রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ ছবির সন্ধানে
“এই ছবি তো বিশ্বভারতীর সেই ২৫ ছবির অ্যালবামে নেই! দুটি ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু দুটিই মনোবীণা রায়ের তোলা। ভিডিওতে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, এটুকু বুঝা হলো, এই ছবি আগে কখনো দেখিনি। ”
এই লেখাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অপ্রচলিত ও ভীষণ দুর্লভ আলোকচিত্র নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের যে প্রতিকৃতিটি খুঁজে পাওয়ার গল্প বলতে বসেছি, সেটি সম্ভবত কখনো বঙ্গদেশ পর্যন্ত পৌঁছায়ই নি। বঙ্গদেশ বলতে দুই বাংলার কথা বলছি। ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ বিশ্বকবির ২৫টি আলোকচিত্র নিয়ে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। নাম রাখা হয়, ‘টুয়েন্টি পোরট্রেটস অব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। এই অ্যালবামে কবির জীবনের প্রথম ফটোগ্রাফ থেকে শুরু করে মৃত্যুর কিছুদিন আগে তোলা ছবি জায়গা পায়। ছবিগুলো তুলেছিলেন সুকুমার রায় ও সত্যেন্দ্রনাথ বিশীসহ দেশি-বিদেশি আলোকচিত্রীরা। প্রথম ছবিটি ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকের গোড়ার দিকে তোলা। আর শেষ ছবিটি ১৯৪১ সালের জুলাইয়ের। দ্বিতীয় ছবিটি তোলা হয় ১৮৮৫ সালে। ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ নাটকে বাল্মীকি চরিত্রে তরুণ রবীন্দ্রনাথ—সবার পরিচিত ছবিটি তুলেছিল ‘বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড’। ২০ নম্বর ছবিটিতে এসে চোখ আটকে যায়। এটি একজন নারী আলোকচিত্রীর তোলা। পুরো অ্যালবামে নারী আলোকচিত্রী হিসেবে একজনের নামই পাওয়া যায়, তিনি মনোবীণা রায়।
শুধু তাই নয়। মনোবীণার তোলা ছবিটি দিয়েই ওই অ্যালবামের প্রচ্ছদ করা হয়েছিল। পুরো অ্যালবামটির একটি পিডিএফ সংস্করণ এখনো পাওয়া যায়। ছবিটি ১৯৩৯ সালে কবির জন্মদিন উপলক্ষে তোলা। কবি তখন তিন সপ্তাহ বিশ্রাম নিতে ওড়িশায় গিয়েছিলেন। পুরীতে তার জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছিল তখনই ছবিটি তুলেছিলেন মনোবীণা। ছবিতে দেখা যায় কবির মাথায় টুপি ও গলায় কণ্ঠহার। ছবির ইংরেজি ক্যাপশন অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “৯ মে, পুরী, ‘পরমগুরু’র পোশাকে রবীন্দ্রনাথ, তার ৭৯তম জন্মবার্ষিকীতে উপাধিটি দিয়েছেন পুরীর রাজা।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি দুর্লভ ছবির সন্ধানে নেমে পড়ার শুরুটা হয়েছে এই সূত্র ধরেই। এই ছবি মনোবীণা রায় সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
জানলাম, তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বিমল রায়ের সহধর্মিনী। তার যমজ বোন দেবলীনা রায়। এই উপমহাদেশে গোড়ার দিককার হাতেগোনা নারী আলোকচিত্রীদের মধ্যে এই দুই বোন অন্যতম। তাদের জন্ম ১৯১৯ সনের ২৭ নভেম্বর—বেনারসের রামনগরে। তাদের বাবা বিনোদবিহারী সেন রায় ছিলেন মহারাজা প্রভু নারায়ণ সিংয়ের মেস্টন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি যুবরাজের গৃহশিক্ষকও ছিলেন। মেস্টন হাই স্কুল ছিল শুধুমাত্র ছেলেদের। তাই বিনোদবিহারী তার কন্যাদের শিক্ষার জন্য কলকাতা থেকে আসা মণীন্দ্রনাথ নামে একজনকে আবাসিক গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। দুই বোন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। বিনোদবিহারী সেন রায় ছিলেন ব্রিটেনের ‘দ্য রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’র সদস্য। তিনি চাইতেন তার কন্যারাও ফটোগ্রাফিচর্চা করুক। বীণা ও লীনা মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরা উপহার পান। বিনোদবিহারী কন্যাদের জন্য বাড়িতে একটি ডার্করুমও তৈরি করে দিয়েছিলেন। বিমল রায় ছিলেন মনোবীণাদের কাকিমা বিভাময়ীর ভাই। সেই সূত্রে বিমলের সঙ্গে মনোবীণার পরিচয় ও প্রেম। ১৭ বছর বয়সে ২৮ বছরের বিমল রায়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তখন অবশ্য বিমল চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠেননি, ছিলেন একজন সিনেমাটোগ্রাফার। দুই বোনের ছবিগুলো প্রথম ছাপা হয় ১৯৩৭ সালে ‘সুচিত্র ভারত’ পত্রিকায়। ১৯৪০ সালে তাদের ছবি প্রথম প্রদর্শিত হয় এলাহাবাদে।
গার্হস্থ্য-ফটোগ্রাফি ছাড়াও মনোবীণা তার আশপাশের জীবনযাপন এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্যামেরাবন্দী করেছেন। তার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন জাওয়াহারলাল নেহরু, কৃষ্ণ মেনন, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ধীমানরা। নেহরুর ছবি তোলার গল্পটি মজার। মনোবীণা নেহরুকে রাজি করিয়েছেন তার ছবি তুলবেন। কিন্তু উত্তেজনায় ক্যামেরার ফিল্মই সঙ্গে নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। ভীষণ মন খারাপ হয়। তারপরও তিনি নেহরুর কাছে অন্য কোনো দিন ছবি তোলার অনুমতি চান, নেহরু রাজি হয়েছিলেন। ১৯৫৯ সালে বিলেতে গিয়েও অনেক ছবি তুলেছিলেন এই অন্যতম পথিকৃৎ নারী আলোকচিত্রী। আরও জানা গেল, তাদের দুই বোনের ফটোগ্রাফিকর্ম নিয়ে দুটি পিএইচডি গবেষণা হয়েছে।
মনোবীণাকে নিয়ে পড়াশোনা করতে করতেই জানলাম, ৮২ বছর বয়সে ২০০১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর ১৮ বছর পর, ২০১৯ সালের নভেম্বরে মনোবীণার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন রায় দম্পতির ছেলে জয় বিমল রায়। ‘আ ওমেন অ্যান্ড হার ক্যামেরা’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি মুম্বাইসহ একাধিক বড় শহরে আয়োজন করা হয়েছিল। মনোবীণার ইচ্ছে ছিল তারও যেন একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। হলো, কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারলেন না।
এই প্রদর্শনী নিয়ে একটি ভিডিও কন্টেন্ট পাই ইউটিউবে। ভিডিওটির এক জায়গায় এসে আমার চোখ রবীন্দ্রনাথের একটি ছবিতে এসে আটকে যায়। ছবিটি দেখে আমি অবাক হই। এই ছবি তো বিশ্বভারতীর সেই ২৫ ছবির অ্যালবামে নেই! দুটি ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু দুটিই মনোবীণা রায়ের তোলা। ভিডিওতে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, এটুকু বুঝা হলো, এই ছবি আগে কখনো দেখিনি। গুগলের মাধ্যমে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও এর সঙ্গে মেলে—এমন কোনো ছবির সন্ধান পাওয়া গেল না। খুব ক্লোজআপ—খাড়া একটি ছবি। ছবিতে কবির বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট, কবি যেন বলছেন, ‘আকাশে পৃথিবীতে/ এ জন্মের ভ্রমণ হল সারা/ পথে বিপথে/ আজ এসে দাঁড়ালেম/ প্রথমজাত অমৃতের সম্মুখে’। ছবিটি এমনভাবে কম্পোজ করা হয়েছে যাতে দর্শকের চোখ সবার আগে কবির চোখের ওপরই পড়ে। কপালে গভীর ভাঁজ, নাকের ছায়াময় খাঁজ ‘কবিতার ঋষি’র চোখ দুটিকে ঘিরে রেখেছে। আর শুভ্র চুল-দাড়ির ঢেউ যেন একটি জ্যোতির্বলয়ের হয়ে মলিন মুখটি ঘিরে আছে। ছবিটি পোজ দেওয়া নয়—মনে হয় কবি ধ্যানমগ্ন।
নিশ্চিত তো হতে হবে। বিশ্বভারতীর অ্যালবামের ছবিটির মতো এই ছবিটিও কি মনোবীণার তোলা? অনেকদিন ধরে চেষ্টা করেও কূল-কিনারা করতে পারছিলাম না। ফেসবুকে খুঁজে বের করি মনোবীণার পুত্র জয় বিমল রায়কে। তাকে ভিডিওর স্ক্রিনশট পাঠিয়ে জানতে চাই, ছবিটি তার মায়ের তোলা কিনা। তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, এটি আমার মায়ের তোলা।’ এভাবেই তার সঙ্গে আমার আলাপ শুরু হয়। তিনি তার মায়ের স্মৃতিচারণ করলেন এবং আমি তার মাকে নিয়ে লিখছি শুনে ভীষণ আনন্দিত হন। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি আমাকে মনোবীণা রায়ের তোলা রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় ছবির একটি কপি ইমেইলের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। আমার সঙ্গে কথা বলে জয়ের একটি ভুল ভাঙে। বিশ্বভারতীর অ্যালবামে যে তার মায়ের একটি ছবি ছাপা হয়েছিল তা তিনি জানেন, কিন্তু সেটি কখনো দেখেননি। তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন, তাদের কাছে থাকা ছবিটিই ওই অ্যালবামে ছিল। আমি জয়কে বিশ্বভারতীর অ্যালবামটিতে ছাপা হওয়া ছবিটি পাঠাই। তিনি আমাকে জানান, এই ছবিটি তাদের কাছে নেই এবং তারা আগে কখনো এটি দেখেননি। তার ধারণা ছিল, তার মা রবীন্দ্রনাথের একটি ছবিই তুলেছিলেন।
মানে দাঁড়াল, মনোবীণা রায় রবীন্দ্রনাথের কমপক্ষে দুটি ছবি তুলেছিলেন। একটি ছাপা হয় বিশ্বভারতীর করা ২৫টি ছবির অ্যালবামে। আরেকটি আছে জয় বিমল রায়ের কাছে। এখন কথা হলো, বিশ্বভারতীর ছবিটি তো ১৯৩৯ সালে ওড়িশার পুরীতে তোলা। জয়ের কাছে থাকা ছবিটি কবে, কোথায় তোলা? দুটি ছবি কি একই স্থানে, একই সময় তোলা? জয় নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তার অনুমান ছবি দুটির মধ্যে কয়েক বছরের ব্যবধান রয়েছে এবং তার সংগ্রহে থাকা ছবিটি শান্তিনিকেতনে তোলা। হতে পারে। শান্তিনিকেতনের কলাভবন মিউজিয়ামের কিউরেটর, চিত্রশিল্পী ও প্রাবন্ধিক সুশোভন অধিকারী তার ‘কবির আলোকচিত্র থেকে জীবনচিত্র’ গ্রন্থে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের সঙ্গে মনোবীণার ‘ঘনিষ্ঠতা ছিল সুবিদিত’। জয়ের ধারণা, তার সংগ্রহের ছবিটি কবির ‘মৃত্যুর খুব বেশি আগের নয়’।
রবীন্দ্রনাথের ছবির অভাব নেই। গুগলে সার্চ দিলে পাওয়া যাবে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির তোলা ছবিও। সিদ্ধার্থ ঘোষ তার ‘ছবি তোলা : বাঙালির ফোটোগ্রাফি-চর্চা’ বইয়ে বলেছেন, ‘…অনেক বিষয়ের মতো ফোটোগ্রাফারদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র জগতের কথা বাদ দিলে উদয়শঙ্কর ছাড়া আজ অবদি আর কোনো বাঙালির বিভিন্ন বয়সের ও মেজাজের এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ ফোটোগ্রাফিক সম্ভার আর রচিত হয়নি।’ সেই সম্ভারে যোগ হতে যাচ্ছে আমাদের আলোচিত আলোকচিত্রটি—এই ভেবেই ভালো লাগছে।
অন্যান্য তথ্যসূত্র:
thehindu.co
scroll.in
imp-art.org
thewire.in
Ramblings of a Bandra Boy - Joy Bimal Roy
