২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

কেহলগ অ্যালব্রান-এর দ্য প্রফিট

আজহার ফরহাদ আজহার ফরহাদ

Published : 26 Sep 2026, 01:51 PM

Updated : 26 Sep 2026, 02:53 PM

ভূ মি কা

Wisdom from Mystical Nonsense—মরমি অর্থহীনতা থেকে উঠে আসা প্রজ্ঞা।

কাহলিল জিবরানের দ্য প্রফেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে। অল্প আয়তনের এই বইটির দীর্ঘ জীবন সাহিত্যের ইতিহাসে কিছুটা বিস্ময়কর। এর কাহিনি প্রায় নামমাত্র। বারো বছর অরফালিস নগরে কাটিয়ে আলমুস্তাফা স্বদেশে ফিরে যাবেন; জাহাজ আসার আগে নগরের অধিবাসীরা তাঁকে ঘিরে ধরে জীবনের কয়েকটি চিরপরিচিত বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়—প্রেম, বিবাহ, সন্তান, কাজ, স্বাধীনতা, আনন্দ ও দুঃখ, সৌন্দর্য, ধর্ম, মৃত্যু। আলমুস্তাফার উত্তর কোনো দার্শনিক তর্কের পদ্ধতি অনুসরণ করে না; তাঁর ভাষা কাব্যিক, উপমাময়, কখনো মরমি। দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অভিজ্ঞতা তাঁর কথায় বৃহত্তর তাৎপর্য লাভ করে।

দ্য প্রফেট -এর স্থায়ী জনপ্রিয়তার কারণ নিশ্চয় একটিমাত্র নয়। কিন্তু তার ভাষার একটি বিশেষ ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন। জিবরানের বাক্যের এমন একটি স্বর আছে, যা একই সঙ্গে সরল এবং গম্ভীর; কোনো সাধারণ অভিজ্ঞতাকেও তিনি এমনভাবে উচ্চারণ করতে পারেন যে তা ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন কোনো সত্যের আভাস দেয়। ষাটের দশকের আমেরিকায় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বাইরে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা, প্রাচ্যের দর্শন ও বিকল্প জীবনবোধের প্রতি যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, The Prophet-এর নতুন জনপ্রিয়তা সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।

কোনো রচনার ব্যাপক জনপ্রিয়তার একটি অনিবার্য পরিণতি আছে। তার বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তার ভঙ্গিও পরিচিত হয়ে ওঠে। আমরা শুধু কী বলা হচ্ছে তা নয়, কীভাবে বলা হচ্ছে তাও চিনে ফেলি। কখনো এমনও হয়, বক্তব্যের আগেই তার ভাষার ধরন আমাদের মনে একটি প্রত্যাশা তৈরি করে দেয়। জিবরানের মরমি গদ্যের ক্ষেত্রেও সম্ভবত তা-ই ঘটেছিল। তাঁর বাক্যের ছন্দ, প্রকৃতিনির্ভর উপমা, বৈপরীত্য, গাম্ভীর্য এবং বাণীর মতো সংহত উচ্চারণ ক্রমে এমন একটি স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছিল, যার অনুকরণ সম্ভব—এবং সেই অনুকরণের মধ্য দিয়েই তার parody-ও সম্ভব।

ঠিক পঞ্চাশ বছর পরে, ১৯৭৩ সালে, প্রকাশিত দ্য প্রফিট -কে এই পটভূমিতেই দেখা উচিত। বইটির লেখকের নাম দেওয়া হয়েছে কেহলগ অ্যালব্রান। নামটি কাল্পনিক; এর আড়ালে ছিলেন Martin A. Cohen ও Sheldon Shacket। Kahlil Gibran থেকে Kehlog Albran এবং The Prophet থেকে The Profit—নামের এই দুটি রূপান্তরেই বইটির কৌতুকের প্রাথমিক প্রকৃতি ধরা পড়ে। মূল গ্রন্থকে চেনেন এমন পাঠকের পক্ষে ইঙ্গিতটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তৎকালীন একটি সংবাদপত্র Cohen ও Shacket-কে শিকাগোর বিজ্ঞাপনজগতের মানুষ বলে পরিচয় দিয়েছিল; বইটির প্রকাশক Price/Stern/Sloan-ও মূলত জনপ্রিয় হাস্যরস ও অভিনবধর্মী বইয়ের জন্য পরিচিত ছিল। এই তথ্যগুলো The Profit-এর সাহিত্যিক অর্থ নির্ধারণ করে দেয় না, কিন্তু তার সাংস্কৃতিক অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে।

দ্য প্রফেট -এর মতো দ্য প্রফিট -এও একজন গুরু আছেন, আছেন প্রশ্নকারীরা, আছে জীবন সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসা। কিন্তু সাদৃশ্যটি যত স্পষ্ট, পার্থক্যটিও ততই তাৎপর্যপূর্ণ। জিবরানের আলমুস্তাফার ভাষা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে প্রায়ই একটি আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে যায়; দ্য প্রফিট -এর গুরু যেন সেই উচ্চতার মধ্যে বারবার পার্থিব জীবনের অতি সাধারণ বস্তু ও অভিজ্ঞতাকে প্রবেশ করিয়ে দেন। কখনো কোনো প্রতিভা, আকাঙ্ক্ষা বা বিশেষ যোগ্যতাহীন মানুষের উপযুক্ত পেশা হিসেবে উঠে আসে স্টকব্রোকারের নাম; কখনো আশীর্বাদের মহিমার পাশে এসে দাঁড়ায় গ্যাসের বিল; আবার কোথাও হাস্যরসের মূল্যও যেন বাজারদরের ভাষায় মাপা হতে থাকে। এমনকি যে প্রজ্ঞা অর্জন করতে তাঁর দশটি জীবন লেগেছে বলে দাবি করা হয়, পাঠক সেই প্রজ্ঞার বইটি কিনতে পারে মাত্র আড়াই ডলারে।

এখানে প্রফেট থেকে প্রফিট -এর রূপান্তরটি নিছক শব্দের কৌতুকের চেয়ে কিছু বেশি অর্থ বহন করতে পারে। প্রজ্ঞা যখন বই হয়ে প্রকাশিত হয়, তখন তারও একটি মূল্য নির্ধারিত হয়; আধ্যাত্মিক বাণীও মুদ্রিত হয়, বিপণন হয়, কেনাবেচা হয়। অবশ্য এই কারণে দ্য প্রফিট -কে পুঁজিবাদবিরোধী কোনো রাজনৈতিক রচনা বলা সঙ্গত হবে না। পুঁজির প্রকৃতি, শ্রেণিসম্পর্ক কিংবা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোনো সুসংহত সমালোচনা এখানে নেই। কিন্তু বাজার, অর্থ, মূল্য এবং পণ্যের ভাষা যে বারবার মরমি উচ্চারণের মধ্যে প্রবেশ করছে, সেটিও উপেক্ষা করার মতো নয়।

বরং বিষয়টিকে একটু অন্যভাবে বলা যায়। বইটি সম্ভবত বাজারব্যবস্থার চেয়ে বেশি আগ্রহী মূল্যবোধ ও মূল্যের মধ্যকার অস্বস্তিকর সম্পর্কটিতে। যে প্রজ্ঞাকে আমরা অমূল্য বলি, সেটিও যখন বই হয়ে দোকানে আসে, তখন তার গায়ে দাম লেখা থাকে। এই দ্বন্দ্বকে বইটি আরও কয়েকভাবে কৌতুকের বিষয় করেছে—সম্পদের আলোচনায় সোনা, সম্মান ও মুদ্রামূল্য একে অন্যের জায়গা বদলায়; আবার মানুষের মূল্য নিয়েও এমনভাবে দাম হাঁকা হয়, যেন মানুষও দোকানের তাকের কোনো পণ্য। এই দ্বন্দ্বটি বই নিজেকেও রেহাই দেয় না। এক জায়গায় বন্ধুকে নিজের কপি পড়তে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়—কারণ বন্ধুর নিজেরই একটি কপি কেনা উচিত। যে বই প্রজ্ঞার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে হাসতে পারে, সে নিজের বাণিজ্যিক অস্তিত্ব নিয়েও হাসতে জানে।

তবু আমার মনে হয়, দ্য প্রফিট -এর অধিকতর আকর্ষণীয় দিকটি তার বাজারসংক্রান্ত কৌতুকে নয়, তার ভাষার ব্যবহারে। গুরুর কথার একটি বিশেষ ধরন আছে। প্রকৃতি থেকে উপমা আসে, বাক্যে একটি ধীর গাম্ভীর্য তৈরি হয়, কোনো সাধারণ প্রশ্ন যেন ক্রমে বৃহত্তর কোনো সত্যের দিকে এগোয়। পাঠকও সেই ভাষার পরিচিত সংকেত অনুসরণ করে একটি গভীর উত্তরের জন্য প্রস্তুত হন। তারপর হঠাৎ যুক্তির মধ্যে একটি বিচ্যুতি ঘটে। কোনো শব্দ অন্য অর্থে চলে যায়, উপমা অপ্রত্যাশিতভাবে ভেঙে পড়ে, অথবা মরমি উচ্চারণের মধ্যে এমন একটি দৈনন্দিন বস্তু এসে উপস্থিত হয় যে সমগ্র গাম্ভীর্যটি মুহূর্তে হাস্যকর হয়ে ওঠে।

এ পর্যন্ত হলে দ্য প্রফিট একটি দক্ষ parody হিসেবেই যথেষ্ট আকর্ষণীয় হতো। কিন্তু বইটির কোনো কোনো অংশে আরেকটি ঘটনা ঘটে, যা আমার কাছে অধিকতর কৌতূহলোদ্দীপক। কৌতুকের কারণে বক্তব্যটি ভেঙে যাওয়ার পরেও তার মধ্যে কখনো একটি অর্থের অবশেষ থেকে যায়; কখনো আবার সেই ভাঙনই পরিচিত কোনো সত্যকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে।

Expectations বা প্রত্যাশা প্রসঙ্গটি এর একটি ভালো উদাহরণ। গুরু এমন কিছু প্রত্যাশার কথা বলেন, যা তাদের স্বভাবের কারণেই অসংগত—পিচ গাছ থেকে নাশপাতির আশা করা, পাথরের কাছে ডিম প্রত্যাশা করা, কিংবা সিয়ার্স কোম্পানীর কাছে লনমোয়ার বা ঘাস কাটার যন্ত্র যথাযথভাবে জোড়া লাগানোর আশা। শেষ উদাহরণটির কৌতুক স্পষ্ট। কিন্তু কৌতুকটি স্বীকার করেও এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে প্রত্যাশা ও বস্তুর স্বভাবের সম্পর্ক নিয়ে এখানে একটি অর্থপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়ে গেছে। বাস্তবের স্বভাবকে উপেক্ষা করে তার কাছে যা স্বভাবতই সম্ভব নয়, তা প্রত্যাশা করলে হতাশা প্রায় অনিবার্য। কথাটি গুরুতর ভাষায় বলা যেত; এখানে তা বলা হয়েছে অর্থহীনতার সীমা ছুঁয়ে যাওয়া কৌতুকের মধ্য দিয়ে।

এই অভিজ্ঞতা সাহিত্যিক nonsense-এর বৃহত্তর ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। Lewis Carroll-এর রচনায় nonsense অর্থের নিছক অনুপস্থিতি নয়; বরং প্রচলিত ভাষা ও যুক্তির নিয়মকে অস্থির করে দিয়ে অর্থ তৈরির প্রক্রিয়াটিকেই দৃশ্যমান করে। Alice-এর জগতে যুক্তি লোপ পায় না; বরং যুক্তি এমনভাবে নিজের নিয়ম অনুসরণ করতে থাকে যে শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচিত যুক্তির অসংগতিগুলোই চোখে পড়ে। নাসিরুদ্দিন হোজার বহু গল্পেও নির্বুদ্ধিতা ও প্রজ্ঞার সীমা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে কথায় আমরা প্রথমে হোজার ওপর হাসি, কখনো সেই কথাই ঘুরে এসে আমাদের নিজেদের কোনো পূর্বধারণা কিংবা আত্মনিশ্চয়তার অসারতা প্রকাশ করে দেয়।

এই প্রজ্ঞাময় নির্বুদ্ধিতার ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো এবং আরও বিস্তৃত। পাশ্চাত্য সাহিত্যে Shakespeare-এর Fool তার একটি পরিচিত রূপ। রাজা যেখানে নিজের ক্ষমতা ও মর্যাদার আবরণে সত্য দেখতে ব্যর্থ হন, সেখানে বিদূষক কখনো ঠাট্টার ছলে এমন কথা বলে ফেলতে পারে যা সভার প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। Fool-এর সামাজিক অবস্থান নিচে, তার কথাও আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন; অথচ সেই গুরুত্বহীনতাই তাকে এমন কিছু বলার স্বাধীনতা দেয়, যা গাম্ভীর্যের ভাষায় বলা বিপজ্জনক কিংবা অসম্ভব।

Erasmus-এর Praise of Folly-তেও অনুরূপ একটি বিপরীত গতি লক্ষ করা যায়। সেখানে Folly নিজেই নিজের প্রশস্তি করে; কিন্তু নির্বুদ্ধিতার কণ্ঠ যত কথা বলতে থাকে, মানুষের তথাকথিত প্রজ্ঞা, আত্মগরিমা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অনেক অসংগতি ততই প্রকাশিত হয়। এখানে নির্বুদ্ধিতা আর প্রজ্ঞা পরস্পরের নিছক বিপরীত হয়ে থাকে না; নির্বুদ্ধিতাই কখনো প্রজ্ঞার দাবিকে যাচাই করার উপায় হয়ে ওঠে।

প্রাচ্যের কয়েকটি ঐতিহ্যে এই সম্পর্কটি আরও ভিন্ন রূপ নিয়েছে। Zen বা Chan বৌদ্ধধারার kōan-এর কথাই ধরা যাক। kōan-কে নিছক nonsense বলা ঠিক হবে না; তার নিজস্ব সাধনাগত উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্য আছে। কিন্তু সাধারণ কার্যকারণনির্ভর যুক্তির বিচারে কোনো কোনো kōan প্রথমে অসম্ভব কিংবা অর্থহীন বলে মনে হতে পারে। সেখানে উদ্দেশ্য সবসময় একটি যুক্তিসংগত উত্তর পাওয়া নয়; কখনো প্রশ্নের এমন একটি সীমায় পৌঁছানো, যেখানে পরিচিত চিন্তার অভ্যাস আর কাজ করে না। যুক্তি সেখানে শেষ কথা নয়; তার সীমায় পৌঁছেই কখনো অন্য ধরনের উপলব্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এই প্রসঙ্গে Budai-এর কথাও মনে পড়তে পারে—দশম শতকের চীনা Chan ঐতিহ্যের সেই হাস্যোজ্জ্বল, স্থূলকায় ভিক্ষু, যিনি পরবর্তী জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ‘Laughing Buddha’ নামে পরিচিত হয়েছেন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যে Maitreya বা ভবিষ্যৎ বুদ্ধের সঙ্গে অভিন্ন বলে বিবেচিত হয়েছেন। তিনি অবশ্য ঐতিহাসিক গৌতম বুদ্ধ নন। কিন্তু তাঁর লোকপ্রিয় প্রতিমূর্তিতে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে হাসি, অনাড়ম্বরতা এবং দৈনন্দিন জীবনের এক আশ্চর্য সহাবস্থান দেখা যায়। গুরু বা সাধকের সঙ্গে কেবল গাম্ভীর্য ও দূরবর্তী মহিমাকে যুক্ত করার যে অভ্যাস, Budai-এর হাস্যোজ্জ্বল প্রতিমূর্তি তার পাশে আরেকটি সম্ভাবনার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

সুফি শিক্ষামূলক গল্পের কোনো কোনো ধারাতেও আমরা দেখি, সরলবুদ্ধি মানুষ, ভুল বোঝাবুঝি, অসম্ভব উত্তর কিংবা আচমকা উল্টো প্রশ্নের মধ্য দিয়ে একটি গুরুতর উপলব্ধির পথ তৈরি হয়। রুমি বা আত্তারের সমগ্র রচনাকে অবশ্য এই সূত্রে ব্যাখ্যা করা যাবে না; কিন্তু তাঁদের কাহিনির জগতে paradox, reversal এবং আপাত-অসংগতির ব্যবহার একেবারে অপরিচিত নয়। সেখানে পাঠককে কখনো সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় না; পরিচিত বোধের ভিতটিই একটু সরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখা সম্ভব হয়।

এই উদাহরণগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। Cohen ও Shacket আসলে Carroll, Nasiruddin, Zen, Erasmus কিংবা Shakespeare থেকে The Profit-এর কৌশল নিয়েছিলেন—এমন কোনো দাবি এখানে করা হচ্ছে না। বরং পাশাপাশি রাখলে একটি বৃহত্তর সাহিত্যিক ও মানবিক প্রবণতা চোখে পড়ে: প্রজ্ঞার কথা বলার জন্য মানুষ সবসময় শুধু প্রাজ্ঞের কণ্ঠই বেছে নেয়নি; নির্বোধ, বিদূষক, trickster, paradox, এমনকি আপাত-অর্থহীনতাকেও কখনো সেই কাজে ব্যবহার করেছে।

এর কারণ সম্ভবত প্রজ্ঞার প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। যে সত্য আমরা আগে থেকেই জানি বলে নিশ্চিত, তাকে নতুন করে দেখা কঠিন। কখনো সেই নিশ্চয়তার মধ্যে সামান্য গোলযোগ ঘটানো প্রয়োজন। Fool সেই গোলযোগ ঘটাতে পারে; kōan পারে যুক্তির অভ্যাসে বিঘ্ন ঘটাতে; Nasruddin পারে প্রশ্নটিকেই উল্টে দিতে; Carroll পারে ভাষার নিয়মকে তার নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে। এদের প্রত্যেকের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে তুলনা সম্ভব—চিন্তার পরিচিত পথটি সাময়িকভাবে রুদ্ধ হলে কখনো অন্য একটি পথ দৃশ্যমান হয়।

The Profit-এর কৌতুকও কোনো কোনো মুহূর্তে এই বৃহত্তর অঞ্চলের কাছাকাছি এসে পড়ে। তবে তার নিজস্বতা আছে। Carroll-এর nonsense প্রধানত অর্থ ও যুক্তির নিয়ম নিয়ে খেলে; Nasruddin-এর কৌতুক প্রায়ই সাধারণ বুদ্ধি ও সামাজিক অভ্যাসকে উল্টে দেয়; kōan পরিচিত বুদ্ধিবৃত্তিক পথকে অতিক্রম করার একটি সাধনাগত উপায়। The Profit বিশেষভাবে যে জিনিসটি নিয়ে খেলে, তা হলো প্রজ্ঞার ভাষা—কোনো কথা কীভাবে গভীর শোনায়, এবং সেই গভীরতার ভঙ্গি আমাদের বিচারকে কতখানি প্রভাবিত করে।

এই কারণেই এখানে Fool ও Sage-এর সীমারেখাও স্থির থাকে না। গুরুর কোনো কথা প্রথমে নিছক অর্থহীন বলে মনে হতে পারে; অথচ সেই কথাই যদি আমাদের পরিচিত কোনো সত্যকে অন্যভাবে দেখতে বাধ্য করে, তবে Fool অপ্রত্যাশিতভাবে Sage-এর কাজ করে বসে। গুরু নিজে সত্যের অধিকারী কি না, তার চেয়ে তখন বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর কথার ফলে পাঠকের চিন্তায় কী ঘটছে।

সম্ভবত এইখানেই হাসির একটি বিশেষ জ্ঞানতাত্ত্বিক মূল্য আছে। গাম্ভীর্য প্রায়ই কর্তৃত্ব দাবি করে; হাসি সেই কর্তৃত্বে সামান্য ফাটল ধরায়। আর ফাটল ধরলেই যে সত্য বেরিয়ে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সেই মুহূর্তে অন্তত কথাটিকে তার গাম্ভীর্যের আবরণ থেকে আলাদা করে আবার বিচার করার অবকাশ তৈরি হয়। হাসি এখানে প্রজ্ঞার নিশ্চয়তা নয়; বরং কখনো সেই বিরতি, যার মধ্যে বিশ্বাস, সংশয় ও বিচারবোধ নতুন করে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করতে পারে।

কোনো বাক্যকে আমরা প্রাজ্ঞ বলে চিনব কীভাবে? তার বক্তব্য দিয়ে, না তার ভঙ্গি দিয়ে?

প্রকৃতির উপমা, ছন্দিত গদ্য, বৈপরীত্য, বিমূর্ত শব্দ এবং বক্তার নিশ্চয়তা—এসবের সমন্বয়ে কোনো সাধারণ কিংবা অস্পষ্ট বক্তব্যও গভীর বলে প্রতীয়মান হতে পারে। The Profit এই গভীরতার ভাষাটি প্রায় অক্ষুণ্ণ রেখে কখনো তার মধ্যে এমন বক্তব্য স্থাপন করে, যা শেষ পর্যন্ত নিজের অসারতা প্রকাশ করে দেয়। এই অর্থে বইটি শুধু The Prophet-এর parody নয়; কোনো কোনো জায়গায় তাকে গভীরতার ব্যাকরণের parody বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু এখানে পাঠকের জন্য বিপরীত একটি বিপত্তি অপেক্ষা করে। গভীর বলে প্রতীয়মান সব কথাই যেমন গভীর নয়, তেমনি অর্থহীন বলে প্রতীয়মান সব কথাই অর্থশূন্য নয়।

The Profit-এর প্রতিটি কৌতুকের মধ্যে গভীর তাৎপর্য খুঁজতে যাওয়াও তাই সমীচীন হবে না। ‘Fate’ সম্পর্কে প্রশ্ন ভুল শুনে গুরু যখন ‘Freight’ নিয়ে উত্তর দেন, সেখানে কোনো দর্শন খোঁজার প্রয়োজন নেই; শব্দের ভুল শোনাই কৌতুকের যথেষ্ট কারণ। অর্থহীনতারও নিজস্ব কৌতুকমূল্য আছে। প্রতিটি nonsense-কে প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত করতে গেলে বরং nonsense ও প্রজ্ঞার মাঝখানে বইটি যে অনিশ্চিত ক্ষেত্র তৈরি করে, তার স্বাতন্ত্র্যই নষ্ট হবে। অথচ অন্য কোনো জায়গায় ব্যাপারটি এত সহজ নয়। সেখানে পাঠের অভিজ্ঞতাটি যেন তিনটি মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যায়। প্রথমে একটি বক্তব্যকে প্রজ্ঞা বলে মনে হয়। তারপর তার অসংগতি প্রকাশিত হয় এবং আমরা হাসি। কিন্তু হাসির পর কখনো আবার মনে হয়—কথাটি কি সত্যিই সম্পূর্ণ অর্থহীন ছিল?

এই তৃতীয় মুহূর্তটিই আমার কাছে বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাহিত্যিক সম্ভাবনা। একে আমি বলতে চাই—Wisdom from Mystical Nonsense — মরমি অর্থহীনতা থেকে উঠে আসা প্রজ্ঞা।

মরমি অর্থহীনতাকে প্রজ্ঞা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, কখনো তার মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞার একটি সম্ভাবনা জন্ম নিতে পারে। একটি উদ্ভট উত্তর আমাদের প্রশ্নটির ভুল ভিত্তি চিনিয়ে দিতে পারে; একটি আপাত-গম্ভীর উচ্চারণ ভেঙে যাওয়ার পরও তার ভিতরের কোনো সত্য অক্ষত থাকতে পারে। এই দিক থেকে The Profit-এর গুরুকে কোনো একটি স্থির পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা কঠিন। কখনো তাঁর মধ্যে নবীসুলভ গাম্ভীর্যের parody দেখি, কখনো নির্বোধের সরলতা, কখনো বিক্রেতার বাস্তববুদ্ধি, কখনো trickster-এর ছল ও কৌতুক; আবার কোনো কোনো মুহূর্তে তাঁর মুখ দিয়েই একটি যথার্থ পর্যবেক্ষণ বেরিয়ে আসে। তাঁর কর্তৃত্বও তাই স্থির নয়। যে গাম্ভীর্যের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলতে শুরু করেন, পরের মুহূর্তেই নিজের কথায় সেই গাম্ভীর্য ভেঙে দিতে পারেন।

ফলে বক্তা নিজে প্রাজ্ঞ কি না, সেই প্রশ্নের মীমাংসা না করেও তাঁর কথা প্রজ্ঞার উপলক্ষ হতে পারে। প্রজ্ঞা তখন বক্তার কাছ থেকে প্রস্তুত অবস্থায় পাঠকের হাতে আসে না; বক্তার কথা, তার অসংগতি এবং পাঠকের বিচারের পারস্পরিক সংঘাতের মধ্যেই কখনো তার উদ্ভব ঘটে। এই জায়গাতেই বইটি শেষ পর্যন্ত পাঠকের বিচারবোধকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কোনো কথাকে সত্য বা গভীর বলে গ্রহণ করি কেন? বক্তার মর্যাদা, তাঁর নিশ্চয়তা, বাক্যের সৌন্দর্য কিংবা রহস্যময়তার কারণে? নাকি বক্তব্যটি আমাদের অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধের পরীক্ষায় টেকে বলে?

অন্যভাবে বললে, আমরা সত্য চিনতে পারি, নাকি সত্যের পোশাক চিনে তাকে সত্য বলে ভুল করি? কিন্তু এর বিপরীত প্রশ্নটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়: সত্য যদি পরিচিত পোশাক না পরে আসে, তখন কি আমরা তাকে চিনতে পারি? সম্ভবত এই দুই প্রশ্নের মাঝখানেই The Profit-এর কৌতুকের গভীরতর তাৎপর্য। এ কারণেই ১৯৭৩ সালের একটি হাস্যরসের বই আজও একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। বরং আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিবেশে প্রশ্নটি কোনো কোনো দিক থেকে আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য প্রেরণামূলক বাণী, জীবনদর্শন, self-help aphorism, corporate wisdom এবং আধ্যাত্মিক উক্তি আমাদের সামনে আসে। একটি সুন্দর ছবি, কয়েকটি সুচারু শব্দ, কোনো বিখ্যাত মানুষের নাম কিংবা সামান্য রহস্যময়তা একটি সাধারণ বক্তব্যকেও গভীরতার চেহারা দিতে পারে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অনায়াসে দার্শনিক বা মরমি বলে প্রতীয়মান বাক্য নির্মাণ করতে পারে।

ফলে পুরোনো প্রশ্নটি থেকেই যায়—গভীর শোনানো এবং গভীর হওয়া কি একই ব্যাপার?

আবার এর বিপরীতটিও সত্য। একটি কৌতুক, meme কিংবা আপাত-উদ্ভট বাক্য কখনো বাস্তবতার এমন কোনো অসংগতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারে, যা গুরুগম্ভীর আলোচনায় সহজে ধরা পড়ে না। অর্থহীনতা প্রজ্ঞার পোশাক পরতে পারে; প্রজ্ঞাও কখনো অর্থহীনতার পোশাকে আমাদের সামনে আসতে পারে। কাজেই শেষ পর্যন্ত দায়িত্বটি পাঠকের বিচারবোধের ওপরই ফিরে আসে। এখানে এসে The Prophet ও The Profit-এর পার্থক্যটিও অন্যভাবে দেখা যায়। জিবরানের আলমুস্তাফা সাধারণ জীবনের প্রেম, শ্রম, দুঃখ, আনন্দ ও মৃত্যুর মধ্যে বৃহত্তর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আবিষ্কার করেন। The Profit-এর গুরু যেন বিপরীত কাজটি করেন—আধ্যাত্মিক উচ্চারণকে বারবার টেনে নামান বাজার, বস্তু, শরীর এবং দৈনন্দিন জীবনের মাটিতে। এখানে আগের নির্দিষ্ট পণ্যগুলোর তালিকা আর প্রয়োজন হয় না; এই অবতরণই কৌতুকটির মূল গতি।

জিবরানের গতি সাধারণ থেকে অতীন্দ্রিয়ের দিকে; The Profit-এর গুরুর গতি অতীন্দ্রিয় থেকে সাধারণের দিকে। একজনকে যদি উত্তরণের কবি বলা যায়, অন্যজনকে বলা যেতে পারে অবতরণের কৌতুককার। কিন্তু এই বিপরীত যাত্রা পরস্পরকে সম্পূর্ণ বাতিল করে না। জিবরান যদি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সাধারণ জীবনের মধ্যেও গভীরতা আছে, The Profit যেন তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি প্রয়োজনীয় সংশয় যোগ করে—গভীরতার মতো শোনালেই কি কোনো কথা গভীর হয়ে যায়?

একটি ভাষা আবেশ সৃষ্টি করে, অন্যটি সেই আবেশ ভাঙে। অথচ আবেশ ভেঙে যাওয়ার পরেও যদি কোনো সত্য অবশিষ্ট থাকে, তবে সম্ভবত সেই সত্য আরও কঠিন একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এল। এ কারণেই The Profit-কে শুধু The Prophet-এর একটি সফল parody হিসেবে পড়লে আমার মনে হয় বইটির একটি আকর্ষণীয় দিক অনালোচিত থেকে যায়। এখানে প্রজ্ঞা ও নির্বুদ্ধিতা, মরমি ভাষা ও nonsense, বাজার ও আধ্যাত্মিকতা, গাম্ভীর্য ও হাসি পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে তাদের সীমারেখা সবসময় নিশ্চিত থাকে না। কখনো আমরা গুরুর ওপর হাসি, কখনো তাঁর শ্রোতাদের ওপর; আবার কোনো কোনো মুহূর্তে বুঝতে পারি, আমাদের হাসির একটি অংশ নিজেদের জন্যও বরাদ্দ ছিল।

গুরুর প্রতিটি বাণী সত্য হলে পাঠকের কাজ সহজ হতো—তাঁকে বিশ্বাস করলেই চলত। প্রতিটি বাণী অর্থহীন হলেও কাজ সহজ ছিল—হেসে বই বন্ধ করা যেত। The Profit-এর আকর্ষণ সম্ভবত এই যে সে আমাদের এই দুই নিশ্চয়তার কোনোটিই দেয় না। তাই শেষ পর্যন্ত গুরু নিজে কতখানি প্রাজ্ঞ, সেটিই হয়তো প্রধান প্রশ্ন নয়। অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর সঙ্গে এই অদ্ভুত কথোপকথনের পরে পাঠক নিজের প্রজ্ঞা ও নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে সামান্য বেশি সচেতন হলেন কি না।

গুরু আমাদের প্রজ্ঞা দেন না; কখনো এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেখানে প্রজ্ঞা জন্ম নিতে পারে। এই ধারাবাহিক অনুবাদ পাঠের সময় তাই একটি কথাই মনে রাখা যেতে পারে—প্রতিটি অর্থহীনতার মধ্যে অর্থ খোঁজার প্রয়োজন নেই; আবার অর্থহীন বলে প্রতীয়মান হলেই কোনো কথাকে তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করারও প্রয়োজন নেই। মাঝখানের এই অনিশ্চিত জায়গাটিই সম্ভবত বইটির সবচেয়ে আনন্দময় এবং চিন্তাপ্রবণ অঞ্চল।

অর্থহীনতা সবসময় অর্থের শেষ নয়। কখনো সেখান থেকেই অর্থের শুরু; কখনো সেখান থেকেই প্রজ্ঞারও। মরমি অর্থহীনতা থেকে উঠে আসে যে প্রজ্ঞা।

সূ চ না

উপত্যকার পাদদেশে জনসমুদ্র।

হাজার হাজার মানুষ ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে চলেছে।

চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এক রহস্যময় গমগম ধ্বনি, যা বহু মাইল দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিল।

তিনি কি এখনো নামেননি? স্বার্থপরের মত চিৎকার করে উঠল এক ব্যবসায়ী।

আমি তাকে কোথায় দেখতে পাব, একজন বৃদ্ধা আর্তনাদ করে উঠল।

আমি তাঁর অপেক্ষায় আছি একশ বছরেরও বেশি... কৃশকায় এক বৃদ্ধ বিড়বিড় করলেন।

ঠিক তখনই দূরের কুয়াশার আড়াল ভেদ করে একটি ক্ষীণ অবয়ব ভেসে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সমবেত জনতা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তিনি এসেছেন, ফিসফিসিয়ে উঠল সবাই।

তাঁকে দেখতে প্রায় যুবকের মতো। অথচ তাঁর বয়স কত, আন্দাজ করা অসম্ভব।

দৈহিক উচ্চতায় তিনি খুব একটা লম্বা নন; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল এক অনন্য উচ্চতা।

সবাই যখন অপলক তাকিয়ে আছে, তিনি একটি পাথরের ওপর বসলেন।

নীরবে হাত দুটি বুকের ওপর ভাঁজ করে বলতে শুরু করলেন।

আমি এসেছি।

আমি ক্লান্ত।

তবু তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেব।

তবে আগে আমার জন্য কিছু খাবার আনো। পানীয় আনো।

আর, একটু সোনাও আনতে ভুলো না।

প্রতিটি উত্তরের বিনিময়ে লাগবে সামান্য কিছু রূপা।

প্রতিটি সংশয়ের মূল্য এক দ্রাখমা*। আর প্রতিটি চিন্তার দাম এক পেনি।

কারণ আমি দ্য প্রফিট। আজ যা জানি, তা জানতে আমার লেগেছে দশ-দশটি জীবন।

আর তোমরা যা এখন জানতে প্রস্তুত, তার মূল্য মাত্র দুই ডলার পঞ্চাশ সেন্ট*।

টিকা— *দ্রাখমা : প্রাচীন গ্রিসের প্রধান রৌপ্য মুদ্রা

*দুই ডলার পঞ্চাশ সেন্ট : ‘দ্য প্রফিট’ বইয়ের প্রথম সংস্করণের মূদ্রিত মূল্য

জি জ্ঞা সা স মূ হ

পর্বতের উপদেশ

ভিড়ের মধ্য থেকে এক লোক এগিয়ে এসে বলল, এখন কি আমি প্রশ্ন করতে পারি?

গুরু সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।

আচ্ছা গুরু, পর্বত থেকে আপনি কী শিক্ষা লাভ করেছেন?

সবই। শান্তভাবে উত্তর দিলেন তিনি ।

মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে কি কোনো জ্ঞান আছে?

গুরুর দৃষ্টি ধীরে ধীরে প্রশ্নকর্তার ওপর থিতু হলো। মুহূর্তেই জনতার মধ্যে যেন এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।

তারপর তিনি বললেন:

মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের জ্ঞান যৎসামান্য।

তবু এই জ্ঞান নিয়েই মানুষ নিজেকে পৃথিবীর অন্য সব প্রাণীর ওপর ঈশ্বরতুল্য মনে করে।

সে যে কত বড় ভ্রান্তির ভেতর বসবাস করছে, তা বোঝা যায় নিজের বুদ্ধিমত্তার ক্ষুদ্র অংশটিকে কী কাজে সে ব্যয় করছে, তা দেখলেই।

সে তার সোনাদানা নিয়ে গর্বিত।

জাগতিক ধন-সম্পদের পেছনে ছুটে বেড়ায়।

আর এই পুরো সময় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটুকু আঙুলের ফাঁক গলে বয়ে যাওয়া ঝরনা-জলের মতো ফসকে যায়।

এমন কিছু সে হাতছাড়া করে যা একবার হারিয়ে গেলে কোনো মূল্যেই আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, কারও কাছ থেকে যা ধার নেওয়া যায় না, বিক্রিও করা যায় না।

সময়? তবে কি সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ গুরু?

মৃদু হেসে উত্তর দিলেন গুরু, না, বৎস, তবে খুব কাছাকাছিই পৌঁছাতে পেরেছ।

জীবিকা সম্পর্কে

এরপর এক পণ্ডিত এগিয়ে এসে বললেন,

গুরু, আমার জন্য উপযুক্ত জীবিকা কোনটি, সে বিষয়ে আপনি পরামর্শ দেবেন?

তিনি বললেন:

কেউ কেউ তাদের মনের শক্তি বা মেধার জোরেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

অন্যদের নির্ভর করতে হয় নিজ হাতের শ্রম আর পিঠের ঘামে।

প্রকৃতির বিধানও এর ব্যতিক্রম নয়।

কিছু প্রাণী সহজেই তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে, যেমন খরগোশ, ঘোড়া আর হাতি।

অন্য প্রাণীদের আহারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়, যেমন ফ্লেমিঙ্গো, ছুঁচো আর পিঁপড়া।

তাই দেখতেই পাচ্ছো, মানুষের স্বভাবের সঙ্গে তার পেশা বা জীবিকারও মিল থাকা চাই।

কিন্তু আমার কোনো ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা বা প্রতিভাই নেই, গুরু, লোকটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

গুরু জিজ্ঞেস করলেন, কখনো শেয়ার দালাল হওয়ার কথা ভেবেছ?

চলবে