এম এন রায়: মেক্সিকো-প্রবাসের স্মৃতি-১১

তখন দলটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তারা মেক্সিকোতে রয়েছে যে দেশে একজন কালো মানুষ সবচেয়ে শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিটির মতো একই মর্যাদার অধিকারী।

প্রিসিলা রাজপ্রিসিলা রাজ
Published : 31 March 2024, 11:38 AM
Updated : 31 March 2024, 11:38 AM

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার আরবেলিয়া গ্রামে শাক্ত ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্য পরিবারে ১৮৮৭ সালে জন্ম নরেন্দ্রনাথের যিনি পরে এম এন রায় হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামী, কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সমধিক পরিচিতি উদার মানবতাবাদের (radical humanism) তাত্ত্বিক ও প্রবক্তা হিসেবে। বিপ্লবী জীবনে তাঁকে বহু ছদ্মনাম নিতে হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি প্রয়াত হন এই মনিষী।

মেক্সিকো সফর তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। এক অর্থে তার রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও মানবেন্দ্রনাথের মেক্সিকো-সফর বড় ধরনের বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইংরেজিতে লিখিত তাঁর স্মৃতিকথা Memoirs ১৯৬৪ সালে দিল্লী থেকে প্রকাশিত হয়। ৬২৮ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ স্মৃতিকথার শতাধিক পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মেক্সিকো বাসের রোমাঞ্চকর ও ঘটনাবহুল স্মৃতি। মূল গ্রন্থের ৫ম অধ্যায় থেকে ২৯ অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সেই স্মৃতিচারণ। স্মৃতিকথার এই নির্বাচিত অংশ কলামিস্ট অনুবাদক প্রিসিলা রাজ-এর অনুবাদে ধারাবাহিকভাবে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আজ থাকছে মেক্সিকো সফরের একাদশ পর্ব। এই অনুবাদে মূল বইয়ের পর্ব-বিন্যাস অনুসরণ ও উল্লেখ করা হয়েছে।

১৫

মেক্সিকোয় মার্কসবাদ ও নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদ

১৯১৭’র শেষদিকে উত্তরবাসী ক্ষমতাধর প্রতিবেশীর সঙ্গে মেক্সিকোর সম্পর্ক বড়্ই নাজুক হয়ে উঠল। কাইজারদূতের গোপন সফরের ফলে জার্মানির প্রভাব আরো বেড়ে গেল। জার্মানির সহযোগিতায় বেশ শক্তিশালী একটা রেডিও স্টেশন বসানো হয়েছিল। বার্লিন ও নয়াবিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হলো তার দৌলতে। মেক্সিকো সিটি শুধু যে জার্মান প্রচার-প্রোপাগান্ডার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হলো তা-ই নয়, আমেরিকা ও কানাডাকে লক্ষ্য করে নানা ধরনের কৌশলগত অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতাও এখানে থেকেই পরিচালিত হতে লাগল। জার্মান প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকাও তার চাপ বাড়াতে লাগল ক্রমশ। গণমাধ্যমে কাররান্সা সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রোপাগান্ডা জোর কদমে চলতে লাগল। গৃহযুদ্ধের গভীর ক্ষতে ভুগলেও মেক্সিকোয় গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। দেশের প্রধান দৈনিকগুলোর অর্থের যোগান আসত বিদেশী শক্তির কাছ থেকে। বহিঃশক্তির অর্থপুষ্ট প্রধান দৈনিকগুলোতে কাররান্সা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিষোদ্গার চলমান ছিল। তাঁর সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থানকে তারা জার্মান পক্ষপাতিত্ব বলে অভিযুক্ত করল। দিনের পর দিন মেক্সিকোর জনগণকে খোঁচানো হতে লাগল এই বলে যে, নিরপেক্ষতার নীতি ত্যাগ করে মেক্সিকোর উচিত অবিলম্বে মিত্রবাহিনীর পক্ষাবলম্বন করে সম্মানিত বোধ করা। মিত্রবাহিনীর পক্ষে প্রধান সাফাইগায়ক ছিলেন এক ইতালীয় সাংবাদিক। মেক্সিকোর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন ইনি। এই প্রচার-প্রপাগান্ডার প্রধান খুঁটি জেনারেল ওব্রেগন কাররান্সা সরকারের বিরুদ্ধে যিনি প্রায় কোনো রাখঢাক না রেখেই সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

মেক্সিকোর সংবিধানের জাতীয়করণ বিষয়ক অনুচ্ছেদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ প্রায় চরমে উঠল। মেক্সিকো সরকারের মতে, দেশের খনিজ সম্পদ বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম নিয়ে ব্যবসারত বিদেশী কোম্পানিগুলোকে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল তা সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের বলে খারিজ হয়ে গেছে। ওদিকে বিদেশী কোম্পানিগুলো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ভয় দেখাচ্ছিল, পাশাপাশি সংবিধানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন করছিল। তবে মেক্সিকো সরকার আপোসরফায় আগ্রহী ছিল। তাদের শর্ত, যেহেতু (পোরফিরিও) দিয়াস সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা নতুন সংবিধান বলবৎ হওয়ার মাধ্যমে বাতিল হয়ে গেছে সেহেতু পুরানো বিদেশী কোম্পানিগুলোকে নতুন করে ইজারা দেওয়া হবে। কিন্তু কোম্পানিগুলো রাজী হলো না এতে। মেক্সিকো সরকার তখন জাতীয় সম্পত্তি এই যুক্তিতে পেট্রোলিয়াম রপ্তানি বন্ধ করে দেবে বলে হুমকি দিল। এর পেছনে জার্মান সরকারের হাত থাকতে পারে বলে কারো কারো সন্দেহ হয়েছে নিশ্চয়ই। তবে একইসঙ্গে মেক্সিকো সরকারের যুক্তিও অস্বীকার করার উপায় নেই। একটা আপোসরফা হওয়া সম্ভব ছিল এবং কমজোর পক্ষ হিসেবে মেক্সিকো তাতে আগ্রহীও ছিল। তবে দেশের মৌলিক আইন লঙ্ঘন করে বিদেশী কোম্পানিগুলোর ব্যবসা চালিয়ে যাবে এটা তারা কোনোভাবেই মানতে রাজী ছিল না।

এ বিষয়ে একটা পরীক্ষামূলক মামলা মেক্সিকোর সুপ্রিম কোর্টে উঠল। আদালত দেশের সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে রায় দেবে না ধারণা করে মার্কিন সরকার মেক্সিকো সরকারের স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং আইনসিদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্য চলমান রাখতে উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে সৈন্য নামানোর হুমকি দিল। তাদের যুক্তি পেট্রোলিয়াম ফিল্ডগুলো যেহেতু ব্যক্তিমালিকানার সম্পত্তি সেহেতু পেট্রোলিয়াম রপ্তানি নিষিদ্ধ করার অর্থ এই সম্পদ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা। এভাবে আমেরিকা মেক্সিকোর জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস জোর করে দখল করার হুমকি তো দিলই, অন্যদিকে মেক্সিকান ডাকাতরা সীমান্ত পার হয়ে উপদ্রব করে এই অভিযোগ এনে তাদের প্রতিহত করার অজুহাতে মার্কিন সৈন্যদল উত্তর সীমান্ত অতিক্রম করে মেক্সিকোর ভেতরে ঢুকে পড়ল।

এসব ঘটনার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল পুরো মেক্সিকো সিটি জুড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যে মার্কিনবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে উঠল। এখানে বসবাসরত আমেরিকান নাগরিকদের ওপর এর আঁচ পড়ার আশঙ্কা বাড়ল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো তর্ক-বিতর্ক বাধলে মার্কিনিরা অপমান, এমন কী মারধোরের শিকার হওয়ার শঙ্কা তৈরি হলো। মিত্রবাহিনীবান্ধব দৈনিকগুলো বিদেশী পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলো সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করে ঠিক করছে এসব বলে এবং এর পেছনে জার্মান সরকারের ইন্ধন আছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের ক্রোধ আরো বাড়িয়ে দিল। এমন এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সাধারণ মেক্সিকানদের মধ্যে মার্কিনবিরোধিতার যে ঢেউ এনেছিল তা একটা ঘটনা বললে আরো পরিষ্কার হবে।

ওই সময়েই বিখ্যাত মার্কিন মুষ্টিযোদ্ধা জ্যাক জনসন দেশ থেকে পালিয়ে এসে মেক্সিকোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শ্বেতাঙ্গিনীকে বিয়ে করাই তাঁর অপরাধ। মেক্সিকোতে তিনি সরকারি সহায়তা নিয়ে কালোদের জন্য একটা কৃষিভিত্তিক কলোনি স্থাপনের চেষ্টা করছিলেন। পাশাপাশি মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর ব্যবস্থায় তরুণ সৈনিকদের মুষ্টিযুদ্ধের পাঠও দিচ্ছিলেন।

ইং-মার্কিন বাসিন্দাদের সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র ছিল ফ্যাশনদুরস্ত আভেনিদা দে মাদেরোতে অবস্থিত স্যানবোর্নস ওষুধের দোকানটি। পুরোপুরি মার্কিন ধাঁচের দোকানটায় ওষুধের পাশাপাশি সাজগোজের উপকরণ এবং মিষ্টিজাতীয় খাদ্যদ্রব্যও বিক্রি হতো। তবে ওষুধের দোকানের মূল পণ্য নানান রঙের ঠাণ্ডা পানীয় সরবরাহের সোডা ফাউন্টেন বা ঝর্না। উচ্চশ্রেণীর ওষুধের দোকানগুলোতে চা-ঘর, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁও থাকে। কেতাদুরস্ত লোকজন সেখানে সামাজিকতা করে। স্যানবোর্নের আইসক্রিম বিখ্যাত। দারুণ কফিও পাওয়া যায়। ওরিসাবা নামের মেক্সিকান কফি তো জগদ্বিখ্যাত। জীবনের ভাল ভাল জিনিস পায়ে ঠেলতে নেই সে শিক্ষা ততদিনে হয়ে গেছে আমার। ফলে জায়গাটাতে ঢুঁ মারতাম। কখনও একা যেতাম। কুঁড়ের দলের সদস্যরাও সঙ্গী হতো মাঝেসাঝে। একা গেলে চুপচাপ বসে একটা ভিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দাদের আচার-আচরণ লক্ষ করতাম। এরকম নিঃসঙ্গ বিহারের এক দুপুরে স্যানবোর্নে বসে আছি, এমন সময় একটি সুপুরুষ লম্বা নিগ্রো দোকানে ঢুকল। যুবকটির সঙ্গে একটি শ্বেতাঙ্গ নারী। খালি টেবিলের খোঁজে চারদিকে চোখ বুলিয়ে তারা ঘরের পেছনদিকে গিয়ে একটা টেবিল দখল করে বসল। দোকানে যথেষ্ট ভিড় তখন। ওরা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশটা কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। সেটা বুঝতে পেরে যুগলটিকে লক্ষ করতে লাগলাম আমি। ওরা ওখানে বসে থাকল বেশ কিছুক্ষণ কিন্তু কেউ তাদের অর্ডার নিতে এল না। অবশেষে মেয়েটি একটি ওয়েট্রেসকে ইশারায় ডাকল। মেয়েটি কাছে গেলে ওদের মধ্যে কিছু বাতচিৎ হলো। তারপর বেয়ারা মেয়েটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে সরে গেল। মেয়েটি যে অপমানের ঘায়ে ক্রুদ্ধ সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু তার কৃষ্ণ সঙ্গীটি উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্গিনীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ দেহ ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা মেয়েটির ওপর ছায়া ফেলল। কিছুই হয়নি এমন ভাব করে সঙ্গিনীর হাত ধরে বেরিয়ে গেল যুবক।

মার্কিন রেস্টুরেন্টে নিগ্রোদের ঢুকতে দেওয়া হয় না সেটা আমার জানা ছিল। কালোদের এমন কী শ্বেতাঙ্গ মালিকানার সেলুনেও ঢুকতে দেওয়া হয় না। কিন্তু আমরা আমেরিকায় নয়, মেক্সিকোয় আছি। মিশ্ররক্তের মেক্সিকান জাতির বহুজাতিক মানসিকতার জন্য যথেষ্ট খ্যাতি আছে। নিগ্রো যুবকটির পরিচয় বুঝতে পারিনি। তখনও জানতাম না জ্যাক জনসন মেক্সিকোয় উপস্থিত হয়েছেন। তবে অপমানিত যুগলটির জন্য যথেষ্ট সহানুভূতি হলো আমার। সেই সহানুভূতি রাগে রূপান্তরিত হলো যখন দোকানঘরে উপস্থিত লোকজনকে হাসাহাসি করতে দেখলাম। রাগে-ক্ষোভে উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক করলাম এই দোকানে আর কোনোদিন পা রাখব না। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে সেনাপোশাক পরা একটা দল দোকানে এসে ঢুকল। তাদের সঙ্গে সেই নিগ্রো। তারা ঢোকামাত্র অনেক ক্রেতা দ্রুত দোকান ত্যাগ করল। সৈন্যদলটি ওয়েট্রেসদের ডেকে কয়েকটা টেবিল জোড়া দিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে আদেশ দিল। তারপর চেয়ারে বসে ম্যানেজারকে ডেকে পাঠাল। মিনমিনে দেখতে ম্যানেজার দৃশ্যে আবির্ভূত হয়ে ভাবগম্ভীর ব্যক্তিত্ব ধারণের চেষ্টা করে। সৈন্যদলটি একসঙ্গে হেঁকে ওঠে, “জ্যাক, মিস্টার স্যানবোর্নকে তোমার অর্ডারটা দিয়ে দাও।” এতক্ষণে বোঝা গেল এই যুবক আসলে বিখ্যাত জ্যাক জনসন। জনসন দেঁতো হাসি হাসলেও তাকে বিব্রত দেখাচ্ছিল। ম্যানেজার কয়েকজন ওয়েট্রেসকে ডেকে অর্ডার নিতে বলে। কিন্তু দলটির নেতা গোছের একজন ম্যানেজারকে বলে, “মেয়েগুলো আমাদের অর্ডার নেবে আর মিস্টার স্যানবোর্ন আপনাকেই ব্যক্তিগতভাবে জ্যাকের দেখভাল করতে হবে। ওদের যে অপমান করেছেন সেটার প্রতিকার এভাবেই করবেন আপনি।” ম্যানেজারকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। তখন দলটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে তারা মেক্সিকোতে রয়েছে যে দেশে একজন কালো মানুষ সবচেয়ে শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিটির মতো একই মর্যাদার অধিকারী। ওরা ম্যানেজারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিল। মেক্সিকোতে ব্যবসা করে খেতে হলে তাদেরকে এই দেশের আইন মেনে চলতে হবে, যে আইন সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছে।

ম্যানেজার সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দমন করেন। তারপর প্যান্ট্রিতে গিয়ে একটা ট্রেতে খাবার নিয়ে এসে নিগ্রো যুবকের সামনে রাখেন। যুবকটি উঠে দাঁড়িয়ে চওড়া মনখোলা হাসিমুখে লোকটির করমর্দন করে বলে, “যা হয়েছে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী মিস্টার স্যানবোর্ন।” তার আচরণে মদগর্বী ম্যানেজারের লজ্জায় অধোবদন হওয়ার কথা ছিল। দলটি কিছুক্ষণ পর উঠে বাইরে চলে গেল। সেখানে আনন্দে উন্মত্ত জনতার শোরগোল চলছে। তাদের মধ্যে থেকে মার্কিনবিরোধী বা দেশপ্রেম ফেটে বেরুনো কোনো শ্লোগান শোনা গেল না। তাদের উল্লাসের পুরোটাই ছিল নিগ্রো যুবককে ঘিরে। ওরা তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। বস্তুত তাদের উচ্ছ্বাস-উল্লাস সবই ছিল ন্যায়বিচারের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ। শুধুমাত্র গায়ের রঙ কালো বলে একজন মানুষ অপমানের শিকার হয়েছে। মেক্সিকানদের বীরত্ববোধ এর মধ্য দিয়ে মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদাকে উদযাপন করেছে মাত্র।

নিগ্রো যুবকের সঙ্গে পরে আমার একবারই দেখা হয়েছিল। হঠাৎ সেই দেখা হওয়ার সময় মনে হয়েছিল স্যানবোর্নের সেই অভিজ্ঞতা তার ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। তখন আমরা সোভিয়েত সংবিধানের স্প্যানিশ অনুবাদ ছাপার জন্য চাঁদা তুলছিলাম। সেইসময় তার সঙ্গে হঠাৎ একদিন পথে দেখা হয়ে গেল। আমার সঙ্গে ছিল আরউইন গ্র্যানউইচ। তাকে থামিয়ে আরউইন বলল, “দেখো জ্যাক, তুমি কি বলশেভিকদের বিরুদ্ধে?” নিগ্রো যুবক একটু থমকে গিয়ে বলল, “বিরুদ্ধে বলে তো জানি না।” আরউইন তখন চাঁদার কথাটা বলে। কেন দরকার সেটাও ব্যাখ্যা করে। জ্যাক তখন পকেট থেকে দশ ডলারের একটা নোট বের করে দিয়ে চওড়া হাসি দিয়ে বলশেভিকদের সৌভাগ্য কামনা করে।

মেক্সিকোতে তখন মার্কিনবিরোধী মনোভাব ক্রমশ দানা বাঁধছে। তবে এখানকার জনগণের সহজ আচরণে সহসা তা প্রকাশ পেত না। কিন্তু সরকারের মধ্যে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বেড়েই চলল। দেশের মধ্যবিত্ত অংশটি আমেরিকার আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাপারে যথেষ্ট রুষ্ট হলেও সশস্ত্র মার্কিন অভিযানের ব্যাপারে তাদের খুব বেশি মাথাব্যথা ছিল না। সামরিক বাহিনী ছাড়া আর কোনোভাবে মার্কিন আগ্রাসন ঠেকানোর উপায় সরকারের কাছেও ছিল না। কিন্তু সেই সেনাবাহিনী যে খুব ভরসাযোগ্য তা-ও নয়। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে জেনারেল ওব্রেগনের বেশ সমর্থন আছে সেটাও জানা ছিল। মেক্সিকোর গৃহযুদ্ধের ইতিহাসে নীতি-নৈতিকতার বালাইহীন অস্ত্রবাজির ধারা চলে আসায় পেশাদার সৈন্যদের কাছে টাকাটাই মূল হয়ে উঠেছিল। জেনারেল ওব্রেগনের ঝুলিতে রূপার ঝনঝনানির কমতি ছিল না।

ফলে সরকার সর্বত্র মিত্র খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো। লা মুহের মোদের্নার অট্টালিকা থেকে আমার চায়ের নেমন্তন্ন এল। গিয়ে দেখলাম ওটা লা মুহের মোদের্নার আর দশটা সাহিত্যবাসরের মতো আসর নয়। একটা আধা-আনুষ্ঠানিক আড্ডা। বিদেশমন্ত্রী ও চেম্বার অব ডেপুটির সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্টও আছেন আমন্ত্রিতদের মধ্যে। এর্নান্দেস তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ওই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন। বড় ভাই ভদ্রলোক আমার সঙ্গে পুরানো পরিচিতের মতোই আচরণ করলেন। পরিচয়ের কয়েক মুহূর্ত পরে উনি আমাকে একপাশে নিয়ে জানতে চাইলেন আমি ভুট্টাক্ষেতের মধ্যে ওই বাড়িতেই আছি কিনা। কূটনৈতিক ভঙ্গিতে একটু হেসে বললেন, বিভিন্ন মহলের লোকজন আমার ব্যাপারে কৌতূহলী তাই নিজের চলাফেরার ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকি। চিন্তা করতে নিষেধও করলেন কেননা আমার বাসার অবস্থানের কারণে পুলিশকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।

চেম্বার অব ডেপুটির প্রেসিডেন্ট তাঁর বন্ধু সান্তিবানঞেসের কাছে আমার সম্পর্কে শুনেছেন। তা থেকে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সোশ্যালিস্ট পার্টি অব মেক্সিকোর ভবিষ্যৎ বিষয়ে আলোচনা করতে চান তিনি। দন মানুয়েলকে দেখলাম বেশ সোজাসুজি কথা বলেন। তবে তাঁর আচরণে গাম্ভীর্য নেই মোটেই। সরাসরি মূল কথায় চলে যেতে পছন্দ করেন। আদর্শের দিক থেকে ভদ্রলোক সমাজতন্ত্রী। আইন পেশায় জড়িত আরো অনেকেই এই আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু কট্টর নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদীদের দ্বারা ভুল পথে চালিত হয়ে দেশের শ্রমিকরা তথাকথিত পাতিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাস করত না। কিন্তু এদেশের রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যদি নিতে হয় তবে দুই প্রধান সামাজিক গোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। তাঁর সঙ্গে একমত হলাম আমি। তারপর জিজ্ঞেস করলাম তিনি এবং তাঁর মতো আরো যাঁরা আছেন তাঁরা সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দিচ্ছেন না কেন? মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলেন প্রেসিডেন্ট মশাই, “যুক্তিবোধ আছে এমন মানুষের পক্ষে ওইসব অন্ধ নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদীদের নিয়ে কী করার আছে বলেন?” তাঁর বন্ধু সান্তিবানঞেস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারেন এবং সমাজতন্ত্রী দলকে পুনর্গঠন করতে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারি আমরা।

এবার মূল বিষয়টি তুলে ধরে বললাম, “আমাদের পক্ষে শ্রমিক শ্রেণীকে সংগঠিত করে মার্কিন আগ্রাসনের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং তাকে প্রতিরোধ করা কি সম্ভব নয়?” “কীভাবে?” সাগ্রহে প্রশ্ন রাখেন উনি। সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিলে পুরো পেট্রোলিয়াম শিল্প অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু তার প্রস্তুতি হিসেবে রাজধানীতে গণমিছিল নামাতে হবে। হতাশ হয়ে মাথা নাড়েন ভদ্রলোক। নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদীরা সব সরকারকেই এক চোখে দেখে। এই সরকার আর ওই সরকারের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই তাদের চোখে। আমাদের সরকারের সমর্থনে তারা গলা তুলবে না। তবে আমার বিশ্বাস ছিল সরকার যদি শ্রমিক শ্রেণীর অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার প্রতি সহানুভূতির সঙ্গে সাড়া দেয় তবে নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদীদের প্রভাবকে জয় করা সম্ভব। আমাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে দু’টো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল। প্রথমত, সান্তিবানঞেস ও সমাজতন্ত্রী দলের নির্বাচিত কয়েকজন নেতার সঙ্গে আমাদের বৈঠক হওয়া প্রয়োজন এবং দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার একটি সাক্ষাৎ একান্ত প্রয়োজন যাতে করে তাঁর সরকারের বিবেচনার জন্য একটি খসড়া শ্রমনীতি উপস্থাপন করতে পারি।

এই বৈঠকে বিদেশমন্ত্রী যোগ দিলেন কেবল একে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। ডন মানুয়েল তাঁর কাছে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ সংগঠিত করার যে আইডিয়া দিয়েছি তা ব্যাখ্যা করলেন। বিদেশমন্ত্রী শিক্ষা ও মেজাজের দিক থেকে আবার যতটা না স্প্যানিশ তার চেয়ে বেশি ফরাসী। এই পরিকল্পনার পেছনে শক্ত যুক্তির ভিত খুঁজছিলেন তিনি। ভদ্রলোক সমাজতন্ত্রী নন, তবে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। তখন আমি এমন এক ইউটোপিয় মার্কসবাদী ঝড়ের বেগে যে কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদেশমন্ত্রীর যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মবিশ্বাস আমার কাছে তাঁকে বুর্জোয়া হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যাই হোক, সরকারের এমন উচ্চপদে অধিষ্ঠিত লোকজন গুরুত্ব ও আস্থার সঙ্গে নেওয়ার বিষয়টা নিজের কাছে নিজের গুরুত্ব অনেকটা বাড়িয়ে দিলো আমার। আর তার ফলে নিজের আপোসহীন বিপ্লবী বিচার-বিবেচনা কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো।

পরদিন কুঁড়ের দলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বসলাম। তবে ওদের সবার সঙ্গে নয়, ওদের কেন্দ্রীয় দলটির সঙ্গে আলোচনা করলাম। ওই দলটি এল এরালদো-এর ইংরেজি বিভাগের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিল। মেক্সিকো আমাদের আশ্রয় দিয়েছে সুতরাং আমাদের আশ্রয়দাতার সাহায্য হয় এমন কিছু কি আমাদের করা উচিত নয়? আমার এই মার্কিন বন্ধুরা সকলেই লাল বিপ্লবী হওয়ায় পেট্রোল বাদশাদের হুঙ্কারকে ভাল চোখে দেখছিল না। কিন্তু তাই বলে আরেকটি বুর্জোয়া সরকারকে সমর্থন দিতেও রাজী ছিল না। সামাজিক বিপ্লবের স্বার্থে তারা বরং কাররান্সার বিপরীতে আলবারাদোকে সমর্থন দিতে আগ্রহী র্ছিল। কিন্তু আমি যুক্তি দিলাম, ওই মুহূর্তে মেক্সিকোর দুই রাজনৈতিক দল বা নেতার মধ্যে কাকে সমর্থন করা হবে সেই বিষয়টি মুখ্য ছিল না। ওই মুহূর্তে দ্বন্দ্বট ছিল বহিঃশক্তির ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মেক্সিকোর জাতীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে। কিন্তু প্রলেতারিয়েতদের তো কোনো পিতৃভূমি নেই। সুতরাং কী করে আন্তর্জাতিকতাবাদী সামাজিক বিপ্লবীরা এক শত্রুর বিরুদ্ধে গিয়ে আরেক শত্রুকে সমর্থন জানাবে? এই প্রশ্নে তাত্ত্বিকভাবে একমত হলাম আমি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই যুক্তিও হাজির করলাম যে, ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় প্রলেতারিয়েত শ্রেণীকে অবশ্যই ওই নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর সেদিক থেকে বর্তমান পরিস্থিতি তার জন্য একটি ভাল সুযোগ এনে দিয়েছে।

চার্লি হচ্ছে শান্তিবাদী মানুষ। তত্ত্বকথা নিয়ে তার কোনো বাতিক নেই। বিপ্লবী রাজনীতি বিষয়ে তার আগ্রহ বা সম্পৃক্ততা প্রাথমিকভাবে আবেগের জায়গা থেকে। তাদের প্রতি মেক্সিকো যে আতিথেয়তার হাত বাড়িয়েছে সেই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করার বিষয়টি তার মনে ধরল। স্বভাবসুলভ হঠকারিতায় সে ঘোষণা দিল, আমাদের সকলেরই সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দিয়ে তাকে বিপ্লবী গণসংগঠন রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করা উচিত। অন্যরা তাতে একমত হলো বটে তবে তাদের মধ্যে যথেষ্ট মানসিক বাধাও কাজ করছিল। ওদের মধ্যে বেকার ও গ্লিনটেনক্যাম্প ছিল ছন্নছাড়া বৈঠকখানার বিপ্লবী। রাজনীতি নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা ছিল না। আরউইন গ্র্যানউইচ আবার নৈরাজ্যবাদী কমিউনিস্ট। সে সামাজিক বিপ্লবে বিশ্বাসী হলেও রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক সংগঠনে বিশ্বাসী ছিল না।

মতপার্থক্যের এসব জায়গা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা যাবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রত্যেকে প্রত্যেকের কমরেড, –আর সকলেই তার নিজের জায়গা থেকে নিজের মতো করে সর্বহারা ও শোষিত জনগণের সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করে যাচ্ছে। আর তাই আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তাছাড়া যেহেতু আমরা মেক্সিকোতে আছি সেহেতু এদেশের শ্রমজীবী শ্রেণীর সংস্পর্শে থাকতে হবে আমাদের, তাদের সংগঠনে এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে হবে।

সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমরা সান্তিবানঞেসের সঙ্গে দেখা করতে চললাম। আমাদের সিদ্ধান্ত শুনে তিনি আনন্দে প্রায় আত্মহারা হলেন। আমাদের যোগদানের মধ্য দিয়ে সোশ্যালিস্ট পার্টি অব মেক্সিকো সত্যিকার অর্থে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে পরিণত হতে যাচ্ছে। দলটির ইতিহাসে এটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন। দিনটি অতিঅবশ্যই একটা উন্মুক্ত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হবে। তবে আমার প্রস্তাব ছিল, পার্টির নির্বাহী কমিটি যেন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপরে একটা জনসভায় পার্টির নতুন সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।

এই সুযোগে অন্যান্য সমাজতন্ত্রী যেমন চেম্বার অব ডেপুটির সভাপতির মতো লোকজন তাঁদের দলে যোগ দিতে আগ্রহী হতে পারেন সে খবরটাও সান্তিবানঞেসের কানে তুলে দিলাম। তবে তার জন্য তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আরো প্রসারিত করতে হবে সে কথাটাও জানাতে ভুললাম না। কথাটা শোনামাত্র সান্তিবানঞেস তাঁর কায়েমি স্বার্থের সমর্থনে ব্যাখ্যা শুরু করলেন। বললেন, এসব সুযোগসন্ধানী পার্লামেন্টারিয়ান আর বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীর দল শ্রমজীবী শ্রেণীকে কেবল ঘৃণার চোখেই দেখে। একটু মিইয়ে গেলেও মৃদু ভঙ্গিতে সতর্কতা উচ্চারণ করলাম। কোনো মানুষের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলে তা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে দোষ কী? বিশেষ করে তাতে যদি দলের শক্তি ও মর্যাদা দুটোই বাড়ে? জাতীয় যে সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে তা নিরসনে দল যদি ভূমিকা পালন করতে পারে তাহলে রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব অনিবার্যভাবে বেড়ে যাবে। কোনো সরকার তখন তাকে অবহেলা করতে পারবে না। এটাও ইঙ্গিত করলাম যে পার্টি যাতে সেই প্রয়োজনীয় ভূমিকা নিতে পারে সেজন্য সরকার তাকে সহায়তাও করতে পারে।

সান্তিবানঞেসের চতুর উকিল মন ইঙ্গিতটা ঠিকই ধরতে পারে। উনি আমাকে ডন মানুয়েলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। স্বীকার করলাম। সঙ্গে এও জানালাম যে অন্যদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। উনি তখন ছোট দলের নেতার সঙ্কীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে রীতিমতো উৎসাহ নিয়ে জানতে চাইলেন ডন মানুয়েল মায়েস্ত্রো কাসাসের কথা উল্লেখ করেছেন কিনা। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর মশাইও তাহলে সমাজতন্ত্রী? একটা চাল মারলাম। সান্তিবানঞেসকে বললাম ওসব দিক আমি দেখব। যদি তাঁর দলের নির্বাহী পর্ষদ সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী ত্যাগ করতে পারে তাহলে তাঁদের সবাই পার্টিতে যোগ দেবেন। তাছাড়া, সরকারও শ্রমজীবী শ্রেণীর বর্তমান অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়াও বিবেচনায় নেবে। যেহেতু এখানে নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদীরাই মূলত শ্রমজীবী শ্রেণীটির কথা বলে থাকে সেহেতু তাদেরকে লাইনে আনা কঠিন কিছু হবে না।

মেক্সিকোর কার্ল মার্কসের ফ্যাকাসে গালদুটোয় মৃদু লালিমা খেলে গেল। চশমার মোটা কাচের আড়ালে চোখ দুটোও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সারাটা জীবন তিনি অনর্থক কিছুতে ব্যয় করেননি তাহলে - হয়তো এরকম কোনো উপলব্ধির প্রতিফলন পড়েছিল তাঁর চোখেমুখে।

পাদটীকা

১.New World (নয়াবিশ্ব)। নিউ ওয়ার্ল্ড বা নয়াবিশ্ব বলতে পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধের সিংহভাগ বিশেষ করে দুই আমেরিকাকে বোঝায়। নয়াবিশ্ব অভিধাটি ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। এসময়টাকে ইউরোপ মহাদেশের আবিষ্কারের যুগ বলা হয় যখন ইতালীয় অভিযাত্রী আমেরিগো ভেসপুচি নিশ্চিত করে জানান যে, আমেরিকা আসলে নতুন মহাদেশ। এ বিষয়ে আমেরিগো ভেসপুচি একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন যার লাতিন শিরোনাম ছিল Mundus Novus. এ বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর থেকে ধ্রুপদী ইউরোপীয় ভূগোলবিদদের ভাবনার দিগন্ত অনেক প্রসারিত হয়ে ওঠে। এর আগে তাঁরা আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়া এই তিন মহাদেশ নিয়ে বিশ্ব গঠিত বলে ধারণা করতেন। আমেরিকা আবিষ্কার হওয়ার পরে আগের তিন মহাদেশকে পুরানো বিশ্ব বা Old World বা আফ্রো-ইউরেশিয়া বলে অভিহিত করা হতে লাগল।

তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/New_World

২. মিত্রবাহিনী (Allies of the World War I or Entente Powers)। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মিলিত বাহিনীকে মিত্রবাহিনী বলা হয়। এই বাহিনী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়ার মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয় হয়।

৩. Jack Johnson(জ্যাক জনসন)। ১৮৭৮-১৯৪৬। প্রথম কালো আমেরিকান বিশ্ব হেভিওয়েট মুষ্টিযুদ্ধ চ্যাম্পিয়ন। তাঁকে গ্যালভেস্টন জায়ান্ট বলেও ডাকা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের জিম ক্রো শীর্ষক বর্ণবাদী আইনের কঠোরতম প্রয়োগের সময় ১৯০৮ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। সর্বকালের প্রভাবশালী মুষ্টিযোদ্ধাদের অন্যতম জ্যাক জনসন। অসম সাহস, বর্ণবাদী আইন লঙ্ঘন এবং বিতর্কিত ও বর্ণিল জীবনের জন্য জ্যাক জনসন আমেরিকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আলাদা স্থান করে নিয়েছেন। ১৯১২ সালে “অনৈতিক উদ্দেশ্যে নারী পরিবহন”-এর অভিযোগে জনসনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঐতিহাসিক এই মামলা ষড়যন্ত্রমূলক বলে প্রমাণিত হয়েছে। মূলত শ্বেতাঙ্গ নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং বিয়ের কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক এই মামলা করা হয়। মামলায় জনসনের এক বছর এক দিনের জেল হয়। জামিনে বের হয়ে তিনি দেশের বাইরে পালিয়ে যান। ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও মেক্সিকোয় সাত বছর কাটিয়ে ১৯২০ সালে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। জেলের মেয়াদ কাটিয়ে মুক্তি পান পরের বছর। ১৯৪৬ সালের ১০ই জুন একটি রেস্তোরাঁয় খেতে যান জনসন ও তাঁর বন্ধু। গাত্রবর্ণের কারণে তাঁদের খাবার দিতে অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। ক্রুদ্ধ জনসন সেখান থেকে বেরিয়ে অত্যধিক জোরে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় টেলিগ্রাফের খুঁটিতে সজোরে ধাক্কা মারেন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।

https://en.wikipedia.org/wiki/Jack_Johnson_(boxer) দেখা হয়েছে ৯/০৪/২০২১।

৪. নিগ্রো। আফ্রিকার কালো গাত্রবর্ণের মানুষের বংশধর বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয় যা প্রায়শ নেতিবাচক বা অমর্যাদাসূচক অর্থ প্রকাশ করে। তবে এখানে লেখক “নিগ্রো” শব্দটি নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার করেছেন। কোনো অমর্যাদাকর অর্থে ব্যবহার করেননি। তাই আফ্রো-আমেরিকান বোঝাতে শব্দটি বাংলাতেও ব্যবহার করা হলো।

৫. Chamber of deputies. দশম অধ্যায়ের পরিশিষ্ট দেখুন।

৬. নৈরাজ্য-সিন্ডিকেটবাদী। Anarcho-syndicalist. চতুর্দশ অধ্যায়ের পরিশিষ্ট দেখুন।