Published : 15 Aug 2025, 01:41 PM
তের আগস্টের দুপুরের রোদটা এমন বিষণ্ন হয়ে উঠবে কে জানত! জানতাম তিনি অসুস্থ, শুধু অসুস্থ না বেশ অসুস্থ। যে -কোনো সময় যে-কোনো কিছু হতে পারে। তবে মৃত্যু চির সত্য হলেও তাকে মেনে নেওয়া তো এত সহজ না। তাঁর মৃত্যু সংবাদও আমাকে বিচলিত করেছিল ভয়ানকভাবে। তাঁকে, যতীন সরকারকে আমি যে কেবল প্রিয় লেখকের জায়গায় স্থান দিয়েছি তা নয়, বরং দূরের থেকে আমার জীবনের দ্রোণাচার্যের ভূমিকায়ই তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন।একলব্য দ্রোণের কাছে যুদ্ধবিদ্যা শিখতে আগ্রহী হলে গুরুদেব গুরুদক্ষিণা হিসেবে তাঁর কাছে হাতের বুড়ো আঙুল দাবি করেন। ভক্তিভরে গুরুরূপী দ্রোনকে একলব্য নিজের কাটা আঙুল উপহার দিয়েছিলেন। আমার ‘গুরু’ প্রাতঃস্মরণীয় প্রাবন্ধিক যতীন সরকার নির্দয় নন, তিনি অক্লেশে মানুষকে জ্ঞান বিতরণ করে গেছেন। যতীন সরকার আমাদের দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক এবং সাধক। তিনি এমন কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন প্রগতিপ্রয়াসী যে-কোনো মানুষকে তাঁর লেখা আকৃষ্ট করবে। তাই তাঁর প্রয়াণ কেবলমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয় বরং এই সমাজের জন্য এক গভীর হাহাকারের ঘটনা। যতীন সরকার নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ(১৯৩৬) করেছিলেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (২০১০)-প্রাপ্ত এই বহুমাত্রিক লেখক প্রবন্ধ ও গবেষণায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ (২০০৭) পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পালন করেছেন ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র কেন্দ্রীয় সভাপতির ভূমিকা।
সমকালীন সকল প্রাবন্ধিকের মধ্যে সামাজিক ইতিহাসের মনস্বী চর্চায় অদ্বিতীয় সার্থকতায় তিনি শ্রেষ্ঠ। সমাজ এবং সাহিত্যচিন্তায় বুদ্ধিবৃত্তির ঔজ্জ্বল্যেও তিনি অনন্য। তাঁর দার্শনিক সত্তা ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গে অনেকটা সম্পর্কযুক্ত। আধুনিক সমাজমনস্কতার অঙ্গীকারে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘সত্য কখনো একমাত্রিক নয়, ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিলে সত্য খণ্ডিত হয়ে যায়, আর খণ্ডিত সত্য তো মিথ্যার সহোদর।’ নিরহঙ্কার, ধীরস্থির, সরল মানুষটির চরিত্র ছিল সততার সহজাত বর্মে আবৃত। দেশের প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করেও মনন-পরিক্রমা পূর্ণ করে শিল্প সৃষ্টিতে তিনি সবসময় ছিলেন সক্রিয়। অল্পায়াসলদ্ধ প্রাপ্তিতে তিনি সন্তুষ্ট হতেন না, তাই মনমতো না-হলে খসড়া লেখার ওপর কলমচালাতেই থাকতেন। ফলে ডানহাতের তর্জনীর একপাশ শক্ত হয়ে গিয়েছিল। মূলত ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ নামের আকর গ্রন্থরচনাকালে আঙুলের এ-দশা হয়েছিল। আশি বছর বয়সে এই বর্ষীয়ান লেখক কলম থামিয়ে দেন। আমৃত্যু আর লেখেননি। নেত্রকোনার সাতপাইয়ের ‘বানপ্রস্থ’ নামের বাড়িতে অনিয়মিতভাবে কেবল গ্রন্থ পাঠ করে মন্দাক্রান্তাচালে জীবনের গোধূলিবেলা পার করেছেন। তাঁর কর্ম ও লেখালেখির ওপর এ-পর্যন্ত তিনজন গবেষক পিএইচডি করেছেন।
ছাত্রাবস্থায় যতীন সরকারের আত্মোপলব্ধি হয়, জ্ঞানের ভুবনে ডায়ালেকটিক বস্তুবাদী বা মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্তে না আনলে কারো পাণ্ডিত্য পূর্ণাঙ্গ হওয়া সম্ভব না। এটি জীবন ও জগৎকে অবলোকনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ডায়ালেকটিক বস্তুবাদের কেবল তাত্ত্বিক নয় বরং প্রায়োগিক দর্শনও তাঁর অন্বিষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত মার্কসবাদেই তিনি মুক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন। জ্ঞানের পরিধি বিস্তারে অনেকটা পিতৃপ্রভাবে পুরুষানুক্রমে জিজ্ঞাসু মনের অধিকারী যতীন সরকার ছোটবেলা থেকেই বইমুখি। এ কারণেই হয়ত উত্তর জীবনে আয়ত্ত করেছিলেন জীবনকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এক অনায়াস-শক্তি। ভিন্নমত গ্রহণ এবং যুক্তির নিরিখে তা বিশ্লেষণ করা তাঁর নিত্যকৃত্য ছিল। অন্যদিকে কারো মতামত গ্রহণযোগ্য না-হলে মন্তব্যদাতার সঙ্গে যতীন সরকারের মতান্তর ঘটে কিন্তু মনান্তর ঘটত না।
বিভিন্ন সভায় অপূর্ব তেজস্বী ভাষণ দেয়ায়ও তাঁর জুড়ি মেলাভার ছিল। যদিও শেষের দিকে শারীরিক অক্ষমতার কারণে ভাষণের পরিধি আর সর্বব্যাপ্ত ছিল না। বাড়িতেই সমগোত্রীয়দের সামনে মাঝে-মধ্যে বক্তৃতার ফুলঝুরি ছোটাতেন। ভক্ত-পরিবেষ্টিত পরিবেশে যখন কথা বলতেন, বোঝা যেত, যে বিষয়ে বলছেন তা তাঁর মনকে একেবারে দখল করে রেখেছে, জগতে তখন অন্য বস্তুর আর অস্তিত্ব নেই।
যতীন সরকারের গ্রন্থাবলির তালিকা দীর্ঘ। ‘পাকিস্তানের জন্মমত্যু-দর্শন’ (২০০৫) তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। আমরা জানি, দ্বিজাতিতত্ত্ব নামের প্রপঞ্চের চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটে এবং জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। যতীন সরকার ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ বইতে ইতিহাসের পরম্পরা ঘেঁটে বাংলাদেশের জন্মের সুবিশাল পটভূমির ওপর যেমন আলো ফেলেছেন, তেমনি ইতিহাসের নতুন পথের সন্ধানে সমাজ-রাষ্ট্রে যাঁর যে ভূমিকা ছিল অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাঁকে সে-স্থানে চিহ্নিত করতে ব্রতী হয়েছেন।
লীনা দিলরুবার ক্যামেরায় যতীন সরকারের আবক্ষ মূর্তি
কোনো ভাবালু উচ্ছ্বাস নয়, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের ওপর ভর করেও নয়, মূলত ঘটনা প্রবাহের ওপর নির্মোহতার আলো ফেলাই ছিল তাঁর বিবেচ্য বিষয়। বইটির জন্য তিনি ‘প্রথম আলো পুরস্কার’ (২০০৫) পেয়েছিলেন। ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ নামের আত্মজৈবনিক ঐতিহাসিক গ্রন্থটিতে তিনি দেখিয়েছেন, আদর্শ অসাম্প্রদায়িক সমাজ হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের আচার এবং বিশ্বাসের অস্ত্রকে পুঁজি করে কীভাবে যুদ্ধংদেহী হয়ে যায়। একসময় তারা হয়ে যায় নিজ বাসভূমে পরবাসী। এর জের ধরে হিন্দুরা উনিশশো সাতচল্লিশের পর স্বদেশ থেকে দেশান্তরি হতে আরম্ভ করে। ধর্মমত্ততা আর যুক্তিবোধের অভাব মানুষকে অন্ধ করে তোলে, যার ফায়দা লোটে বিশ শতকের চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা।
ধর্মসম্প্রদায়কে জাতি হিসেবে উপস্থিত করার ফলে এদেশে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে সেই অনিষ্টসাধনে ইন্ধনদাতা হিসেবে কীভাবে শাসকদল ভূমিকা পালন করেছিল বইতে যতীন সরকার সুনিপুণভাবে তা তুল ধরেছেন। একসময় হিন্দুরা দেশব্যাপী দুশমন হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে। এর পেছনে কারণ অনুসন্ধানে কোনো এক পক্ষকে দায়ী করে লেখক দায় সারেন নি। বরং হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষেরই অপরপক্ষের প্রতি অন্যায় আচরণকে বহুকৌণিকভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই দেখাশোনাগুলো ছিল পক্ষপাতশূন্য এবং নির্মোহ।
এ দেশে মৃত পাকিস্তানের প্রেতাত্মাকে অবলোকন করে লেখা সিরিজের দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘পাকিস্তানের ভূতদর্শন’। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে চূর্ণ করে কীভাবে এখানে মৃত পাকিস্তানের প্রেতাত্মাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সেই বাস্তবতাকেই নতুন ইঙ্গিত এবং নতুন মাত্রিকতা দিয়ে বইটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য মননশীল গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর লেখা দুটো সারবান এবং চিন্তাশীল গ্রন্থ ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’ এবং ‘আমার নজরুল অবলোকন’। সাহিত্যের এই দুই নক্ষত্রকে নিয়ে লেখা লেখকের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে মনোজ্ঞ গ্রন্থগুলোতে।
‘আমার নজরুল অবলোকন’ লেখকের ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাতটি গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা নজরুল সম্পর্কিত ভাবনাগুলোর সমষ্টি। গ্রন্থটিতে যতীন সরকার দেখিয়েছেন, সারাজীবন স্তাবক ও নিন্দুক উভয় পক্ষেই অনেকে নজরুলকে ভুল বুঝেছেন। নজরুলের সমগ্রতাকে অনুধাবন করতে না পেরে খণ্ডিত নজরুলকে নিয়েই তাঁরা মেতে থেকেছেন। হতে পারে অখণ্ড নজরুলের ব্যাপ্তি এবং বিভা এমনই যে সেটিকে ধারণ করার ক্ষমতা গড়পড়তা বাঙালির নেই। তাই নজরুলের স্তব ও নিন্দা উভয়ই আংশিক এবং বিকৃত। যতীন সরকারের কৃতিত্ব এ-জায়গায় যে, অখণ্ড ও সমগ্র নজরুলকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন তিনি। হিন্দু ও মুসলমানের অখণ্ড ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে নজরুল কীভাবে মহৎ কবিতে রূপান্তরিত হলেন সেটিও তিনি দেখিয়েছেন। এছাড়াও, নজরুলের মূল্যায়নে মার্কসীয় সমালোচনার নতুন দ্বারোন্মোচন করেছিলেন তিনি। পণ্ডিতম্মন্য আধুনিক সমালোচকরা যে-দৃষ্টিকোণ থেকে নজরুলকে মূল্যায়ন করেছেন, যেভাবে খণ্ড, ক্ষুদ্র ও হেয় করার চেষ্টা করেছে নজরুলকে, তারই প্রবল প্রতিবাদ আছে যতীন সরকারের লেখায়। এদিক দিয়ে দেখলে, মানুষ নজরুল, কবি ও লেখক নজরুল, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকৃত বার্তাবাহী নজরুলের প্রতি ইতিহাসের দায়মোচন করেছেন তিনি।
‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’-এ যতীন সরকার রবীন্দ্রনাথ নামের অনন্যসাধারণ এবং বর্ণাঢ্য চরিত্রটিকে সমগ্র অবয়বে দেখার প্রয়াস পেয়েছে। অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথের বহুধাবিস্তৃত সৃষ্টি যতীন সরকারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গ্রন্থটির বারোটি প্রবন্ধের প্রথমটিতে যতীন সরকার রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটির ঘটনাধারার বহিঃসত্তা এবং নায়ক উপেনের ভাবনাধারার মাধ্যমে সৃষ্ট রবীন্দ্রনাথের অন্তঃসত্তার মধ্যে ঐক্যের মাধ্যমে তৈরিকৃত যুগ্মসত্তা কীভাবে ডায়ালেকটিকাল সামঞ্জস্য ঘটিয়ে কবিতাটিকে মাহাত্ম্য প্রদান করেছে তার ব্যাখ্যা হাজির করেন। প্রবল কাণ্ডজ্ঞানের অধিকারী রবীন্দ্রনাথ জন্মসূত্রে সমাজের উচ্চাসনে বসে সমাজের তলে বসবাসকারী উপেন তথা এই শ্রেণীকে করুণার দৃষ্টিতে না-দেখে যেন ইতিহাসের মূল নায়ক হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের ভাষার ওজস্বিতা, বর্ণনার তীক্ষ্ণতায় যে আবেদনময় আবেগ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যতীন সরকারের বিশ্লেষণে তার তাৎপর্য পাঠককে কবিতাটি সম্পর্কে নতুনভাবে সচেতন করে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়া বইতে দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজবিজ্ঞানী নানাপরিচয়ের রবীন্দ্রনাথকে এবং তাঁর সৃষ্টিকর্মকে ভিন্ন ভিন্ন প্রবন্ধে সাহসী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যতীন সরকার উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের উদার মানবিকতা, তীক্ষ্ণ সৌন্দর্যানুভূতি, প্রবল অনুসন্ধিৎসা, অদম্য জীবনতৃষ্ণা ইত্যাদির মাধ্যমে যেভাবে তাঁকে নতুন দৃষ্টিকোণ দেখা হল তাতে যতীন সরকারের ভূমিকাকে অবিসংবাদিত বললে অত্যুক্তি হয় না।
লীনা দিলরুবার ক্যামেরায় নিজ বাসভূমে যতীন সরকার
‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ (১৯৮৫) দিয়ে শুরু, এরপর যতীন সরকারের অসংখ্য লিখিত এবং সম্পাদিত বই অপসৃয়মান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এদেশের সাহিত্যপ্রেমিক এবং শিল্পরসবেত্তারা তাঁর লেখার সঙ্গে সুপরিচিত। বিভিন্ন বইয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর যুক্তির সারবত্তা, পরিশীলিত ভাষা, বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত গঠন-কাঠামো যতীন সরকারকে দার্শনিক এবং প্রাবন্ধিক হিসাবে যে অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিল সেটি যেমন বিশিষ্ট, তেমনি ব্যতিক্রমীও।
‘আমাদের চিন্তাচর্চার দিক-দিগন্ত’ বইতে তিনি হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের মানুষের মানস এবং ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন একসময় বিষময় হয়ে উঠে, এর পরই মূলত সৃষ্টি হয় পাকিস্তান রাষ্ট্র। এদিকে মুসলমানদের মধ্যে যেমন আশরাশ আতরাফ নিয়ে বিভক্তি ডেকে আনে, হিন্দুদের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে জাতপাত প্রথা। যতীন সরকার কেবল চিন্তক ছিলেন না, তিনি চিন্তাকে প্রয়োগ করেছেন। লেখালেখি, সংস্কৃতিচর্চা এবং রাজনীতির মাধ্যমে তিনি চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, এবং এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন এদেশের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলে। মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় সভা-সমিতি করে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে সংগঠকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে একসময় শত্রুদের কাছে চিহ্নিত হয়ে পড়েন। প্রাণরক্ষার তাগিদে বাবা-মা এবং কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে নিয়ে পরে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ‘বাঘমারা শরণার্থী শিবির’-এ আশ্রয় হয় তাঁদের। যদিও একমাত্র পুত্র এবং স্ত্রীকে শত্রুবেষ্টিত দেশে রেখে যেতে বাধ্য হন তিনি। শরণার্থী শিবিরে যতীন সরকার একদিন শোনেন জীবন রক্ষার তাগিদে তাঁর স্ত্রী-সহ শ্বশুরকূলের আত্মীয়স্বজন মুসলমান হয়ে গেছেন। বিষয়টিকে তিনি এবং তাঁর পরিবার সহজভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন। বোধগম্য যে, তাঁদের পারিবারিক শিক্ষা এবং সুরুচির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছিল।
চিন্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে খরা চলে আসছিল যতীন সরকার সেই জায়গায় নিজের চরিত্রবল নিয়ে আলো ছড়িয়ে গেছেন। তিনি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন, এ-ক্ষতি অপূরণীয়। গোটা কর্মজীবন মার্কসীয় মতাদর্শ অবলম্বন করে তিনি নিজেকে বিকশিত করেছেন। তাঁর মহাপ্রয়াণে জাতি কেবল একজন মার্কসীয় চিন্তাবিদকে হারায়নি, বরং একজন অভিভাবককে হারিয়েছে। আমার দ্রোণাচার্যের মহাপ্রয়াণে আমিও এলোমেলো হয়ে গেছি। তিনি নেই, এখন তাঁর গ্রন্থই কেবল আমাদের দেখাতে পারে বেদনা আর বিষাদকে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার রাস্তা।