Published : 06 Jun 2026, 08:57 PM
বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আনিস আহমেদ সম্প্রতি ফেসবুকে যুক্তরাষ্ট্রের কলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নাভিন মুরশিদের একটি পডকাস্ট শেয়ার করেছেন, যার শিরোনাম ছিল, ‘রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করার যোগ্যতা কি আমাদের আছে’? এই ভাবনাগুলোর আরও সুসংহত রূপ পাওয়া যায় ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত নাভিন মুরশিদের লেখা, ‘The Rabindranath We Have Not Yet Claimed’, শীর্ষক প্রবন্ধে।
নাভিন মুরশিদের আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের একটি বিশেষ পাঠ সামনে আসে, যাকে তিনি ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথ’ নামে চিহ্নিত করেন।
নাভিনের মতে, শিলাইদহে এসে পদ্মা নদী, বিস্তীর্ণ প্রকৃতি এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় রবীন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। পদ্মা তাঁকে বদলে দিয়েছিল। পূর্ববঙ্গ তাঁর কল্পনা, ভাষা, অনুভব ও মানবিক বোধকে পুনর্গঠিত করেছিল। নিজেদের জমিদারি তদারকির সূত্রে পূর্ববঙ্গের কৃষকের জীবন, নদীভাঙন, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ পরিচয় তাঁর হয়েছিল, তা তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে বাউল ও ফকিরি ধারার প্রভাবকে নাভিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ও আধ্যাত্মিকতার অন্যতম উৎস ছিল এই বাউল-ফকিরি ঐতিহ্য। লালন ও বাউল দর্শনের মাধ্যমে তিনি এমন এক ধর্মবোধের সন্ধান পেয়েছিলেন, যেখানে মানুষই ঈশ্বরকে উপলব্ধির প্রধান পথ হয়ে ওঠে। পূর্ববঙ্গের এই লোকজ জগৎ রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন জমিদার নয়, একজন গভীর মানবতাবাদী চিন্তকে পরিণত করেছিল।
নাভিনের মতে, আমরা এখনো সেই রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি পুনরাবিষ্কার করতে পারিনি, যাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গড়ে উঠেছিল এই ভূখণ্ডে। ‘The Rabindranath We Have Not Yet Claimed’— বলে নাভিন এটাই বলতে চান, এই রবীন্দ্রনাথ এমন এক রবীন্দ্রনাথ, যাঁকে আমরা এখনো আমাদের নিজস্ব ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে দাবি করে উঠতে পারিনি।
নাভিনের পডকাস্টকে ঘিরে আনিস আহমেদের পোস্টে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। সেসব মন্তব্যের বেশিরভাগই ছিল নাভিনের বক্তব্যের বিরোধিতা করে। এই আপত্তি মূলত তাঁর তথ্যের কারণে নয়, বরং সেই তথ্যের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে। সমালোচকদের মতে, পূর্ববঙ্গ, পদ্মা, বাউলধারা ও গ্রামীণ জীবনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের ওপর গভীর ছিল--এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য, কিন্তু সেখান থেকে ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথ’ ধারণা নির্মাণ করলে রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক ও বিশ্বজনীন সত্তা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
উদাহরণ হিসেবে এখানে দু’জনের মন্তব্য হাজির করছি। প্রথমজন প্রাবন্ধিক এবং শিক্ষাবিদ সুব্রত শঙ্কর ধর। তিনি বলেন, ’রবীন্দ্রসাহিত্যে পূর্ববঙ্গ নিয়ে গোলাম মুরশিদের একটি বইই আছে, সেটি সাহিত্য-কেন্দ্রিক। আজ যে “বাংলাদেশী রবীন্দ্রনাথ”-এর তত্ত্বতালাশ দেখি, সেটি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, তাকে যে মুখোশই পরিয়ে রাখা হোক না কেন, আপাতদৃষ্টিতে একজন বাংলাদেশী রবীন্দ্রনাথের নির্মাণ যেন রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক রাখার একটি উদ্ধার-প্রকল্প। কিন্তু কোন খণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে হাজির করে তাঁকে উদ্ধার করার এই “মহৎ” প্রকল্পটির পিছনের মতলবটি বোঝা দরকার। রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিত করে যারা দেখে বা দেখাতে চায়, তারা আসলে “আধখানা কথা”ই বলে এবং সেই কথনটি মোটেও নির্দোষ, মোটেও অরাজনৈতিক নয়। কোনভাবে ওই রাজনৈতিক ছাঁচে রবীন্দ্রনাথকে ফেলতে পারলে একজন সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করার কাজটা সহজ হয়।’
নাভিন মুরশিদের বক্তব্যে “আমাদের” ও “ওদের”, “ভিতর” ও “বাহির”—এই ধরনের বিভাজনের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের মূল্য প্রধানত “আমাদের” অভিজ্ঞতার ভেতরে নিহিত; বিশ্বপরিসরে পরিচিত রবীন্দ্রনাথ যেন এক অর্থে “ওদের” নির্মিত অবয়ব। এই দৃষ্টিভঙ্গির জবাবে সুব্রত শঙ্কর ধরের বক্তব্যের সারমর্ম মোটামুটি এভাবে তুলে ধরা যায়—‘রবীন্দ্রনাথকে “ভিতর” ও “বাহির”, কিংবা “আমাদের” ও “ওদের”—এই কৃত্রিম বিভাজনের মধ্যে আবদ্ধ করা তাঁর সমগ্রতাকেই খণ্ডিত করে। এতে রবীন্দ্রনাথের কোনো ক্ষতি হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা নিজেরাই। কারণ এই বিভাজন কেবল একজন লেখককে নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক কল্পনাশক্তিকেও সংকুচিত করে। “ভিতরের মানুষ” কোনো একরৈখিক সত্তা নয়; তার ভেতরেই যেমন মুক্তির সম্ভাবনা আছে, তেমনি আছে সংকীর্ণতা ও ধ্বংসের প্রবণতাও। তাই শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথকে যেমন দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে বিশ্বমানব রবীন্দ্রনাথকেও। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা—সব ধরনের সংকীর্ণ পরিচয় ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠার শিক্ষা। সে কারণেই বাঙালি শেষ পর্যন্ত অর্ধেক রবীন্দ্রনাথে থেমে থাকবে না; নিজের সাংস্কৃতিক তাড়নায় সে ফিরে যাবে সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথের কাছেই। আর সেই সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে দেখতে হবে আকাশভরা চন্দ্র-তারার বিস্তারে—যেভাবে দেখেছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদের মতো প্রাজ্ঞ মানুষরা।’
সুব্রত শঙ্কর ধর একটি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দেশভাগের সীমারেখা তো কোনো চিরন্তন বা স্বাভাবিক সত্য ছিল না, তা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। ইতিহাস অন্যভাবে ঘটলে শিলাইদহ আজকের বাংলাদেশের বদলে নদীয়া জেলার অংশও হতে পারত। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথের ওপর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দাবি হঠাৎ করেই দুর্বল হয়ে যেত? কিংবা তিনি আর “আমাদের” থাকতেন না?’
এই প্রশ্নটি দেখিয়ে দেয় যে, কোনো শিল্পীকে কেবল ভূগোলের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার মধ্যে মৌলিক সমস্যা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সীমানা পরিবর্তনশীল, কিন্তু সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তার চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী ও বিস্তৃত। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশেরও, ভারতেরও; আবার একই সঙ্গে তিনি এই দুই পরিচয়কেও অতিক্রম করেন। তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের খোপে আটকে ফেললে তাঁর সৃষ্টিশীলতা, বৌদ্ধিক বিকাশ এবং বিশ্বজনীনতার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে।
পরের মন্তব্যটি কবি, প্রাবন্ধিক গোলাম ফারুক খানের। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই টানা-হেঁচড়ার ইতিহাস নতুন নয়। পাকিস্তান আমলেই এটা শুরু হয়েছিল এবং এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খান সারওয়ার মুরশিদ স্যার রীতিমতো নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। একটা anecdote (এর পেছনে কিছু সত্যতাও থাকতে পারে) আছে -- পূর্ব-পাকিস্তানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ গভর্নর আবদুল মোনেম খান নাকি একবার অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইকে বলেছিলেন, “এই ভারতীয় হিন্দু কবির গান নিয়ে এত আদিখ্যেতা কেন? আপনারা নিজেরা রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না?” জবাবে অধ্যাপক হাই নাকি বলেছিলেন, “জনাব, আমি লিখলে তো সেটা রবীন্দ্রসঙ্গীত থাকবে না, হাই-সঙ্গীত হয়ে যাবে।” এখন কৌশল পালটেছে। একদিকে রবীন্দ্রনাথের ওপর অশালীন নগ্ন আক্রমণ যেমন চলছে, অন্যদিকে তেমনি সূক্ষ্ম কৌশলে তাঁকে কাটছাঁট করার কিংবা খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা আছে। পাশাপাশি বাইনারি নিরসনের নামে বাঙালি আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে উচ্ছেদ করে চোরাগলি দিয়ে মুসলিম আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে এনে সর্বগ্রাসী করে তোলার চেষ্টাও আছে। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ-বাসপর্ব (১৮৯১-১৯০১) দিয়ে তাঁর বাংলাদেশিকরণের চেষ্টাটাও হয়তো এই কৌশলেরই অংশ।
সত্য যে, শিলাইদহ-বাস রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এ নিয়ে অনেক আগেই অনেকে লিখেছেন। কিন্তু শুধু এই পর্ব এবং তার প্রভাবের জন্যই কি রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবেন? এর আগের রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের রবীন্দ্রনাথ নন? কিংবা এর পরের রবীন্দ্রনাথ কি শুধু শিলাইদহ-বাসের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান দিয়ে গড়া? সতত-বৃদ্ধিশীল রবীন্দ্রমানস স্বদেশ ও বিশ্বের চিত্তসম্পদকে আত্মস্থ করে নিজের অলোকসামান্য প্রতিভার গুণে যে বহুবর্ণিল, বহুস্তরীয় সৃষ্টি আমাদের উপহার দিয়েছে, তাকে শুধু শিলাইদহের ছোট খোপে ঢুকিয়ে বিচার করা যাবে? “স্বদেশ” পর্বের অনেক বিখ্যাত গান তো শিলাইদহ-বাসের পরেই লেখা। “আমার সোনার বাংলা”ও বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯০৫ সালে লেখা। তাই বলে কি এগুলোকে বাঙালি আত্মপরিচয়ের রাজনীতির প্রতীক বলে ধরে নিয়ে তথাকথিত বাংলাদেশ ২.০-র কালে আমাদের বর্জন করতে হবে? সেটাই হবে “রাজনীতিকে পাশে সরিয়ে দিয়ে” রবীন্দ্রপাঠ? এ কথাও সত্য যে, রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের পর থেকে ক্রমাগত জাতীয়তাবাদকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। তার মানে তো এই নয় যে তিনি অরাজনৈতিক হয়ে গিয়েছিলেন কিংবা বাংলাদেশ তাঁর চিত্ত থেকে অবলুপ্ত হয়েছিল।
আসলে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে ও ধারণ করতে হলে তার সমগ্রতাকে বুঝতে হবে, টুকরো রবীন্দ্রনাথকে নয়। কারণ তিনি একজন মহৎ শিল্পী, যিনি একই সঙ্গে সমকাল আর চিরকালের প্রতিনিধি, যিনি বহু বিপ্রতীপকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেন। “রক্তকরবী”তে রঞ্জনকে বাদ দিয়ে নন্দিনীকে যখন যক্ষপুরীতে নিয়ে আসা হয়, সে প্রশ্ন করেছিল রঞ্জনকে কেন আনা হলো না। জবাবে অধ্যাপক বলেছিলেন, “সব জিনিসকে টুকরো করে আনাই এদের পদ্ধতি।” আমরাও কি রবীন্দ্রনাথকে এভাবে টুকরো করতে চাই? কিন্তু তা সম্ভব নয়। সেটা হবে আলোর শিখাকে ছুরি দিয়ে টুকরো করার অপচেষ্টা। এই অপচেষ্টা পাকিস্তান আমলে ব্যর্থ হয়েছিল, এখন আবার ব্যর্থ হবে, ভবিষ্যতেও ব্যর্থ হবে।’
নাভিন মুরশিদ সমালোচনাগুলোর কিছু জবাব দেবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়াগুলোও তাঁর পডকাস্ট এবং লেখার মতো একই ধরনের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের ভূগোল ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্পাঠের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিলেও, রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাকে রাষ্ট্র ও জাতীয়তার সংকীর্ণ সীমানার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছিলেন, সেই দিকটি তাঁর আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে কখনো কখনো তাঁর বক্তব্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাদেশি’, ’ভারতীয়’ কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রিক পরিচয়ের কাঠামোর মধ্যেই বুঝতে হবে। অথচ রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী ও বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি এমন এক পরিসরে অবস্থান করে, যা এই ধরনের পরিচয়গত সীমারেখাকে অতিক্রম করে। ফেসবুকে এরপর এ-বিতর্কে তাঁর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
নাভিন মুরশিদের পিতামহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ খান সারওয়ার মুরশিদ, ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অধুনালুপ্ত ত্রৈমাসিক ‘শ্রাবণ’ পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যায় ১৯৮৭ সালে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এই সাক্ষাৎকারটি রবীন্দ্রনাথকে বোঝার জন্য এবং ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকট বোঝার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এর মূল্যায়ন কয়েকটি দিক থেকে করা যায়।
সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় খান সারওয়ার মুরশিদ বলেন, ‘পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জনের ভাষা বাংলার ইতিহাসের মহত্তম স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। সে কারণে আমি তাঁর সাহিত্য পড়বো এবং অন্যরাও পড়ুক তা চাইবো। তাঁকে অস্বীকার করার অর্থ নিজ সাহিত্যে এবং মহৎ সাহিত্যে বাঙালির অধিকার হারানো। আর রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে বাঙালির আকর্ষণ ভাবালুতার ব্যাপার নয়। পৃথিবীর অনেক বড়ো প্রতিভার তুলনায়ও তিনি বিশিষ্ট। খুব কমই সার্থক শিল্পী আছেন যিনি সাহিত্যের এবং শিল্পের এতগুলো বিভাগে একই সঙ্গে এমন তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আমরা এই ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির যে-অংশের সঙ্গে পরিচিত সেটার ব্যাপ্তি নেহায়েত কম নয়। ভেবে দেখো, রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় উপনিষদের ঐতিহ্য থেকে আরম্ভ করে ইসলামি মরমিবাদ, পাশ্চাত্যের রেনেসাঁস, মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান ইত্যাদি মিলিয়ে ভারতীয় ও আধুনিক সংস্কৃতির কি বিরাট এলাকা তাঁর রচনায় প্রকাশ করেছেন। ঠিক অতখানি কি আর কেউ করতে পেরেছেন ভারতীয় উপমহাদেশে? রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংস্কৃতির সবচেয়ে পূর্ণোদিত মানুষ এবং একই সঙ্গে স্ববিরোধ সত্ত্বেও একজন বড়ো মাপের আধুনিক মানুষ। তাঁর কালের, আমাদের কালের পরিপ্রেক্ষিতেও ভাবুক হিসেবে তিনি উপেক্ষণীয় নন। তাঁর সমাজ-ও-রাষ্ট্রচিন্তা এবং শিক্ষাদর্শনে ভাববার মতো অনেক কিছু আছে। কবি হিসেবে তাঁর অন্যান্য দিকের মধ্যে তাঁর বিবর্তন ও পরিণতিতে বিস্ময় ও আকর্ষণ আছে।’
পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন একটি একক ধর্মভিত্তিক জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করছিল এবং রবীন্দ্রনাথকে সেই পরিচয়ের বাইরে ঠেলে দিতে চাইছিল সেই প্রেক্ষাপটে খান সারওয়ার মুরশিদ বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের বর্ণাঢ্য বিচিত্রমুখী অবদান বাঙালি সত্তাকে ঋদ্ধ করেছে। পাকিস্তানি হয়েও আমরা তাঁর অংশীদার। সুতরাং সে মহৎ সাহিত্য আমার, এবং আমার উত্তরাধিকারীকে আমি তা থেকে বঞ্চিত হতে দেবো কেন?’ তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করার শর্তে আমরা পাকিস্তান গ্রহণ করিনি এ কথাটা শাসকদের যথাযোগ্যভাবে জানিয়ে দেওয়া আমি জরুরি মনে করি।’
সাক্ষাৎকারের একদম শেষে খান সারওয়ার মুরশিদ বলেন, ’মানুষ ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথ একটি বিশেষ কালের সবচেয়ে পূর্ণ প্রকাশ ও রূপমণ্ডিত প্রতিভূ, সে কারণে পরবর্তী কালের এক তীক্ষ্ণ বিচারক এবং কষ্টিপাথর। আর শিল্পী রবীন্দ্রনাথ নিরন্তর সৃষ্টি, বিকাশ ও পরিণতিতে, নেতি ও ইতির মোকাবেলায়, নানা ঋতু ও গতি পরিবর্তনে, এক বিস্ময়কর কাব্যিক বিবেক ও অভিজ্ঞতা, যার পাঠ সহজে ফুরোবার নয়।’
খান সারওয়ার মুরশিদের রবীন্দ্রনাথ-চিন্তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কথাগুলোকে আমরা দেখতে পারি। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে একজন সাহিত্যিক হিসেবে মূল্যায়ন করেননি, বরং তাঁকে বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আধুনিক আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মুরশিদ স্মরণ করিয়ে দেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ ছিল বাংলাভাষী। যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার ওপর একধরনের একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। এখানে রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, তিনি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতারও প্রতীক। পাকিস্তানি রাষ্ট্র যখন বাঙালিকে তার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করা এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে উঠেছিল।
মুরশিদের অন্যতম শক্তিশালী বক্তব্য হলো--রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার অর্থ নিজ সাহিত্যে এবং মহৎ সাহিত্যে বাঙালির অধিকার হারানো। এখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে শুধু একজন ব্যক্তিগত প্রতিভা হিসেবে দেখছেন না। বরং বলছেন, রবীন্দ্রনাথ এমন এক সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারের প্রতিনিধি, যার মধ্যে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, দর্শন ও আধুনিকতার দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রা সঞ্চিত আছে। রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করা মানে কেবল একজন লেখককে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং নিজের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেই প্রত্যাখ্যান করা।
মুরশিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা খণ্ডন করেন। তিনি বলেন, বাঙালির রবীন্দ্রনাথপ্রেম কোনো আবেগপ্রবণ বা ভাবালু জাতীয় প্রবণতা নয়। তাঁর যুক্তি হলো, বিশ্বসাহিত্যের পরিমণ্ডলেও রবীন্দ্রনাথ একটি বিরল ঘটনা। খুব কম শিল্পী আছেন যাঁরা কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, শিক্ষা-চিন্তা, সমাজ-চিন্তা, রাষ্ট্র-চিন্তা--এসব ক্ষেত্রে একযোগে এত গভীর ও স্থায়ী অবদান রাখতে পেরেছেন। এখানে মুরশিদ রবীন্দ্রনাথকে কেবল বাঙালি লেখক নয়, বিশ্বমানের বহুমাত্রিক প্রতিভা হিসেবে দেখছেন।
রবীন্দ্রনাথের রচনার মধ্যে মিলিত হয়েছে উপনিষদের আধ্যাত্মিকতা, ইসলামি মরমিবাদ, ইউরোপীয় রেনেসাঁস, মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা। অর্থাৎ তিনি কোনো একক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি নন। তিনি বহু ঐতিহাসিক ধারার সংলাপস্থল।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে পূর্ণোদিত মানুষ—এই অসামান্য উক্তির মাধ্যমে তিনি বলবার চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রনাথ একটি সভ্যতাগত সংশ্লেষণের প্রতীকও।
আমরা দেখি, খান সারওয়ার মুরশিদ রবীন্দ্রনাথকে নিছক ঐতিহ্যের কবি হিসেবে দেখেন না। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন—সমাজচিন্তা, রাষ্ট্রচিন্তা, শিক্ষাদর্শন, এই ক্ষেত্রগুলোতে রবীন্দ্রনাথ এখনও প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ তাঁর গুরুত্ব শুধু সাহিত্যিক নয়, বৌদ্ধিকও। এখানে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে। মুরশিদ রবীন্দ্রনাথকে এমন একজন আধুনিক চিন্তাবিদ হিসেবে দেখছেন, যিনি জাতি, রাষ্ট্র, শিক্ষা ও মানবমুক্তি সম্পর্কে এমন প্রশ্ন তুলেছেন যা আজও অমীমাংসিত।
মুরশিদের মন্তব্য, প্রারম্ভিক রবীন্দ্রনাথ এবং পরবর্তী রবীন্দ্রনাথ এক নন। প্রকৃতি ও প্রেমের কবি, স্বদেশচিন্তার কবি, বিশ্বমানবতার কবি, আধুনিক উদ্বেগের কবি--এই দীর্ঘ যাত্রাপথে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বারবার নতুন করে নির্মাণ করেছেন। খান সারওয়ার মুরশিদের কাছে এই বিবর্তনই তাঁকে আরও বড় শিল্পীতে পরিণত করেছে।
পাকিস্তানি হয়েও আমরা তাঁর অংশীদার, কেন বললেন তিনি? এখানে তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য টানছেন। রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব এক জিনিস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আরেক জিনিস। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির সাংস্কৃতিক সম্পদ। তাই পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও একজন বাঙালির তাঁর ওপর অধিকার আছে।
এবার যদি আমরা নাভিন মুরশিদের রবীন্দ্র-ভাবনা নিয়ে কথা বলতে চাই, দেখব তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তিনি রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক পরিচয়কে একটি নির্দিষ্ট ভূগোল ও রাষ্ট্রিক দাবির কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী। পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি, পদ্মা কিংবা শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু সেখান থেকে ‘বাংলাদেশি রবীন্দ্রনাথ’-এর ধারণাকে রবীন্দ্রনাথের প্রধান পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা সমস্যাজনক।
কারণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর সাহিত্য ও চিন্তায় জাতীয়, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রিক সীমানাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেকে কোনো সংকীর্ণ ভূখণ্ডের কবি হিসেবে কল্পনা করেননি; বরং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত থেকে দাঁড়িয়ে এক বিশ্বজনীন মানবতাবাদের দিকে অগ্রসর হয়েছেন। নাভিনের পিতামহের কাছ থেকেই তো আমরা জেনেছি, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক পরিসরে যেমন পূর্ববঙ্গ আছে, তেমনি উপনিষদ, বৈষ্ণব ভাবধারা, ইসলামি মরমিবাদ, ইউরোপীয় রেনেসাঁ, মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধুনিকতার নানা প্রবাহও আছে।
আর রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাদেশি’ প্রমাণ করার প্রয়োজনই বা কী? বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে আপন মনে করে বলেই তো তিনি আমাদের। শেক্সপিয়ারকে নতুন করে ব্রিটিশ প্রমাণ করে কেউ পড়েন না, দস্তয়েভস্কিকেও রুশ পরিচয়ের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় না। মহৎ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত জাতীয়তার চেয়ে মানবজাতি নামক বৃহত্তর পরিসরে অবস্থান করে।
‘শ্রাবণ’ পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খান সারওয়ার মুরশিদের আরো কিছু কথা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের বহু আয়তন, তাঁর নিছক নৈষ্ঠিক পণ্ডিতি চর্চা একটা বিপুল প্রয়াস হয়ে উঠতে পারতো, যেমন হয়েছে ইয়েটসের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে ভাবনা চিন্তা এবং গবেষণা হচ্ছে এ বাংলার অবদান তাতে অকিঞ্চিৎকর। গত পঁচিশ বছরের মধ্যে এখানে ডিগ্রির জন্যে লিখিত দু'একটা অভিসন্দর্ভ, এক আধটা সমালোচনা-গ্রন্থ, ছিটেফোঁটা কয়েকটি প্রবন্ধ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে কি? আমাদের কোনো পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথকে তাঁর জীবনের সাধনা করেননি। কবি-গাল্পিক রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা মাঝে মাঝে যাই। কিন্তু প্রতিবাদী ‘সমাজ-সমালোচক, জিজ্ঞাসু অস্বস্তিকর’ রবীন্দ্রনাথ আমাদের বড়ো একটা কৌতূহলের ব্যাপার নয়। শিক্ষা সমাজ রাষ্ট্র সভ্যতার নানা মৌলিক প্রশ্ন ও সমস্যার নিরন্তর বিশ্লেষক, এসব বিষয়ের ভাবুক, রবীন্দ্রনাথ আমাদের খুব কাছের ব্যক্তি নন। আসলে এ দূরে সরে যাওয়া নয়, মনন বা জিজ্ঞাসাজাত অবস্থান পরিবর্তন নয়, বিশ্বসাহিত্যের খোলা দিগন্তে অপর কোনো মহৎ অনুরাগ নয়, কোনো সচ্ছল উদার আপেক্ষিকতাবোধও নয়--এ অজ্ঞতা বা ঔদাসীন্য বা দুই-ই। এ আমাদের অগভীর বৌদ্ধিক জীবন, তরল সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত।’
খান সারওয়ার মুরশিদ অনুধাবন করেছেন, রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, দর্শন, শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রবিষয়ক ভাবনার ব্যাপ্তি এত বিশাল যে, তাঁকে নিয়ে সারাজীবন গবেষণা করা যায়। কিন্তু সেই আশির দশক অব্দি বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে গভীর ও ধারাবাহিক গবেষণা খুব কম হয়েছে। এখনো যে সেই পরিবেশ বদলেছে, আমরা তা বলতে পারি না। বরং এখন বিভ্রান্তি আরো বেড়েছে।
নাভিন মুরশিদের রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ক আলোচনা, যেমন মানস চৌধুরী, মোহাম্মদ আজম, সাজ্জাদ শরিফ কিংবা অন্যদের নিয়ে করা তাঁর পডকাস্টগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে একটি নির্দিষ্ট বৌদ্ধিক প্রবণতা চোখে পড়ে। তিনি বাংলা সংস্কৃতি ও তার প্রতিষ্ঠিত পাঠগুলোকে পরিচয়, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্কের আলোকে পুনর্বিবেচনা করতে আগ্রহী। এই প্রচেষ্টার গবেষণামূল্য থাকলেও, যখন প্রতিষ্ঠান ও তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান বিশ্লেষণের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সৃষ্টিশীল কাজটি অনেক সময় আড়ালে চলে যায়। ফলে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক কল্পনার বিস্তারের ভেতর দিয়ে বোঝার পরিবর্তে তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ও চর্চার ইতিহাসই মুখ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক সত্তা একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে—যা খান সারওয়ার মুরশিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে।
নাভিনকে ধন্যবাদও দিতে হয়, তিনি তাঁর নিজের মতো করে রবীন্দ্রসংগীতচর্চায় নিবিষ্ট। সত্যি বলতে, নাভিন মুরশিদ হয়তো রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করতে চান না। কিন্তু ওই শিলাইদহের খোপ দিয়ে দেখে রবীন্দ্রবিচারের বিপদের দিকটিও তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। রবীন্দ্র-সংকীর্ণায়ন রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করারই প্রাথমিক পদক্ষেপ। সেটি তিনি যাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন। প্রশ্ন হলো নাভিন সেটি বোঝেন কি না।