Published : 17 May 2024, 03:35 PM
“উহু, যাজককে আমাদের দুর্দশার কথা বলবে না,
হয়তো তিনি এটাকে পাপ বলবেন;
এই যে-আমরা সারা রাত বনে ছিলাম,
এক-ভৌতিক গ্রীষ্মের মাঝে!"
বাক্যগুলি রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর পাক অব পুকস হিল বইয়ের 'অ্য সঙ অব ট্রি' কবিতার অংশ বিশেষ। প্রকৃতি, উৎসব আর পার্বনকে আবর্ত করে লেখা কিপলিংয়ের এই কবিতাটি বহু বছর ধরে বেল্টেইন উৎসবের একটি জনপ্রিয় গান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
সেল্টিক ক্যালেন্ডারে দুটি ঋতু চক্র বিবেচনা করা হয়। গ্রীষ্ম এবং শীত। শীতের রুক্ষতা যখন শেষ হয়, তখন প্রকৃতি সবুজের ডানা মেলে ধরে। এপ্রিলের শেষ থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বেল্টেইন উৎসবের জন্য প্রস্তুত হয়। বেল্টেইন একটি সেল্টিক শব্দ যার অর্থ "বেল-এর আগুন" (বেল ছিলেন একজন সেল্টিক দেবতা)। এটি একটি অগ্নি উৎসব, যা গ্রীষ্মের আগমন এবং আসন্ন বছরে ভূমির উর্বরতা কামনা করে উদযাপিত হয়।
সেল্টিক উৎসবগুলি প্রায়শই স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। বসন্তের সময়, যখন তাদের আবাদের দিনপঞ্জি শুরু হয়, তখন প্রত্যেকেই তাদের পরিবারের সমৃদ্ধি এবং অধিক ফসলের আশায় একটি ফলবতী বছরের কামনা করে থাকে।
বেল্টেইনের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রায়শই প্রণয়-প্রার্থনার একটি পর্ব দেখা যায়: উদাহরণস্বরূপ, এই সময় যুবক-যুবতীরা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে নানা ধরণের ফুল সংগ্রহ করে এবং সন্ধাবেলা তারা আগুন জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসবে মাতে। আর এই উৎসব পর্বের মাঝেই যুবক-যুবতীরা তাদের মনের মানুষকে খুঁজে পায় এবং আসন্ন গ্রীষ্মে বা শরৎকালে তারা বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
বেল্টেইন উৎসবের অন্যান্য সব আচার-পর্বেও আগুন যুক্ত থাকে, যাকে পরিস্কার, শুদ্ধতা এবং জমির উর্বরতা বৃদ্ধিদায়ক বলে মনে করা হয়। এই সময়ে গবাদি পশুদের উর্বরতা নিশ্চিত করতে সেগুলিকে দুই প্রান্তে জ্বলন্ত আগুন ও ধোয়ার মাঝ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
আজও পৌত্তলিকরা বিশ্বাস করে যে, বেল্টেইন-এর সময় ঈশ্বর (যাকে দেবী *দক্ষিণায়নে জন্ম দিয়েছিলেন) প্রণয়-প্রার্থনার জন্য শক্তি এবং পরিপক্কতা অর্জন করেন এবং দেবীর প্রেমিক হন। যদিও শস্যক্ষেত্রে আজকাল যা ঘটছে তাতে করে বেশীরভাগ পৌত্তলিকদের কাছে বেল্টেইন-এর তাৎপর্য ফুরিয়ে গেছে, তবুও উর্বরতা সৃষ্টি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এমা রিস্টল অর্ হলেন একজন আধুনিক যুগের দ্রূইদ বা আধ্যাত্মিক নেতা। তিনি "আমাদের ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার উর্বরতার" কথা বলেন (স্পিরিট অফ দ্য সেক্রেড গ্রোভ, প্রকাশনা, থরসনস্, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা. ১১০)। এই নারী দ্রূইদ মানুষের সক্রিয় ও সৃজনশীল জীবনের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের কাজ, পরিবার এবং আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই একটি উর্বর মন দরকার।"
আগুন এখনও বেশীরভাগ বেল্টেইন উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং এর সাথে অনেক ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। এটিকে পরিশুদ্ধকারী গুণাবলী হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা নির্মল ও পুনরুজ্জীবিত করে। আগমনী বছরে সৌভাগ্য, উর্বরতা (মন, শরীর ও আত্মার) এবং সুখ বয়ে আনতে মানুষ বেল্টেইনের আগুনের উপর দিয়ে লাফ দেয়।
যদিও বেশীরভাগ ধর্মীয় গুরুরা বেল্টেইন উৎসবকে একটি প্রকাশ্য যৌনতার উৎসব হিসেবে গণ্য করেন। কিন্তু সেটা পুরোপুরিই দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে। উৎসবটির সাথে যৌনতা আর উর্বরতার সম্পর্ক থাকলেও পৌত্তলিকরা কদাচিৎ তাদের আচার-অনুষ্ঠানে যৌনতা ব্যবহার করে। পুষ্পশোভিত প্রোথিত দন্ডের চারপাশে নাচের ঐতিহ্য এক ধরণের মোহময় যৌন চিত্রকল্প রচিত করে এবং এখনও সেটি আধুনিক পৌত্তলিকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় বেল্টেইন উৎসব এডিনবার্গে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাতে আগুন জ্বালিয়ে ভোর পর্যন্ত উৎসব চলতে থাকে। গ্রীষ্মের শুরুতে সমগ্র যুক্তরাজ্য জুড়ে আগুনের এই উৎসব শুরু হয় এবং কোভেন আর গ্রোভসদের (পৌত্তলিক দলসমূহ) মধ্যে সেটি নিজস্ব পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবর্তিত জলবায়ু, অনিয়মিত ঋতু চক্র, নৃতাত্ত্বিক গণবিলুপ্তি এবং গণ-ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে প্রকৃতি ও তার অপার বৈচিত্র্যকে উদযাপনের গুরুত্ব অসীম। বেল্টেইন উৎসব শুধু যৌনতা ও উর্বরতার ধারণাকেই ধারণ করে না বরং বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সাথে মানুষের অন্তর্ভুক্তি বা ওতোপ্রতভাবে জড়িয়ে থাকারও ইঙ্গিত দেয়। প্রেম এবং আনন্দের সমস্ত কাজই যে প্রকৃতির আপন ধর্ম, সে কথা এই গ্যালিক উৎসবটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়। প্রতি বছর, মে মাসের প্রথম দিনে, চিত্তাকর্ষক এই উৎসটি পালন করা হয়। পৌত্তলিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম প্রধান উৎসবগুলির মধ্যে একটি হল এই বেল্টেইন উৎসব, যেটিকে কখনও খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করা যায়নি! এই দিনে ইউরোপে ছুটি ঘোষণা করা হয়। ইতিহাস জুড়ে এই উৎসব উদযাপনের সমৃদ্ধি ও উর্বরতার দু’টি স্বতন্ত্র স্বাদ রয়েছে। একটি পার্বনে প্রকৃতি এবং জীবিকার এই আশাবাদী ফল কামনা করার চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে?
সম্ভবতঃ এই কারণেই উরুগুয়ের প্রখ্যাত দার্শনিক ও লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো বলেছেন, "প্রকৃতি বোবা নয়। তার অনেক কিছু বলার আছে। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, আমাদেরকে তার সন্তানদের সাথে এই বধির-বধির খেলা বন্ধ করতে হবে। হয়তো ঈশ্বরও একদিন প্রকৃতির কান্না শুনতে পাবেন এবং তার সংবিধানে একটি সংশোধনী যোগ করবেন, যা তিনি সিনাই পর্বত থেকে ঘোষণা দেবার সময় বাদ দিয়েছিলেন: 'তুমি যে-প্রকৃতির অংশ, তাকে ভালোবাসো।' "
*টীকা: নিরক্ষরেখার উত্তরে বা দক্ষিণে সূর্যের দূরতম অবস্থান কাল। উত্তরায়ণ হল ২১ জুনের কাছাকাছি এবং দক্ষিণায়ন হল ২২ ডিসেম্বরের কাছাকাছি।