Published : 23 Feb 2023, 12:51 PM

প্রশ্ন: কোভিডোত্তর মেলা নিয়ে এবার কি আশা করছেন?
উত্তর: এই বইমেলার বড় বাঁধা হচ্ছে কাগজের মূল বৃদ্ধি। কাগজের মূল্য বৃদ্ধির হচ্ছে। বই যারা ক্রয় করে তাদের সামর্থ্য এমনিতেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণেও বইমেলা প্রভাবিত। এ কারণে বইমেলা প্রচুর দর্শনার্থী হচ্ছে, কিন্তু বই বিক্রি কম হচ্ছে। বইমেলা একটা বাঙালির উৎসব, সর্বকালের সব মেলাকে ছাপিয়ে যায় বইমেলা। মাসব্যাপি এই মেলায় প্রচুর লোক সমাগম হয় কিন্তু এ বছর তুলনায় বেচাবিক্রি কম।
প্রশ্ন: এর কারণ কী? বইয়ে দাম বেড়েছে?
উত্তর: বইয়ের দাম বেড়েছে, আমাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
প্রশ্ন: বইয়ের দাম বাড়িয়েছেন, এর প্রেক্ষিতে পাঠক বই কেনা কমিয়ে দিয়েছে—এরকম বলছেন আপনি?
উত্তর: হ্যাঁ। একদিকে বইয়ের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। দুইটা মিলিয়ে এ বছর বই বিক্রি কমে গেছে।
প্রশ্ন: পাঠক-ক্রেতার প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
উত্তর: তারা বই নিয়ে নাড়াচারা করছে, দেখছে। দেখে চলে যাচ্ছে। এরকম হচ্ছে, হয়তো দশ জন দেখতে আসছে তাদের মধ্যে একজন বই কিনছে। বই খুব খুটিয়ে দেখছে। একদম প্রয়োজন ছাড়া কিনছে না।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বই প্রকাশের সংখ্যা কমে গেছে কিনা?
উত্তর: অবশ্যই কমিয়েছি মেলাকে টার্গেট করে। কারণ এখানে দ্বিগুণ পুজি লাগছে। সেক্ষেত্রে বই বের করা আমদের জন্য ঝুঁকি মনে হচ্ছে। মেলার শুরুতে বিক্রি কম হওয়ায়, সে অনুযায়ী বই প্রকাশের সংখ্যা কম হবে।
প্রশ্ন: এর প্রভাবে বা কোন আশঙ্কা থেকে কোন ধরনের বিক্রয়কৌশল হিসেবে কোন ধরনের বই বেশি বা কম প্রকাশ করছেন কিনা?
উত্তর: নতুন লেখকদের বই কম বের হয়েছে। এছাড়া কোনও ক্যাটাগরি ধরে ধরে বই প্রকাশ কমিয়েছি-- এরকম না। আমাদের কথা যদি বলি, গেল বছর ১২০টির মতো বই বের করেছিলাম। কিন্তু এ বছর এ পর্যন্ত বই বেরিয়েছে বিশ পঁচিশটি, আর বের হবে আশা করি দশ পনেরোটি। আমারটা দিয়ে বলতে পারি অন্যদেরও একই অবস্থা।
প্রশ্ন: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ ভালো। তবে যত্রতত্র বিকাশের স্টল বসানো ঠিক কাজ হয়নি। তাদের দৌরাত্ম্য খুব বেড়ে গেছে। বিকাশের কাছে থেকে বাংলা একাডেমি বড় অংকের টাকা নেয়, যেটা দিয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করা হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের মেলার যে আদল ছিলো শুরুতে, তা অনেকখানি বদলে গেছে। যত্রতত্র বিকাশের স্টল বসেছে, হাসপাতাল, ওষুধ, আয়ুর্বেদ, আকুপাংচার ইত্যাদির স্টল বসেছে। এসবের স্টল কোনওদিন বইমেলায় ছিলো না। এদের দরকারও নেই। এরা বইমেলার সঙ্গে যায় না। এগুলো অপরিকল্পিত, এগুলো মেলা পরিকল্পনায় ছিলো না। আমি মেলা পরিচালনা কমিটিতে আছি। সেখানে এইসব স্টল যে বসবে তার কোনও আলোচনাই হয়নি। এইসব স্টল বসানোর অনুমতি কারা দিয়েছে তাও পর্যন্ত জানি না। এসবের এক্তিয়ার মেলা পরিচালনা কমিটির। অথচ আমরা কিছু্ জানি না। এটা নিয়ে প্রকাশকদের মনে ক্ষোভ জন্মেছে।
আরেকটা বিষয় হলো, একটা সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব বিশ ফিট থাকার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে দুই সারির মাঝে প্যাভিলিয়ন বসিয়ে দূরত্ব রাখা হয়েছে সাত ফিট। এর ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বলি, কমিটির মিটিংয়ের বাইরে কোনও সিদ্ধান্ত থাকা উচিত না। কারণ তাতে কমিটির কেউ বহির্ভুত বিষয়ে কোনও জবাব দিতে পারে না।
প্রশ্ন: এর অর্থ আপনাদের অজ্ঞাতসারে মেলায় স্টল বসেছে?
উত্তর: হ্যাঁ, আমরা জানতাম না। হসপিটালের স্টল বসবে। যেখানে সেখানে বিকাশের স্টল বসবে। আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। বিকাশের স্টল বসবে সেটা পরিকল্পনার সময়ই বলা উচিত ছিলো। কোথায় কোথায় বসবে তা পরিকল্পনা করে বসাতাম। কিন্তু পরিকল্পনার পরে কেন, বিকাশের স্টল বসবে? হাসপাতালের সারি দেয়া হবে?
প্রশ্ন: মেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ অন্য বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। আপনার উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে থাকতে পারে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই থাকতে পারে। এখানে আছে যেমন, স্বেচ্ছায় রক্ত প্রদান। খুব ভালো উদ্যোগ। সেটা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজন করতে পারতো। অথচ সেগুলোর স্টল দেয়া হয়েছে মেলার বই কেনাবেচার প্রাঙ্গণে। যেখানে ধূলোময়লা রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। তাই বলছিলাম মেলার শুরুর পরে নানা বিষয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, যা কাঙ্ক্ষিত ছিলো না।

প্রশ্ন: কোভিডোত্তর মেলা নিয়ে এবার কি আশা করছেন?
উত্তর: মেলার বিশ বাইশ দিন পার হয়ে গেল। গেল দুই বছর অতিমারীর কারণে সেভাবে মেলা করতে পারিনি। এই বছর সেইসব সঙ্কট নেই। পাঠক এবং প্রকাশক লেখক সবাই নিশ্চিন্তে এবার মেলায় এসেছে এবং প্রচুর লোকসমাগম হয়েছে। আমাদের যে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা তা পূরণ হবে আশা করি।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বইয়ের দামও নিশ্চয় বাড়িয়েছেন, সেটা নিয়ে পাঠক-ক্রেতার প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
উত্তর: এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা, সব জিনিসের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে কাগজের মূল্য সর্বাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশের দেশ কোলকাতা বইমেলায় আমাদের অংশগ্রহণ ছিলো। সেখানে দেখেছি, ততোটা মূল্য বৃদ্ধি ঘটেনি। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমাদের প্রকাশনা শিল্পে পড়বে। আমরা নিজ উদ্যোগে প্রকাশনা শিল্প গড়ছি। কোনও সাহায্য-সহযোগিতা-অনুদান-বিশেষ সুবিধা ছাড়াই গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। সেটা ব্যাহত হবে। লক্ষ্য করার বিষয়, নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরনো বই যে গুলোর পুনঃমুদ্রণ করতে হচ্ছে সেটাও ব্যাহত হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে শিল্পের জন্য অশনিসংকেত। আমাদের বইয়ের দাম পনেরো থেকে বিশ ভাগ বেড়েছে। অর্থ্যাৎ দুইশো টাকার বই দুইশো পঞ্চাশ টাকা হচ্ছে। এইসব নতুন, পুনঃমুদ্রিত বই ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অর্থ্যাৎ বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এমনকি বাজারে কাগজেরও সঙ্কট রয়েছে। এখন বাজারে গেলেই কাগজ পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বই প্রকাশের সংখ্যা কমে গেছে কিনা?
উত্তর: না, লেখকরা তাদের বই দিচ্ছে। লেখকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রকাশকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে এখন দায়িত্ব প্রকাশকের। তাই প্রকাশকরা দেখবে কতো দ্রুত একটা বই প্রকাশ করতে পারে তারা। প্রকাশক চাইবে সব বই প্রকাশ হোক, লেখকেরাও তাই চায়। একটা টানাপোড়েন চলছে কাগজ এবং বইয়ের দাম বৃদ্ধির মধ্যে।
প্রশ্ন: এর প্রভাবে বা কোন আশঙ্কা থেকে কোন ধরনের বিক্রয়কৌশল হিসেবে কোন ধরনের বই বেশি বা কম প্রকাশ করছেন কিনা?
উত্তর: তেমন করে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে আমি কোনও সিদ্ধান্ত নেইনি। আমরা যে কটা বই প্রস্তুত করতে পেরেছি সে কটা বই ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর: মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ ধুলো, একে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভালো। ইট বিছালে ভালো হতো। আগের দুই বছর ইট বিছানো হয়েছিলো। এনামুল করিম নির্ঝর যখন ছিলো তখন ইট বিছানো হয়েছিলো। সেসময় তেমন ধুলো হয়নি। এখন এতো ধুলো… মাত্র আমরা অতিমারী থেকে বেরিয়েছি। করোনায় আক্রান্ত ছিলো বা এখন আছে তাদের জন্য সমস্যা এটা। আমার মনে হয়, ইট বিছিয়ে চলাচল সহজ করা যেতো। দেখা যাচ্ছে সকালে পানি দিলে, সেটা বিকালে থাকে না। আবার ধুলো সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন: কোভিডোত্তর মেলা নিয়ে এবার কি আশা ছিলো?
উত্তর: গত দুবছর পরে এবারের মেলা শুরু হয়েছিলো সঠিক সময়ে। কোভিডের কারণে আগের বছর একমাস পর মেলা শুরু হয়। তার আগের বছর মেলা অর্ধেক যেতেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই গত দুবছরের লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে এবারের মেলায়। সেটা অনেকটা হয়তো পুষিয়ে নেয়া গেছে। কিন্তু আমরা যতোটা আশা করেছিলাম ততোটা আশাব্যঞ্জক সারা মেলেনি। মেলায় যে অনুযায়ী পাঠক সমাগম হয়েছে সে অনুযায়ী বিক্রি বাড়েনি।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বইয়ের দামও নিশ্চয় বাড়িয়েছেন, সেটা নিয়ে পাঠক-ক্রেতার প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
উত্তর: পাঠক প্রতিক্রিয়া খুব একটা দেখছি না। কারণ প্রত্যেক দ্রব্যমূল্য—আলু, পেঁয়াজ, তেল, লবণের দাম যতোটা বেড়েছে, সে অনুযায়ী বইয়ের দাম যতোটা বাড়ানো উচিত ছিলো ততোটা আমরা বাড়াইনি। সীমিত পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছি, সুতরাং বইয়ের প্রতি পাঠকের যে ভালোবাসা, সে ভালোবাসায় এই সামান্য মূল্য বৃদ্ধি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বই প্রকাশের সংখ্যা কমে গেছে কিনা?
উত্তর: না, আমরা বই প্রকাশের সংখ্যা কমাইনি। বরং ২৯টি বই বেশি প্রকাশিত হবে এবার।
প্রশ্ন: এর প্রভাবে বা কোন আশঙ্কা থেকে কোন ধরনের বিক্রয়কৌশল হিসেবে কোন ধরনের বই বেশি বা কম প্রকাশ করছেন কিনা?
উত্তর: না, এরকম কোন বই বাদ দেইনি। যেসব বই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি, প্রকাশ হওয়া উচিত—সব বই আমরা প্রকাশ করবো। বই দামের কারণে আমরা কোনও বই প্রকাশ স্থগিত করিনি।
প্রশ্ন: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় মেলা শুরু হয়েছিলো। এখনও মেলার মাঠ অপরিচ্ছন্ন। নানা জায়গায় এবড়োখেবড়ো, হাঁটতে গিয়ে অসুবিধায় পড়ছে অনেকে। পানি ছিটানোর কথা, সেটা অপর্যাপ্ত। প্রচণ্ড ধুলোবালিতে সবারই অবস্থা বিপর্যস্ত। আজকে আমরা এতো বছর ধরে মেলা করছি, তবুও এসব নিয়ে কথা বলতে হয়। কেন? এই মেলার প্রস্তুতি নেয়া উচিত এক বছর আগে থেকে অথচ শুরু হয় একমাস আগে থেকে। এতবড় একটা মেলা সেটা একমাস আগে থেকে শুরু করলে কখনোই সুষ্ঠুভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব না। এইসব কিছু মিলিয়ে আমি বলবো মোটামুটি একটা পর্যায়ে আছে মেলা। সামগ্রিকভাবে খুব একটা সন্তোষজনক না।

প্রশ্ন : কোভিডোত্তর মেলা নিয়ে এবার কী আশা করছেন?
উত্তর: অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলাদেশের সকল বয়সের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের স্বপ্নের এক মহামিলনমেলা।বইপ্রেমী মানুষেরা আগ্রহভরে অপেক্ষা করেন বৎসরান্তে প্রকাশকরা তাদের পছন্দের বইয়ের কী বৈচিত্রময় আয়োজন নিয়ে আসেন সেটা দেখার জন্য! এরকম একটা আনন্দময় প্রত্যাশার ধারাবাহিকতায় বিগত পরপর দুই বছর কোভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাতে মেলাকেন্দ্রিক সকল কর্মকাণ্ড ব্যাহত ও পর্যুদস্ত হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট সকলের আশাভঙ্গ ঘটে।
২০২২-এর মাঝামাঝি থেকেই কোভিড সংক্রমণ স্তিমিত হতে শুরু হলে সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। সবার মধ্যে আস্থা তৈরি হয় যে এবার বইমেলা জমজমাট হবে। আর সত্যি সত্যি হয়েছেও তাই। দর্শক-ক্রেতাগণ নির্ভয়ে মেলায় আসছেন। মেলার নান্দনিক পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তুলছেন। ধারণা করি, ক্রয়-বিক্রয়ও ভালোই হচ্ছে।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বইয়ের দামও নিশ্চয় বাড়িয়েছেন, সেটা নিয়ে পাঠক-ক্রেতার প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
উত্তর: কাগজের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে -- প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে এক লাফে। তাই বলে তো বইয়ের দাম সেই হারে বাড়ানো যায় না। ক্রেতার দিকটাও বিবেচনায় রাখা দরকার। বইয়ের উৎপাদন ব্যয় এবং ক্রেতার ক্রয়মূল্যে একটা সহনীয় পর্যায়ের সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বই প্রকাশের সংখ্যা কমে গেছে কি না?
উত্তর: হ্যাঁ, স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে।২০২২-এর শেষের দিকে যখন ২০২৩ গ্রন্থমেলার জন্য বই মুদ্রণের ভরা মৌসুম, ঠিক সে সময় হঠাৎ করেই কাগজের দাম বৃদ্ধি প্রকাশকদের জন্য এক বড় ধাক্কা। আশা করা হচ্ছিল, এ সংকট অচিরেই কেটে যাবে, কিন্তু তা হয়নি।
প্রশ্ন: এর প্রভাবে বা কোন আশঙ্কা থেকে কোন ধরনের বিক্রয়কৌশল হিসেবে কোন ধরনের বই বেশি বা কম প্রকাশ করছেন কি না?
উত্তর: কাগজ সংকটের প্রভাবে বিক্রয় কৌশলে পরিকল্পিত পরিবর্তন আনার বিষয়টি সরল নয়। কারণ, কোন ধরনের বই বেশি বিক্রয় হবে সেগুলো আগে প্রকাশের ভাবনা থাকতেই পারে। কিন্তু আমাদের প্রকাশনায় শুধু লাভালাভের বিষয়টি মুখ্য বিবেচ্য হয় না। বইয়ের বিষয়ের গুরুত্ব, লেখকের প্রতি অঙ্গীকার -- এসব দিক বিবেচনায় রেখেও বইমেলার জন্য আমরা বই প্রকাশ করে থাকি।
প্রশ্ন: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। আমরা আমাদের প্যাভিলিয়ন (নং ৭) নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

প্রশ্ন: কোভিডোত্তর মেলা নিয়ে এবার কী আশা করছেন?
উত্তর: এবারের মেলা নিয়ে একটা সঙ্কটের কথা আগে থেকেই মাথায় ছিলো—সেটা হচ্ছে কাগজের দাম। শুধু কাগজের দামই না, বই প্রস্তুতির যতো সরঞ্জাম আছে তার সবটাতেই টালমাটাল অবস্থা। এরমধ্যেও যথেষ্ট বই প্রকাশ পেয়েছে। আমরা মনে করেছিলাম বই অর্ধেক বেচা হবে, মানুষের সমাগম কম হবে। কিন্তু মানুষ মেলায় এসেছে প্রচুর। সেই অর্থে বিক্রিবাট্টা খুব করুণ। আমি বলবো—বই আসছে অর্ধেক এবং ভালো করে খবর নিলে জানা যাবে বিক্রিও অর্ধেক। কোভিডের সময় বাদ দিয়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় কথাগুলো বলছি।
বইমেলা এক অর্থে একটা উৎসব। আমরা কোভিডের চোখরাঙানির মধ্যেও বইমেলায় গেছি। মেলা অর্ধেক সময়ের হয়েছে কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের আগে পরে হয়েছে। তারপরও সানন্দে আমরা মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কোভিড শুরু হয়েছে এরমধ্যেও লোক এসেছে। ঠিকই প্রবণতা বেড়ে গেলে শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে যায়। সেই সময়েও লোকজন এই উৎসবে অংশ হতে পিছপা হয়নি। সে্ই কারণে বইমেলায় যাবো, শুধু বেচাবিক্রি মূল উদ্দেশ্য না। ফলে আনন্দ নিয়ে প্রতিবছর যেমন অংশগ্রহণ করি, এবছরও করেছি।
প্রশ্ন: কাগজের দাম বাড়ায় বইয়ের দামও নিশ্চয় বাড়িয়েছেন, সেটা নিয়ে পাঠক-ক্রেতার প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
উত্তর: পাঠক ক্রেতারা জানেন—আমি বলবো জানেন না যে তা না—তাদের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, যেখানে পাঁচটা বই কেনার কথা, সেখানে সে দুইটা বই কিনছে। মেলায় যে এতো লোকসমাগম হয়—তারা সবাই যে বই কেনে আমি তা বলি না। আকাঙ্ক্ষাও করি না। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থে বই কেনে তাদের বই কেনার মাত্রাটা এবার একটু কম।
প্রশ্ন: এর প্রভাবে বা কোন আশঙ্কা থেকে কোন ধরনের বিক্রয়কৌশল হিসেবে কোন ধরনের বই বেশি বা কম প্রকাশ করছেন কিনা?
উত্তর: না। এই একটু আগে যে কথা বললাম—অনেকগুলো বই শেষ হয়ে গেছে। গত কোভিডকালে অল্প অল্প করে বিক্রি করে চলেছি। বইয়ের পুণঃমুদ্রণ করা হয়নি। এবার ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বইয়ের পুনঃমুদ্রণ করবো। কিন্তু কাগজের দাম—১৯শ ২১শ টাকার কাগজ প্রায় ৩৬শ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বিদেশী কাগজ ছোঁয়াই যাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই যা চেয়েছিলাম তা হচ্ছে না।
প্রশ্ন: বাজারে কি কাগজের সংকট আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, কাগজের সংকট আছে। আর যে ধরনের কাগজ আছে সেগুলোতে মুদ্রণ করা লোকসানের। গতকালই পাঠক সমাবেশের বিজু (সাহিদুল আলম বিজু) সাহেবের সঙ্গে কথা হলো। তার ম্যানেজার জানিয়েছে একশ রিম কাগজ কিনেছিলেন কিন্তু এখন আর কাগজ কিনতে পারছেন না। এখানেও একটা ব্যাপার কিন্তু আছে।
প্রশ্ন: মেলার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
উত্তর: এইটা একটা কঠিন প্রশ্ন। আগেও কয়েক জায়গায় আমি বলেছি—যেমন ধরেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই তো আগের মেলা বসতো। অল্প জায়গার মধ্যে, গাদাগাদি করে, স্টল ছোট করে সাজিয়ে আমরা মেলা করতাম। কিন্তু আমাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা গেলাম কোথায়? গেলাম সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে। এই পাওয়া কিন্তু আমাদের জন্য বিশাল পাওয়া ছিলো। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে প্রকাশকরা বিশাল করে জায়গা নিয়ে স্টল সাজালো, প্রতিষ্ঠান বেড়ে গেলো, স্টলের সংখ্যা বেড়ে গেলো। কিন্তু একটা দাবি মাঝে উঠল—এতো বড় চত্বর নিয়ে মেলা হলে পাঠকরা হেঁটে কুল পায় না। এটার সঙ্গে আমি একমত না, মেলায় গিয়ে আমি একদিনে গোটা মেলা হেঁটে দেখতে পারবো—এটা নাও হতে পারে। খুব কম মানুষই আছেন এই মেলায় যারা একদিন আসেন। এমনও মানুষ আছেন প্রতিদিন মেলায় যান। ফলে একদিনে আমি মেলা পুরোটা দেখে ফেলবো—এটা আশা করি কেন? সারা দুনিয়াতে এরকম আরও বহু মেলা আছে। কোলকাতা বইমেলা আমাদের বইমেলার চেয়ে অনেক বড় হয়। কিন্তু মানুষ ঘুরে দেখে সেটা। আমি বুঝি না, এটা কার বুদ্ধিতে হলো—মেলার জায়গাটা ছোট করে আনলে ভালো হবে। এবার ছোট হয়েছে তবু মানুষ কথা বলছে যে আবার সেই গাদাগাদি? এই পরীক্ষার শেষ নেই। আমরা একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতরে শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে যেতে পারবো, একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে থাকতে পারবো। আবার মেলা শুধু বই বিক্রির জন্য স্টল সাজিয়ে বসলাম, তা তো না। এই বইমেলা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে। একটা জাতির যা কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ম, চিন্তার জায়গা, সৃজনশীলতার জায়গা এই বইমেলা। সবকিছুরই বহিঃপ্রকাশ এই বইমেলায় ঘটে। এখানে আরো অনেক ইভেন্ট থাকতে পারে। তাবু টানিয়ে ছোট ছোট মঞ্চ করে সেখানে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা… কতো কি না হতে পারে! আমার মনে হয়, এ বিষয়ে যারা ভাবেন তাদের মেলা কর্তৃপক্ষ, বাংলা একাডেমির সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা সাজিয়ে শুধু বই বিক্রির মধ্যে না রেখে বইমেলাকে কেন্দ্র করে জাতীয় পরিচয়ের সার্বিক স্ফূরণ ঘটাতে পারেন। এক মাস ধরে হয় এমন কোন ইভেন্ট আছে বাংলাদেশে বর্তমানকালে? একমাস ধরে হচ্ছে, তার এতো প্রচার! সমস্ত মিডিয়া ঝাপিয়ে পরছে এর কর্মযজ্ঞে। অথচ সেই জায়গায় আমরা কী দিতে পারছি? যারা বইমেলায় আসে তারা খালি ঘুরে, দুচারটা বই কিনে চলে যাবে? তা কেন? এখান থেকে অনেক কিছু নিয়ে যাবার আছে। আমরা যদি দিতে পারি, মানুষ নেবে। সময় লাগবে হয়তো সেটা বুঝতে। এটাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে দিনে দিনে।