কালের বিচারে ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনি

বৈদিক ভাষাকে বিশ্লিষ্ট করে ব্যাকরণের সূত্র নির্ধারণের প্রথম পর্যায়ে পাণিনি বাক্যকে একক হিসেবে ধরে নিয়েছেন; তারপরে তিনি বাক্যকে পদে বিভক্ত করেছেন যেখানে ক্রিয়ার মূল তো বটেই, নামশব্দের মূলও আলোচনাতে এসেছে।

ফয়জুল ইসলামফয়জুল ইসলাম
Published : 11 Feb 2024, 04:52 PM
Updated : 11 Feb 2024, 04:52 PM

বিশ্বের প্রথম বর্ণনামূলক ব্যাকরণের সূত্র প্রণয়নের ঘটনার সন্ধান আমরা পাই এই ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের ভাষাবিজ্ঞানী ও বৈয়াকরণ পাণিনি বিরচিত ব্যাকরণের মৌখিক সূত্রের সংকলনের নাম ‘অষ্টাধ্যায়ী’। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে পাণিনি তৎকালীন বৈদিক ভাষাকে সুত্রাবদ্ধ করে ‘সংস্কৃত’ নামের একটা নতুন সাহিত্যিক ভাষা প্রচলনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। তার ব্যাকরণ বিষয়ক সূত্রগুলোর সংকলনে রয়েছে মোট আটটা অধ্যায়: প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে সংজ্ঞা; দ্বিতীয় অধ্যায়ে সমাস, কারক, বিভক্তি ইত্যাদির সূত্র; তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে কৃৎপ্রত্যয়ের বর্ণনা; চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে তদ্ধিত প্রত্যয়ের নিয়মকানুন; ষষ্ট ও সপ্তম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে স্বরাঘাত ও ধ্বনির পরিবর্তন নিয়ে; এবং অষ্টম অধ্যায়ে রয়েছে সন্ধি নিয়ে আলোচনা। পাণিনি নিজেই বলেছেন যে তার আগে প্রাচীন ভারতবর্ষের অনেক মুনিই বৈদিক ভাষাকে সূত্রাবদ্ধ করবার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। আমাদের ধারণা, সেগুলো হয়ত পাণিনির মতো আনুষ্ঠানিক ব্যাকরণের কোনও সূত্র ছিল না-- শব্দের রূপতত্ত্ব (Morphology) বিষয়ক আলোচনা ছিল মাত্র। তবু খ্রিষ্টের জন্মের আগে যে ভারতবর্ষে এককালিক ও বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের অন্তর্গত শব্দের রূপতত্ত্ব নিয়ে ভাবনা এসেছিল প্রাচীন ভারতের মনীষী পাণিনিসহ আরও কিছু মুনির মনে, সেটাই বা কম কী! বিশুদ্ধ ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা তখন আরেক প্রাগ্রসর সভ্যতার গ্রিস কেন, বিশ্বের আর কোথাও শুরু হয়নি।

আমরা দেখছি, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলো (বেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উপাচার ও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয় যে গ্রন্থে, যেমন, ঋগ্বেদ সংহিতার সাথে জড়িত ঐতরেয় ব্রাহ্মণ; শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতার সাথে যুক্ত শতপথ ব্রাহ্মণ ইত্যাদি)-তে ভাষা ব্যাকৃতকরণ, অর্থাৎ, শব্দের প্রকৃতি বিশ্লেষণের প্রাথমিক প্রমাণ মেলে। যজুর্বেদেও এভাবে শব্দকে বিশ্লেষণের প্রয়াস নেয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রাচীন ভারতের মুনিরা, যেমন, পাণিনি, কাত্যায়ন, যক্ষ প্রমুখ বৈদিক মুনি মনে করেছেন, ভাষা বা শূন্যের একক হলো গিয়ে শব্দ। মৈত্রী উপনিষদে দু’ধরণের ব্রহ্মের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে-- শব্দ ব্রহ্ম ও অশব্দ ব্রহ্ম। মাণ্ডুক্যোপনিষদের প্রথম খণ্ডে বলা হচ্ছে, ‘...সূক্ষ্ণবাক্যের মধ্যে যে অর্থরূপী আন্তর জ্ঞান তাহাই স্বস্বরূপে অভিব্যক্তি জন্য শব্দরূপে বিবির্ত্তিত হয়েন। শব্দকে তবে অগ্রাহ্য করা যায় না। শব্দ জড় মাত্র ইহা বলা চলে না “যত্র চ ব্রহ্ম বর্ত্ততে”। শব্দই ব্রহ্ম, শব্দই জগৎ। শব্দই চৈতন্যে অধিষ্ঠিত শক্তি।’ মোদ্দা কথা, প্রাচীন ভারতের মুনিরা মনে করতেন, এই মহাবিশ্বসহ সব কিছুই শব্দব্রহ্ম থেকে সৃষ্ট-- ওঁম শব্দ থেকে। ওঁ-কার হলো গিয়ে মূল ধ্বনি, ওঁ-কারই (অ উ ম--এই ত্র্যক্ষর) হলো আদি বাক, আদি শব্দ: তাই শব্দ হলো গিয়ে ব্রহ্ম। বৈদিক ধারণা মতে কোনও শব্দের আওয়াজই ধ্বনি। ধ্বনির লিখিত রূপই হলো গিয়ে বর্ণ। তবে ভাষা বিশ্লেষণের বেলাতে তারা ধ্বনি পর্যন্ত যাননি কেননা বৈদিক ঐতিহ্য মতে শব্দই ব্রহ্ম, যেমন, ঋগ্বেদ অনুযায়ী ব্রহ্ম বাক পর্যন্ত বিস্তৃত। কাজেই ভাষাবীক্ষণ বা ব্যাকরণ তৈরি করবার সময় তারা বাক্যকে ভেঙে শব্দ পর্যন্তই গেছেন-- ভাষার ক্ষুদ্রতর একক ধ্বনি অবধি তারা আর যাননি। আমরা জানি, নোয়াম চমস্কির মতো আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভাষার ক্ষুদ্রতম একক হলো ধ্বনি-- শব্দ নয়। শব্দ এখানে কোনও ভাষার মৌখিক ও লিখিত রূপের একক যা কিনা কিছু অর্থবোধক ধ্বনির সমষ্টি মাত্র। কাজেই শব্দকে বিশ্লিষ্ট করলে ধ্বনিই মিলবে। আবার এও ঠিক যে শব্দ বা পদই বাক্যগঠনের মূল উপাদান, ঠিক এ জায়গাতে প্রাচীন ভারতের মুনিদের সাথে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের মিল রয়েছে বটে। পার্থক্য এই যে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার বৈশিষ্ট্য ধরবার জন্য বাক্যের ধ্বনি পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে থাকেন।

বৈদিক যুগে, পাণিনি মুনির আগে, ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষা-পর্বের অন্যতম সদস্য এই ভারতবর্ষে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাকরণের উপস্থিতি আমরা দেখছি না। আমরা আগেই বলেছি, স্বয়ং পাণিনি স্বীকার গেছেন, তার আগে বৈদিক ভাষাকে শৃঙ্খলাতে আনবার জন্য চেষ্টা করেছিলেন শাকটায়ন, শৌনক, কাশ্যপ, ভরদ্বাজ প্রমুখ প্রাচীন ভারতের মুনিরা। তবে দুঃখের বিষয় এই যে মুনিরা যাকে ব্যাকরণ বলে জ্ঞান করেছেন তা নিয়ে তাদের সূত্রগুলোর কোনও নিদর্শণ আর মেলেনি। আমরা কেবল জানতে পারছি, বৈদিক মুনিরা যাকে ব্যাকরণ বলতে চেয়েছেন তাকে আবার প্রতিশাখ্যও বলে-- যেমন, শৌনক প্রবর্তিত ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদের প্রতিশাখ্য, কাত্যায়ন প্রণীত শুক্লযজুর্বেদের প্রতিশাখ্য এবং বাল্মীকির করা কৃষ্ণযজুর্বেদের প্রতিশাখ্য। এসব ব্যাকরণ বা প্রতিশাখ্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খুবই সীমিতই বলতে হবে কেননা এতে কেবল শব্দের উচ্চারণ ও ছন্দ নিয়েই আলোচনা হয়েছে, এমনকি শব্দের রূপতত্ত্ব নিয়ে কোনও বিশ্লেষণ নেই সেখানে। বরংচ নিরুক্ত বৈদিক অভিধানে শব্দের অর্থ ও ছন্দ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা পেয়েছি যাস্কমুনি (খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম থেকে ৫ম শতক)-র কথ্য সংস্কৃত ভাষা নির্ভর শব্দের বুৎপত্তিগত ও বিশ্লেষণধর্মী রচনা ‘নিরুক্ত’-র। প্রাচীন ভারতীয় ভাষাবিদেরা বলছেন, ‘অবৈদিক সংস্কৃত’ (যা মৌখিক সংস্কৃত-- কৃত্রিম কোনও সাহিত্যিক ভাষা নয়)-এর ওপরে ভিত্তি করে সংকলিত হয়েছিল যাস্কের ‘নিরুক্ত’, পাণিনির কাজ প্রকাশিত হবার বেশ আগেই। যাস্ক বাদে নিরুক্তকারদের মাঝে রয়েছে ঔর্ণবাভ, শাকপূণি প্রমুখ যারা কিনা যাস্কের আগেই শব্দের রূপ নিয়ে ভেবেছেন-- যাস্কের শব্দরূপের বইতে লিখা আছে এসব মুনিদের নাম।

আমরা জানছি, ভাষাবিজ্ঞানের কাঠামোতে শব্দের রূপতত্ত্বের আলোচনাতে অবৈদিক শব্দের রূপ নির্ধারণের প্রচেষ্টাকে মোটেই স্বাগত জানাননি পাণিনি ও পাণিনি-সম্প্রদায়ের মুনিরা (ভর্তৃহরি, জয়াদিত্য, বামন, হরদত্ত, নারায়ণ ভট্ট, কৈয়ট, পুরুষোত্তম, ভট্টোজি দীক্ষিত, বৈদ্যনাথ পায়গুণ্ড প্রমুখ) কেননা পাণিনিরা বিশুদ্ধ সংস্কৃত ভাষা প্রণয়নেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন। যাহোক, যাস্কমুনির শব্দের বুৎপত্তিগত বিশ্লেষণের সূত্রগুলো ঠিক আদর্শ ব্যাকরণ নয়-- বর্ণনামূলক ও কাঠামোগত ভাষাবিজ্ঞানের একটা অভিব্যক্তি মাত্র। কাজেই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, পাণিনিমুনিই ভারতবর্ষে জ্ঞানের বিকাশে বর্ণনাবাদী ভাষাবিজ্ঞান ও আনুষ্ঠানিক ব্যাকরণের প্রথম প্রবক্তা। পরে আমরা দেখব, ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষা-পরিবারের অপর সদস্য গ্রিকদেরও আরও আগে ব্যাকরণের মৌখিক সূত্রগুলো প্রণয়ন করেছিলেন পাণিনি। তার ব্যাকরণের সূত্রগুলো নিশ্চয় সেই সময়টাতে পূর্ণ রূপে বিকশিত হয়নি, পরবর্তী ভারতীয় মুনিবৃন্দ (যেমন, বামন, জয়াদিত্য, ভট্টোজি দীক্ষিত প্রমুখ) ও ইউরোপিয় ভাষাবিদ (যেমন, থিওডর গোল্ডস্টুকার, লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড, আর এইচ রবিনস, কেইথ বেররিডেল প্রমুখ)-রা পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলোকে পরিমার্জন করেছেন এবং নব্য ভাষাবিজ্ঞানের কাঠামোতে সূত্রগুলোর মূল সুর বসাবার চেষ্টা করেছেন।

পাণিনির সমসময়ে গ্রিসে ভাষা বিষয়ক কী চিন্তাভাবনা হয়েছিল তা একবার দেখে নেয়া যাক। দার্শনিক প্লেটো (খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৯- খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭), পাণিনির সমসাময়িক ভাষাচিন্তক, তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কথোপকথন’-এ গ্রিক ভাষার মৌখিক শব্দসমূহের উৎস নিয়ে কাজ করেছিলেন। ভাষার উন্নয়ণে মানুষের চিন্তাশক্তির সৃষ্টিশীল ভূমিকা নিয়ে ভাবিত হয়েছিলেন তিনি; যুক্তি দিয়েছিলেন যে মানুষ নিজের সাথে নিজে নীরবে কথা বলে যাকে আমরা শব্দহীন সংলাপ বলে থাকি (ভারতীয় মুনিদের অশব্দ ব্রহ্ম-এর ধারণা যেমনটা)। আর নিজের সাথে নিজের এ নীরব কথপোকথন যখন শব্দে শব্দে সরব হয়ে ওঠে তখন তাকে আমরা মানুষের মুখের ভাষা বলি। প্রাচীন ভারতীয় মুনিদের ভাষা সংক্রান্ত ব্যাপক ভাবনার সাথে পাণিনির সমসাময়িক ভাষাচিন্তক প্লেটোর ভাবনা এবার মিলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা কাকতালীয় নিশ্চয় কেননা তখনও আলেকজান্ডারের গ্রিক বাহিনী ভারত জয়ের অভিযানে নামেইনি।

এদিকে প্লেটোর শিষ্য দার্শণিক আরিস্টোটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪- খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২) আরও পদ্ধতিগতভাবে ভাষার বিশ্লেষণ করেছেন। তার বই ‘পোয়েটিক্স’-এ তিনি দেখিয়েছেন, ভাষার ক্ষুদ্রতম একক হলো গিয়ে বর্ণ (Letter), যার পরে আর ভাষাকে ভাঙা যায় না। বর্ণ রয়েছে তিন ধরনের-- স্বর, ব্যঞ্জন ও অর্ধস্বর (ভারতীয় ধারণাতেও অর্ধস্বর আছে)। বর্ণের চাইতে ভাষার বৃহত্তর একক হচ্ছে অক্ষর (Syllable), তারপরে রয়েছে শব্দ আর পদ। সবশেষে ভাষার বৃহত্তম একক হিসেবে এসেছে বাক্য বা স্পিচ। বাক্যকে বিভিন্ন পদে (Parts of Speech) বিভক্ত করবার কায়দা তিনিই বের করেছিলেন। এভাবে বর্ণনামূলক ব্যাকরণের যে মূল কাঠামো তিনি তৈরি করে দিলেন তা দীর্ঘকাল ধরে ইউরোপে ব্যাকরণের সূত্র হয়ে রইল। এদিকে খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতকে গ্রিক ভাষাতে প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন দিওনুসিউস থ্রাক্স (খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০- খ্রিষ্টপূর্ব ৯০)। এ সময়কালের ১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলো পরিমার্জনের কাজ করেছিলেন পতঞ্জলি। এর আগেই আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ৩২৭ খিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিছু অংশ জয় করেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরে তার ভারত-অভিযান থমকে যায় এবং তার সৈন্যদলের একটা অংশ উত্তর-পশ্চিম ভারতে স্থায়ীভাবে রয়ে যায়। স্পষ্টতই আলেকজান্ডারের ভারত-অভিযানের অনেক আগেই পাণিনি তার ব্যাকরণের সূত্রগুলো প্রণয়ন করেন। পাণিনির পরের মুনিরা, যেমন, পতঞ্জলি, হয়তবা গ্রিকদের ভাষা বিষয়ক বীক্ষণ ও ব্যাকরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। পাণিনির বেলাতে, ভারতবর্ষের মতো ভৌগলিকভাবে নিমীলিত (Closed) সমাজে, অন্য কোনও বিদেশি ভাষার উন্নয়ণ সম্পর্কে জানতে পারাটা সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

গ্রিক ভাষাবিদ দিওনুসিউস মূলত শব্দের রূপতত্ত্ব নিয়েই আলোচনা করেছেন, যেমনটা করেছেন তার চাইতে বয়সে খানিকটা বড় ভারতের ভাষাবিদ পাণিনি। পাণিনির মতো করে তিনিও বাক্যকে বিশ্লিষ্ট করে থেমে গেছেন শব্দ-পর্যায়ে। আপোলোনিওস দুসকোলোস (১৪০ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান তিনি) এদিকে প্রথম বারের মতো বাক্যকে ধ্বনি অবধি ভাঙবার জন্য প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন যা পরে ইউরোপে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতির বিকাশ ঘটায় বলে আমরা প্রত্যক্ষ করি। আপোলোনিওস উদভাবিত ভাষাতাত্ত্বিক এই কাঠামোই পরবর্তিতে অনুসরণ করেছে লাটিনরা, আলেকজান্দ্রিয়ার টলেমিয়রাও। কাজেই আমরা দেখছি, প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতরা একই সময়ে ভাষাতত্ত্ব ও ব্যাকরণের এসব দিক সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছেন। এ বিষয়ে পাণিনির আগের প্রাচীন ভারতীয় মুনিদের, যেমন, আপিশলি, কাশ্যপ, গার্গ্যা, গালব, চাক্রবর্ম্মন, ভারদ্বাজ, শাকটায়ন, শাকল্য, শৌনক, স্ফোটায়ন প্রমুখের ভাষা বিষয়ে আগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ছিল বলে আমরা দেখছি। পাণিনি নিজেও ভাষার উন্নয়ন নিয়ে ভেবেছিলেন তখনটায়।

আমরা জানি, শব্দের গঠন (রূপতত্ত্ব) ও শব্দের সঠিক ব্যবহারের অনুশাসনকেই প্রাচীন ভারতে ব্যাকরণ বলে মনে করা হতো। তবে বলতে হয়, কেবল শব্দের রূপতত্ত্ব (Morphology) দিয়েই ব্যাকরণের সূত্র তৈরি করতে যাওয়াটা যথেষ্ট নয়-- পূর্ণাঙ্গ একখানা ব্যাকরণ রচনা করতে রূপতত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োজন অন্বয় বা বাক্যতত্ত্ব (Syntax), ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) ও অর্থতত্ত্ব (Semantics)-এর যোগ। আমরা দেখছি, এ সমস্ত বিশ্লেষণের হাতিয়ার পাণিনির ব্যাকরণে নেই-- আছে কেবল শব্দের রূপের বিশ্লেষণ ও ব্যবহার। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ব্যাকরণের যে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়েছে, পাণিনির সূত্রগুলো তার কেবল শব্দের রূপের আলোচনাকেই বিবেচনাতে নেয়। অর্থাৎ, পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলো কোনও ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণগ্রন্থের একটা মডিউল মাত্র হিসেবে গৃহিত হতে পারে। অনেক পরে অবশ্য ভারতেও পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণের সূত্র নিয়ে আধুনিক ভাষাবিদরা কাজ করেছেন বলে আমরা জানি।

পাণিনি কেন তৎকালীন বৈদিক ভাষাকে সুসংহত করে সংস্কৃত নামের একটা নয়া সাহিত্যিক ভাষার (কৃত্রিম বটে!) প্রবর্তন করেছিলেন-- এ প্রশ্ন আমাদেরকে ভাবায়। ইতিহাসের প্রেক্ষিতে উত্তরটা এমন: মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে বৈদিক ভাষা ক্রমশ তখন ধাবিত হচ্ছিল প্রাকৃত পর্যায়ের অভিমুখে। ভাষার এই স্বাভাবিক বিবর্তনের প্রক্রিয়াতে ব্রাহ্মণদের মুখের ভাষা তার স্বকীয়তা হারাতে বসেছিল। বৈদিক ভাষার বিবর্তনের স্বাভাবিক এ প্রক্রিয়া রুদ্ধ করবার জন্য বৈদিক ভাষাকে নানান সূত্রে ফেলে সংস্কৃত নামের নতুন একটা সাহিত্যিক ভাষা তৈরি করেছিলেন পাণিনি। নতুন একটা সাহিত্যিক ভাষা সৃষ্টি করতে গিয়ে বৈদিক শব্দের রূপ নির্ধারণের জন্য তিনি ভাষাবিজ্ঞানের এককালিক বর্ণনামূলক পদ্ধতি (Synchronic or Descriptive Method) ব্যবহার করেছিলেন। তার শব্দ বিশ্লেষণের ধারা যে স্থৈতিক, নিশ্চল তা বোঝাই যায়। বৈদিক ভাষার সাহিত্যিক অংশের শব্দগুলোই তার রেফারেন্স ছিল-- গতিময় মৌখিক শব্দগুলো নয়। ব্যাকরণের সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করবার সময়ে পাণিনি ভারতের মধ্যদেশ (দিল্লি-মিরাট-মথুরা অঞ্চল)-এর শিক্ষিত জনের মুখের ভাষাকে আদর্শ ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর সাথে তিনি মিশিয়ে নিয়েছেন তার নিজের জন্মভূমি পেশোয়ারের কাছাকাছি পুস্ককলাবতী এলাকার মৌখিক ভাষা। প্রকৃতিগতভাবে পাণিনি প্রবর্তিত নতুন সাহিত্যিক ভাষা ছিল স্থৈতিক, মানে, ভাবনাটা এমন যে সময়ের মাপে কোনও পরিবর্তন করা যাবে না এ ভাষার। এভাবে পাণিনি-উদভাবিত সূত্রই বৈদিক ভাষাজাত সংস্কৃত ভাষার ওপরে স্থায়ীভাবে চেপে বসে রইল, এ সাহিত্যিক ভাষাতে আর তেমন কোনও পরিবর্তনের সুযোগ রইল না; কাত্যায়ন আর পতঞ্জলির মতো মশহুর বৈদিক মুনিরা সংস্কৃত ভাষার রূপতত্ত্বের কেবল সংযোজন আর বিয়োজনই ঘটালেন, মানুষের মুখে আর উচ্চারিত হলো না! এভাবে পাণিনি জীবন্ত বৈদিক ভাষার সংস্কারের নামে যে সংস্কৃত ভাষার প্রবর্তন করেন কালে কালে তা মৃত একটা সাহিত্যিক ভাষাতে পরিণত হলো যা কেবল ব্রাহ্মণদের বইপত্তরেই রয়ে গেল; নানার আচার-উপাচারে মন্ত্র হিসেবে উচ্চারিত হলো। মাঝখান থেকে জীবন্ত বৈদিক ভাষার মৌখিক রূপ ভারতবর্ষের আর সব পুরোনো দেশজ ভাষার সাথে মিলে মোটামুটিভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ১০ম খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে গতিময়ভাবে পরিণত হলো প্রাকৃত নামের মৌখিক এক ভাষাতে যা থেকে উদ্ভব হলো মধ্য ও আজকের নব্য ভারতীয় আর্যভাষার। প্রাকৃতের সাহিত্যিক ভাষারও জন্ম হয়ে গেল তখন। আর সংস্কৃত ভাষা অব্যবহারে বন্দী হয়ে গেল ব্রাহ্মণদের আলমারিতে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার বই The Origin and Development of the Bengali Language (১৯৭০)-এ পাণিনি প্রবর্তিত সংস্কৃত ভাষার কার্যহীণতা ও মৃত্যু নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তবে বলতেই হবে, আলমারিতে সেঁধিয়ে যাবার আগে সংস্কৃত ভাষাতে দুর্দান্ত সব সাহিত্য রচিত হয়েছিল-- রামায়ণ, মহাভারত, রঘুবংশ, কুমারসম্ভব, কামসূত্র, পঞ্চসায়ক, নাটক (মৃচ্ছকটিকম, শকুন্তলা, স্বপ্নবাসবদত্তা, বেনীসংহার, মুদ্রারাক্ষস প্রভৃতি) ইত্যাদি। এসব সাহিত্যকর্ম ধ্রুপদী কাজের সম্মান পেয়েছে এবং এখনও এসবের অনুবাদ পঠিত হয়, এগুলো নিয়ে গবেষণাও হয়। বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষাতে আমরা কেউ আর কথা বলি না; লিখি না এই যা!

বৈদিক ভাষাকে নিয়মে বাঁধবার জন্য পাণিনির সূত্র সম্বলিত ব্যাকরণগ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী বা ‘শব্দশাসন’ (শব্দই ব্রহ্ম; ধ্বনি হলো পরম শিবের প্রথম প্রকাশ)-এ মোট ৩৯৯৬ সংখ্যক ভাষিক সূত্র রয়েছে যেগুলোর মধ্যে আড়াই হাজার সুত্রের জনক পাণিনি স্বয়ং; এবাদে পাণিনির ভ্রম, অতিকথন, অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি সংশোধনের জন্য তা’তে পরবর্তীতে যোগ হয়েছে কাত্যায়নের দেড় হাজারের মতো ‘বার্তিক সূত্র’। ভাষিক সূত্রগুলো বিচার করলে শব্দ ও পদকে বর্ণনা করবার জন্য সাত রকমের সূত্রের সন্ধান আমরা পেয়ে যাই: সংজ্ঞা, পরিভাষা, বিধি, নিয়ম, অধিকার, অতিদেশ এবং অপবাদ। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের বর্ণনামূলক অংশের বৈশিষ্ট্যের সাথে পাণিনির এসব সূত্র, দূরাগতভাবে হলেও, মিলে যায় বটে।

বৈদিক ভাষাকে বিশ্লিষ্ট করে ব্যাকরণের সূত্র নির্ধারণের প্রথম পর্যায়ে পাণিনি বাক্যকে একক হিসেবে ধরে নিয়েছেন; তারপরে তিনি বাক্যকে পদে বিভক্ত করেছেন যেখানে ক্রিয়ার মূল তো বটেই, নামশব্দের মূলও আলোচনাতে এসেছে। এডেনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের শিক্ষক আর্থার বেররিডেল কেইথ তার বিখ্যাত বই A History of Sanskrit Literature (১৯৭৩) শীর্ষক বইতে এ ব্যাপারটা লক্ষ করেছেন। আমরা জানি, শব্দের (ও পদেরও বটে) রূপতত্ত্বের ওপরে মনোনিবেশ করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান বাক্যকেই ভাঙতে ভাঙতে পদ ও ধ্বনির অবস্থান ও রূপের দিকে ধাবিত হয়। এর উদাহরণ হিসেবে আমরা অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইটি-র ভাষাবিজ্ঞানের ভূতপূর্ব অধ্যাপক নোয়াম চমস্কির পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে পারি। স্বভাবে তিনি বর্ণনাবাদী ও কাঠামোবাদী ভাষাবিজ্ঞানী, ভাষার ফলিত দিকেই তার আগ্রহ বেশি। তার আগে স্ইুস ভাষাবিদ ফারডিনান্ড ডি সোস্যুর ও জার্মান ভাষাবিদ লিওনার্ড ব্লুমফিল্ডের মতো বর্ণনা ও কাঠামোবাদী ভাষাবিজ্ঞানী ব্যাকরণের নানান নিয়মকানুন দিয়ে বাক্য, পদ ও ধ্বনির বহিরাঙ্গের রূপ প্রকাশ করতেই ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মানবভাষা যে একটা ধারণাগত নির্মাণ এবং ভাষা যে এখানে একটা চলক (ধ্রুবক নয়)-- এ সত্যকে অনুধাবন করতে পারেনি তারা। পরিণামে মানবভাষা হয়ে উঠল যান্ত্রিক; হারালো ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। তখন নোয়াম চমস্কি বললেন: ভাষা আসলে যান্ত্রিক কোনও প্রপঞ্চ নয়-- বাক্যকে ইউনিট হিসেবে ধরে নিয়ে তিনি দেখালেন, যে কোনও পরিস্থিতিতেই প্রাক-তথ্য বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই শব্দে শব্দে হাজার হাজার বাক্য সৃজন করবার ক্ষমতা রাখে মানুষ এবং তা যে ব্যাকরণে বিধৃত হয় নোয়াম চমস্কি তার নাম দিয়েছেন সৃজনধর্মী ব্যাকরণ (Generative Grammer)। এখানে নোয়াম চমস্কির ধারণার সাথে অমিল লক্ষ করি ভারতবর্ষের বর্ণনাধর্মী ও কাঠামোবাদী ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনির সূত্রের প্রয়োগের সাথে। পাণিনির মতে, যে কোনও ভাষার একক আসলে বাক্যস্থিত শব্দ বা পদ যাকে আর ভাঙা যায় না কেননা বেদ ও উপনিষদের ধারণা অনুযায়ী শব্দই পরম ব্রহ্ম। কাজেই শব্দ বা পদের রূপ বিশ্লেষণের পরে প্রাচীন ভারতীয় মুনিরা পদবন্ধ বা বাক্যাংশ (Phrase) থেকে ফিরে যান বাক্য গঠনের প্রক্রিয়াতে। পাণিনির শব্দের রূপতত্ত্বের সাথে চমস্কির ফ্রেমওয়ার্কের আদতেই বিশাল পার্থক্য রয়েছে। চমস্কি নিজেই বলছেন, পাণিনি প্রণীত ভাষিক সূত্রগুলো আসলে চমস্কি প্রবর্তিত সৃজনমূলক ব্যাকরণের ধারণার কেবল একটা খণ্ডিত অংশ মাত্র বলে বিবেচিত হতে পারে, তা পূর্ণাঙ্গ কোনও গতিময় ভাষাকাঠামোর জন্ম দেয় না। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের ভারতীয় ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনি, অন্ততপক্ষে, বুঝেছিলেন যে বৈদিক ভাষার বহিরাঙ্গের কাঠামো ধরতে হলে বাক্যকে বিশ্লিষ্ট করতে হবে শব্দ-পর্যায়ে। বৈদিক ভাষার অন্তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তিনি খুব একটা মাথা ঘামাননি, যে কাজটা নোয়াম চমস্কিসহ আজকের ভাষাবিজ্ঞানীরা করে থাকেন। সেটা করলে পাণিনি চরম রক্ষণশীলতা থেকে সংস্কৃত ভাষাকে মুক্তি দিতে পারতেন-- তার প্রবর্তিত নতুন একটা সাহিত্যিক ভাষা পোশাকী একটা ভাষাতে পরিণত হতো না। ভাষা যে গতিময় চলক তা ভুলে গিয়েছিলেন তখনকার ভারতীয় মুনিরা। এ কারণেই তারা দল বেধে বৈদিক ভাষা থেকে প্রাকৃত ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে আটকাতে চেয়েছিলেন; পারেননি বটে-- ইতিহাস সেটাই বলছে।

পাণিনির ব্যাকরণের মৌখিক সূত্রগুলো (কাত্যায়ন ও পতঞ্জলির সংযোজন-বিয়োজনের সূত্রগুলোসহ)-কে নানান সময়ে নানান ভারতীয় ভাষাবিদেরা গ্রন্থিত করেছেন, নানান মুনি পাণিনির সূত্রগুলো পাঠকের কাছে বোধগম্য করবার জন্য সংস্কৃততে টীকাভাষ্যও রচনা করেছেন। পাণিনি খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে ভাষিক কাজটা করেছিলেন যা বৈদিক ও সংস্কৃত পণ্ডিতেরা ছাড়া সাধারণ পাঠকের বুঝবার জো ছিল না। তাই টীকাভাষ্য তৈরি করতে হয়েছিল। সুখের বিষয় এই যে এখন তো বাংলাতেই আমরা পাণিনির ব্যাকরণ পড়তে পারছি, টীকাসহ। যাহোক, উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখি, সেই প্রাচীন ভারতে, পাণিনির সূত্রগুলো নিয়ে বামন ও জয়াদিত্য ‘কাশিকা-বৃত্তি’ নামের গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন (তাদের টীকাভাষ্যের নাম ‘পদমঞ্জরী’); সংস্কৃত ভাষার জার্মান পণ্ডিত থিওডোর গোল্ডস্টুকার পাণিনির ভাষা বিষয়ক অবদানের ওপরে একটা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন (ব্যাকরণ নিয়ে নয়); আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দে পতঞ্জলি রচনা করেছিলেন ‘মহাভাষ্য’ (টীকা প্রণয়ন করেছিলেন কৈয়ট, ‘ভাষাপ্রদীপ’ নামে); ভট্টোজি দীক্ষিত লিখেছিলেন ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’ (নিজেও টীকা প্রণয়ন করেছিলেন ‘পৌঢ় মনোরমা’ নামে) ইত্যাদি। এসব কাজের ভেতরে সবচাইতে জনপ্রিয় হয়েছে ভট্টোজিকৃত ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’ (আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকে প্রণীত)। পাণিনির ভাষাতত্ত্বের ব্যাপক সূত্রগুলোর সাথে কাত্যায়ন ও পতঞ্জলির সূত্রগুলোর সমন্বয় সাধন করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই ত্রিমুনির ব্যাকরণের এই গ্রন্থের নাম হয়েছে ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’। পাণিনি-সম্প্রদায়ের একখানা উক্তি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে: ‘সূত্রকার পাণিনি, বাক্যকার বররুচি (বা কাত্যায়ন), ভাষ্যকার পতঞ্জলি’। এই বইয়ের পূর্বার্দ্ধে প্রথাগতভাবে পাণিনির ফরম্যাট বা বিন্যাস অনুযায়ী রয়েছে সংজ্ঞা, পরিভাষা, বিধি, নিয়ম, অতিদেশ, অধিকার ইত্যাদি। উত্তরার্ধে রয়েছে তিঙন্ত, কৃদন্ত, উনাদি, স্বর প্রক্রিয়া ও লিঙ্গশাসন প্রকরণ। আমরা বলতে চাই, সংস্কৃত ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’ বা তার অনুবাদ পাঠ করলে বরং সাধারণ পাঠক বিশ্বের প্রথম দিককার বর্ণনাধর্মী ভাষাবিজ্ঞানী পাণিনির সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ সহজে বুঝতে পারবেন।

বলতেই হবে, পাণিনির ব্যাকরণগ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী নিয়ে কিছু সমস্যাও রয়েছে। প্রথমত, সংস্কৃত ভাষাতে রচিত এ ব্যাকরণের সূত্রগুলোতে ঢুকতে পারাটা মোটেই সহজ নয়, যাদের সংস্কৃত ভাষাতে অধিকার নেই তাদেরকে টীকাভাষ্যের সহায়তা নিতেই হবে। দ্বিতীয়ত, বাক্যকে বিশ্লিষ্ট করবার জন্য যে ১৪টা প্রত্যাহারিক সূত্র আছে (যেমন, ‘অ ই উণ্’, ‘হ য় ব র ট্’, ‘চ ট ত ব্’ ইত্যাদি যেগুলোকে পাণিনি ‘অথ শিব-সূত্রাণি’ নাম দিয়েছেন) সেগুলোর পিছে গাণিতিক নোটেশন রয়েছে। এ কারণে সহজে পাণিনির ব্যাকরণগ্রন্থ অষ্টাধ্যায়ী-তে দাঁত বসানো সম্ভব হয় না। তৃতীয় সীমাবদ্ধতা এই যে তুলনামূলক ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ঢোকেননি পাণিনি; ঢুকলে আমরা ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষা-পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভাষা, যেমন, আবেস্তা, গ্রিক, রোমান, জার্মানিক ইত্যাদি ভাষার কাঠামো মিলিয়ে দেখা যেত; এমনকি ভারতবর্ষের দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, ভোট-চেনি ইত্যাদি প্রাচীনতর জাতিগোষ্ঠীর ভাষার সাথেও বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষার তুলনা করে দেখা সম্ভব হতো।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে আমরা জানছি, পাণিনিই আনুষ্ঠানিক ব্যাকরণ ও বর্ণনাধর্মী ভাষাবিজ্ঞানের প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বের সকলের কাছে প্রশংসা পেয়েছেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কাজে খামতি থাকবেই! তবে পাণিনির শব্দের রূপতত্ত্ব বিষয়ক কাজই আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের একটা গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এখনও। বৈদিক ভাষাকে যে তিনি ব্যাকরণ দিয়ে নিয়মে বেধেছিলেন, তার একটা নেতিবাচক দিকও রয়েছে-- আগেই বলেছি আমরা। এসব নিয়মকানুনের ওপরে ভিত্তি করেই সংস্কৃত নামের যে সাহিত্যিক ভাষার চল হয়ে গেল তখন, নিয়মের নিগঢ়ে পড়ে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে মারা গেল লেখ্য সংস্কৃত ভাষা। তবুও আমরা পাণিনির সৃষ্টিশীলতার প্রশংসা করি।

পাণিনি, কাত্যায়ন ও পতঞ্জলি-- প্রাচীন ভারতের এই তিন মুনি সংস্কৃত ভাষার শব্দ সংক্রান্ত রূপতত্ত্বের সূত্র প্রণয়নের পরে এ ভারতবর্ষে ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পাণিনির পরবর্তী ভারতীর বৈয়াকরণ ও ভাষাবিদেরা নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা যাতে করে যান্ত্রিকতার শিকার না হয়ে পড়ে, তার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্যই আমরা দেখি, ভাষার বিবর্তনের মুখে কোনও আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুনের বাধা আর নেই। লক্ষ করবার বিষয় হলো, পাণিনির সূত্রগুলোও ক্রমশ সংখ্যার দিক থেকে কমে আসছে। এদিকে পাণিনি-সম্প্রদায় বাদে প্রাচীন ভারতবর্ষে আর যেসব বৈয়াকরন-সম্প্রদায় ছিল তারা বৃহৎ পরিসরে সংস্কৃত ভাষার রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, ধ্বনিতত্ত্ব ও ছন্দতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। সে সব নমস্য মূনিদের নাম এখানে আনতেই হয়: সর্ববর্মা, চন্দ্রগোমিন, জিনেন্দ্র, শাকটায়ন, ভোজরাজ, হেমচন্দ্র, বোপদেব, পুরুষোত্তম প্রমুখ। এদের কাজ খুবই গুরত্ববহ হয়েছে এ কারণে যে তাদের সূত্রে আমরা মৌখিক সংস্কৃত ভাষার আঞ্চলিক রূপের দেখা পাই, যে রূপটাকে এড়াতেই এত কিছু করেছিলেন পাণিনি ও পাণিনি-সম্প্রদায়ের বৈয়াকরণের-- তারা সংস্কৃত ভাষাকে ধ্রুব অবস্থায় রাখতেই চেয়েছিলেন। আমরা মনে করি, পাণিনির মতো ভুবনজয়ী ভাষাবিদ না হলেও এসব ভারতীয় ভাষাবিদদের প্রণীত আধুনিক ব্যাকরণ-সূত্র আমাদের নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার পূর্বী উপশাখার ভাষাগুলোকে বিবর্তনের মাধ্যমে পুষ্টই করে চলেছে। আজকালকার বৈয়াকরণেরা মৌখিক সংস্কৃত ভাষার আঞ্চলিক ভিন্নতাকেও স্বীকার করে নিয়েছেন। তাই এখন বাংলা বা অসমিয়া বা উড়িয়ার মতো কোনও ভাষা আর সংস্কৃত ভাষার মতো করে কঠোর নিয়মে বন্দী হয়ে হাঁসফাঁস করবে না।

এত সব আলোচনা-সমালোচনার পরে বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে পাণিনিকেই আমরা কুর্নিশ করব, এই আড়াই হাজার বছর পরেও! আজকের ভাষাবিজ্ঞান যে শক্ত ভিত্তির ওপরে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে তার পেছনে মূলতই অবদান রেখেছিলেন প্রাচীন ভারতীয় ও গ্রিক ভাষাবিদেরা। তাদের মাঝে সসম্মানে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বের প্রথম শব্দের রূপতত্ত্ববিদ, প্রাচীন ভারতের ঋষি, পাণিনি।