Published : 13 Oct 2025, 09:29 PM
…
ঘড়ির কেসটা বত্রিশ চাকের, কলে কব্জা বেসুমার
দুইশ ছয়টা হাড়ের জোড়া বাহাত্তর হাজার তার
ও মন, দেহঘড়ি চৌদ্দতলা, তার ভিতরে দশটি নালা,
একটা বন্ধ নয়টা খোলা গোপনে এক তালা আছে।।
একটা চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া
জনম ভইরা চলিতেছে
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মেস্তরী বানাইয়াছে।।
—আবদুর রহমান বয়াতি

Light Passage, Body And Light drawing series, 1990–96
১৪ শতকের দক্ষিণী উর্দু সাহিত্যের প্রথম মরমি উপাখ্যান বা মসনবীর একটি গল্পপাঠ দিয়ে শুরু করা যাক —
হিরণনগরের রাজা কদম রাও ছিলেন জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, ধনী, তবু তাঁর অন্তরে বাস করত এক গভীর ভয়—মৃত্যুভয়। তিনি ভাবতেন, এই দেহ তো নশ্বর, একদিন নিশ্চয়ই ক্ষয় হবে। দিনরাত তিনি ধ্যানে বসতেন, চেষ্টা করতেন কোনো উপায় খুঁজতে —কীভাবে প্রাণটাকে অমর রাখা যায়। তিনি সহচর পদম রাওকে বললেন,“মৃত্যুভয় আমার হৃদয়ে ঘুরে বেড়ায়। জীবন যত সুখেরই হোক, শেষটাতো ধ্বংসই।”
পদম রাও শান্তভাবে বলল, “রাজা, যা এসেছে তা একদিন চলে যাবে। দেহে থাকুন, মনে শিবের ভাব রাখুন —এ-ই জীবনের সত্য।”
রাজা সে উপদেশ মানলেন না। তাঁর মনে অহংকার ও অমরত্বের বাসনা জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন, যদি কোনো গুপ্ত রহস্য জানা যায়, যার দ্বারা দেহকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়?

Sleep, Body And Light drawing series, 1990–96
এক যোগী এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, “রাজা, আমি জানি সেই রহস্য, তুমি যা চাও তা অর্জন করতে পারবে।”
যোগী রাজার দরবারে এসে মন্ত্র পাঠ করলেন। রাজা গভীর ধ্যানে বসলেন। যোগী বললেন, “দেহ ত্যাগ করো, আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করো।” রাজা চোখ বন্ধ করলেন, ধীরে ধীরে তাঁর চেতনা দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেল। রাজার দেহ নিথর হয়ে রইল, আর যোগী সেই ফাঁকা দেহে প্রবেশ করলেন। রাজার আত্মাকে তিনি এক তোতা পাখির ভেতর বন্দি করে রাখলেন, এক সোনার খাঁচার ভেতরে।
কিছুদিন পর পদম রাও লক্ষ করল —রাজা আর আগের মতো নন। চোখে অন্য রকম দৃষ্টি, কথায় গর্ব, হৃদয়ে শীতলতা। সে ভাবল, এ আর সেই রাজা নয় —এই দেহে অন্য কেউ আছে।
রাতের রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠল, বাতাসে ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। পদম রাও বুঝলো, কোনো গভীর ছলনা ঘটেছে। অনুসন্ধান করতে করতে সে এক গোপন কক্ষে পৌঁছালো। সেখানে এক সোনার খাঁচার মধ্যে বসে ছিল এক তোতা পাখি, চোখে তার সেই একই রাজসিক দৃষ্টি। মন্ত্রী নিঃশ্বাস চেপে বললো, “এই তো রাজার প্রাণ—এই তো তাঁর জীবনের আলোকবিন্দু।”
সে প্রার্থনা করল, মন্ত্র পাঠ করল। তোতাটি কেঁপে উঠল আর রাজার দেহ হতে যোগী সরে যেতেই প্রাসাদে নিথর পড়ে থাকা দেহটিও নড়ল, চোখ খুলে উঠল কদম রাওয়ের।
রাজা গভীর নিশ্বাস নিয়ে জেগে উঠলেন। তার মুখে আলো ঝলমল করল, কণ্ঠে শান্ত স্বর, তিনি বললেন —
দেহ মেঁ মন্দির, জান মেঁ নূর
দোনো মিলে তো হোয়ে হুজুর।।
… … …
দেহে মন্দির, প্রাণে আলো,
দুয়ে মিলে অস্তিত্ব প্রকাশিলো।
“দেহ হলো মন্দির, আত্মা তার প্রদীপ। দু’য়ে এক হলে তবেই জ্বলে জগতের আলো। আমি দেহ থেকে পালাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বুঝলাম—ঈশ্বর এই দেহঘরের মধ্যেই আছেন।”
সেদিন থেকে রাজা প্রতিদিন প্রভাতে আয়নায় তাকাতেন, দেখতেন নিজের মুখ নয়, বরং ভেতরের সেই দীপ্তি, যে দীপ্তি একদিন বন্দি ছিল এক পাখির হৃদয়ে।
—ফখরুদ্দিন নিযামী বিদরী; কদম রাও পদম রাও
: : মার্বেলের সিনেমাকৃতি বনাম দেহস্থাপত্যের ভবদর্শন : :
দেহ এবং ঘর। দেহঘরের শুরুর কথা পাড়বার কষ্টদায়ক প্রচেষ্টা যাই হোক তার সহজ উদাহরণ বা দৃশ্যায়ন যেখানে মিলবে সেখানে স্বয়ং শিল্পেশ্বর অ্যান্টনি গর্মলি বিরাজ করেন। সমকালীন সময়ের সেরা পাঁচজন ভাস্করের ভেতর তাঁর নাম নিলে শুরুতেই জ্বলজ্বল করবে। কিংবা একুশ শতকের শ্রেষ্ঠতর মহান ভাস্কর বললেও তাকে বাড়িয়ে বলা হয় না। সেই তিনি পশ্চিমা ভাস্কর্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে ‘‘মার্বেলের সিনেমা’‘ বলে মনে করেন।
অ্যান্টনি গর্মলি বুঝতে পারলেন—যেভাবে তাঁর ভেতরের আকাশ নীরবে প্রসারিত হয়, তেমনি বাইরের দুনিয়াতেও শিল্প মানে এক নীরব বিস্তার, কোনো নাটকীয় প্রদর্শনী নয়। পশ্চিমা ভাস্কর্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন—সেখানে মানুষকে প্রায়ই দেখা হয় এক অভিনয়রত শরীর হিসেবে। মার্বেলের দেহে জমে আছে ক্রোধ, যন্ত্রণা, বীরত্ব, প্রেম—যেন কোনো মুহূর্তের নাটক থেমে গেছে চিরতরে। তিনি একে বলেছিলেন “মার্বেলের সিনেমা”—একটা এমন ভাস্কর্য-ধারা, যা সময়কে থামিয়ে রাখে কেবল বাহ্যিক আবেগের দৃশ্য হিসেবে। যেন সিনেমার এক ফ্রেম, যা থেমে গেছে, কিন্তু চলতে চায়।

Witness
তাঁর মনে হয়েছিল, এই জমাট নাটকীয়তা শেষ পর্যন্ত হাস্যকর হয়ে ওঠে, কারণ তা আমাদের স্পর্শ করে না। দেহের ভেতরের নীরব আলো, সেই অনুভবের গভীরতা সেখানে অনুপস্থিত। শিল্প হয়ে ওঠে কেবল দৃশ্যমান এক প্রতিলিপি, এক পুনরুৎপাদিত অ্যাকশন। গর্মলি সেই পুনরুৎপাদনের বিরোধিতা করেন। তাঁর কাছে ভাস্কর্য কোনো নাটক নয়—এটা টেলিভিশন বা সিনেমার কাজ। ভাস্কর্যের কাজ হলো থেমে থাকা, সেই থেমে থাকার ভেতর মানুষের অস্তিত্বের উপস্থিতি অনুভব করা।
‘‘আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা নীরব, কিন্তু তোমাকে তোমার দেহ সম্পর্কে সচেতন করবে।” তিনি বলেন, “It is not the body that acts that interests me, but the body that feels.” এই অনুভবী দেহই তাঁর শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে কোনো গতি নেই, কোনো ভঙ্গি নেই, আছে কেবল উপস্থিতির ঘনত্ব। তাঁর দৃষ্টিতে, শিল্প মানে দেহ ও সময়ের মধ্যকার এক গোপন স্থিরতা, যা আমাদের আত্মার মতো—চলমান অথচ দৃশ্যত স্থির। সেই স্থিরতার ভেতরেই জেগে ওঠে সবচেয়ে গভীর আন্দোলন: চেতনার, স্মৃতির, অস্তিত্বের।
গর্মলির কাছে এই স্থির দেহই সত্যিকারের শিল্প, যেখানে দর্শক নাটক দেখে না—বরং নিজেকে খুঁজে পায়।

গর্মলির চোখে মানবদেহ কোনো বাহ্যিক সৌন্দর্যের বস্তু নয়। বরং এক যন্ত্র, যার প্রতিটি হাড়, কোষ, পেশি, ও শ্বাসে কাজ করছে এক অদৃশ্য কলকব্জা। তিনি বলেন, “The body is not an object. It is a place — a place of memory, of imagination, of consciousness.” অর্থাৎ দেহ তাঁর কাছে অভ্যন্তরীণ চেতনার স্থান, যেখানে পৃথিবী ও মানুষের সংলাপ ঘটে। তাঁর ভাস্কর্যে তাই দেহ কখনোই নিখুঁত নয়—ভেতরটা ফাঁপা, ভাঙা, বা ঘনকাকারে গঠিত। সেই ভেতরের শূন্যতাই আসল বিষয়; যেন শরীরের মধ্য দিয়েই দেখা যায় অস্তিত্বের গভীর যান্ত্রিকতা।
গর্মলি বিশ্বাস করেন, মানুষের শরীরই আমাদের প্রথম ঘর—“The body is our first architecture.” এই দেহঘর আমাদের স্থিতি ও স্মৃতির স্থান, যেখানে সময় থেমে যায়, অথচ জীবন কাজ করে কলকব্জার মতো। তাঁর কাছে স্থিরতা মানে স্থবিরতা নয়—এটা সম্ভাবনার পূর্ণতা। তাই তাঁর দেহগুলো নড়ে না, কিন্তু স্পন্দিত হয়। তারা দাঁড়িয়ে থাকে—নীরবে, গভীরভাবে—যেন পৃথিবীর চৌম্বকীয় ভারে স্থিত হয়ে থাকা মানুষ।
এই দেহযন্ত্র বা ঘরের তিনটি স্তর তিনি নিজেই নির্মাণ করেছেন: স্মৃতিদেহ, যেখানে নিজের ছাঁচে তৈরি মানুষ সময়ের ভার বহন করে; শূন্যদেহ, যেখানে দেহ ফাঁপা, আর ভেতরের অন্ধকারে বসবাস করে চেতনার আলো; এবং কলকব্জাদেহ, যেখানে মানুষ হয়ে ওঠে এক স্থাপত্য—যান্ত্রিক কিন্তু অনুভূতিশীল। এই তিনটি স্তর একসঙ্গে গড়ে তোলে তাঁর শিল্পের নীরব গাণিতিক বোধ: আমরা যেমন দেহ, তেমনি শূন্যতার ধারক; যেমন রক্তের সঞ্চালন, তেমনি নীরবতার প্রতিধ্বনি। এইভাবেই গর্মলির শিল্পে দেহ হয়ে ওঠে এক দার্শনিক যন্ত্র, যে দেহযন্ত্রে নিহিত তাঁর শিল্পের আত্মা: স্থির অথচ সচল, নীরব অথচ গভীরতর গতিশীল।
রাজা কদম রাওয়ের মত—দেহে মন্দির, প্রাণে আলো; দু’য়ে মিলে অস্তিত্ব প্রকাশিলো।

Home Of The Heart I, Body And Light drawing series
: : অন্ধকারের উৎস হতে : :
লন্ডনের হ্যামার্সমিথে গ্রীষ্মের শেষভাগ। ১৯৫০ সালের আগস্ট—যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন তখনো শহরের দেহে দগদগে। ভাঙাচোরা বাড়ির দেয়ালে শেল-বোমার কালো দাগ, আকাশে ধোঁয়ার লেপটানো পর্দা, রাস্তায় শ্রমিকদের হাঁকডাক। সেই ধ্বংসচিহ্নের ভেতরেই জন্ম নিলো এক শিশু—অ্যান্টনি মার্ক ডেভিড গর্মলি। নবজাতকের প্রথম কান্না যেন শহরের ক্লান্তির সঙ্গে মিলেমিশে গেল, এক নতুন অস্তিত্বের ঘোষণা হয়ে। পৃথিবী তাকে স্বাগত জানাল ধ্বংসের ভেতর দিয়ে, যেন বোঝাতে চাইছে—আলো সবসময় জন্ম নেয় অন্ধকারের বুক থেকে।
গর্মলির শৈশব ছিল শান্ত অথচ অনুসন্ধিৎসু। তিনি এক ক্যাথলিক পরিবারে বড় হন। চার্চ, প্রার্থনা, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন—সবই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার সঙ্গী। কিন্তু ছোট থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জেগে উঠত: ঈশ্বর কোথায়? তিনি কি শুধু গির্জার ভেতরেই আছেন, নাকি মানুষের শরীরের ভেতরেও কোনো গোপন আলো জ্বলছে?
দুপুরবেলা মা তাঁকে শুইয়ে দিতেন ‘বিশ্রাম’-এর জন্য। কিন্তু ছয়-সাত বছরের শিশুর চোখে ঘুম কই! বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলে তিনি দেখতে শুরু করতেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। প্রথমে লালচে উষ্ণতা, যেন চোখের পাতার ভেতর রোদের ছায়া। ধীরে ধীরে নামত এক গভীর কালো অন্ধকার। কিন্তু এই অন্ধকার ভীতিকর নয়; বরং রহস্যময়, ডেকে নিয়ে যেত ভেতরের দিকে। অনেকক্ষণ স্থির হয়ে থাকলে সেই অন্ধকার প্রসারিত হতো, আকাশের মতো বিস্তৃত হয়ে যেত।
একদিন হয়তো তিনি মাকে বললেন,—“মা, আমি চোখ বন্ধ করলে ভেতরে আকাশ দেখি।” মা হয়তো হেসে উঠেছিলেন, ভেবেছিলেন শিশুর কল্পনা। কিন্তু অ্যান্টনির জন্য সেটি ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর শৈশবের অদৃশ্য পাঠশালা। এখানেই তিনি প্রথম শিখলেন: মানবদেহই আসলে এক মহাবিশ্বের দরজা। ভেতরের সেই শূন্যতা শুধু শূন্য নয়, বরং সম্ভাবনায় ভরপুর মহাকাশ। পরবর্তী জীবনে তাঁর ভাস্কর্যে এই শৈশবের অন্ধকারই হয়ে উঠল প্রধান ভিত্তি—স্থিরতা, নীরবতা আর অস্তিত্বের রহস্যের প্রতীক।
গর্মলির ভেতরে জেগে ছিল সেই শিশুপ্রশ্ন—“আমি কে? দেহের ভেতরে কী আছে?” পড়াশোনায় তিনি ছিলেন মনোযোগী, কিন্তু কখনোই শুধু পরীক্ষার খাতার জন্য নয়। বইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে খুঁজতেন জীবনের বৃহত্তর মানে। ইতিহাসে পড়লেন সভ্যতার উত্থান-পতন, ধর্মে পড়লেন আত্মার মুক্তির পথ, আর বিজ্ঞানে পড়লেন দেহ ও প্রকৃতির সম্পর্ক। সব মিলে তাঁর ভেতরে তৈরি হলো এক অস্থির কৌতূহল—মানুষ কি কেবল মাংস ও হাড়ের দেহ, নাকি তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা কোনো আকাশসত্তা?
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়লেন প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান ও শিল্প ইতিহাস। সেখানেও তাঁর অস্থিরতা কাটল না। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন—“আমাদের যত পড়াশোনা, সবই মানুষের বাইরে। অথচ ভেতরে যে রহস্য, সেখানে কেউ তাকাচ্ছে না।”
ক্যামব্রিজে তিন বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন গর্মলির কাছে ছিল মস্তিষ্ক–কেন্দ্রিক, শুধুই পড়াশোনার ক্লান্তিকর সময়। অনুভব করলেন যে কেবল চিন্তায় ডুবে থেকে তিনি জীবনকে ছুঁতে পারছেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন ভারত ভ্রমণের। তখন ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল হিপি সংস্কৃতি, পশ্চিমা তরুণরা ছুটে যাচ্ছিল পুবের মরমি আধ্যাত্মিকতার খোঁজে। গর্মলিও বেরিয়ে পড়লেন সে যাত্রায়, যা বদলে দিয়েছিল তাঁর সমগ্র জীবন।
: : আলোকযাত্রা : :
১৯৭০ সালের শুরু। লন্ডনের কুয়াশা ছেড়ে অ্যান্টনি এক ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে নেন। পকেটে সামান্য টাকা, মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। বন্ধুরা অবাক—তুমি কেমব্রিজের ছেলে! ক্যারিয়ার করবে না! অ্যান্টনি শুধু হেসে বললেন, “আমি জীবনের মানে খুঁজতে যাচ্ছি।”

স্কেচবুক
বাস, ট্রেন, ট্রাক—যেভাবেই হোক, ধীরে ধীরে পাড়ি জমালেন এশিয়ার পথে। আফগানিস্তানের পাহাড়ি গ্রামে রাত কাটালেন, খাওয়ার জন্য রুটির টুকরো ভাগ করে নিলেন অচেনা মানুষের সঙ্গে। ইরানের মরুভূমি পেরোলেন, পাকিস্তানের রঙিন বাজারে হারিয়ে গেলেন।
শেষমেশ পৌঁছালেন ভারত। দিল্লির ধুলোভরা রাস্তা, ভিক্ষুকের হাত বাড়ানো, হঠাৎ কোনো মন্দির থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক ঘূর্ণিঝড়।
কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ট্রেনে চেপে কখনো বারাণসী, কখনো বোম্বাই। গর্মলির চোখে বারবার ধরা দিল মানুষের ভিড়, অথচ ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা। একদিন সে রাজস্থানের মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে দেখলেন সূর্যাস্ত—লাল আকাশের নিচে উটের সারি এগিয়ে যাচ্ছে। তখন মনে হলো, মানুষ আসলে বালুকণার মতোই ক্ষুদ্র।
ভারতের তিন বছর শেষে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে এক বৌদ্ধ মঠে আশ্রয় নিলেন। ভোরে ঘণ্টাধ্বনি, দুপুরে ভিক্ষা সংগ্রহ, রাতে দীর্ঘ ধ্যান। কিছুদিনের মধ্যেই মনে হলো—যেন সত্যিই মুক্তির পথে এগোচ্ছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর হাত কাঁপছিল। মাটির ওপর আঙুল চালিয়ে হঠাৎ তিনি আকার আঁকতেন, কোনো দেহের রেখা। ভেতর থেকে এক কণ্ঠ বলত—তুমি শুধু বসে থাকবার জন্য জন্মাওনি। তোমার কাজ হলো তৈরি করা।
তবু প্রশ্ন থামে না। আমি কি সন্ন্যাসী হব? নাকি শিল্পী?

Listening
এই দ্বন্দ্ব চলে মাসের পর মাস। শেষে প্রায় সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ল। একদিন সাগরপাড়ে হাঁটছিলেন। তরঙ্গের শব্দে হঠাৎ মনে হলো—শিল্পই তাঁর পথ।
ধ্যান তাঁকে শিখিয়েছে ভেতরের নীরবতা কীভাবে খুঁজে পেতে হয়। এখন সেই নীরবতাকে রূপ দিতে চান। মঠ ছেড়ে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেন। মনে তখনও দ্বিধা, কিন্তু জীবনের মানচিত্র বদলে গেছে। আর্ট স্কুলে ফেরার পথে যেন জানতেন—এবার আর কেবল ছাত্র নয়, এবার তিনি হবেন একজন যাত্রী, যিনি দেহের ভেতরের মহাবিশ্বকে পৃথিবীর সামনে হাজির করবেন।
ভারত তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল এক নতুন দিগন্ত—
প্রথমত, এখানে ইতিহাসের সাথে ধারাবাহিকতা ছিল অবিচ্ছিন্ন। দ্বিতীয়ত, বৌদ্ধ ও জৈন শিল্পে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন এক ধরনের “অসংখ্যের ভেতর অসীম একক” ভাবনা। তৃতীয়ত, দিল্লির জন্তর মন্তর কিংবা মাউন্ট আবুর দিলওয়ারা মন্দিরে তিনি দেখেছিলেন দেহ, স্থাপত্য আর মহাজাগতিক স্থানের সম্পর্ক।
এই অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত তাঁর শিল্পকে গড়ে তুলেছিল—ভাস্কর্য আর ধ্যান, শরীর আর শূন্যতা, পদার্থ আর মহাজাগতিকতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন। কিন্তু আরেকদিকে তাঁর ভেতরের শিল্পী বলছিল, “এই অভিজ্ঞতা একান্ত নিজের ভেতরে আটকে রাখলে চলবে না। একে রূপ দিতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে। ধ্যানের অভিজ্ঞতা যেন অন্য মানুষও অনুভব করতে পারে, এমন কিছু তৈরি করতে হবে।”
অবশেষে ১৯৭৩ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—সন্ন্যাস নয়, শিল্পই হবে তাঁর সাধনা। তিনি বললেন, “ধ্যান আমাকে দিয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এক দরজা। আমি চাই সেই দরজার ছবি বানাতে, যাতে অন্যরাও দেখতে পারে জীবনের গভীরতা।”
এই সিদ্ধান্তই তাঁকে ফিরিয়ে নিল লন্ডনে, কিন্তু তখন তিনি আর আগের মত রইলেন না। তাঁর মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল ভারতের রাস্তা, নদী, ঘাট আর ধ্যানের নীরবতার অমোঘ ছাপ।
: : ধর্মনিরপেক্ষ মরমি আধ্যাত্মিকতা : :
আমি ধর্মীয় মানুষ নই, তবে আমি বিশ্বাস করি মানুষের মধ্যে এক গভীর আত্মিক আকাঙ্ক্ষা আছে—নিজেকে জানতে চাওয়া, নিজের শরীরের ভেতরে অসীমকে খুঁজে পাওয়া। ভাস্কর্য সেই জায়গাটিই খুলে দেয়। আমি চাই, দর্শক আমার ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে সহসা টের পাক—সে-ও তো এখানে আছে, শ্বাস নিচ্ছে, জায়গা দখল করছে।
এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছিলেন গর্মলি। আরো বলেছিলেন যে তিনি শিল্প নিয়ে শিল্প করতে চাননি। জীবন আর মৃত্যুর কথা বলতে চেয়েছেন। তার কাজ সবসময় দেহ নিয়ে—প্রতিকৃতি নিয়ে নয়। তার কাছে দেহ প্রমাণ, অভিজ্ঞতার ছাপ।
ভারত থেকে ফেরা অ্যান্টনি গর্মলি আর আগের মানুষ রইলেন না। লন্ডনের রাস্তায় হাঁটলেও তাঁর ভেতরে বেজে চলত ঘন্টা, ঘুমের ভেতরেও ভেসে উঠত বারাণসীর ঘাট বা রাজগিরের আশ্রমের নীরবতা। ধ্যান থেকে পাওয়া সচেতনতা যেন প্রতিটি মুহূর্তে তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখত। তিনি বুঝলেন, জীবনের প্রকৃত সাধনা হলো অভিজ্ঞতাকে রূপ দেওয়া। তাই আবার পড়াশোনায় ফিরলেন, তবে এবার আর কেবল বই নয়—ভাস্কর্যের স্টুডিওতে। ভর্তি হলেন স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্ট, লন্ডনে। সেখানে শিক্ষকরা চাইতেন শিক্ষার্থীরা বিমূর্ত রূপ নিয়ে পরীক্ষা করুক, আধুনিক ধ্যানধারণা অনুযায়ী ক্যানভাস বা কাঠামো নিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করুক। কিন্তু গর্মলি একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটলেন। তাঁর একমাত্র প্রশ্ন ছিল—“মানবদেহকে কেন্দ্র করে আমরা কীভাবে অস্তিত্বের সত্যকে প্রকাশ করব?”
এ প্রশ্নই তাঁকে শিল্পের মূল স্রোত থেকে আলাদা করে দিল।
প্রথম দিকের বছরগুলোতে গর্মলি কখনোই ধনী বা বিখ্যাত ছিলেন না। তিনি ছোট ছোট স্টুডিওতে কাজ করতেন, অনেক সময় গরমে ঘেমে অস্থির হয়ে যেতেন, আবার শীতে হাত জমে যেত। কিন্তু তাঁর ভেতরের শৃঙ্খলা—যা ধ্যান তাঁকে শিখিয়েছিল—তাঁকে প্রতিদিন কাজে ফিরিয়ে আনত। তিনি প্রতিদিন সকালে ব্যায়াম করতেন, শরীরকে প্রস্তুত করতেন ভাস্কর্যের জন্য। তাঁর কাছে শরীর শুধু উপকরণ নয়, বরং ধ্যানের ক্ষেত্র। তিনি বলতেন, “ভাস্কর্য কোনো গল্প বলে না, এটি কেবল ‘অস্তিত্ব’কে সামনে আনে। স্থিরতা ও নীরবতাই এর ভাষা।”
Sense, 1993, Body And Light drawing series
ধীরে ধীরে তাঁর শিল্পজীবনের ভেতরে তৈরি হলো এক নতুন দর্শন—শরীরের অন্ধকার থেকে মহাবিশ্বের আলোয় পৌঁছানোর চেষ্টা।
দেহকে তিনি বস্তু নয়, বরং একটা স্থান হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তিনি বুঝেছিলেন, কিছু না করা—অ্যাকশন না থাকা—একপ্রকার দরজা হতে পারে, যা দিয়ে এক সীমাহীন, অদৃশ্য, বস্তুশূন্য মহাকাশে প্রবেশ করা যেতে পারে। ভারতে গিয়ে ভিপাসনা ধ্যান শেখার পর এই অভিজ্ঞতাকে আরও দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, “একবিংশ শতকে সাইকোনট—যে মনের ভেতরে ভ্রমণ করে—সে বিংশ শতকের মহাকাশচারীর মতো, অথবা ঊনবিংশ শতকের অভিযাত্রীর মতো। আমাদের মানব প্রকৃতিকে বোঝার একটাই পথ আছে: ভেতরের দিকে যাওয়া। আমার জন্য এই ভ্রমণের শুরু হয়েছিল ওই শৈশবের দুপুরের বিশ্রামের মুহূর্ত থেকেই।”
অ্যান্টনি গর্মলি সেই প্রজন্মের মানুষ, যারা বিদ্রোহ করছিল, নিজেদের কণ্ঠ খুঁজছিল। চেষ্টা করছিল নিজেদের খুঁজে বের করতে, ১৯৫০–এর দশকের দমনমূলক বেড়ে ওঠা থেকে আলাদা হয়ে।
আশির দশকের শুরুতে তিনি যখন লন্ডনে ফেরেন। তখন নিউ ইয়র্কে মিনিমালিজম আর কনসেপচুয়ালিজমের প্রভাব প্রবল ছিল। কিন্তু এখানে তিনি ও তার সতীর্থরা অন্য কিছু খুঁজছিলেন। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে ছিল রিচার্ড ডিকন, বিল উডরো, অনিশ কাপুর, অ্যালিসন ওয়াইল্ডিং। সবাই শরীর, পদার্থ আর অভিজ্ঞতার সম্পর্ক নতুনভাবে মরমি সুরে ভাবতে চাইছিলেন।
গর্মলির ভাস্কর্য কোনো ধর্মীয় মূর্তি নয়, তবু তারা আধ্যাত্মিক। কেননা তারা দর্শককে মনে করায়—তুমি এক দেহে আছো, কিন্তু সেই দেহের ভেতরেই অসীম বাস করে। তিনি নিজে বলেছেন, “আমার ভাস্কর্য হলো এমন এক আয়না, যেখানে দর্শক নিজের দেহকে দেখতে পায়, আর সেই দেহের ভেতরকার অদৃশ্য চেতনার ছায়া উপলব্ধি করে।”
এখানেই তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে সেক্যুলার স্পিরিচুয়ালিটি—ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিক আত্মার সন্ধান।
: : দেহঘরের শিল্পবিস্তার : :
শিল্পের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের কাজ কেবল গ্যালারির ভেতর ঝুলে থাকে না, বরং মানুষের স্মৃতি, শহরের আকাশরেখা, এমনকি একেকটা প্রজন্মের জীবনচর্চার ভেতর মিশে যায়। অ্যান্টনি গর্মলি তেমন এক শিল্পী—যিনি দেহকে অবয়বের চেয়ে স্থান হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছেন, আর শূন্যতাকে পরিণত করেছেন এক প্রাণময় শক্তির উৎসে। তিনি সমকালীন ভাস্কর্যে এমন এক ভাষা নির্মাণ করেছেন যেখানে দেহ হয়ে ওঠে মহাবিশ্বের মানচিত্র, শূন্যতা হয়ে ওঠে শক্তির উৎস, আর শিল্প হয়ে ওঠে জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর ফেরেশতা, মরুভূমির দেহমূর্তি কিংবা শহরের ছাদে ছড়িয়ে থাকা অবয়ব—সবকিছু আমাদের মনে করায়: আমরা প্রত্যেকেই ক্ষুদ্র দেহের ভেতরে বহন করি অসীম মহাশূন্য।
অ্যান্টনি গর্মলির শিল্পজগত হলো ত্রিধারা বা ত্রিবেণীসঙ্গমের দেহঘর। তিনটি নদী সবসময় যেন বয়ে যায়—স্মৃতি, মানবদেহ আর শূন্যতা । স্মৃতি দেহে এসে জমাট বাঁধে, আর দেহ খুলে দেয় শূন্যতার দ্বার। এই তিন ধারা—স্মৃতি, দেহ, শূন্যতা—আসলে একে অপরের প্রতিচ্ছবি। স্মৃতি গঠন করে দেহের ভাষা, দেহ ধারণ করে শূন্যতার ফ্রেম, আর শূন্যতা তৈরি করে নতুন স্মৃতির সম্ভাবনা।

এ তিনটি ছাড়া যেন তার কাজের অস্তিত্ব নেই। মানবদেহকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে পুনরাবিষ্কার করেছেন তিনি। তাঁর কাছে শরীর কেবল রক্ত-মাংসের বস্তু নয়, বরং এক জীবন্ত স্থাপত্য—এক “দেহঘর,” যেখানে চেতনা, পদার্থ, যন্ত্র ও নীরবতা মিলেমিশে থাকে এক পারমার্থিক সমন্বয়ে। এ দেহঘরই তাঁর নন্দনচিন্তার মূল প্রতীক: এমন এক স্থান, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও মহাকাশের সীমানা মুছে যায়। গর্মলি বলেন, “The body is the house of being.” অস্তিত্বের দেহঘরখানা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।
তাঁর sculpture তাই কেবল ভাস্কর্য নয়; জীবন্ত ঘর—যেখানে মানুষ, সময় ও মহাশূন্য একসঙ্গে বাস করে। অ্যান্টনি গর্মলি আমাদের শেখান—মানবদেহ এক স্মৃতির পাত্র, এক চেতনার যন্ত্র, আর একই সঙ্গে এক শূন্যতার গুহা, যেখানে প্রতিটি শ্বাসই এক মহাজাগতিক ছন্দের পুনরাবৃত্তি।
১. স্মৃতি : সময়ের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য
গর্মলির কাছে ভাস্কর্য মানে একরকম “ধারণক্ষম সময়”—একটি সময়ের আকার, যা আমরা ছুঁতে পারি। তাঁর প্রতিটি কাজ যেন নিজের মধ্যে বহন করে একটি দেহের স্মৃতি। যেমন “Bed” বা “Bread Line” সিরিজে তিনি নিজের শরীরের আকৃতি তৈরি করেছেন রুটির স্তরে স্তরে কেটে—যেন মানবদেহের ভেতরে থাকা সময় ও ক্ষয়ের ছাপ ফুটে উঠেছে। সেই “খাওয়ার” প্রক্রিয়া, যেখানে রুটি থেকে শরীর তৈরি হয়, তা গর্মলির কাছে এক রূপান্তরের রসায়ন—এক স্মৃতি যা দেহের ভেতরে প্রবেশ করে, পুনরায় দেহ হয়ে ওঠে।
গর্মলির ভাস্কর্যে আমরা পাই অনুপস্থিতির স্মৃতি—যেমন “Another Place” বা “Field” সিরিজে শত শত দেহ দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু প্রত্যেকেই কোনো এক অনুপস্থিত সত্তার প্রতীক। যেন মানবসভ্যতার অসংখ্য স্মৃতি—দেহের ছায়ায় ঘনীভূত। এই স্মৃতি কেবল অতীতের নয়; এটি মানবতার সামষ্টিক অভিজ্ঞতার, আমাদের জন্ম, ক্ষয়, নিঃসঙ্গতা ও পুনর্জন্মের। তাই গর্মলির sculpture হলো সময়ের fossil, যেখানে প্রতিটি রেখা ও ফাঁক অতীতের প্রতিধ্বনি বহন করে।
২. মানবদেহ: চেতনার যন্ত্র ও ঘর
গর্মলির সমস্ত শিল্পের কেন্দ্রে দেহ। তাঁর কাছে দেহ কোনো বিষয় নয়, বরং এক প্রক্রিয়া—যার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে জানতে পারে এবং জগতকে অনুভব করে। নিজের শরীরই হয়ে ওঠে sculpture-এর মূল মডেল—যেমন “Angel of the North”, “Quantum Cloud” বা “Event Horizon”।
তাঁর ধারণা অনুযায়ী, শরীর হলো “the place where mind and matter meet.” এই ভাবনা তাঁকে এক প্রকার নিউ-হিউম্যানিস্ট স্থাপত্যের দিকে নিয়ে যায়—যেখানে শরীরকে দেখা হয় চেতনার ঘর হিসেবে। দেহ তাঁর কাছে কোনো পবিত্র বেদী নয়, বরং সাধনার এক পরীক্ষাগার—এক দেহঘর—যার ভেতরে কাজ করে কলকব্জা, রক্ত, আলো ও শ্বাসের জটিল সুর। তিনি একবার বলেছিলেন, “I am not interested in representing the body; I am interested in what the body represents.” এ কথাতেই তাঁর শিল্পের মূল দর্শন—দেহকে তিনি আঁকেন না, বরং দেহের মধ্য দিয়ে আঁকেন অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা। তাই তাঁর ভাস্কর্যে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে একা, স্থির, কিন্তু ভেতরে তীব্র স্পন্দন—যেন প্রতিটি দেহে মহাবিশ্বের নিশ্বাস চলিষ্ণু।

Trinity College’s Stuart Gates is a rusted cast iron door designed by Antony Gormley
৩. শূন্যতা: অস্তিত্বের নীরব কেন্দ্রস্থল
গর্মলির ভাস্কর্যে শূন্যতা কোনো অনুপস্থিতি নয়; বরং এক অন্তরস্থ সক্রিয় শক্তি। তাঁর মতে, sculpture আসলে শূন্যতার আকার দেওয়া—“to make space visible.”
“Expansion Field” বা “Inside Australia” সিরিজে প্রতিটি দেহের ভেতরে যে ফাঁকা অন্ধকার ঘর, সেটিই তাঁর শিল্পের মূল উপাদান। এই শূন্যতা এক ধরনের “dark energy”—যা একই সঙ্গে রহস্য, ভয়, ও ধ্যানের ক্ষেত্র।
এই বোধ তাঁর বৌদ্ধ প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ভারতের অভিজ্ঞতা ও ধ্যান তাঁকে শিখিয়েছে—অন্তরের নীরব শূন্যতাই জীবনের আসল কেন্দ্র। তাঁর কাজ তাই ক্রমে হয়ে ওঠে ধ্যানময় স্থাপত্য—যেখানে দর্শককে তিনি আমন্ত্রণ জানান “থামতে”, “শ্বাস নিতে”, “চুপ করে থাকতে”।
তিনি বিশ্বাস করেন, “Stillness is not absence; it is presence at its most intense.” এই স্থিরতার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান শিল্পের নন্দন, অস্তিত্বের তীব্রতা, এবং শূন্যতার প্রাণ।
: : প্রেম, পরিবার ও শৈল্পিক নিঃসঙ্গতা : :
অ্যান্টনি গর্মলির জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে যেমন দেহ, তেমনি উপস্থিত রয়েছে ভালোবাসা—কিন্তু এই ভালোবাসা কখনোই নিছক রোমান্স নয়। এটি এক গভীর আত্মীয়তা, এক নীরব সঙ্গ, যেন শরীরের মতো আত্মাও কোনো শিল্পকর্মের উপাদান।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়। ভারত থেকে ফিরে এসে গর্মলি তখন নিজের শিল্পের ভিত খুঁজছেন—কখনো গুদামঘরে, কখনো নিজের স্টুডিওর অন্ধকারে, যেখানে আলো প্রবেশ করে কেবল ইস্পাতের ছিদ্র দিয়ে। সেই সময়েই তাঁর জীবনে প্রবেশ করেন ভিকি হ্যাজলেট, এক মনোবিজ্ঞানী, যিনি মানুষের মনের ভেতরের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতেন ঠিক যেমন গর্মলি দেহের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতেন।
দুজনের পরিচয় প্রথমে ছিল পারস্পরিক কৌতূহলে, কিন্তু ধীরে ধীরে তা এক নীরব বন্ধনে রূপ নেয়। ভিকি গর্মলির শিল্পে খুঁজে পান মানবমনের গভীর প্রতিচ্ছবি, আর গর্মলি ভিকির চোখে দেখতে পান সেই মনস্তাত্ত্বিক স্তরগুলো যা ভাষায় বলা যায় না। তাদের সম্পর্ক তাই কেবল প্রেম নয়—এ যেন ছিল চিন্তা, শরীর ও অনুভূতির এক মিলিত পরিসর।
তাদের সংসার ছিল এক অদ্ভুত জায়গা—একদিকে সন্তানদের হাসি, অন্যদিকে স্টুডিওর নিস্তব্ধতা। তিনি যখন রাত জেগে নিজের দেহের ছাঁচ নিতেন; ভিকি তখন পাশে বসে নোট করতেন, কীভাবে শিল্পী নিজের অস্তিত্বের ভেতর প্রবেশ করছে। অনেক সময় গর্মলির শরীরে প্লাস্টার জমে যেত, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, তবু তিনি থামতেন না। ভিকি পরে বলেছিলেন, “It was as if he was sculpting silence itself.”
গর্মলির কাজের সেই নীরবতাই তাদের সম্পর্কের ভাষা হয়ে উঠেছিল। প্রেম, ধৈর্য, সহানুভূতি—সব মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এক ‘দেহঘর’—যেখানে তারা একে অপরের মধ্যে আশ্রয় পেতেন।
তবে এই সান্নিধ্যের ভেতরও গর্মলি ছিলেন একাকী। তাঁর শিল্প যত বড় হতে লাগল, ততই তাঁর ভিতরকার নিঃসঙ্গতা গভীর হলো। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “Love doesn’t fill the void; it makes it visible.”
ভিকির সঙ্গে সেই সম্পর্ক তাঁকে মানুষ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে শিখিয়েছে একাকিত্বের মর্যাদা। তাঁরা দুজনেই জানতেন, একজন শিল্পীকে নিজের গভীর গুহায় একা থাকতে হয়। ভিকি কখনো সেই গুহায় প্রবেশের চেষ্টা করেননি; বরং দূর থেকে আলো জ্বেলে রেখেছিলেন, যেন ফিরে আসতে পারেন গর্মলি, তার নিজের দেহঘরের অন্ধকার থেকে।
প্রেম গর্মলিকে কেবল মানবিক করেনি; তাঁকে শিখিয়েছে, দেহ মানে শুধু মাংস নয়—এটি এক সম্পর্কের স্থান, যেখানে আমরা অপরের উপস্থিতিকে অনুভব করি। তাঁর ভাস্কর্যে তাই প্রতিটি ফাঁকা জায়গা যেন সেই প্রেমের স্মারক—যেখানে কেউ নেই, কিন্তু উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

: : দেহঘরের উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের শিল্পচিন্তা : :
গর্মলির কাজ আমাদের শেখায় যে, শরীরই প্রথম স্থাপত্য—যেখানে জীবন, সময় ও অনুভূতির ছাপ জমে থাকে। তিনি যেভাবে নিজের দেহকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করেন—তাতে একাধারে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সার্বজনীন মানব অভিজ্ঞতা মিশে যায়। এই প্রক্রিয়ায় তিনি দেহকে বস্তু থেকে রূপান্তর করেন অভিজ্ঞতার ঘরে। তাঁর Allotment সিরিজে যেমন প্রতিটি মানুষের মাপে গড়া কংক্রিটের ঘর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা প্রত্যেকে একেকটি জীবন্ত স্থাপত্য, একেকটি গোপন ভুবন।
এই ধারণাটি কেবল ভাস্কর্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দর্শনেরও পুনঃনির্মাণ। পশ্চিমা শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাসে যেখানে মানবদেহকে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, সেখানে গর্মলি তাকে রূপান্তর করেছেন অন্তর্দৃষ্টি ও ধ্যানের আয়নায়। তাঁর দেহগুলো মুখবিহীন, পরিচয়হীন—তবু প্রতিটি দেহই আমাদের নিজের প্রতিফলন। এই অদ্ভুত নীরব আত্মপ্রত্যয় তাঁকে পরিণত করেছে আধুনিক শিল্পের এক মরমি দার্শনিক রূপে।
গর্মলির কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি শিল্পকে মিউজিয়ামের দেয়াল থেকে মুক্ত করেছেন। তাঁর দেহগুলো বালুকাবেলায়, পাহাড়চূড়ায়, নগরের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে—প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যে এক সেতু হিসেবে। Event Horizon বা Another Place–এর মতো কাজগুলো কেবল প্রদর্শনী নয়, বরং অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র, যেখানে দর্শক নিজেই শিল্পের অংশ হয়ে যায়। তাঁর কাছে শিল্প মানে জনতার সঙ্গে মেলবন্ধন—এক প্রকার “সামাজিক ধ্যান”, যেখানে মানুষ, সময় ও স্থান একে অপরকে চিনে নেয়।
এই দেহঘর ধারণা এক অর্থে গর্মলির উত্তরাধিকার—এক নতুন নন্দনতত্ত্ব যা আধুনিকতার যান্ত্রিকতা অতিক্রম করে আত্মিক মানবতাকে পুনরুদ্ধার করেছে। তাঁর কাজ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক শিল্প কেবল প্রযুক্তির বিস্তার নয়; এটি মানুষের গভীরতর আত্মবোধের ভাষাও হতে পারে। গর্মলি আমাদের শেখান—শিল্প হলো এমন এক স্থান যেখানে মানুষ নিজেকে আবার খুঁজে পায়।
তাঁর এই চিন্তা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক দিকনির্দেশ। যখন সমকালীন শিল্প ভিজ্যুয়াল স্পেকট্যাকলে পরিণত হচ্ছে, তখন গর্মলির কাজ স্মরণ করিয়ে দেয়—চিত্র, উপকরণ বা রূপের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো উপস্থিতি, চেতনা, এবং অন্তর্দৃষ্টি। তিনি বলেন, “Art is not about decoration—it’s about the depth of being.”
অ্যান্টনি গর্মলি তাই থেকে যাবেন এক উত্তরাধিকারী সন্ন্যাসী হিসেবে—যিনি আধুনিক শিল্পে আত্মিক বস্তুতত্ত্বের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছেন। তাঁর দেহঘর আমাদের শেখায়—মানুষ আসলে এক ঘর, যেখানে সময় বাস করে, স্মৃতি শ্বাস নেয়, এবং নীরবতা কথা বলে। এই নীরব ঘরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিল্পের চিরন্তন সত্য—মানুষই নিজের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য।
এভাবে গর্মলি তৈরি করেন এক নতুন বস্তুতত্ত্ব—spiritual materialism, যেখানে আত্মা ও পদার্থের পার্থক্য মুছে যায়। তাঁর Field for the British Isles, Another Place, Inside Australia কিংবা Angel of the North—সব কাজেই এই ধারণা দৃশ্যমান। হাজার হাজার মাটির ছোট মানুষ, লোহায় গড়া ধ্যানরত দেহ, বা আকাশের দিকে বিস্তৃত ডানাওয়ালা ফেরেশতা—সবই এক মহামানবিক একাকীত্বের প্রতীক, যেখানে মানুষ নিজের দেহের মধ্যেই মহাবিশ্বকে খুঁজে পায়।

সমকালীন শিল্পে গর্মলির এই দৃষ্টিভঙ্গি একধরনের প্রতিরোধও। যখন প্রযুক্তি, বাজার, ও প্রদর্শনীর জগৎ শিল্পকে প্রায় ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে, তিনি সেখানে ফিরিয়ে আনলেন নীরবতার নন্দন। তাঁর কাজের শক্তি এটাই যে, তা আমাদের দৃষ্টি নয়—আমাদের শ্বাসকে জাগিয়ে তোলে। দর্শক যখন তাঁর কোনো কাজের সামনে দাঁড়ায়, তখন সে যেন নিজের অস্তিত্বেরই সাক্ষাৎ পায়। এইভাবে গর্মলি এক নতুন দর্শকতত্ত্ব তৈরি করেন—যেখানে শিল্পকর্ম আর দর্শকের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না।
সমালোচকরাও একে বলছেন “the metaphysics of presence”—এক নান্দনিক ধ্যান, যেখানে বস্তু আর চেতনার মিলনে গড়ে ওঠে এক সুরেলা নীরবতা। তাঁর দেহঘর-ভাবনা সেই কারণেই এত গভীর—শরীর এখানে এক cosmic instrument, যা প্রতিনিয়ত মহাকাশের সাথে সংলাপে থাকে।
আজকের দিনে, যখন মানবসভ্যতা পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নিঃসঙ্গতার সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, গর্মলির শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেহই আমাদের প্রথম ঘর, পৃথিবী তার সম্প্রসারণ, আর শূন্যতা তার নিঃশব্দ হৃদয়। তাঁর প্রতিটি ভাস্কর্য যেন ফিসফিসিয়ে বলে— “তুমি নিজেই সে উপাদান, যার ভেতর দিয়ে বিশ্ব গড়ে ওঠে।”
গর্মলির এই উত্তরাধিকার কেবল ভাস্কর্যে নয়, দর্শনের দিক থেকেও বিপ্লবী—তিনি প্রমাণ করেছেন, নীরবতা ও স্থিরতাও শিল্পের সবচেয়ে প্রগাঢ় ভাষা হতে পারে।
: : দেহাত্মবাদী কনসেপশনিস্ট: তার কাজ ও অর্জন : :
গর্মলি একরকম অস্তিত্ববাদী কনসেপশনিস্ট, যিনি পারসেপশনের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেন। তাঁর শিল্প না কেবল দেখা বা অনুভব করা, না কেবল বিমূর্ত ধারণার খেলা—বরং দুয়ের সংযোগ। দর্শক তাঁর ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে যেমন দেহের ভার, স্থিরতা বা শূন্যতা অনুভব করেন (পারসেপশন), তেমনি তা থেকে জন্ম নেয় গভীর অস্তিত্ব–সংক্রান্ত প্রশ্ন (কনসেপশন)।
১. প্রারম্ভিক পর্ব : বস্তুর ভেতর শূন্যতা (The Object and the Inner Void)
গর্মলির শিল্পজীবনের সূচনা ছিল একদম নীরব, পর্যবেক্ষণনির্ভর। সত্তরের দশকের শেষভাগে, ভারত–ভ্রমণ শেষে লন্ডনে ফিরে তিনি ধীরে ধীরে কাজ শুরু করেন এমন সব বস্তু নিয়ে, সেসব যেন নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে ভর নয়, বরং শূন্যতা। ধাতু, সীসা ও কাঠের মতো প্রাথমিক উপাদানে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রতিটি ফর্মের ভেতরে এক “ফাঁপা স্থান” তৈরি করে শূন্যতাকে অস্তিত্বের কেন্দ্রে আনার প্রচেষ্টা। এ সময়েই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম দিকের কাজ—Full Bowl (১৯৭৭–৭৮)।
একটি সাধারণ কাঠের বাটি থেকে শুরু করে গর্মলি তৈরি করেছিলেন নতুন এক যাত্রা—তিনি সীসার পাত ঢেলে ও হাতুড়ির আঘাতে বারবার গড়েছিলেন বাটির ছাঁচ, একটির ভেতরে আরেকটি, যেন এক অন্তহীন জন্মচক্র। প্রতিটি বাটি আগেরটার মতোই, অথচ একেবারে নতুন; প্রতিটি যেন আগেরটির জননী।
এ ধারাবাহিক গঠনের ভেতরেই গড়ে ওঠে এক কেন্দ্রীয় শূন্যতা—যেখানে আলো প্রবেশ করে না, তবু উপস্থিত থাকে সম্ভাবনা। গর্মলির কাছে এই অন্ধকার ফাঁকই ছিল সৃষ্টির উৎসস্থল। তিনি বলেছিলেন, “I wanted to make a form that holds its own darkness—an intimate void.” এই Full Bowl–এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর মূল অনুসন্ধান—ভর ও শূন্যতার সহাবস্থান, দেহ ও আত্মার বিনিময় একে অপরের মধ্যে। এ যেন দেহের প্রাথমিক ছাঁচ,
যেখানে ভেতরের ফাঁকা স্থানই হলো অস্তিত্বের প্রথম প্রতীক।

Full Bowl, 1977-78
এখান থেকেই শুরু তাঁর আজীবনের দুই মূল ধারণা—void (অন্তরস্থ শূন্যতা) এবং expansion (ভেতর থেকে বাইরের বিস্তার)। এই দুই শক্তিই পরে ফিরে আসে তাঁর পরবর্তী বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে—Bodycase, Quantum Cloud, Matrix প্রভৃতিতে—যেখানে দেহ আর শূন্যতার সম্পর্কই হয়ে ওঠে শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
এরপরের কাজ— Mother’s Pride, Land, Sea and Air 1 সবই এই ধারণার প্রসার। দেহ, খাদ্য, শ্বাস—সবকিছুতেই তিনি খুঁজতে থাকেন ভেতরের ফাঁপা শক্তিকে। প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কও এখানে একীভূত হয়ে পরবর্তীতে বিকশিত হয় Land, Sea and Air সিরিজে, যেখানে শরীর হয়ে ওঠে পৃথিবীর মাপ।
প্রারম্ভিক এ পর্ব থেকেই ঘটে পদার্থ থেকে শূন্যতার দিকে যাত্রা।
২. দেহের পরিমাপ: স্থান ও কেন্দ্র হয়ে ওঠা
Full Bowl–এর শূন্যতা ধীরে ধীরে রূপ নিতে লাগল মানুষের দেহে—শূন্যতা আর শরীর যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে উঠল। গর্মলি বুঝতে পারলেন, শরীরের ভেতরও আসলে এক “space of the void”—এক ফাঁকা ঘর, যেখানে চেতনা বাস করে। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ১৯৮২ সালের বিখ্যাত কাজ Land, Sea and Air II—তিনটি মানবদেহ, মাটিতে সমান দূরত্বে শুয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সঙ্গে মিলিয়ে গেছে। এগুলো মানুষের মূর্তি হলেও প্রতিটিই আসলে “ছাঁচ” বা “নেগেটিভ স্পেস”—দেহ নয়, দেহের অনুপস্থিতি। যেন মানুষ পৃথিবীর বুকেই নিজের স্থান পরিমাপ করছে, ভূমি ও শূন্যতার সংযোগরেখা আঁকছে।
এ ধারাটিই পরে আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে তাঁর Bodycase সিরিজে (১৯৮২–৮৫)।
এখানে গর্মলি নিজের শরীরের ছাঁচ নিয়েছেন—মাথা থেকে পা পর্যন্ত—তারপর তা ঢেকে ফেলেছেন সীসায়। ভেতরের ফাঁকা জায়গাটিই হয়ে উঠেছে ভাস্কর্যের প্রাণ। এই দেহগুলোতে কোনো বিশেষ অঙ্গভঙ্গি নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই—তারা স্থির, নীরব, কিন্তু উপস্থিত। গর্মলি বলেন, “I wanted to make the body the place of truth.”
অর্থাৎ শরীরই তাঁর কাছে সত্যের স্থান, কোনো প্রদর্শনের বস্তু নয়। এই লিড-দেহগুলো যেন ধাতব খোলসের ভেতর বন্দি আত্মা—তাদের ভেতরের শূন্যতা দর্শক অনুভব করে নীরবতার মাধ্যমে। যেন প্রতিটি দেহের বুকের ভেতর এক অন্ধকার ঘর, যেখানে আলো পৌঁছায় না, কিন্তু প্রাণ লুকিয়ে আছে।

Land Sea And Air II, 1982

Three Calls Pass Cast And Plumb, 1983-84. Bodycase Series
গর্মলির কাছে ভাস্কর্য তখন আর কোনো বস্তু নয়—এটা এক প্রক্রিয়া, যেখানে দেহের ফাঁকা জায়গা, শ্বাস, নৈঃশব্দ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে আত্মার মানচিত্র। এ পর্বে দেহকে বিশ্বের কেন্দ্র ও আয়না হিসেবে দেখা শুরু হয়।
৩. দেহ থেকে দিগন্ত: অসীমের প্রতিধ্বনি
শরীরের ভেতরের শূন্যতা থেকে শুরু করে গর্মলি এবার শরীরের বাইরের অসীমের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাঁর প্রশ্ন তখন—“মানুষ কোথায় শেষ হয়? দেহের প্রান্তে, না কি দৃষ্টির দিগন্তে?” মানুষের উপস্থিতি প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মাঝখানে স্থাপন শুরু হয়।
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথেই জন্ম নেয় তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলির একটি—Another Place (১৯৯৭)। ইংল্যান্ডের লিভারপুল উপকূলের ক্রসবি বিচে তিনি স্থাপন করেন নিজের শরীরের ছাঁচে তৈরি ১০০টি লৌহমানব মূর্তি, সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে, আকাশের নিচে, জোয়ার–ভাটার সীমারেখায়। জোয়ারে দেহের কিছু অংশ পানির নিচে ডুবে যায়, ভাটায় আবার দৃশ্যমান হয়—এ যেন অস্তিত্বের চিরন্তন চক্র: উপস্থিতি ও বিলুপ্তির পরস্পর–রূপ।

Another Place, 1997 in Liverpool, UK
এ কাজেই প্রথমবার তাঁর “দেহ থেকে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া” ধারণা পুরোপুরি প্রকাশ পায়। মানুষ যেন নিজের একক সত্তা হারিয়ে মিশে যাচ্ছে পৃথিবীর উপাদানে—লবণ, জল, বাতাস, আলো, সময়ে। দেহ হয়ে উঠছে পৃথিবীর পরিমাপের একক—জীবন্ত ম্যাট্রিক্স। তিনি এ সময় ইস্পাত ও বিশাল পরিসরের ব্যবহার শুরু করেন।
এর কয়েক বছর পর, ২০০০ সালে, গর্মলি তৈরি করেন Quantum Cloud—একটি বিশাল ভাস্কর্য যা তৈরি হয়েছে হাজারো ইস্পাত রডের সংযোগে, টেমস নদীর ধারে। দূর থেকে দেখলে এর ভেতরে আবছাভাবে ফুটে ওঠে এক মানবদেহের অবয়ব, কিন্তু কাছে গেলে সেই অবয়ব মিলিয়ে যায় ধাতব রেখার জালে। যেন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এক দৃশ্যরূপ—মানুষ কোনো স্থির বস্তু নয়, বরং শক্তি ও সম্ভাবনার ক্ষেত্র (field of energy and potentiality)। গর্মলি বলেছিলেন,“This work tries to find a language for the body in the 21st century—an energy field rather than a fixed thing.”

Quantum Clouds, 2000
এ সময়েরই আরেক প্রতীকী কাজ ফেরেশতার ডানা, Angel of the North (১৯৯৮)—একটি বিশাল লৌহমানব যার ডানা বিস্তৃত ৫৪ মিটার, নিউক্যাসলের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যেন মানবজাতির প্রতিনিধি হয়ে আকাশের সঙ্গে সংলাপে মত্ত। গর্মলি এখানে মানুষকে এক নীরব প্রহরী, এক মহাজাগতিক বার্তাবাহক হিসেবে দেখেছেন—যে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের প্রান্তে, ভূমি ও আকাশের মাঝ বরাবর।

Angel of the North 1998
এসব কাজের মাধ্যমে তাঁর শিল্পের কেন্দ্র ধীরে ধীরে সরে যায় ব্যক্তিগত দেহ থেকে মানবতার সমষ্টিগত উপস্থিতিতে—মানুষ আর ক্ষুদ্র দেহ নয়, বরং অসীম মহাবিশ্বের প্রতিধ্বনি। মানুষকে শক্তিক্ষেত্র ও সময়ের অংশ হিসেবে দেখা শুরু হয় এ পর্বে. যেখানে দেহ হলো এক মাপ, এক ছায়া, আর শূন্যতা হলো তার অনন্ত বিস্তার।
৪. ভেতরের বাহিরানা : এক হতে এককে
দেহের এক থেকে গর্মলি এবার পৌঁছলেন সমষ্টির এককে। তিনি চাইলেন ভাস্কর্যকে একা নয়, বরং হাজারো মানুষের উপস্থিতির ভেতর দেখতে—যেন পৃথিবীর সমস্ত মুখ, চোখ, ও দৃষ্টি মিলেমিশে তৈরি করছে এক নীরব প্রার্থনা। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত সিরিজ Field (১৯৯১–২০০৩)।
প্রথম Field for the British Isles–এ গর্মলি স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিলে তৈরি করান প্রায় ৩৫,০০০টি ক্ষুদ্র মাটির মূর্তি। ক্ষুদ্রার্থে এসবকে মানবমূর্তি মনে না হলেও, সমষ্টিগতভাবে এক বৃহৎ মানবসম্মিলনের মহাপ্রান্তর হিসেবে রূপান্তর লাভ করেছে। প্রতিটি মাত্র কয়েক ইঞ্চি উঁচু, কিন্তু চোখদুটো বড়, গম্ভীর, আর একই দিকে তাকানো। তারা একত্রে দাঁড়িয়ে আছে গ্যালারির মেঝেতে—হাজার হাজার ছোট দেহ, কিন্তু এক বিশাল দৃষ্টি। এটা এক উল্টো অভিজ্ঞতা—সাধারণত দর্শক ভাস্কর্য দেখে, কিন্তু এখানে ভাস্কর্যগুলোই যেন দর্শকদের দেখছে। গর্মলির ভাষায়, “Field is about the collective energy of human beings—the earth looking at itself.”

Close up of one of Antony Gormley’s `Field’ works

An installation view of ANTONY GORMLEY's Asian Field
এরই সম্প্রসারিত রূপ Asian Field (২০০৩)—চীনের গুয়াংডং অঞ্চলে স্থানীয় কারিগর ও গ্রামবাসীদের হাতে তৈরি হয় ২,১০,০০০ মাটির ফিগার। প্রতিটি ফিগার আলাদা, প্রতিটি চোখ ভিন্ন—কিন্তু একসঙ্গে তারা হয়ে ওঠে মানবতার এক নিঃশব্দ ঐকতান। এ যেন পৃথিবীর আত্মপ্রতিকৃতি—যেখানে মানুষ শিল্পের বিষয় নয়, বরং শিল্পেরই স্রষ্টা।
এ সময়েই গর্মলি মানুষের ভেতর আর বাইরের সীমানা নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। Blind Light (২০০৭) নামের কাজটিতে দর্শক প্রবেশ করে এক কাচের ঘরে—ভেতরে ঘন ধোঁয়ায় ভরা সাদা আলো। ভেতরে ঢুকলেই নিজের দেহ মিলিয়ে যায়, হাতের কাছে থাকা মানুষকেও দেখা যায় না—শুধু আলো আর ধোঁয়ার ভেতর এক বিভ্রান্ত অবস্থান।
এ যেন দেহের বিলোপ, কিন্তু চেতনার উন্মোচন। তিনি বলেন, “Inside the light you lose your body but find your being.”

Blind Light, 2007
গর্মলির কাছে এটি ছিল reverse sculpture—যেখানে শিল্পকর্ম গড়া নয়, বরং অভিজ্ঞতা সৃষ্টি। দর্শক আর শিল্প আলাদা থাকে না তখন; দেহ, আলো, সময়, স্থান—সব মিশে যায় এক অভ্যন্তরীণ প্রান্তরে। এ পর্বে দেহ ও স্থানকে একক অস্তিত্বে মিলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলে। এইভাবে তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে মানব অস্তিত্বের একক মানচিত্র, যেখানে প্রতিটি মানুষ এক বিন্দু আলো, আর সব আলো মিলে তৈরি করে এক অন্তহীন ক্ষেত্র বা স্থান।
৫. আলো, ভার ও উপস্থিতি : প্রাণ ও প্রকৃতির মন্তাজ
গর্মলির শিল্পযাত্রা যতই পরিণতির দিকে এগিয়েছে, ততই তাঁর আগ্রহ বেড়েছে দেহের বাইরের অসীম পরিসর নিয়ে—যেখানে মানুষ আর পৃথিবী আলাদা নয়, বরং একই জীবন্ত নকশার অংশ।
২০০২ সালে তৈরি Inside Australia তাঁর সেই ভাবনার প্রতীক। অস্ট্রেলিয়ার লেক বলার্ড নামের এক প্রাগৈতিহাসিক শুকনো হ্রদের তটে তিনি স্থাপন করেন ৫১টি দেহভাস্কর্য—প্রতিটিই তৈরি স্থানীয় মানুষের দেহ–স্ক্যান থেকে, কিন্তু সেগুলো ধাতবভাবে পাতলা, প্রসারিত ও সরলীকৃত। বিস্তীর্ণ সাদা লবণভূমিতে ছড়িয়ে থাকা এ দেহগুলো দূর থেকে ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো, কিন্তু সূর্যালোকে ঝলমল করে উঠলে মনে হয় তারা আলো ও মাটির মধ্যবর্তী সেতুবন্ধ। গর্মলি বলেন,“These figures are not sculptures of people, but measurements of existence—each a coordinate between earth and sky.”

Inside Australia
এরপর আসে Event Horizon (২০০৭–২০১০)—লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, হংকং, সাও পাওলো—পৃথিবীর নানা শহরের ছাদে তিনি স্থাপন করেন মানুষের দেহরূপ লৌহভাস্কর্য। কেউ দেখে ভাবে, হয়তো কেউ আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে; কেউ আবার ভাবে, শহর নিজেই এখন চিন্তামগ্ন। এখানে গর্মলির লক্ষ্য ছিল দর্শককে নিজের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্নে ফেলানো—তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছো? কী দেখছো? আর তোমার শরীর কোথায় শেষ হয়?
এই “দেহের দিগন্ত” ধারণাই তাঁর কাজকে মহাজাগতিক ও মানবতাবাদী দুই দিকেই ছড়িয়ে দেয়।

Event Horizon, Hong Kong
পরে Horizon Field (২০১০–২০১২) সিরিজে তিনি অস্ট্রিয়ার আল্পস পর্বতে স্থাপন করেন ৩২০টি দেহভাস্কর্য, প্রতিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,০০০ মিটার উচ্চতায়, যেন মানুষ আর প্রকৃতি সমান উচ্চতায় একসঙ্গে দণ্ডায়মান। এটা আর ভাস্কর্য থাকে না, বরং হয়ে ওঠে মানব উপস্থিতির জ্যামিতি—যেখানে শরীর, স্থান, ও দূরত্ব একে অপরের সংলাপে জড়িয়ে যায়।
সবশেষে তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলিতে (Absent, Subject, Matrix, Alert, Cave) গর্মলি ফিরে গেছেন দেহ ও স্থাপত্যের ঘন সম্পর্কের দিকে—যেখানে মানুষ নিজেই হয়ে ওঠে একটি কক্ষ, একটি গহ্বর, একটি ঘনকাকার ধাতব স্থিরতা। কখনও সেই দেহ ঝুলে থাকে শূন্যে, কখনও দেয়ালের সঙ্গে মিশে যায়—এ যেন ভাস্কর্য নয়, বরং এক অস্তিত্বের মানচিত্র, যেখানে দেখা যায়—আলো ও অন্ধকার, শূন্যতা ও ভার, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি—সবই একে অপরের প্রতিফলন।

Horizon Field series in Alps
গর্মলি আজও বিশ্বাস করেন,“Sculpture is not about making an object, but about making a place where we can sense ourselves.”
তাঁর কাছে শিল্প মানে কোনো দৃশ্য নয়, বরং এক ধ্যানমগ্ন স্থান—যেখানে মানুষ নিজেকে, পৃথিবীকে, এবং মহাবিশ্বকে একসঙ্গে অনুভব করতে পারে। এইভাবেই তাঁর শিল্প শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় মানুষের অস্তিত্বের আধ্যাত্মিক জ্যামিতিতে—যেখানে দেহ হলো কেন্দ্র, আর শূন্যতা তার চিরন্তন পরিসর।
৬. সমসাময়িক পর্ব: শিল্প ও বিজ্ঞান, ধ্যান ও ডেটা
অ্যান্টনি গর্মলির সাম্প্রতিক কাজে তাঁর শিল্প যেন একদিকে অতিলৌকিক, অন্যদিকে গাণিতিকভাবে স্থির। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন তিনি শরীর, স্থাপত্য, এবং শূন্যতার সম্পর্ককে এমনভাবে গেঁথে ফেলেছেন, যা একাধারে দার্শনিক, ভৌত, ও ধ্যানমগ্ন।

Cave 2019 (Outside)

Cave 2019 (Inside)
২০১৯-এর পর গর্মলির কাজের কেন্দ্রে আসে স্থানের গঠন — এমন কাজ যা দর্শককে দেহের ভেতরে প্রবেশ করার আমন্ত্রণ জানায়।
২০১৯ সালে লন্ডনের Royal Academy of Arts–এ প্রদর্শিত Cave ইনস্টলেশন এমন একটি অসাধারণ স্থাপনা-ভাস্কর্য। এটি এক আর্কিটেকচারাল স্কেল–এর ঘন কিউবয়েড কাঠামো, যার বাইরে এক ভাস্কর্য দৃশ্য, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই গহ্বরের মতো অবস্থা: আলো কম, প্রতিটি পথ ও বাঁক যেন আমাদের নিজের দেহের ভেতরকার অন্ধকার ও কৌতূহলকে প্রতিফলিত করে।
গর্মলি বলেন, “When you enter this dark geometry, you enter the architecture of your own body.”
এরপরের সিরিজ Matrix (2019–ongoing)–এ তিনি খণ্ড-খণ্ড রেখার মতো ইস্পাত কাঠামো দিয়ে তৈরি করেছেন একটি বিশাল ভাসমান ঘন জাল—যা একই সঙ্গে কোষ, কোয়ান্টাম ফিল্ড, ও দেহের প্রতিচ্ছবি। এখানে “ভর” নেই, আছে কেবল সংযোগ। দর্শক ভেতরে দাঁড়িয়ে অনুভব করে যেন পুরো বিশ্বজগৎ এক নেটওয়ার্ক, আর মানুষ তার ভেতর এক ক্ষুদ্র দেহতরঙ্গ। এসব কাজে গর্মলির মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় presence without object—অর্থাৎ বস্তু ছাড়াই উপস্থিতি অনুভব করানোয়।

Matrix III
আবার Host হলো জল, মাটি, আলো, ও নীরবতার সংলাপ। Host–এ গ্যালারির মেঝে ভরে দেওয়া হয় কাদামাটি ও সমুদ্রের জলে—যেন এক পরিবর্তনশীল জীবন্ত পরিসর, যেখানে দর্শককে ভাবতে হয়: “এই ঘর আমার ভেতর, না আমি এই ঘরের ভেতর?”
গর্মলির নিজের ভাষায়,“The work asks: what is our relationship to the earth, to stillness, to ourselves?”
একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে গর্মলির শিল্প এক নতুন পরিসরে প্রবেশ করেছে—যেখানে ধাতু, আলো, জ্যামিতি ও নীরবতার মিলনে গঠিত হচ্ছে চেতনার স্থাপত্য।
এই সময়ের প্রতিটি কাজ—Body Politic (2023), Aerial (2024), Time Horizon (2024), Body Buildings (2024–25) মানুষের শরীরকে আর পদার্থ হিসেবে দেখে না, বরং এক শক্তিক্ষেত্র (energy field) হিসেবে চিনে নেয়। তাঁর কাজ আরও বেশি আত্মমগ্ন ও প্রযুক্তি–সচেতন হয়ে উঠেছে। দেহ এখানে শক্তিক্ষেত্র ও তথ্যরূপে প্রকাশিত।
এখানে দেহ আর মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই; সে ভাসছে তথ্য, তড়িৎ ও আলোকরশ্মির সংলাপে—যেখানে প্রতিটি রেখা, প্রতিটি কিউব, প্রতিটি ছায়া একেকটি Data point হয়েেউঠেছে যেন। গর্মলি যেন শিল্পের ভাষায় মানব মস্তিষ্কের ম্যাপ তৈরি করছেন—যেখানে মাপা হচ্ছে শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়, বরং চেতনার গতি ও অস্তিত্বের তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

Body buildibgs, White Cube Bermondsey, London
Body Politic–এ ইস্পাতের রডে তৈরি দেহগুলো যেন সামাজিক অঙ্গসংস্থান; প্রতিটি শরীর মিলিত হয়ে গড়ে তোলে এক অদৃশ্য সমাজদেহ—যেখানে ব্যক্তির চেয়ে বৃহত্তর কোনো সমন্বয় কাজ করছে। Time Horizon–এ শতাধিক মানবমূর্তি একই সমতলে, কিন্তু ভিন্ন দূরত্বে দাঁড়িয়ে; যেন সময়ের প্রতিটি বিন্দু সমান উচ্চতায় বিদ্যমান, আর মানুষ তাতে নিজের স্থান নির্ণয় করছে। আর Body Buildings–এ স্থাপত্য ও দেহ একাকার হয়ে গেছে—ইট, কাদা, আলো ও বাতাসে গড়া এক স্পন্দিত নগরদেহ; যেন শহর নিজেই শ্বাস নিচ্ছে, মানুষের অভ্যন্তরীণ ছন্দে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।
এ পর্বে গর্মলির শিল্প হয়ে উঠেছে ধ্যান ও ডেটার সংলাপ। যেখানে বিজ্ঞান পরিমাপ দেয়, ধ্যান দেয় অর্থবোধ, আর শিল্প সেগুলোকে মিলিয়ে তৈরি করে এক অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ জগৎ—যার মাপে মানুষ এখন একসঙ্গে কণিকা ও তরঙ্গ, দেহ ও ক্ষেত্র।
এই সমসাময়িক পর্বে গর্মলি যেন নিজের শিল্পজীবনের পূর্ণবৃত্ত সম্পূর্ণ করছেন। Full Bowl–এর সেই ছোট্ট শূন্যতা এখন হয়ে উঠেছে মহাবিশ্বের পরিমাপ—একটি void যা আলো, দেহ, স্থান ও সময়—সবকিছুকে ধারণ করে। মানুষের দেহ এখন আর কোনো ভাস্কর্য নয়, বরং এক স্থানের সম্ভাবনা, যেখানে বসবাস করে—অস্তিত্বের নীরব ও অসীম আলো।

Body Space Time, Galleria Continua, San Gimignano, Italy
১৯৯৪ সালে টার্নার পুরস্কার ও ২০১৪ সালে নাইট উপাধি পাওয়া সমকালীন বিশ্বের মহান শিল্পী অ্যান্টনি গর্মলির প্রতিটি প্রধান কাজই যেন একেকটি যুগচিহ্ন বা যুগস্মারক।
তাঁর শিল্পে দেহ কখনো স্থির, কখনো ভেঙে যাচ্ছে, কখনো প্রকৃতির সাথে এক হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই দেহ হয়ে ওঠে স্মৃতি, আত্মিক গভীরতা ও অসীমের সাক্ষ্য। যদিও তিনি বলেন, ‘‘আমার দায়িত্ব পুরস্কার পাওয়া নয়। দায়িত্ব হলো দর্শককে তার নিজের শরীরের ভেতরের শূন্যতা অনুভব করানো।’’
: : শিল্পবুদ্ধের নির্বাণপথ : :
“যখন আমি শরীরের ভেতরের অন্ধকারে ঢুকলাম”— অ্যান্টনি গর্মলি এক সাক্ষাৎকারে বলছেন,“আমি তখন আমার শরীরের ছাঁচ নিতে শুরু করি, তখন অদ্ভুত এক মুহূর্ত আসে। শরীরটা ঢাকা থাকে প্লাস্টারে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখ কিছু দেখতে পায় না—শুধু ভেতরের শব্দ শুনি, হৃদস্পন্দন আর শ্বাসের গুঞ্জন। তখন বুঝি, আমরা বাইরে নই, ভেতরের অন্ধকারে বাস করি। সে অন্ধকারে কোনো ভয় নেই, বরং তা আমাদের আসল স্থান—যেখানে চেতনার জন্ম হয়।”
অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত যে আলো সে আলোয় নিত্যস্নান সেরে গর্মলি থেমে থাকেন না। তাঁর চোখ সবসময় ভবিষ্যতের দিকে, শিল্পের মুক্তির দিকে। আরেক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তাঁর সবচেয়ে পাগলাটে স্বপ্নের কথা।

তিনি চেয়েছিলেন মধ্য এশিয়ার কোথাও—কাজাখস্তান বা আজারবাইজানে—এক বিশাল ভূগর্ভস্থ গম্বুজ বানাতে। ওপরে কিছুই দেখা যাবে না। মাটির নিচে থাকবে এক অসীম গহ্বর, যেন পৃথিবীর গর্ভে বানানো প্যানথিয়ন। ওখানে মানুষ জমায়েত হবে, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবে, কিংবা গাইবে সমবেত কোরাস। ওপরের ছোট্ট ফাঁকা দিক দিয়ে ঢুকবে আলো, প্রতিধ্বনি হবে সংগীতের।
এটা এখনো স্বপ্ন, কাগজে আঁকা কিছু রেখা। কিন্তু স্বপ্নই তো গর্মলির আসল শক্তি।
আরেক স্বপ্ন ছিল ইতালির ফ্লোরেন্সে—পিয়াজ্জা সিগনোরিয়াতে তিরিশটা মার্বেল দেহ, শুয়ে থাকবে চত্বর জুড়ে। ডেভিড, পার্সিয়ুস, স্যাবাইন নারীর ভাস্কর্যের পাশে মানুষ দেখবে এই ঘুমন্ত দেহগুলো। কেউ ভাববে—“শিল্প মানে শুধু বীরত্ব নয়, শান্তিও।”
সব স্বপ্ন বাস্তব হয়নি, কিন্তু গর্মলি জানেন—শিল্প শুধু তৈরি করাই নয়, স্বপ্ন দেখানোও।
৭৫ বছরের তরুণ এ শিল্পবুদ্ধ হয়তো এ মুহূর্তে তাঁর স্টুডিওর জানালায় আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবন্ত ধ্যানের প্রতিমা হয়ে মানুষকে আবারো বলে উঠবেন—
“যেদিন মানুষ কল্পনা করা বন্ধ করবে, সেদিনই শিল্পের মৃত্যু ঘটবে।”

Hold II, Body And Light drawing series
সূত্র :
১. https://www.antonygormley.com
2. https://www.antonygormley.com/resources/texts/silence-and-stillness-antony-gormley-interviewed-by-enrique-juncosa
3. Antony Gormley: Being Human - imagine... - BBC
4. https://www.antonygormley.com/resources/texts/body-as-place-antony-gormley-outside-in
5. https://www.independent.co.uk/arts-entertainment/art/news/sir-antony-gormley-interview-i-don-t-have-any-choice-over-this-it-s-what-i-was-born-to-do-10236697.html
6. https://brooklynrail.org/2016/05/art/antony-gormley-with-allie-biswas
7. Wilson, Robert. “The Body of Antony Gormley,” Interview Magazine, May 11, 2016.
8. https://www.royalacademy.org.uk/exhibition/antony-gormley
9. https://culturieuse.blog/wp-content/uploads/2019/12/antony-gormley-exhibition-online.pdf