদানে ছাত্র পাঠক ও তারুণ্যের মাঝে দাগ কেটে গেছেন তাঁদের মধ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন অন্যতম। এমনিতেই অনেক ক্ষেত্রে আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তরুণরা বাঘ হয়ে ঢোকেন আর কয়েক বছর পাঠান্তে সনদ বগলে করে বিড়াল হয়ে বের হয়ে আসেন।

খোন্দকার আশরাফ ছিলেন এই ধারার বিপরীতে অবস্থানকারী বিরল মানুষদের একজন যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে একজন ছাত্রকে বাঘ থেকে বিড়ালে রূপান্তর থেকে রক্ষা করতেন। সেই সঙ্গে তাঁর অমর কীর্তি তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে লেখালেখিতে তারুণ্যের উদযাপন ছড়িয়ে দিতেন। তিনি একদিকে শ্রেণিকক্ষে দিনের বেলায় তরুণদের অভিনব কায়দায় কবিতা পড়াতেন। আবার সেই তিনি সন্ধ্যেবেলায় নগরের ফুটপাতে বসে তরুণদের সঙ্গে মিলে আড্ডা দিতেন--তিনি তরুণ হয়ে যেতেন বয়সের ফারাককে পরাজিত করে। তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে আমার প্রিয় শিক্ষকদের একজন।

দেশে দেশে ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে কবিতার অনেক বক্তৃতা শোনার সুযোগ ঘটেছে। কিন্তু কৈশোর আর তারুণ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ক্লাসে পশম খাড়া হয়ে যাবার মত কবিতার বিস্ময়কর বক্তৃতা আর কোথাও শুনিনি। এই পর্যায়ে ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে চাই, তাতে একটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে কেমন যাদুকরী মোহনীয় ক্লাস ছিল খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি  একবার কোলরিজের কবিতা পড়াতে গিয়ে মসজিদের গম্বুজের সঙ্গে নারীর স্তনের তুলনা করেছিলেন। কবিতার উপমাকে এভাবে সহজ ও সাহসী ভঙ্গিতে আকর্ষণীয় কায়দায় অভিনব করে তুলতেন। তাঁর কবিতার ক্লাসে সবসময়ে ছাত্রছাত্রীতে ঠাসাঠাসি ভিড় থাকতো। ওই বয়সে এরকম সাহসী উচ্চারণ শুনে আমরা ঘোরের মধ্যে ঢুকে যেতাম। খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন কবিতার একজন বিশ্বমানের শিক্ষক। এরকম শিক্ষক এক জাতির জীবনে এক শতকে খুব বেশি আসে না। 

বিশ্বমানের এই শিক্ষকের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা 'একবিংশ'সহ সাহিত্যের ভিন্ন মেজাজের তিনটি কাগজ নিয়ে আলোকপাত করে তাঁকে স্মরণ করতে চাই।  অন্য কাগজ দুটি হচ্ছে 'গল্পকার' এবং 'শিশুসাহিত্যসারথি'।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে একসময় সাময়িকপত্র এবং দৈনিক পত্রিকা উভয় মাধ্যমেই মূলধারার লেখালেখি নিয়ে দাপট এবং গরজ ছিল। বাংলা ভাষাভাষী উভয় দেশেই হাল আমলে সাময়িকী  বা লেখালেখি বিষয়ক পত্রপত্রিকাগুলোর ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতিও খুব একটা সুখকর নয়। পশ্চিমবঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যমের মুঘলদের মালিকানাধীন কিছু সাময়িকীসহ বিকল্প সাহিত্যসাময়িকীগুলো তাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া রোধ করে এখনো টিকে আছে এবং নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এর কিছুটা টের পাওয়া যায় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশ নিলে।

পশ্চিমবঙ্গের বিকল্প সাহিত্য সাময়িকীর বাস্তবতা নিয়ে লেখক সুজন বড়ুয়া সম্প্রতি কলকাতা এবং শান্তিনিকেতন ঘুরে এসে একটা তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। সেই কথাটা আমার মনে রেখাপাত করেছে। তিনি বলেছেন, 'পশ্চিমবঙ্গে প্রায় লেখকের নিজের এক একটা সাহিত্যের কাগজ রয়েছে।'

এর মধ্যে 'দেশ' এবং 'প্রতিক্ষণ' পত্রিকার কথা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সাময়িকীটি প্রথম দিকে এটি পুরোপুরি সাহিত্য পত্রিকা ছিলো। যদিও দেশে এখন সাহিত্য ছাড়া রাজনীতি, খেলা, আজকাল, বাংলার হালচাল, সিনেমা, থিয়েটার, সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে লেখালজোখা ছাপা হচ্ছে। পত্রিকাটি শতবর্ষের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিক্ষণ পার করছে প্রকাশনার চার দশক।  পশ্চিমবঙ্গ থেকে নতুন প্রকাশিত আরো কয়েকটি ভিন্নধর্মী সাময়িকীর কথা বলে নেয়া দরকার, এর একটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত 'কৃত্তিবাস', বীথি চট্টোপাধ্যায়ের 'প্রথম আলো' আর 'দেশ' পত্রিকার অঙ্গন থেকে প্রকাশিত সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে বই বিষয়ক দুনিয়ার সেরা সাময়িকী 'বইয়ের দেশ'। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত সাময়িকীটি নিয়মিতই প্রকাশিত হচ্ছে।

পুস্তক নিয়ে আমাদের দেশেও জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র থেকে একটি পত্রিকা বের হয় বটে। এটিকে কেন যে মানসম্পন্ন একটি পত্রিকা হিসেবে দাঁড় করানো হলো না এই প্রশ্নটি এই গ্রন্থকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দরবারে রাখতে চাই। এর বিপরীতে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা বা সংস্কৃতি বিভাগের বড় কাজ হওয়া উচিত সাহিত্য সমালোচনা বা বই আলোচনা ছাপানো। হরেদরে প্রতি সপ্তাহে মৌলিক লেখা, যেমন কবিতা উপন্যাস গল্প ও নাটক ছাপানো দৈনিক পত্রিকার কাজ হতে পারে না। আমাদের দেশের কর্পোরেট গণমাধ্যমের মুঘলদের এসব নিয়ে কী ভাবনা কে জানে। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ স্বরূপ 'কালি ও কলম' সাময়িকীর নাম উল্লেখ করতে চাই।  সাময়িকীটি পশ্চিমবঙ্গেও সমাদৃত হচ্ছে।

তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে হাল আমলে আমাদের লেখক সম্প্রদায়, সাহিত্যের কাগজ এবং দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীগুলোর কী অবস্থা? আমাদের লেখক সম্পাদকদের কেউ কেউ পদভারে ভারাক্রান্ত এবং অনেকে পদ রাষ্ট্রাচার পুরস্কার আর পদবীর চূড়ান্ত শিখরে আরোহন করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। সেখানে মানসম্মত সাহিত্য সাময়িকী বের করার যোগ্যতা এবং সময় দুইয়েরই ঘাটতি রয়েছে উনাদের। দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা এবং পরিধি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় আমাদের এখানে ব্যাপক হারে বাড়লেও, সাহিত্যের মর্যাদা এবং সাহিত্যপাতার গুরুত্ব সেইভাবে বাড়েনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে সংকুচিত হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যার ঐতিহ্যের আদলে আমাদের এখানে শত শত পৃষ্ঠা সম্বলিত ঢাউস ঢাউস ঈদসংখ্যা প্রকাশ করার রেওয়াজ চালু হয়েছে। তা কেন যেন সাহিত্যের চেয়ে পদ-পদবী আর নামধারীদের তোষণের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন আকৃষ্ট কর্পোরেট পণ্য উৎপাদনের মত ঠেকে। বিগত কয়েক দশকের হাজার হাজার পৃষ্ঠার ঈদসংখ্যাগুলো আমাদের সাহিত্যে এমন কি কোনো দাগ ফেলেছে? এই ঈদসংখ্যাগুলো প্রকাশিত না হলে আমাদের সমসাময়িক লেখালেখির এমন কী ক্ষতি বৃদ্ধি হত?

এই পর্যায়ে আগে বলা একটি কথার পুনরাবৃত্তি করতে চাই। আমাদের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সাহিত্য পাতার চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে খেলার পাতার সাহিত্য মান ভালো। একই সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই আমাদের গণমাধ্যমের উল্লেখযোগ্য সাময়িকীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, উদাহররণস্বরূপ বিচিত্রা, ২০০০, সচিত্র সন্ধানী, রোববার-এর মত পত্রিকাগুলোর কথা বলা যায়। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশিত 'সাহিত্য পত্রিকাটি'ও আর প্রকাশিত হচ্ছে না। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কর্তা উপকর্তারা অনেক বয়ান দিয়ে থাকেন সুযোগ বুঝে। অন্যদিকে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো বিশেষ করে 'উত্তরাধিকার' এবং 'ধানশালিক' অনেকটা নিয়মিত প্রকাশিত হয়।  ইতিবাচক উদাহরণ। তবে কোথায় যেন গৎবাঁধা আমলাতান্ত্রিক মেজাজ ও মর্জির মত ঠেকে।  প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনা বলে কি? একই চিত্র এবং প্রশ্ন তোলা যায় শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'শিশু' পত্রিকা নিয়েও।

সাহিত্য সাময়িকীর বড় আবেদন হল এসব যেন লেখালেখির নবতর আবিস্কার ও উদ্ভাবনের হদিস নিয়ে হাজির হবে। প্রচলিত ধারা ও প্রথাকে নাড়া দেবে। নতুন প্রতিভা তুলে আনবে দেশের যেকোন চেনা বা অচেনা প্রান্ত থেকে। সেই সঙ্গে চলমান লেখালেখির ধারাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিবে। প্রশ্নের পর প্রশ্নের ঢালা মেলে ধরবে সমসাময়িক সাহিত্যের মোড়লদের উদ্দেশে। আর বিদ্যমান প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারার প্রতি নিয়ত বিদ্রোহ প্রকাশ করবে। তবে তা ব্যক্তি আক্রোশ ও আক্রমণের জায়গা থেকে নয়, লেখালেখির শৈল্পিক মানদণ্ডের আবেদন থেকে।

আমাদের লিটল ম্যাগাজিনগুলো 'জ্বলে আর নিবে' করে করে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া ঠেকিয়ে টিকে আছে। সেসবের মান ও মর্জি যাই থাকুক, তারণ্যের উদযাপনে অবশ্যই ইতিবাচক উদাহরণ। এ প্রসঙ্গে কবি রফিক আজাদের একটি পর্যবেক্ষণ স্মরণ করতে চাই। তিনি বলেছেন, তরুণদের মানসম্মত লেখার হদিস দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় পাওয়া যাবে না, সেসবের হদিস মেলে লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে।

বিকল্প সাহিত্য আন্দোলন বা লেখালেখি ও নন্দনভাবনার উল্লেখযোগ্য কাগজগুলো থেকে তিনটি সাময়িকীর কথা উল্লেখ করতে চাই। এগুলো হচ্ছে 'একবিংশ', 'গল্পকার' এবং 'শিশুসাহিত্য সারথি'।

'একবিংশ' কবিতা ও নন্দন ভাবনার একটি বাংলা লিটল ম্যাগাজিন। আমার শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক, কবি, অনুবাদক ও প্রবন্ধকার খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত এই প্রত্রিকাটি ১৯৮৫ সালে প্রথম ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি সাহিত্য পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ সালের নভেম্বর থেকে প্রায় তিন দশক "একবিংশ" সম্পাদনা করেছেন, ২০১৩ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। তাঁর পরোলোকগমনের পর আমার শিক্ষক, কবি এবং একই বিভাগের অধ্যাপক কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি কামরুল ইসলাম, দাউদ আল হাফিজ এবং সৈয়দ তারিককে সঙ্গে নিয়ে পত্রিকাটির হাল ধরেছেন। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের দেখানো পথ এবং রপ্ত করা মেজাজটা তারা একবিংশ সাময়িকীতে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

রবীন্দ্রযুগে কলকাতার কল্লোল ঢামাঢোলে সাহিত্যের যা হাঁকডাক ছিল, 'একবিংশ'র ভেতরে ঢুকলে সেরকম একটা আবহ টের পাওয়া যায়। কল্লোল যুগের পরে পরে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা এবং তার পরে আমাদের ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত 'কণ্ঠস্বর' পত্রিকার যে নামডাক তার পরের ধারাবাহিকতায় 'একবিংশ'র কথা বলতে হবে।

 এই পত্রিকায় কবিতা ও নন্দন ভাবনা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা দেশবিদেশের তত্ত্ব ও কথার সমৃদ্ধ বয়ান থাকে, থাকে গদ্য ও পদ্যের অনুবাদ, থাকে খবর ঘরের ও বাইরের, পাশের প্রতিবেশী আসাম আর ত্রিপুরার কবিতা ও নন্দনভাবনার গূঢ় কথা ও কণ্ঠস্বর। সবকিছু ছাপিয়ে থাকে বুড়োদের পাত্তা না দেয়ার এক নন্দনবিপ্লব, নতুন নতুন তরুণের লেখালেখির নবতর সুর ও ছন্দের মিছিল। ১৯৮৫ সালের বাংলার জমিনে অবাক করে আবির্ভূত  হওয়া 'একবিংশ' তার প্রায় চার দশকে এসে আজও অন্য এক তাৎপর্য ধরে রেখেছে।

জগতের বেশিরভাগ আধুনিক ভাষার সাহিত্যের কাগজ বলতে কবিতার প্রাধান্যই বেশি। আর কথাশিল্পের মূলধরারার কাগজে উপন্যাসের দাপটের কাছে ছোটগল্পের অবস্থা কোনঠাসা। সেখানে কেবল গল্পের জন্যে একটি  মাসিক পত্রিকা নিয়ম করে আট বছর ধরে লেখালেখির পেশাদারি দাবি ও গুণগত মান বজায় রেখে বাণিজ্যিকভাবেও সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে ঢাকা শহরে টিকে থাকার, চলমান থাকার, অবিরত ডাক দিয়ে যাবার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ছোটগল্পের বড় বিপ্লবের উদ্যোগ মাসিক 'গল্পকার'। পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন কথাসাহিত্যিক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন। তাঁর সম্পাদিত ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটির যোগাযোগ বলয়, লেখক পাঠক ও গ্রাহক দেশের  প্রতিটি জেলার আনাচে কানাচে।

হাল আমলের বাড়বাড়ন্ত ধনিকশ্রেণির  পদপদবীধারীদের  বাড়ন্তের বিপরীতে জাত লেখালেখি এবং লেখকের প্রতি দায়বদ্ধ অবস্থানে থেকে ছোটগল্পকেন্দ্রিক একটি কাগজ বাংলা ভাষার জগতে খুব একটা নাই। অন্তত আমি জানি না। ১৭২ পৃষ্ঠার এরকম নিখুঁত এবং নিখাদ ছোটগল্পের পত্রিকার উদাহরণ আর কোন আধুনিক ভাষাসাহিত্যের আছে? এই পত্রিকার বিষয়সূচি অনেকটা একবিংশ'র মর্জির কাছাকাছি। কবিতার জন্যে 'একবিংশ' আর ছোটগল্পের জন্যে 'গল্পকার'--এ যেন আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের জমিনে দারুণ দুই বৃক্ষ।

তৃতীয় কাগজটি হচ্ছে, কবি সুজন বড়ুয়া সম্পাদিত 'শিশুসাহিত্য সারথি'। সুজন বড়ুয়া শিশুসাহিত্যিক হিসেবে বহুল পরিচিত হলেও তিনি আদতে ছোটদের বড়দের মিলিয়ে লেখালেখির তাবৎ এলাকায় বিচরণ করেন। যার পরিধি কবিতা ছড়া গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং গবেষণা। তিনি তাঁর কর্মজীবনের পুরোটা কাটিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সঙ্গে। যে কারণে ছোটদের লেখালেখির অন্দর ও বাইরের সমূহ খবর তার কাছে রয়েছে। দেশের রাজধানী কেন্দ্র থেকে শুরু করে ছোটদের জন্যে বা ছোটদের লেখালেখির ভুবনে দেশের আনাচে কানাচে কে কোথায় কী লিখছেন কী ভাবছেন তার সব খবর উনার কাছে রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে তার যাপিত লেখক জীবনের পঠন ও অভিজ্ঞতা, প্রাজ্ঞ সব লেখকের সঙ্গে উঠাবসা, দেশে বিদেশে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা তো রয়েছেই।

পত্রিকাটি প্রতি তিনমাসে প্রকাশিত হয়। এটি চার বছর পার করছে। ১৪৮ পাতার এই কাগজটির নিয়মিত বিভাগগুলোর নাম থেকেই বোঝা যাবে রুচি ও মননের কতই না বাহারি আয়োজন ছোটদের লেখালেখির কল্পনা ও মনের খবর নিয়ে। সূচিগুলো এরকম: অগ্রণী আলো; কেমন করে এমন আমি, অনেক আলোর হাতছানি, আবার পড়ি ভাবি শিখি; সময়ের শিখা; শিশুসাহিত্যের প্রিয় বই; গৌরবের সৌরভ; চিরকালের নতুন; বইয়ের বাড়ি; আমার আয়না; বিজ্ঞানের বেগ আবেগ; মুক্তিযুদ্ধ সরণি; ভাষার ছন্দ মধুর দ্বন্দ্ব; সাহিত্যে আনন্দ; শিশুসাহিত্য আজকাল। 

সর্বশেষ সংখ্যায় ছোটদের লেখালেখি জগতের নাম করা, নাম না করা নানা মেজাজের গদ্য পদ্য অনুবাদ কবিতা আর ছড়ায় সমৃদ্ধ সংখ্যাটিতে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের কথা উল্লেখ করতে চাই।  তাতে পত্রিকাটির মেজাজ নিয়ে আরো একটু ধারণা পাওয়া যাবে। তারা হলেন দেলওয়ার বিন রশিদ, সোহেল আমিন বাবু, মুহম্মদ নূরুল হুদা, আমীরুল ইসলাম, সুজন বড়ুয়া, অরুন শীল, হাসনাত আমজাদ, রাশেদ রউফ, চন্দনকৃষ্ণ পাল,স্বপন কুমার রায়, সিকদার নাজমুল হক, মনিরুজ্জামান পলাশ, সুখেন্দু মজুমদার, রফিকুর রশিদ, মুস্তাফা মাসুদ, শেখর বসু, অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, নাসরিন মুস্তাফা, দীপক সাহা, শিবুকান্তি দাশ, সুপ্রতিম বড়ুয়া, ইলিয়াস বাবর প্রমুখ।

এই পত্রিকাটি কেবল ছোটদের লেখালেখি নয় তাবৎ লেখালেখি বিষয়ে বুনিয়াদি ধারণা লাভ আর উৎকর্ষ অর্জনের জন্যে বা কারো লেখক হয়ে টিকে থাকার শক্তি সঞ্চয়ের জন্যে 'শিশুসাহিত্য সারথি' লেখালেখির স্কুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যভাবে এই কাগজটিকে লেখালেখির একটি ল্যাবরেটরিও বলা যায়। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা চলতি সংখ্যা পর্যন্ত চার বছরের সবগুলো সংখ্যা কোন নবীন লেখক পড়লে লেখালেখির প্রস্তুতির পর্বে তিনি পনের বিশ বছর এগিয়ে যেতে পারেন।  

সবশেষে বলতে চাই 'একবিংশ' 'গল্পকার' আর 'শিশুসাহিত্য সারথি' ভুল সময়ের এমন তিনটি শুদ্ধ কাগজ যা পাঠকের রুচি গড়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় লেখক ধারণ গড়ন যত্ন ও লালন করার এক একটি ঠিকানা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক